বর্জ্য থেকে জ্বালানি: বাংলাদেশের জ্বালানি–সংকট মোকাবিলায় টেকসই সমাধানের সন্ধানে

প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশ একটি ক্রমবর্ধমান জ্বালানিনির্ভর ও জ্বালানি–ক্ষুধার্ত রাষ্ট্র। দ্রুত শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও গৃহস্থালি ব্যবহারের প্রসারের ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও গৃহস্থালি ব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি ছিল প্রাকৃতিক গ্যাস। কিন্তু বর্তমানে দেশীয় গ্যাসের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে এবং দুঃখজনকভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নতুন তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। বাংলাদেশের চলমান জ্বালানি–সংকটকে অবশ্যই দেশের জ্বালানি খাতের ঐতিহাসিক পটভূমিতে মূল্যায়ন করতে হবে। দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশ প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল, যেখানে শেল, কেয়ার্ন এনার্জি, টালও অয়েল ও শেভরনের মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এ সময় বাপেক্স (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি) তুলনামূলকভাবে সীমিত অংশীদারত্ব নিয়ে কাজ করেছে। সময়ের পরিক্রমায় এসব বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই ধীরে ধীরে কার্যক্রম সীমিত বা বন্ধ করে দেয়; বর্তমানে দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে শেভরনই সবচেয়ে বড় অবদানকারী হিসেবে রয়ে গেছে।

এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা উন্মোচিত করেছে—সীমিত ও ক্ষয়িষ্ণু জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ও দেশীয় সক্ষমতা বিকাশে দীর্ঘদিনের ঘাটতি। গ্যাস মজুত হ্রাস ও ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি উৎসে বৈচিত্র্য আনা এখন আর বিকল্প নয়; বরং সময়ের অনিবার্য দাবি। এ বাস্তবতায় ওয়েস্ট–টু–এনার্জি কেবল পরিবেশবান্ধব সমাধান নয়; বরং একটি কৌশলগত জ্বালানি বিকল্প, যা দেশের ক্রমবর্ধমান পৌর ও শিল্পের বর্জ্যকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে রূপান্তরের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে পারে, ল্যান্ডফিলের চাপ কমাতে পারে এবং টেকসই ও সহনশীল উন্নয়নের পথ নির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

এর ফলে শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে এবং শহর ও গ্রাম—উভয় এলাকায় গৃহস্থালি পর্যায়ে তীব্র জ্বালানি–সংকট দেখা দিচ্ছে। আমদানিনির্ভর এলএনজি, তেল ও কয়লার ওপর বাড়তি নির্ভরতা দেশের অর্থনীতিকে বৈশ্বিক মূল্য ওঠানামার ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এই পটভূমিতে স্থানীয়ভাবে প্রাপ্য, টেকসই ও বিকল্প জ্বালানি উৎস অনুসন্ধান এখন আর বিলাসিতা নয়; বরং জাতীয় প্রয়োজন।

বর্জ্য: একদিকে সমস্যা, অন্যদিকে সম্ভাবনা

জ্বালানি–সংকটের পাশাপাশি বাংলাদেশ আরেকটি বড় সংকট মোকাবিলা করছে— অব্যবস্থাপিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। প্রতিদিন শহরাঞ্চলে বিপুল পরিমাণ পৌর বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে, যার একটি বড় অংশ খোলা ডাম্পিং গ্রাউন্ড, নদী কিংবা অস্বাস্থ্যকর ল্যান্ডফিলে জমা হচ্ছে। অথচ এই বর্জ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যদি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায়, তাহলে মূল্যবান জ্বালানি সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা বর্জ্যকে এখনো সম্পদ হিসেবে দেখতে শিখিনি।

কেন বর্জ্য আলাদা করা জরুরি: নাগরিক ও প্রজন্মগত দায়িত্ব

বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন শুরু হয়, না বিদ্যুৎকেন্দ্র বা ল্যান্ডফিল থেকে—এর সূচনা হয় প্রতিটি ঘর, বাজার ও প্রতিষ্ঠান থেকে। প্রত্যেক নাগরিককে এবং বিশেষ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানতে হবে, কেন বর্জ্য আলাদা আলাদা বিনে ফেলতে হয় এবং কীভাবে তা সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়।

আরও পড়ুন

উৎসে বর্জ্য পৃথক্‌করণ:

• জৈব বর্জ্যের গুণগত মান বজায় রাখে।

• প্লাস্টিক, কাচ ও ক্ষতিকর বর্জ্য দ্বারা দূষণ রোধ করে।

• প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয় কমায়।

• পুনর্ব্যবহার ও জ্বালানি উৎপাদন সহজ করে।

• জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করে।

যদি বর্জ্য আলাদা না করা হয়, তবে জ্বালানি উৎপাদনে সক্ষম জৈব বর্জ্যও তার সম্ভাবনা হারায়। তাই বর্জ্য পৃথক্‌করণ শুধু একটি কারিগরি বিষয় নয়, এটি নাগরিক দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের নৈতিক অঙ্গীকার। স্কুল শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা ও কমিউনিটি কার্যক্রমের মাধ্যমে এই অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

বর্জ্যের ধরন ও জ্বালানি উৎপাদনে ভূমিকা

দেখা যাক, আমাদের চারপাশের যেসব বর্জ্য জ্বালানি উৎপাদনে কার্যকর, তা হলো উৎপাদিত বর্জ্যের বড় অংশ জৈব প্রকৃতির, যেমন—

• উচ্ছিষ্ট খাদ্যদ্রব্য।

• শাকসবজি ও ফলের অবশিষ্টাংশ।

• পশুর অংশ ও বর্জ্য।

• মাছের বর্জ্য ও মৃত মাছ।

• কৃষি ও কাঁচাবাজারের বর্জ্য।

এগুলো উপযোগী

• বায়োগ্যাস উৎপাদনে।

• অ্যানেরোবিক ডাইজেশন পদ্ধতিতে।

• কম্পোস্ট ও জ্বালানি পুনরুদ্ধারে।

অন্যদিকে যেসব বর্জ্য জ্বালানি উৎপাদনে অযোগ্য—

• কাচ ও ধাতব বস্তু।

• নির্মাণ ও ভাঙাচোরা বর্জ্য।

• বালু, মাটি ও পাথর।

• কিছু প্লাস্টিক।

• চিকিৎসা ও ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য।

জ্বালানি উৎপাদনে কার্যকর নয় এবং এই বর্জ্যগুলো আলাদাভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে মারাত্মক স্বাস্থ্য ও পরিবেশে ঝুঁকি তৈরির আশঙ্কা থাকে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

বায়োগ্যাস: বাংলাদেশে পরীক্ষিত ও পরিচিত সমাধান—

অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির তুলনায় বায়োগ্যাস বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। বহু বছর ধরে গ্রামাঞ্চল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পশুর বর্জ্য ও জৈব উপাদান, বিশেষ করে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা ব্যবহার করে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট চালু রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকার বায়োগ্যাস স্থাপনে নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে আসছে। এটি প্রমাণ করে যে বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন বাংলাদেশে পরীক্ষিত, গ্রহণযোগ্য ও সম্প্রসারণযোগ্য একটি সমাধান।

এখন প্রয়োজন এই অভিজ্ঞতাকে শহরাঞ্চলের খাদ্য বর্জ্য, কাঁচাবাজার ও মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ বর্জ্যের ক্ষেত্রেও বিস্তৃত করা।

অন্যান্য বর্জ্য থেকে জ্বালানি প্রযুক্তি ও সীমাবদ্ধতা

বায়োগ্যাস ছাড়া কিছু প্রযুক্তি রয়েছে—

• রিফিউজ–ডিরাইভড ফুয়েল (RDF): এটি হলো কঠিন বর্জ্য থেকে উৎপাদিত একটি জ্বালানি। এটি জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এ জন্য উন্নত বর্জ্য পৃথক্‌করণ দরকার।

• দাহকরণ (Incineration): উচ্চ ব্যয়, কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও উন্নত প্রযুক্তি ছাড়া পরিবেশ ঝুঁকিপূর্ণ।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রযুক্তি নির্বাচন হতে হবে ব্যয়–সচেতন ও পরিবেশবান্ধব।

কোনটি আমাদের জন্য উপযোগী: বর্জ্যভিত্তিক জ্বালানি বনাম তেল–গ্যাস–কয়লা

তেল, গ্যাস ও কয়লা—

• আমদানিনির্ভর।

• বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়বহুল।

• পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

অন্যদিকে বর্জ্যভিত্তিক জ্বালানি—

• স্থানীয়ভাবে প্রাপ্য।

• বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমায়।

• গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস করে।

• দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

সমন্বিত ব্যয় বিবেচনায় বর্জ্য থেকে জ্বালানি একটি অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক সমাধান।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা ও উত্তম চর্চা

• উৎসে বর্জ্য পৃথক্‌করণ বাধ্যতামূলক।

• আলাদা বিন ও স্পষ্ট নির্দেশনা।

• চিকিৎসার বর্জ্য কখনো গৃহস্থালি বর্জ্যের সঙ্গে মেশে না।

• পুনর্ব্যবহার ও কম্পোস্টের পরেই জ্বালানি পুনরুদ্ধার।

• কঠোর পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিং।

বাংলাদেশের জন্য অভিযোজনযোগ্য শিক্ষা

• বাধ্যতামূলক বর্জ্য পৃথক্‌করণ।

• শহরাঞ্চলে বায়োগ্যাস সম্প্রসারণ।

• চিকিৎসা ও ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্যের আলাদা ব্যবস্থাপনা।

• জনসচেতনতা ও নাগরিক অংশগ্রহণ।

• সরকারি–বেসরকারি ও এনজিওর সহযোগিতা।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন কেবল একটি প্রযুক্তিগত উদ্যোগ নয়, এটি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা, নাগরিক দায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি অঙ্গীকার। অতএব গ্যাসের মজুত কমে আসার এ সময়ে বর্জ্যভিত্তিক জ্বালানি বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবসম্মত ও টেকসই পথ হতে পারে। যদি প্রত্যেক নাগরিক বুঝতে পারে, কেন বর্জ্য আলাদা করা জরুরি এবং নীতিগত দৃঢ়তা ও সচেতনতা একসঙ্গে কাজ করে, তবে বর্জ্য বাংলাদেশের জন্য বোঝা নয়; বরং একটি মূল্যবান সম্পদে পরিণত হবে।

আরও পড়ুন