মালদ্বীপের কয়েকটি দিন—চতুর্থ ও শেষ পর্ব

ছবি: লেখকের পাঠানো

সমুদ্রের বিশাল জলরাশি রাতের অন্ধকারে সফেদ ফেনা নিয়ে ফুলেফেঁপে উঠছে আর ঢেউয়ের বুকচিরে আমাদের বোট এগিয়ে যাচ্ছে গন্তব্যে। মাঝেমধ্যে সমুদ্রবুকে নোঙর করা প্রোমোদতরিগুলো পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় চোখে পড়ছে স্বল্পবসনা পশ্চিমা নর–নারীদের। এই প্রমোদতরিগুলো ভাড়া করে সমুদ্রমাঝে রাত যাপন করা যায়। আমাদের গাইডের তথ্যমতে, পশ্চিমা পর্যটকেরা সপ্তাহ বা মাসের জন্য এই তরিগুলো ভাড়া করে সমুদ্রে অবসর কাটান। অবশ্য পৃথিবীর বহু ধনী এরূপ প্রমোদতরি কিনে রেখেও যান আর মাঝেমধ্যে ছুটে আসেন অবকাশযাপনে।

নিরাপদে হোটেলে ফিরে রাতের খাবার খেয়ে কিছু ঘোরাঘরি, অতঃপর গভীর নিদ্রা। সকালে উঠে প্রস্তুত হলাম স্নোকলিং আর স্কুবা ডাইভিংয়ের জন্য। কিন্তু কেমন যেন ভয় ভয় লাগছে। আগের রাতের হাঙরের মাছ শিকারের ছবিটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে; যদিও হাঙরটা ছিল ছোট প্রজাতির—তিন থেকে চার ফুট হবে। কিন্তু এর চেয়ে বড় প্রজাতির কিছু হাঙর যদি আমাদের দিকে ছুটে আসে! ভিতু বাঙালি মনটা শুধু ভয়ে কুকরে উঠছে আর কৌতূহলী পর্যটক মন সাহস দিচ্ছে। সাহসেরই জয় হলো। আমরা নাশতা শেষ করে ঘাটের দিকে রওনা হলাম। ইন্দোনেশীয় পরিবারটি আজও আমাদের সঙ্গী। তাদের দেখে সাহস আরও একটু বেড়ে গেল; আর আমাদের বাঙালি গাইড দুজন তো আছেই।

আমাদের দুই বন্ধুর ধারণা, যেহেতু মালদ্বীপে প্রচুর বাংলাদেশি, বাংলা খাবারের দোকান নিশ্চয় থাকবে। খুঁজে পেতে খুব একটা দেরিও হলো না। ভাতঘরের মতো ছোট একটা রেস্তোরাঁ।

গাইড দুজন স্পিডবোটে চড়িয়ে আমাদের নিয়ে গেল সমুদ্রের একটি বিশেষ এলাকায়, ডাইভিংয়ের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে তারা মূলত এলাকাটি চিহ্নিত করেছে। একদম নতুনদের ডাইভিং চর্চার জন্য আমাদের দেশি ভাতৃদ্বয় এই জায়গা নির্বাচন করেছে বলে আমাদের জানালেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই বোটে আমদের সবারই একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা। বোটটি ইঞ্জিন বন্ধ করে নোঙর করা হয়েছে, ঢেউয়ের সঙ্গে সঙ্গে বোটটি দাপাদাপি করছে। এতক্ষণ চালু অবস্থায় বোঝা যায়নি ঢেউয়ের দুলুনিটা। এখন দিব্যি টের পাচ্ছি। নিচে অতলসমুদ্র অবশ্য অতটা অতল বলা যাবে না, গাইডদের তথ্যমতে ২০০ থেকে ৫০০ মিটার। এর চেয়ে কম গভীরতা আশা করতে হলে সমুদ্রের উপকূলে গড়াগড়ি দেওয়াই উত্তম!

সমুদ্রের তীরে সুন্দর এক রিসোর্ট ও সূর্যাস্তের ছবি
ছবি: লেখকের পাঠানো

আমরা সরঞ্জামাদি নিয়ে প্রস্তুত। গাইড কিছু ইশারা বা সাইন শিখিয়ে দিচ্ছে পানির নিচে সংকেত আদান–প্রদান করার জন্য। যেমন আমি ফিরে যাব বললে কয়টা আঙুল দেখাতে হবে, আমার সাহায্য দরকার বলার চিহ্ন কী ইত্যাদি। ইন্দোনেশীয় পরিবারটির সবাই একে একে সমুদ্রে নেমে গেল, কিন্তু আমি আর রিপন ভাই নামব কি না, এ দুশ্চিন্তায় কাঠ হয়ে আছি। গাইড দুজন সাহস দিচ্ছে, আপনারা ভয় পাবেন না ইত্যাদি। আগত্যা আমাদের জন্য বয়া নামিয়ে তার ওপর ভর দিয়ে পানির নিচে উঁকি দিয়ে দেখতে বলল। রবিন বলল, সে আমরা দুজনের সঙ্গেই থাকবে। আসলে দেশি এই ভাইয়েরা চাইছিল, আমরা যাতে ডাইভিংয়ের আনন্দ ও অভিজ্ঞতা মিস না করি। আমরাও তাতে রাজি হয়ে গেলাম। বয়া নিয়ে বোট থেকে নেমে গেলাম সমুদ্রে। বয়াগুলো রশি দিয়ে বাঁধা আর রশির মাথা রবিনের হাতে। আমরা বয়ার ওপর ভর করে সমুদ্রের তলদেশে উঁকি দিয়ে দেখছিলাম রঙিন কোরালের অপরূপ সৌন্দর্য আর রঙিন মাছগুলোর খেলে বেড়ানো। হঠাৎ রবিন শার্ক শার্ক বলে সতর্ক করল আর আমাদের অবস্থা হলো ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’। আমি আর রিপন ভাই ডানে–বাঁয়ে নড়েচড়ে হাঙর খোঁজা শুরু করলাম! রবিন পরামর্শ দিল নড়াচড়া বন্ধ করতে, স্থির হতে আর শান্ত হতে। আমরা শান্ত হলাম, কিন্তু ভয়ে শিরদাঁড়া ঠান্ডা হয়ে আছে। মনে হচ্ছে, এই বুঝি হাঙর হামলে পড়ল আমাদের নাদুসনুদুস দেহের ওপর। তবে তার সঙ্গে আমাদের আর সাক্ষাৎ হলো না। আমরাও মনোনিবেশ করলাম কোরাল–জগতের সৌন্দর্য সুধা অনুধাবনে।

আরও পড়ুন

ইন্দোনেশীয় পরিবারটিকে দেখলাম নাশতার টেবিল থেকে নিয়ে আসা পাউরুটি ছোট ছোট টুকরা করে মাছদের খাওয়াতে, ছোট রঙিন কোরালের ঝাঁকও দেখি তাদের আশপাশে দিব্যি খেয়ে আর খেলে বেড়াচ্ছে। অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্যটি দেখে অভিভূত হলাম আর আফসোস করছিলাম, যদি কিছু রুটি আমরাও নিয়ে আসতাম! রবিন বলল, ‘ভাইজান, মালদ্বীপের মানুষ, মাছ—সবই খুব বন্ধুভাবাপন্ন। আমাদের দেশে মাছগুলো আমাদের দেখলে ছুটে পালায় আর এই দেশের মাছগুলো কাছে এসে ঘুরে বেড়ায়।’ তার কথায় হাসব নাকি কাঁদব, বুঝতে পারছি না।

আমাদের ভয় অনেক কমে গেছে। আমরা সাবলীল হয়ে সাঁতার কাটতে শুরু করলাম। ছোট ছোট ডাইভ দেওয়া শুরু করলাম রবিনের পরামর্শমতো। সমুদ্রের তলদেশ সে এক বিচিত্র জগৎ! তলদেশ কোথাও খাড়া হয়ে নিচে নেমে গেছে, আবার কোথাও পাহাড়ের মতো ঢালু! আর এর পৃষ্টদেশে ঘর বেঁধেছে বিভিন্ন প্রজাতির কোরাল, কোরালের গাঁ–জুড়ে ব্যস্ত হাজার প্রজাতির মাছ, ছোট–বড়–মাঝারি; সাদা–কালো, ডোরাকাটা রঙিন; কত বাহারের মাছ, কত ধরনের প্রাণী। খাঁজের গভীরে অন্ধকার, সীমাহীন রহস্য।

ছবি: লেখকের পাঠানো

আমাদের ডাইভিং ১০ থেকে ১৫ ফুট গভীরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এতটুকুতেই আত্মা জুড়িয়ে গেল। কী অসাধারণ রোমাঞ্চ আমাদের মতো সাদামাটা মানুষের জন্য। হোটেলে ফিরে এলাম দুপুর ১২টার আগেই। আজ আর কোনো পরিকল্পনা নেই। কিছু সময় রেস্ট নিয়ে দুই বন্ধু বের হয়ে গেলাম মালদ্বীপের রাজধানী মালে শহরটা ঘুরে দেখব। হলুমালের অপর পাশে মালে মাঝখানে নীলাভ সমুদ্র। মালে যেতে হলে ফেরি বা স্পিডবোটে চড়ে যেতে হবে। ফেরিঘাটের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। ১০ মিনিট পরপর ফেরি ছেড়ে যাচ্ছে। যাত্রীর অভাব নেই, টিকিট কেটে ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করছি। ১০ মিনিট পর ফেরিতে উঠতে পারলাম। একই সময়ে কয়েকটি ফেরি ছেড়ে যাচ্ছে, সিট ক্যাপাসিটি অনুযায়ী যাত্রী নেওয়া হচ্ছে। ফেরিতে উঠেই সিটে বসে পড়লাম। প্রায় ২০০ যাত্রী নিয়ে ফেরিটি যাত্রা করছে। ২০ মিনিটে পৌঁছে গেলাম মালে। রাজধানী মালে পুরোনো ঘিঞ্জি একটি শহর। রাস্তাঘাটগুলো সরু, প্রচুর মানুষের আনাগোনা। ঘাট পেরেয়ে ফিশ মার্কেট আর বাজার। লাঞ্চ করা হয়নি। দুই বন্ধু ক্ষুধার্ত।

আরও পড়ুন

আমাদের দুই বন্ধুর ধারণা, যেহেতু মালদ্বীপে প্রচুর বাংলাদেশি, বাংলা খাবারের দোকান নিশ্চয় থাকবে। খুঁজে পেতে খুব একটা দেরিও হলো না। ভাতঘরের মতো ছোট একটা রেস্তোরাঁ। মাংস, মাছ, শাকসবজি, ডাল, সাদা ভাত—সব আছে। পরিবেশ খুব একটা পছন্দ না হলেও খাওয়া শুরু করলাম। তিন দিন পর বাঙালি খানা খেতে ভালো লাগল। দুদণ্ড জিরিয়ে নিয়ে আমরা দুই পর্যটক হাঁটা ধরলাম, উদ্দেশ্য পুরো মালে হেঁটে দেখা। ৯ বর্গকিলোমিটার ঘুরে দেখা এত জঠিল বিষয় নয়। আমরা ডান হাতের রাস্তা ধরে হাঁটা শুরু করলাম, উদ্দেশ্যহীন হাঁটা। মালের অলিগলি ধরে হেঁটে চলেছি, মাঝের রাস্তাটি সমুদ্রের কিনারার পাশ ঘেঁষে বয়ে গেছে। বিশাল বিশাল পাথরের বাঁধ দিয়ে সমুদ্রের রুদ্র জলরাশিকে শাসন করে রাখা হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্টের এত কাছাকাছি মালদ্বীপ, মনে ভয় জাগে, যেকোনো সাইক্লোন বা সুনামি বুঝি চাইলেই মুছে দিতে পারে এই দেশকে। কিন্তু স্রষ্টার ইচ্ছা অতুলনীয়! সমুদ্রের রানি হয়ে জেগে আছে মালদ্বীপ অপরূপ সাজে।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]