বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান হ্রাসের কারণ: কে দায়ী, জনগণ না রাষ্ট্র?
বাংলাদেশ এক সময় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী পাসপোর্টধারী দেশগুলোর একটি ছিল। এই শতাব্দীর শুরুতেও অনেক দেশেই বাংলাদেশিদের প্রতি একধরনের ইতিবাচক মনোভাব ছিল। ভ্রমণ ও ব্যবসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিকেরা তুলনামূলক সহজেই অনেক দেশে প্রবেশ করতে পারতেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান ক্রমাগত নিম্নগামী। হেনলি পাসপোর্ট সূচক অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ২০০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান নিচের সারিতেই ঘোরাফেরা করছে। প্রশ্ন হলো—কেন এই পতন? কেন বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে, সীমান্তে বা বিমানবন্দরে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর একপাক্ষিক নয়। দায় জনগণেরও আছে, আবার রাষ্ট্র ও সরকারেরও আছে। একদিকে নাগরিকদের সচেতনতা ও নৈতিকতার ঘাটতি; অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থা, দুর্নীতি ও নীতিনির্ধারণে ব্যর্থতা—দুই মিলে আমাদের পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক মানকে ক্রমে দুর্বল করে দিয়েছে।
জনগণের দায়: আমরা নিজেরাই নিজেদের সম্মান নষ্ট করছি—
বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ, যেখানে বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী রয়েছে। কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, দারিদ্র্য, এবং উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা বহু মানুষকে বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখায়। তবে অনেক ক্ষেত্রে এই বিদেশগমন অবৈধ পথে হয়; কেউ কেউ সমুদ্রপথে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করে, কেউ আবার ট্যুরিস্ট ভিসায় গিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশে ফিরে আসে না বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে আশ্রয় (Asylum) প্রার্থনা করে।
প্রতিবছরই বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর আসে ভূমধ্যসাগরে ডুবে বহু বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন, কিংবা অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টাকালে গ্রেপ্তার হয়েছেন। এসব মানুষ দালালের প্রলোভনে পড়ে জীবনের ঝুঁকি নেন, কিন্তু অধিকাংশ সময় তাঁদের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইউরোপে পৌঁছানো অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা শীর্ষ দশের মধ্যে রয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মহলে ‘অবৈধ অভিবাসী-উৎস দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এই ধরনের অবৈধ অভিবাসন বহির্বিশ্বে বাংলাদেশকে এমন একটি দেশ হিসেবে উপস্থাপন করে, যেখানে নাগরিকরা দারিদ্র্য ও বেকারত্বে অতিষ্ঠ হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও দেশ ছেড়ে পালাতে চায়।
বাংলাদেশ থেকে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালিতে অবৈধ অভিবাসনের প্রসঙ্গ টেনে ঢাকায় নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো সম্প্রতি বলেছেন, ২০২৫ সালে ১৮ হাজারের বেশি বাংলাদেশি নৌকায় লিবিয়া হয়ে ইতালি পৌঁছেছেন এবং আশ্রয় চেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যদি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি অবৈধভাবে বিদেশ যান এবং বিদেশে আশ্রয় প্রার্থনার যে প্রক্রিয়া আছে, তার অপব্যবহার করেন, তবে তা পাসপোর্টের সূচকে প্রভাব ফেলে’ (প্রথম আলো, ১৪ নভেম্বর ২০২৫)। বিবিসি বাংলা অনলাইনে ১৬ নভেম্বর প্রকাশিত একটি রিপোর্টেও বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান কমে যাওয়া ও বাংলাদেশিদের ভিসা না দেওয়ার কারণ হিসেবে এই বিষয়গুলো উঠে এসেছে। এ ছাড়া রিপোর্টে আরও বলা হয়, ‘ভিসার অপব্যবহার করে বাংলাদেশিদের একদেশ থেকে অন্যদেশে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে কমেছে বিশ্বাসযোগ্যতা। এ ছাড়া দেশের বাইরে রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের প্রকাশ্য বিবাদে জড়ানোর কারণেও নষ্ট হচ্ছে দেশের ভাবমূর্তি।’
অনেক বাংলাদেশি পর্যটক ভিসা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে যায়; কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষে দেশে ফিরে আসে না। বরং তারা অবৈধভাবে থেকে কাজ করে, যা ভিসার শর্তভঙ্গ। এই অপব্যবহারের কারণে অনেক দেশ বাংলাদেশি নাগরিকদের পর্যটক ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কূটনৈতিকভাবে দেখা যায়, যেসব দেশের নাগরিকরা বারবার ভিসার নিয়ম লঙ্ঘন করে, সেই দেশগুলোর জন্য পরবর্তী সময়ে ভিসা প্রাপ্তির শর্ত কঠোর হয়।
বেশ কিছু বাংলাদেশি বিদেশে গিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে রাজনৈতিক নির্যাতন, ধর্মীয় বৈষম্য বা প্রাণনাশের হুমকির শিকার বলে আশ্রয়ের আবেদন করে। ইউরোপ, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোতে এ ধরনের আবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, অধিকাংশ আবেদনই ভিত্তিহীন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন দপ্তরগুলোর প্রতিবেদনেও দেখা গেছে, ভিত্তিহীন হওয়ায় বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীদের একটি বড় অংশের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। এই মিথ্যা আশ্রয় আবেদন শুধু ব্যক্তির নয়, গোটা দেশের ভাবমূর্তির ওপর আঘাত হানে।
বাংলাদেশিদের মধ্যে অনেকেই বৈধ ভিসা নিয়ে বিদেশে গিয়ে নিয়ম ভেঙে অবস্থান করেন, কেউ কেউ পাসপোর্ট ফেলে দিয়ে অবৈধ হয়ে যান। কিছু প্রবাসী শিক্ষার্থী ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও দেশে ফেরেন না। এইসব নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে ভিসা নীতিতে। অনেক দেশ বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য অতিরিক্ত নথিপত্র, সাক্ষাৎকার বা দীর্ঘ যাচাই প্রক্রিয়া চালু করেছে। যেসব শিক্ষার্থী বা পর্যটক বৈধভাবে বিদেশ যেতে চান, তাঁদেরও বারবার সন্দেহের মুখে পড়তে হয়। এভাবে কয়েকজনের বেআইনি কর্মকাণ্ডের দায় বহন করতে হচ্ছে সমগ্র জাতিকে।
অনেক নাগরিক মৌলিক অভিবাসন আইন, ভিসার শর্ত বা গন্তব্য দেশের শ্রমনীতি সম্পর্কে জানেন না। আবার ব্যবসায়ীরা ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেন। অনেকেই দালালের মাধ্যমে পাসপোর্ট বা ভিসা নেন, জানেন না কীভাবে আইনত বৈধভাবে বিদেশে কাজ করতে হয়। ফলে বিদেশে গিয়ে সমস্যায় পড়েন, গ্রেপ্তার হন, দেশে ফেরত আসেন, আর আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের নাম কালোতালিকায় উঠে আসে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
তা ছাড়া বহু বাংলাদেশি প্রবাসে যাওয়ার সময় বা বিশেষ করে দেশে ফেরার সময় অনাবশ্যক ও অবৈধ মালামাল বহন করেন। যেমন সীমার বাইরে সোনা, মুদ্রা, কিংবা নিষিদ্ধ পণ্য। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এর প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক। বিদেশের ইমিগ্রেশন অফিসারেরা জানেন, কিছু বাংলাদেশি যাত্রী নিয়ম মানেন না। ফলে পুরো জাতি ‘রিস্কি ট্রাভেলার’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। অনেকে আবার বিদেশে গিয়ে স্থানীয় সংস্কৃতি, আইনকানুন ও সামাজিক শিষ্টাচার মানেন না, যা বাংলাদেশের নাগরিকদের ভাবমূর্তিকে আরও ক্ষুণ্ন করে।
তবে সবকিছুর মুলে রয়েছে আমাদের অশিক্ষা, সুশিক্ষার অভাব, ও নৈতিক অবক্ষয়। আমাদের সমাজে অনেকের কাছে শিক্ষা মানে কেবল সার্টিফিকেট অর্জন। আমরা শিক্ষিত হলেও বাস্তবে সুশিক্ষিত নই, এমন এক অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে কেউ কেউ নিজের দেশের মর্যাদাকে ব্যক্তিগত লাভের কাছে বিসর্জন দিতে দ্বিধা করে না। বিমানবন্দরে ঘুষ, কাস্টমসে প্রতারণা, বিদেশে বেআইনি কাজ—সবই এই মানসিকতার প্রতিফলন। এই নৈতিক অবক্ষয় কিছু প্রবাসী বাংলাদেশিদের আচরণেও প্রতিফলিত হয়, যা পুরো জাতির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। যেমন, বিদেশে প্রবাসী শ্রমিকদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার ঘটনা দেশের পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রভাবিত করে। কারণ মিডিয়া ও কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো এসব তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দেয়।
রাষ্ট্র ও সরকারের দায়: কাঠামোগত ব্যর্থতা ও নীতি সংকট
বাংলাদেশের অভিবাসন খাত দীর্ঘদিন ধরে দালালনির্ভর। বিদেশে কাজে পাঠানোর নামে বহু মানুষ প্রতারণার শিকার হন, জাল কাগজে কাজের ভিসা পান, পরে বিদেশে গিয়ে বিপাকে পড়েন। দালাল বা অবৈধ এজেন্টদের কারণে বৈধ প্রক্রিয়া ভেঙে যায়। প্রবাসী শ্রমিকেরা কখনো কখনো নিজেদের জীবন ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলেন। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত তদারকি বা আইনি সহায়তার অভাব এই সমস্যাকে আরও প্রকট করেছে। ফলে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশি কর্মীদের ওপর আস্থা রাখতে পারে না। কিছু দেশ এমনকি বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া সাময়িকভাবে বন্ধও করে দেয়। বিদেশি রাষ্ট্রগুলো এই ধরনের পরিস্থিতি দেখে বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কঠোর নীতি গ্রহণ করে।
আমাদের যুবসমাজের একটি বড় অংশ বাধ্য হয়ে বিদেশে কাজ খুঁজতে যায়; কারণ, দেশে পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ নেই। ফলে অনেকেই যেকোনো উপায়ে বিদেশ যেতে চান, বৈধ বা অবৈধভাবে। রাষ্ট্রের ব্যর্থ অর্থনৈতিক নীতি ও বেকারত্বের সংকটই তাদের এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দেয়। যদি দেশে মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি হতো, তাহলে নাগরিকরা মরিয়া হয়ে বিদেশে অবৈধ পথে যাওয়ার চেষ্টা করতেন না।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও বিদেশে কর্মসংস্থান বা আন্তর্জাতিক নাগরিকত্বের চেতনাবিষয়ক কোনো বাস্তবধর্মী শিক্ষা নেই। ভাষা, সংস্কৃতি, আইন, প্রযুক্তি—এসব বিষয়ে তরুণদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। ফলে বিদেশে গিয়ে তারা কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে বা সমস্যায় জড়ায়। রাষ্ট্র যদি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারত, তাহলে বিদেশে আমাদের নাগরিকদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ত এবং পাসপোর্টের মানও উন্নত হতো।
তা ছাড়া পাসপোর্ট অফিস থেকে শুরু করে ইমিগ্রেশন পর্যন্ত দুর্নীতির প্রভাব স্পষ্ট। কেউ ঘুষ দিয়ে জাল নথিতে পাসপোর্ট পেয়ে যায়, আবার প্রকৃত নাগরিককে পেতে হয় ভোগান্তি। এমনকি কখনো দেখা যায় অপরাধী বা ভুয়া পরিচয়ে কেউ বিদেশে গিয়ে অপরাধ করে, ফলে পুরো দেশই সন্দেহের তালিকায় পড়ে। রাষ্ট্র যদি প্রশাসনিক সততা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারত, তাহলে পাসপোর্টের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থা বাড়ত।
একটি দেশের পাসপোর্টের মান কেবল নাগরিকদের আচরণে নয়, সেই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও বৈদেশিক নীতির শক্তির ওপরও নির্ভর করে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিক্রিয়াশীল ও স্বল্পমেয়াদি। বিদেশে বাংলাদেশের ইমেজ-বিল্ডিং বা নাগরিক অধিকার রক্ষায় দূতাবাসগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখে না। যেসব দেশে বাংলাদেশিদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ হয়, সেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিবাদ বা আলোচনার উদ্যোগ খুবই সীমিত। এই নিস্ক্রিয় কূটনীতি আমাদের পাসপোর্টকে দুর্বল করে তুলছে।
সামগ্রিক দায়: জাতি হিসেবে কোথায় ভুল করছি
বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান কমে যাওয়া কোনো একদিনের ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘ সামাজিক, নৈতিক ও প্রশাসনিক অবক্ষয়ের ফল। আমরা এমন এক সমাজে পরিণত হয়েছি, যেখানে আইন মানা নয়, বরং আইন ফাঁকি দেওয়াকে বুদ্ধিমত্তা মনে করা হয়। যেখানে শিক্ষা মানে চাকরি পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা, মানুষ হওয়া নয়। আমরা সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত হলেও, প্রকৃত অর্থে কুশিক্ষিত। রাষ্ট্রও সেই কুশিক্ষার ফল ভোগ করছে। নীতিনির্ধারণে দূরদর্শিতার অভাব, প্রশাসনে জবাবদিহির অভাব, নাগরিক সচেতনতা গড়ে তোলার উদ্যোগের অভাব—সব মিলে এক দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে।
করণীয়: দায় স্বীকার ও সম্মিলিত উদ্যোগ
বাংলাদেশের মানুষ পরিশ্রমী ও মেধাবী—এই পরিচয়েই বিশ্বে আমাদের আসল মর্যাদা। কিন্তু কিছু নাগরিকের অবৈধ বিদেশগমন, ভিসার অপব্যবহার ও মিথ্যা আশ্রয় আবেদন দেশের ভাবমূর্তিকে কলঙ্কিত করছে, পাসপোর্টের মান কমাচ্ছে। সরকার, সমাজ ও প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই সকল অনৈতিক ও বেআইনি প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে বিদেশগামী নাগরিকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, আইন ও সংস্কৃতিবিষয়ক ওরিয়েন্টেশন, এবং অভিবাসনসংক্রান্ত মৌলিক শিক্ষা দেওয়া দরকার। অভিবাসন খাতে দালালতন্ত্র নির্মূল, পাসপোর্ট ইস্যুতে কঠোর যাচাই-বাছাই, এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গঠন করতে হবে। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পাঠ্যক্রমে নাগরিক নৈতিকতা, বৈশ্বিক নাগরিকত্ব ও মানবিক মূল্যবোধ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যুবসমাজকে বিদেশ-নির্ভর না করে দেশে কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি সম্পর্কে স্কুল ও কলেজ এবং ইউনিয়ন ও গ্রামপর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে প্রচারণা চালানো প্রয়োজন, যাতে মানুষ বুঝতে পারে দালালের মিথ্যা প্রলোভন কতটা ভয়াবহ হতে পারে। যেকোনো ধরনের ভিসা-অপব্যবহার বা জালিয়াতির ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দালাল ও মানবপাচারকারীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নয়নে দূতাবাসগুলোকে আরও সক্রিয় ও দায়বদ্ধ করতে হবে। মিথ্যা আশ্রয় আবেদন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে এবং বৈধ অভিবাসনের ইতিবাচক দিকগুলো প্রচার করতে হবে। সর্বোপরি শিক্ষার মান, নাগরিক সচেতনতা, নৈতিক শিক্ষা, প্রশাসনিক দক্ষতা, ও সামাজিক দায়িত্ববোধ বৃদ্ধির পাশাপাশি সব আইনভঙ্গকারীর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যেদিন আমরা আইনকে মান্যতা দেব, সততা ও শিক্ষা দিয়ে নিজেদের গড়ে তুলব, সেদিন পৃথিবী আমাদের পাসপোর্টকে সম্মানের চোখে দেখবে।
*লেখক: কাজী ফরিদ, অধ্যাপক ও অভিবাসন গবেষক, গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়