মালদ্বীপের কয়েকটি দিন—প্রথম পর্ব
অভিবাসন অফিসারের কাছে পাসপোর্ট দিতেই তিনি আমাদের অন্য লাইন দেখিয়ে দিলেন, লাইনটি খালি ছিল। ইমিগ্রেশন অফিসার জিজ্ঞেস করলেন তোমরা কি ব্যবসার জন্য এসেছ? আমরা জানালাম বেড়াতে এসেছি। অফিসার আমাদের কথায় খুশি হলেন বলে মনে হলো না। আমাদের পাসপোর্টে ডলার এনডোসমেন্ট কত আছে চেক করলেন, ক্যাশ কত আছে জানলেন, ক্রেডিটকার্ডগুলো দেখলেন হোটেল বুকিং ডকুমেন্ট দেখে হোটেলে কল করে চেক করলেন। অতঃপর জানালেন যে আমাদের ভিসা দেওয়া হচ্ছে; কিন্তু যাওয়ার সময় আমাদের দুজনকে একই সঙ্গে ফেরত যেতে হবে। আমরা রাজি হলাম, কিন্তু মনে মনে একটু বিরক্ত হলাম!
বিমানবন্দর থেকে বের হতেই দেখি রাস্তার ওপারেই বিশাল সমুদ্র! অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় কালো পানি আর পানির ওপর ভাসমান কিছু স্পিডবোট ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছে না। কেউ একজন বাংলায় কথা বলে উঠল! আপনারা কি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন? একটু অবাক হয়ে উত্তর দিলাম, জি। আমি হোটেল থেকে এসেছি, আমি রবিন। স্যার প্লিজ আমার সঙ্গে আসুন। বিমানবন্দরের বাইরে হোটেলের গাড়ি অপেক্ষা করছিল, আমরা রওনা হয়ে গেলাম হোটেলের উদ্দেশ্যে।
আমাদের হোটেল হুলুমালেতে। বিমানবন্দর থেকে গাড়িতে সরাসরি যাওয়া যায়। বিমানবন্দর থেকে মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে যেতে হলে স্পিডবোট বা ফেরিতে যেতে হবে। ১০ মিনিটে পৌঁছে গেলাম হোটেলে। মালদ্বীপ মূলত অনেকগুলো দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত একটি রাষ্ট্র। এই হুলুমালে দ্বীপটি একটি কৃত্রিম দ্বীপ। মালে শহরের বাসিন্দাদের বাসস্থান এবং শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মিটাতে সমুদ্রগর্ভে হারিয়ে যাওয়া প্রবাল প্রচীরের এই দ্বীপটিকে পুনরুদ্ধার এবং পুনর্গঠন করা হয়।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
হোটেলে চেক ইন শেষ করে রাস্তায় যখন বের হলাম তখন রাত ৯টা। হোটেলের দুই বিল্ডিং পরেই সৈকত। আন্ধরাকে সমুদ্র ঢেউ সাদা দ্যুতি ছড়িয়ে তীরের দিকে ধেয়ে আসছে, ঢেউয়ের গর্জন শোনা যাচ্ছে। আমরা চট্টগ্রামের মানুষ সমুদ্র আমাদের অতি পরিচিত, অন্ধকারে এই সমুদ্রকে কক্সবাজারে সৈকতের মত মন হলো। আমরা দুই বন্ধু হতাশ হলাম, এত খরচ করে আর কষ্ট করে কেন এইখানে আসলাম! যদিও সকালেই আমাদের হতাশা কেটে যায়। সৈকতে কোনো জনমানবের চিহ্ন না দেখে একটু ভয়ও লাগছে! হোটেলে ফিরে গিয়ে ঘুমানোর সিদ্ধান্ত নিলাম ক্লান্ত বোধ করছি।
হোটেলের রিসিপসনে রবিন আমাদের ম্যানেজারের সাথে দেখা করতে বলল, ম্যানেজার বিরস মুখে আমাদের একটি মূল্য তালিকা দিয়ে বুঝাতে শুরু করল কি কি ধরণের ভ্রমণ বিনোদনে আমরা অংশ নিতে পারি। ম্যানেজারের সাথে আলোচনা করে ভ্রমণকালীন কার্যতালিকা ঠিক করলাম। প্রথম দিন সেন্ড পিকনিক, দ্বিতীয় দিন রিসোর্ট ভিজিট, তৃতীয় দিন ডলফিন সাফারি ও ফিসিং, চতুর্থ দিন স্নো করলিং ও স্কুবা ড্রাইভিং। প্রতিদিনের ভ্রমণ পরিকল্পনা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত, সুতরাং সন্ধ্যার পর সময়টা আমাদের ইচ্ছেমতো ঘুরে কাটানো যাবে। এ ছাড়া আরও অনেক চমকপ্রদ ট্যুরিস্ট অ্যাকটিভিটি লিস্টে ছিল, যা সময় এবং বাজেট অনুযায়ী আমাদের সাধ্যের বাইরে ছিল? মালদ্বীপের পর্যটন সুবিধাগুলো সম্পর্কে যথাসম্ভব তথ্য নিয়ে আমি আর রিপন ভাই ঘুমাতে গেলাম।
সকাল ৮টায় ঘুম থেকে উঠে রুমের জানালার পর্দা সরাতেই অপরূপ সমুদ্রের উঁকি দিল, মনটা আনন্দে ভরে উঠল। কী সুন্দর সকাল! ফিরোজা, হালকা সবুজ আর নীল বর্ণের জলরাশি যেন অভিনন্দন জানাল অসাধারণ এক ভ্রমণ অভিজ্ঞতার জন্য। আর দেরি করা যায় না আমরা প্রস্তুত হলাম মালদ্বীপের প্রথম কর্মসূচি সেন্ড পিকনিকে যাওয়ার জন্য। নিচে নেমে রেস্টুরেন্টে নাশতা শেষ করার আগেই রবিন এসে জানান দিল গাড়ি অপেক্ষা করছে আমাদের জেটিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
জেটিতে পৌঁছে দেখলাম আমাদের সঙ্গে গ্রুপে ইন্দোনেশিয়ান পাঁচজনের একটি পরিবারও যাচ্ছে। মাঝারি আকারের সুন্দর একটি বোট জেটিতে অপেক্ষা করছে। বোট পরিচালনার দায়িত্বে আছে রফিক নামের সুনামগঞ্জের একটি ছেলে এবং তার সহকারী হোটেলের সেই বাংলাদেশী ছেলে রবিন। দুই বাঙালি ভাইকে সঙ্গে পেয়ে যাত্রাটা যেন আরও উপভোগ্য হয়ে উঠল! ইন্দোনেশীয় পরিবারটিও বেশ চমৎকার বাবা, মা, দুই ছেলে আর এক মেয়ে। ট্যুর গাইড সংক্ষেপে ইংরেজিতে বর্ণনা করল আজ আমরা কি করতে যাচ্ছি। বোট নিয়ে আমরা যাব সমুদ্রের মাঝে ডুবন্ত কোনো বালুর দ্বীপে, এখানে মোটামুটি কিছু সময় কাটাব, লাঞ্চ করব বিকেলের আগে ফিরে আসব, ফিরতি পথে স্নোকলিং করা হবে। স্নোকিলিং হলো ড্রাইভিং মাস্ক পরে পানির নিচে উঁকি দিয়ে নিচের কোরাল এবং কোরালের মাছের সৌন্দর্য অবলোকন করা। চলবে...