নাগরিক ও সরকারের যৌথ দায়িত্ব: আমেরিকার তুষারঢাকা সকালের শিক্ষা

তুষারঢাকা সড়ক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন তিন নারী। ছবিটি ওয়াশিংটন ডিসির।ছবি: রয়টার্স

গণতন্ত্রকে আমরা প্রায়ই বৃহৎ পরিসরে ব্যাখ্যা করে থাকি—সংবিধান, নির্বাচন, প্রতিষ্ঠান ও অধিকার নিয়ে। কিন্তু গণতন্ত্রের সবচেয়ে গভীর শিক্ষাগুলো অনেক সময় নীরবে, দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ঘটনায় ফুটে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রে, ভারী তুষারপাতের পর এমনই একটি দৃশ্য চোখে পড়ে, যেখানে সরকার ও নাগরিক—উভয়েই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে কোনো দ্বন্দ্ব, অভিযোগ বা বিভ্রান্তি ছাড়াই।

তীব্র তুষারপাতের পর রাজ্য ও স্থানীয় সরকার দ্রুত মহাসড়ক, প্রধান সড়ক ও জনপরিকাঠামো পরিষ্কারে উদ্যোগ নেয়। তুষার অপসারণকারী যান রাতভর, এমনকি দিনেও কাজ করে যাতে জরুরি সেবা, গণপরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় চলাচল ব্যাহত না হয়। এটি সরকারের দায়িত্ব, এ নিয়ে নাগরিকদের কোনো প্রশ্ন থাকে না, আবার সরকারও এতে গাফিলতি দেখায় না।

একই সঙ্গে নাগরিক পর্যায়েও একটি সমান গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালিত হয়। বাড়ির মালিকেরা নিজেদের বাড়ির সামনে ফুটপাত ও ড্রাইভওয়ে থেকে তুষার সরিয়ে নেন। এটি শুধু ব্যক্তিগত সুবিধার বিষয় নয়; বরং এটি একটি আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব। যদি কোনো বাড়ির মালিক তুষার পরিষ্কার না করেন এবং তার ফলে কোনো পথচারী দুর্ঘটনার শিকার হন, তবে সেই বাড়ির মালিককে আইনি ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে।

এই ছোট্ট ঘটনাই একটি গভীর বার্তা দেয়, জননিরাপত্তা একটি যৌথ দায়িত্ব।

এই জনগুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাকে কার্যকর করে তোলে একটি মৌলিক বিষয়: এমন দায়িত্ববোধ হঠাৎ করে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে অর্জিত হয় না। এটি সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত—প্রায় সামাজিক ডিএনএর মতো—যা মানুষ শৈশবেই শেখে, কৈশোরে পৌঁছানোর অনেক আগেই। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক আচরণের মধ্য দিয়ে শিশুরা দায়িত্ব ও জবাবদিহি প্রত্যক্ষভাবে দেখে বড় হয়। ফলে নাগরিক কর্তব্য বাহ্যিক চাপ নয়; বরং স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

সরকার প্রতিটি ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না, আবার নাগরিকেরাও ব্যক্তিগত সম্পত্তির দায়িত্ব সরকারের ওপর চাপিয়ে দেয় না। প্রত্যেকেই নিজের ভূমিকা স্পষ্টভাবে জানে। অধিকার ও দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য থাকে, আর স্বাধীনতা জবাবদিহির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত থাকে। এখানে নাগরিক সচেতনতা শুধু আইনের ভয়ে নয়; বরং এই উপলব্ধি থেকে আসে যে নিজের অবহেলা অন্যের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

পক্ষান্তরে, বাংলাদেশে সরকার ও নাগরিক—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই যদি আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে চিত্রটি ভিন্ন ও হতাশাজনক। দৈনন্দিন জীবনে এমন নাগরিক দায়িত্ববোধ প্রায় অনুপস্থিত বলা যায়। রাস্তা, ফুটপাত, নালা বা জনপরিসর—সব ক্ষেত্রেই অবহেলা চোখে পড়ে। নাগরিকেরা সবকিছুর দায় সরকারের ওপর চাপায়, আর সরকার প্রায়ই নাগরিক সচেতনতা গড়ে তোলার পরিবর্তে কেবল প্রশাসনিক নির্দেশনার ওপর নির্ভর করে। ফলে দায় এড়ানোর একটি চক্র তৈরি হয়, যেখানে কেউই ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নয়।

আরও পড়ুন

এখানেই প্রশ্ন ওঠে, বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?

কাউকে না কাউকে এগিয়ে আসতেই হবে, নাগরিক দায়িত্ববোধকে জাতীয় মূল্যবোধ হিসেবে লালন ও প্রচার করার জন্য। নৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব ছাড়া নাগরিক সচেতনতা কখনোই টেকসইভাবে গড়ে উঠতে পারে না।

এই পরিপ্রেক্ষিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য। শুধু ব্যর্থতা তুলে ধরা নয়; বরং ইতিবাচক নাগরিক আচরণকে সামনে আনা, অবহেলার প্রশ্ন তোলা এবং নাগরিক ও সরকারের মধ্যে সচেতনতা তৈরির কাজ গণমাধ্যম কার্যকরভাবে করতে পারে। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নাগরিক কর্তব্যকে বাধ্যবাধকতা নয়; বরং গর্বের বিষয়ে পরিণত করতে পারে।

করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও এনজিওগুলোরও এখানে বড় ভূমিকা রয়েছে। করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর), কমিউনিটি উদ্যোগ ও সামাজিক স্বীকৃতির মাধ্যমে তারা নাগরিক উদ্যোগগুলোকে উৎসাহিত করতে পারে। ভালো নাগরিক আচরণ যখন স্বীকৃতি পায়, তখন তা ইতিবাচক জনমত তৈরি করে এবং নাগরিক সম্পৃক্ততায় সুস্থ প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়।

দায়িত্বশীল নাগরিক ছাড়া কার্যকর শাসন সম্ভব নয়, আবার সহায়ক প্রতিষ্ঠান ছাড়া নাগরিক দায়িত্ববোধও বিকশিত হতে পারে না। শুধু আইন দিয়ে নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা যায় না—যতক্ষণ না মানুষ নিজের ভূমিকা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে।

একটি তুষারঢাকা ফুটপাত আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে গভীর শিক্ষা: সরকার ও নাগরিক যখন সমন্বিতভাবে কাজ করে, তখন প্রকৃতির চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করা সম্ভব। প্রকৃত গণতন্ত্র শুধু অধিকার দাবি করার নাম নয়, এটি দায়িত্ব পালনের চর্চা প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজে।

আরও পড়ুন