সড়কে শৃঙ্খলা ও নাগরিক দায়িত্ব: যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের করণীয়
একটি সভ্য ও উন্নত রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো নাগরিকদের শৃঙ্খলাবোধ, আইন মেনে চলার মানসিকতা ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধ। যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সড়ক ব্যবস্থাপনা ও ট্রাফিক শৃঙ্খলা সেখানে কেবল আইন প্রয়োগের বিষয় নয়, এটি একটি শৈশব থেকে গড়ে ওঠা নাগরিক সংস্কৃতি। স্কুল, পরিবার ও সমাজ—এই তিন স্তম্ভের সম্মিলিত প্রয়াসেই আমেরিকান নাগরিকেরা ছোটবেলা থেকেই ট্রাফিক আইন, নাগরিক শিষ্টাচার ও সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্রে শিশুরা স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি সিভিক এডুকেশন বা নাগরিক শিক্ষা গ্রহণ করে। রাস্তা পার হওয়ার নিয়ম, ট্রাফিক সিগন্যালের অর্থ, পথচারীর অধিকার, জরুরি যানবাহনের জন্য পথ ছেড়ে দেওয়া—এসব বিষয় শিশুদের হাতে–কলমে শেখানো হয়। পরবর্তী জীবনে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার জন্য কঠোর প্রশিক্ষণ, লিখিত পরীক্ষা ও ব্যবহারিক দক্ষতা যাচাই বাধ্যতামূলক। ফলে আইন মানা সেখানে ভয়ের কারণে নয়; বরং নৈতিক দায়িত্ব ও অভ্যাসের অংশ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে বা পঙ্গুত্ব বরণ করছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে বা পঙ্গুত্ব বরণ করছে। এর মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে চালক ও পথচারীদের যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা, বেপরোয়া গাড়ি চালানো, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও আইন প্রয়োগে দুর্বলতা। দুঃখজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত ‘ঘাতক চালকেরা’ প্রভাব খাটিয়ে বা আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে শাস্তি এড়িয়ে যায়। এতে আইনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হয় এবং অপরাধপ্রবণতা বাড়ে।
এ অবস্থায় শাস্তি অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর হতে হবে। গুরুতর দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে কঠিন শাস্তি, প্রয়োজনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অন্যরা শিক্ষা গ্রহণ করে। একই সঙ্গে সড়কে মোটরচালিত যান, নন–মোটরাইজড যান, সাইকেল ও পথচারীদের জন্য আলাদা লেন নিশ্চিত করা জরুরি। এটি কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়; বরং জীবন রক্ষার একটি মৌলিক ব্যবস্থা।
তবে কেবল আইন ও শাস্তি দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা ও সচেতনতা কর্মসূচি। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কঠিন বিষয়ের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হলেও নৈতিকতা, মূল্যবোধ, নাগরিক দায়িত্ব, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাকে অনেক সময় উপেক্ষা করা হয়। অথচ একজন শিক্ষিত নাগরিক গড়ে তুলতে হলে তাকে সৎ, মানবিক, আইনপরায়ণ ও দায়িত্বশীল হতে শেখানো অপরিহার্য।
এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা কারিকুলাম থেকে উপযোগী অংশ গ্রহণ করে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োগ করা যেতে পারে। প্রাথমিক স্তর থেকেই নাগরিক শিক্ষা, ট্রাফিক সচেতনতা, পরিবেশ রক্ষা, শৃঙ্খলা ও সামাজিক আচরণ বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
সরকারের পাশাপাশি সব স্টেকহোল্ডারকে সম্পৃক্ত করে একটি জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, পুলিশ, সিটি করপোরেশন, গণমাধ্যম, এনজিও ও বেসরকারি খাত—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে শিশুরা স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি সিভিক এডুকেশন বা নাগরিক শিক্ষা গ্রহণ করে। রাস্তা পার হওয়ার নিয়ম, ট্রাফিক সিগন্যালের অর্থ, পথচারীর অধিকার, জরুরি যানবাহনের জন্য পথ ছেড়ে দেওয়া—এসব বিষয় শিশুদের হাতে–কলমে শেখানো হয়।
এখানে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান লিন্ডে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যিক যানবাহনের চালকদের (লরি, বাস, ট্রাক ইত্যাদি) জন্য প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এ ধরনের উদ্যোগ আরও সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন। অন্যান্য করপোরেট প্রতিষ্ঠানও যদি লিন্ডের মতো এগিয়ে আসে, তবে চালক ও পথচারী উভয়ের জন্য প্রশিক্ষণ, সচেতনতা কর্মশালা ও গণসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
পরিশেষে বলা যায়, সড়কে শৃঙ্খলা ও নাগরিক দায়িত্ব কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, এটি একটি জাতির সামগ্রিক মূল্যবোধের প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখায় যে শৈশব থেকে শিক্ষা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কঠোর আইন প্রয়োগ ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা—এ চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই একটি নিরাপদ ও মানবিক সমাজ গড়ে ওঠে। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে একটি সচেতন, শিক্ষিত ও দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজ গড়তে চায়, তবে এখনই সময় সড়কে নিরাপত্তা ও নাগরিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার।
* লেখক: এম আহসান উল্লাহ খান, সাবেক ঊর্ধ্বতন ব্যাংকার, ইংরেজি সংবাদ উপস্থাপক বিটিভি ও বেতার, খণ্ডকালীন শিক্ষক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]