ইন্দোনেশিয়ায় রাতে তারাবিহ, গ্রামের নিস্তব্ধতা আর এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা

ছবি : লেখকের পাঠানো

পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ার তিমুর প্রদেশের মালাং জেলার কেপাঞ্জেন থানার অন্তর্গত তামানায়ু গ্রামে একবার গিয়েছিলাম পবিত্র রমজান মাসে। শান্ত, নিরিবিলি, ফাঁকা ফাঁকা বাড়িঘর—গ্রামের পরিবেশ মন ছুঁয়ে যাবে যে কারও। বেশির ভাগ মানুষ মুসলিম, তবে কিছু খ্রিষ্টান ও হিন্দুও আছে গ্রামে। কিন্তু ধর্মীয় উৎসবগুলো সবাই মিলেই আনন্দের সঙ্গে উদ্‌যাপন করেন—এ যেন সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আমার বন্ধু আসাদির সঙ্গে পরিচয় দক্ষিণ কোরিয়ায়, আমরা একসঙ্গে কাজ করতাম। তার দেশ ইন্দোনেশিয়া। তার আমন্ত্রণেই সেখানেই যাওয়া। রমজানে ইফতারে সেই গ্রামে মিলনমেলা দেখতাম। মিলনমেলা শেষে গ্রামের আকাশে নেমে এল এক অপার্থিব শান্তি। সূর্য ডুবে গেছে, কিন্তু মানুষের মুখে মুখে আলো। মসজিদের সামনে ছোট ছোট বাচ্চারা দৌড়াচ্ছে, কেউ খেজুর হাতে, কেউ জুসের গ্লাস নিয়ে হাসছে—রমজানের আনন্দ যেন তাদের চোখে-মুখে ঝলমল করছে।

আরও পড়ুন

ইফতারের পর সবাই একসঙ্গে মাগরিবের নামাজ আদায় করলাম। নামাজ শেষে কেউ বাড়িতে ফিরল না। একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার এশা আর তারাবিহর প্রস্তুতি। ছোট্ট সেই মসজিদ মুহূর্তেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেল। বৃদ্ধ, যুবক, কিশোর—সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

তারাবিহর নামাজে ইমামের কোরআন তিলাওয়াত শুনে আমার শরীর শিউরে উঠছিল। এত মধুর কণ্ঠ, এত শুদ্ধ উচ্চারণ—মনে হচ্ছিল স্বর্গীয় কোনো সুর নেমে এসেছে। আমি চোখ বন্ধ করে শুধু শুনছিলাম…মনে হচ্ছিল, হাজার মাইল দূরে থেকেও যেন নিজের দেশ, নিজের শিকড়ের খুব কাছে আছি।

নামাজ শেষে শুরু হলো আরেকটি অন্য রকম আড্ডা। মসজিদের বারান্দায় গোল হয়ে বসে চা, কফি আর হালকা নাশতা। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা জীবনের গল্প বলছিলেন—কেউ যুদ্ধের স্মৃতি, কেউ সমুদ্রের গল্প, কেউ আবার রহস্যময় কিছু ঘটনা।
ঠিক তখনই শুনলাম ‘কালা জাদু’র গল্প।

আরও পড়ুন

গ্রামের এক বৃদ্ধ বললেন—এই এলাকায় নাকি বহু আগে কালা জাদুর চর্চা ছিল। কেউ কারও ক্ষতি করার জন্য নয়, বরং অদৃশ্য জগতের সঙ্গে যোগাযোগের এক অদ্ভুত বিশ্বাস থেকে। কেউ কেউ নাকি গভীর রাতে বনজঙ্গলে ধ্যান করত, অদ্ভুত মন্ত্র পড়ত। অনেকে বিশ্বাস করে, এখনো নাকি কিছু অজানা শক্তি এই দ্বীপে বিচরণ করে।

ছবি: লেখকের পাঠানো

আমি মন দিয়ে শুনছিলাম। ভয় লাগেনি, বরং কৌতূহল জন্মাল। কারণ, দিনের আলোয় যে মানুষগুলো এত সরল, এত আন্তরিক—তাদের জীবনের ভাঁজে ভাঁজে এমন রহস্য লুকিয়ে আছে, ভাবতেই অবাক লাগছিল।

রাত গভীর হলো। চারপাশে নিস্তব্ধতা। দূরে সমুদ্রের বাতাস, কোথাও কোথাও ঝিঁঝি পোকার ডাক। আকাশে অসংখ্য তারা—মনে হচ্ছিল, হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারব।

আরও পড়ুন

সেই রাতে ঘুমাতে গিয়ে মনে হচ্ছিল—ভ্রমণ শুধু নতুন খাবার, নতুন দৃশ্য বা নতুন মানুষ নয়, ভ্রমণ মানে একেকটা দেশের অন্তরে লুকানো আত্মাকে ছুঁয়ে দেখা।

ইন্দোনেশিয়ার এই ছোট্ট গ্রামে আমি দেখলাম রমজানের ভ্রাতৃত্ব, মানুষের আন্তরিকতা, আর একই সঙ্গে লোককথা আর রহস্যের এক ভিন্ন জগৎ।

ভয়ংকর কালা জাদুর দেশে এসেও আমি খুঁজে পেলাম ভয় নয়, ভালোবাসা। অন্ধকার নয়, আলো।

আরও পড়ুন