মানসিক স্বাস্থ্য: যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

মানসিক স্বাস্থ্য এখন আর গৌণ কোনো বিষয় নয়, এটি মানবিক মর্যাদা, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সুস্থ জীবনের একটি মৌলিক উপাদান। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, মানসিক আঘাত ও চাপজনিত রোগ বিশ্বব্যাপী দ্রুত বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মানসিক স্বাস্থ্যকে একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবু বাংলাদেশসহ অনেক সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য এখনো অবহেলিত ও ভুলভাবে তুলে ধরা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে মানসিক স্বাস্থ্যকে শারীরিক স্বাস্থ্যের সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। এটি প্রাথমিক চিকিৎসা, শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্র ও স্বাস্থ্যবিমার সঙ্গে যুক্ত। প্রাথমিক শনাক্তকরণ, প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা, বহুমাত্রিক পেশাগত সহযোগিতা ও কমিউনিটি সহায়তা সেখানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মূল ভিত্তি।

আরও পড়ুন

তবু এতসব উদ্যোগের পরেও যুক্তরাষ্ট্রে মানসিক স্বাস্থ্য একটি গভীর সংকটে রয়েছে। এর একটি দৃশ্যমান পরিণতি হলো গৃহহীনতা। অনেক গৃহহীন ব্যক্তি একসময় স্থিতিশীল পরিবার থেকে এসেছেন, কিন্তু চিকিৎসাহীন মানসিক রোগ, মাদকাসক্ত ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ধীরে ধীরে তাদের মূল স্রোত থেকে ছিটকে দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে মানসিক স্বাস্থ্য কেবল চিকিৎসা দিয়েই সমাধান করা যায় না, এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা।

বাংলাদেশে ধূমপান, মাদক সেবন বা অ্যালকোহল গ্রহণকারীদের সাধারণত নৈতিক বিচারে দেখা হয়। এসব আচরণের পেছনের মূল কারণ—যেমন বিষণ্নতা, উদ্বেগ, বেকারত্ব, পারিবারিক চাপ বা ট্রমা অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে যায়। অথচ এসব অভ্যাস প্রায়ই মানসিক সংকটের লক্ষণ মাত্র।

বাংলাদেশে মানসিক রোগজনিত গৃহহীনতা তুলনামূলক কম দৃশ্যমান, কারণ পারিবারিক বন্ধন এখনো শক্তিশালী। তবে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে অর্থনৈতিক চাপ, চাকরির অনিশ্চয়তা ও সামাজিক চাপ নীরবে একটি মানসিক সংকট তৈরি করছে।

আরও পড়ুন

মানসিক স্বাস্থ্য শারীরিক স্বাস্থ্যের চেয়ে কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সুস্থ শরীরের জন্য যেমন যত্ন প্রয়োজন, তেমনি সুস্থ মনের জন্যও যত্ন অপরিহার্য। মানসিক স্বাস্থ্য উপেক্ষা করলে তার প্রভাব পড়ে শারীরিক অসুস্থতা, আসক্তি, পারিবারিক ভাঙন ও কর্মক্ষমতার ওপর। মানসিক সুস্থতা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের পূর্বশর্ত।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষিত বাংলাদেশি চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা জ্ঞান বিনিময়, প্রশিক্ষণ, টেলি-মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যকে সমান গুরুত্ব দেওয়াই একটি সুস্থ ও সহনশীল সমাজ গড়ার একমাত্র পথ।

লেখক: এম আহসান উল্লাহ খান, সাবেক ঊর্ধ্বতন ব্যাংকার, ইংরেজি সংবাদ উপস্থাপক বিটিভি ও বেতার, খণ্ডকালীন শিক্ষক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ইমেইল: [email protected]