বাঙালি জাতির মধ্যপন্থা নীতি, নতুন শক্তির উত্থান ও চাওয়া-পাওয়ার গরমিল!
রাজনীতি বিজ্ঞানের ছাত্রী ছিলাম। গৎবাঁধা নিয়মে সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, ম্যাকিয়াভেলি, কনফুসিয়াস, কার্ল মার্ক্সসহ কিছু ভুলে যাওয়া দার্শনিকের দর্শন ও বিভিন্ন মতবাদ, রাষ্ট্রের গঠন-প্রকৃতি, বিশ্বরাজনীতি, আইন ও সরকারব্যবস্থার ইতিহাস, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বছরের পর বছর মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় পাতার পর পাতা লিখে কৃতকার্য হয়ে রাজনীতি বিজ্ঞান পর্বের ইতি টেনেছি। তবে বাস্তব জীবনে রাজনীতির ‘র’–এর সঙ্গেও পরিচিত নই। বাংলাদেশে যখন ছিলাম, কখনো দেশের রাজনীতি নিয়ে কোনো ধরনের আগ্রহ অনুভব করিনি। তার কারণ হতে পারে গুটিকয় দলের পালাবদল, নতুনত্বের অভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার, হিংসাত্মক ও মারদাঙ্গার রাজনীতি। রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বলতে দেশে থাকা অবস্থায় একবার ভোট দিয়েছিলাম, সেই পর্যন্তই।
তবে রাজনীতির একটা সময় খুব পরিষ্কার মনে আছে, সেটি হচ্ছে ’৯১–এর নির্বাচন। তখন নিজে রাজনীতির কিছু না বুঝলেও পরিবারের বড়দের কৌতূহল ও উদ্দীপনা ছিল উল্লেখযোগ্য। আর ছাত্রজীবনে দেখেছি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের দাপট। আমার পরিবারে কেউ রাজনীতি করত না, তবে বুঝতে পারতাম বিএনপি সমর্থনঘেঁষা ছিল। আর ব্যক্তিগতভাবে আমার পছন্দের রাষ্ট্রনায়ক সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। নব্বইয়ের দশকে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে বিটিভিতে প্রচারিত ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ গানটির চিত্রায়ণে মাঠে–পথে ঘুরে বেড়ানো ‘এভিয়েটর’ স্টাইলের রোদচশমা পরিহিত জিয়াউর রহমানকে দেখাত। পছন্দের কারণ হয়তো গানটাই!
আমার জেনারেশন তাদের বাপ-দাদার আমলের গান ‘হাওয়ামে উড়তা যায়ে, মেরা লাল দোপাট্টা’ থেকে শুরু করে আলফা জেনারেশনের ‘You're my soda pop, my little soda pop’ গান শোনার সুযোগ হয়েছে। এককথায় আমাদের সময়কালে অনেক পরিবর্তন দেখেছি। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে। বর্তমানে আমরা এআই (AI) যুগে আছি; চারদিকে আধুনিকতার ছোঁয়া। যার ফলস্বরূপ মানুষের চিন্তা-চেতনা, দৃষ্টিভঙ্গি, মনন আরও উদার ও মুক্তমনা হওয়ারই কথা ছিল; কিন্তু আদতে কি আমাদের সমাজব্যবস্থায় ও রাজনীতিতে তার প্রতিফলন ঘটেছে? আবার উদারতা ও মুক্তমনা অর্থ বিশৃঙ্খলতার ইঙ্গিত দেয় না। এর মধ্যে একটি সুক্ষ্ণ সীমারেখা আছে। বর্তমানে বাংলাদেশে অল্প বয়সী মেয়েরা যে হারে পর্দা করছে, তা আমার ছোটবেলায় হাতেগোনা কয়েকজনকে দেখেছি। আমাদের মা-খালা ও চাচিদের জেনারেশন অধিকতর শাড়ির আঁচল দিয়ে ঘোমটা টানার মধ্যেই পর্দা করা সীমাবদ্ধ ছিল; আর গুটিকয়েক নারীকে কালো বোরকা পরিহিত কালেভদ্রে দেখেছি। তাই বলে অশালীনতার ছোঁয়া ছিল না। সেই সমাজব্যবস্থা কাউকে কিছু চাপিয়ে দিত না। তবে আমরা এখন বিভাজনের সমাজব্যবস্থায় আছি, দিন দিন মানসিকভাবে আরও সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছি। আজ মানুষকে মানুষ হিসেবে চিন্তা না করে ধর্ম ও পোশাকের ভিত্তিতে বিবেচনা করার চেষ্টা করছি। বাংলাদেশে এমন একটা সময় ছিল, যখন ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটি লোকমুখে প্রায় অব্যবহৃত ছিল, যা আজ কথায় কথায় ব্যবহার করা হয়। আগে কে কোন ধর্মের বা বর্ণের, কে কী উৎসব উদ্যাপন করবে, কে কার কী গান শুনবে, তা নিয়ে নির্ধারণ, বিভাজন, অতি–উৎসাহিত বা নিরুৎসাহিত করার কোনো বালাই ছিল না। এখন কাজী নজরুল ইসলাম কারও, আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অন্য কারও। যে যার ধর্ম-কর্ম ও উৎসব নিয়ে সুন্দর সহাবস্থানে বাস করবে, সেটিই বাঙালি জাতির পরিচিতি। বাঙালি জাতি আজ তার থেকে দূরে সরে এসে ধর্ম ও পোশাক রাজনীতিতে আবর্তিত হয়েছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গোঁড়ামির ফলস্বরূপ এই ভাগাভাগি। যে কারণে আমরা একে অপরের অবদান স্বীকার করতেও দ্বিধাবোধ করি। নিরপেক্ষভাবে ও যুক্তি দিয়ে বিচার–বিবেচনা করি না। তাই মহান মুক্তিযুদ্ধে কখনো শেখ মুজিবুর রহমান আবার কখনো জিয়াউর রহমানের অবদানকে অস্বীকার করি। কিছু কিছু জাতীয় চরিত্র বা স্থাপনা যে সর্বজনীন সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখা উচিত, সেটি আমাদের বোধগম্য নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ির কারণে জাতীয় চরিত্রকে মানুষের অতি ঘৃণার পাত্র বানিয়ে ফেলি। যেমন আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবুর রহমানকে সেই পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এখন দেখার বিষয় বিএনপি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সেই সম্মান বা স্বীকৃতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়, নাকি ভাঙাভাঙির দিকে ঠেলে দেয়!
এবার আসি চব্বিশের গণ–অভু৵ত্থানে, যা ৫ আগস্ট (৩৬ জুলাই) ২০২৪ অর্জিত হয়েছে। সত্যি কথা বলতে, বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে আমার উৎসাহ তখন থেকেই জন্ম নিয়েছে। ’৭১ দেখিনি; কিন্তু ২৪ দেখেছি। কী অভূতপূর্ব সাড়া, মানুষের সে কী আবেগ, অল্পবয়সী ছেলে-মেয়েদের সে কী সাহস, সে কী দৃঢ়তা, সে কী অকুতোভয় এক জাতি, সে কী ত্যাগ! কেউ কী ঘুণাক্ষরে ভেবেছিল যে এমনও হতে পারে? না ভাবেনি। প্রবাসীরা সেই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট শেয়ার ও প্রতিবাদ করার মাধ্যমে শেয়ার–যোদ্ধা হিসেবে কাজ করেছিলেন। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে সেই আগ্রহ থেকেই সুযোগ পেলেই টিভি পর্দায় বাংলাদেশে কী চলছে খোঁজ রাখি, খবরগুলো দেখি, নয়তো টক শোগুলোতে কিছু শিক্ষিত নির্দলীয় ব্যক্তির কথা শুনি। সেই সঙ্গে সার্বক্ষণিক আপডেটেড থাকার জন্য প্রথম আলোর ওয়েবসাইট তো আছেই। রাজনীতির প্রতি আমার এই আগ্রহ দেখে ঘরের মানুষ বলছে, ‘আমি নাকি প্রমাণ দিচ্ছি—আমি একদা রাজনীতিবিজ্ঞানের ছাত্রী ছিলাম!’
যা–ই হোক, তখন থেকেই জুলাই আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা ছেলে-মেয়েদের গতিবিধির দিকে নজর রাখা শুরু করলাম।
তখন আশার পারদ ছিল তুঙ্গে। একদিকে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, অন্যদিকে জুলাই আন্দোলনের নতুন মুখ। মনে হচ্ছিল এই দুয়ে মিলে দেশে এবার নতুন মাত্রার কিছু যোগ হবে। সেই সময়ে প্রথম আলোর দূর পরবাসে ‘জেনারেশন এক্স টু জির স্বপ্নভার ইউনূসের ওপর ন্যস্ত’ শিরোনামে একটি লেখা লিখেছিলাম। যদিও বাড়াবাড়ি রকম প্রত্যাশা ছিল সবার, যা অবাস্তব। তারপরও এমন একটা গণ–অভ্যুত্থানের পর চোখে পড়ার মতো কার্যকর কিছু জনমঙ্গলকর পরিবর্তন ঘটবে, সেটিই কাম্য। কিন্তু প্রায় দেড় বছর পর দেশ কতটুকু কী অর্জন করেছে, তা সবারই জানা। নতুন করে বলার কিছু নেই। অথচ মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য একটি সরকার। সেই গ্রহণযোগ্যতা থেকে বাংলাদেশের হাতে অনেক বড় একটা সুযোগ ছিল সংস্কারের মাধ্যমে কিছু মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে আসার; কিন্তু দুঃখের বিষয় দেশ সুযোগটি সম্পূর্ণভাবে হারিয়েছে। এটা একেবারেই আমার নিজস্ব মতামত যে ইউনূস সরকারের প্রথমেই উচিত ছিল পরিষ্কারভাবে দায়িত্বের মেয়াদ (কমপক্ষে পাঁচ বছর) নির্ধারণ করা। তারপর সরকারের পরিধি বাড়িয়ে দক্ষ ও পরিশ্রমী লোকজন নিয়োগ করা এবং কাজের গতি বাড়ানো। এরপর ধাপে ধাপে প্রশাসনব্যবস্থা নতুন করে সাজানো, আাইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিতকরণ, বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতিমুক্তকরণ, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুষ্ঠু বিচারব্যবস্থা কার্যকর করা। তার পাশাপাশি সরকারিভাবে জুলাই আন্দোলনের নিহত ও আহত ব্যক্তিদের সঠিক তালিকা প্রণয়ন ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে দেয়ালে–দেয়ালে লিখিত যে সংস্কারের কথা প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন বা নিশ্চিত করা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সর্বশেষ কাজ ছিল দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করা। অধ্যাপক ইউনূস সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আরও জোরদার হবে—সেটিই কাম্য ছিল। অথচ রোহিঙ্গা ইস্যুতে উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে যে মুহূর্তে তিনি দেশের হাল ধরেছিলেন, সেই অবদান অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। অন্যথায় দেশে নেতিবাচক অনেক ঘটনা ঘটার আশঙ্কা ছিল।
তবে বাইরে থেকে যতটা বলা সহজ, হয়তো অধ্যাপক ইউনূস সরকারের কোথাও না কোথাও সীমাবদ্ধতা ছিল। একটি কথা নিঃসন্দেহে সত্যি যে তিনি একজন স্বপ্নবান মানুষ। কিন্তু স্বপ্ন ও বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফারাক। সরকারের ভেতরের রাজনীতি, কথায় কথায় দাবি আদায়ের সংস্কৃতি, ভঙ্গুর ও অকার্যকর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাজের গতি, আমলাদের দৌরাত্ম্য, ঊর্ধ্বগতির বাজার—সব মিলিয়ে সরকারটিকে একটি দুর্বল সরকারে পরিণত করেছে। সরকারটি রাজনৈতিক সহযোগিতা পেলেও প্রশাসনিক সহযোগিতা পায়নি।
এবার আসা যাক জুলাই অভ্যুত্থানে সম্মুখ সারিতে থাকা জুলাই যোদ্ধাদের প্রসঙ্গে। একাত্তরের পর বাঙালি জাতিকে আবারও অবাক করে দেওয়া তরুণ ছেলে-মেয়েরা শুরুতেই নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে পুরো জাতিকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল। যেখানে থাকবে না কোনো বৈষম্য, সংস্কারের মাধ্যমে গঠন করা হবে নতুন বাংলাদেশ। সেই লক্ষ্যে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে নিযুক্ত করে নতুন সরকার গঠিত হলো। সেই সরকারে কিছু জুলাই যোদ্ধাও অংশগ্রহণ করেন। পরে তাঁরা সময়ের ব্যবধানে একে একে পদত্যাগ করে নতুন রাজনৈতিক শক্তি গঠন করেন। জুলাই থেকে জন্ম নেওয়া এই নতুন শক্তি কি শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণকে আকৃষ্ট করতে পেরেছে? আমার মনে হয় পারেনি। তার কিছু কারণও রয়েছে।
প্রথমত, জুলাই যোদ্ধাদের বড় শক্তি ছিল ঐক্য, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন পেশার মানুষকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসতে পেরেছিল। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই তাদের নিজেদের মধ্যেই ভিন্ন ভিন্ন মতের কারণে বিভক্তি দেখা দেয়। আজ বিভেদমুক্ত থাকলে জুলাই পটভূমিতে এককভাবে নতুন শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবর্তিত হতে পারত; কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
দ্বিতীয়ত, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জুলাই যোদ্ধারা আরেকটি তকমা পেয়েছিলেন, তা হলো এই তরুণেরা ‘বেয়াদব’। যদিও আমি এর সঙ্গে একমত নই। তাঁরা কম বয়সী। তাঁদের প্রকাশ, ভাষা ও চাওয়ার ধরন আগের জেনারেশন থেকে ভিন্ন হবে, সেটিই স্বাভাবিক। ‘জেনারেশন গ্যাপ’ বলে একটি কথা আছে, তা মানতেই হবে। দেশকে কিন্তু ফ্যাসিবাদমুক্ত এই বেয়াদবেরাই করেছেন। বর্তমানে যার ফল ভোগ করছে দীর্ঘ সময় রাজনীতি না করতে পারা বিভিন্ন দল। তরুণেরাও যে সব সময় ঠিক ছিলেন, একচেটিয়া তা–ও বলা যায় না; কিন্তু কেউ কি তাদের পাশে সঠিক দায়িত্ব নিয়ে দাঁড়িয়েছে বা সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়েছে? না দেয়নি। বেশি সংখ্যক মানুষ সমালোচকের ভূমিকায় ধরা দিয়েছে, যা দুঃখজনক। এই তরুণদের সঠিক দিকনির্দেশনার খুব দরকার ছিল; কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। সবাই তাঁদের ব্যবহার করে ভোটের হিসাব-নিকাশ কষেছে। অভিভাবক কেউ হয়নি।
তৃতীয়ত, জুলাই যোদ্ধাদের বিভিন্ন দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিতে জড়িয়ে পড়া। যা ছিল তাঁদের জন্য অশনিসংকেতস্বরূপ। তা ছাড়া সরকারে থাকা অবস্থায় জুলাইয়ে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের সঠিক তালিকা সরকারিভাবে প্রকাশ না করতে পারা, সেই সঙ্গে তাঁদের ও তাঁদের পরিবারের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা বাস্তবায়ন না করায় সহযোদ্ধা তথা আপামর জনগণের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা হারাতে শুরু করে। যা অপ্রত্যাশিত ছিল।
চতুর্থত, আস্থার জায়গা তৈরি করতে অক্ষম হওয়া। জুলাই–পরবর্তী রাজনীতিতে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের চাওয়া ছিল গতানুগতিক কিছু রাজনৈতিক দলের বাইরে জুলাই যোদ্ধাদের নেতৃত্বে নতুন একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল রাজনীতির মাঠে নতুন শক্তি হিসেবে আসুক। সেই চাহিদা পূরণে পর্যায়ক্রমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা কিছু জুলাই যোদ্ধা তাঁদের সমমনাদের নিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ গঠন করেন। সাধারণ জনগণ তাদের সাদরেই গ্রহণ করেছিল ও তাদের কাছে নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের প্রত্যাশাও ছিল। দলটি প্রথম থেকেই এককভাবে নির্বাচন করার কথা বলে আসছিল। পরবর্তী সময়ে রাজনীতির বাস্তবতায় সমঝোতার ভিত্তিতে মধ্যপন্থী কিছু দল নিয়ে ৮–দলীয় একটি জোট হওয়ার কথা ছিল। পরে সেটিও হলো না। সেটি হলে বাংলাদেশের জনগণের কাছে এনসিপি গ্রহণযোগ্যতা পেত এবং আস্থার জায়গা তৈরি হতো। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ একটি নতুন শক্তি হিসেবে এনসিপিকে এককভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ চেয়েছিল। একাধারে নতুন দল হিসেবে প্রথম নির্বাচনেই ক্ষমতায় চলে যাবে সেই আশাও করেনি।
পঞ্চমত, ভোটের রাজনীতির হিসাব–নিকাশ বা ক্ষমতা লাভের আকাঙ্ক্ষায় বহুল আলোচিত ও প্রগতিশীল এই নতুন দল আচমকা একটি রক্ষণশীল রাজনৈতিক দলের অংশ হয়ে জোটবদ্ধ হলো, যা দলটির জন্য আত্মহত্যার শামিল। যার দরুন বেশ কিছুসংখ্যক কেন্দ্রীয় সদস্য আপত্তি জানান ও অনেকে পদত্যাগও করেন। যার মধ্যে দুজন নারীর কথা উল্লেখ না করলেই নয়। তাঁদের একজন তাসনিম জারা, অপরজন তাসনুভা জাবিন। অথচ জুলাই অভ্যুত্থানের বড় একটি বৈশিষ্ট্য ছিল নারীদের সামনের কাতারে সাহসী অংশগ্রহণ। জুলাই আন্দোলনের গর্বিত যোদ্ধারা এমন একটি দলের অংশীদার হলেন, যারা মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি ছিল। সে দায়ভার সদ্য জন্ম নেওয়া দলটির কাঁধেও এসে পড়ল। বিষয়টি হতাশাজনক! এই দায়ভার নিয়ে দলটি কতটুকু এগোতে পারবে, যথেষ্ট সন্দেহ আছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তথা মধ্যপন্থা বাঙালি জাতি নিশ্চয়ই নাহিদ-সারজিস-হাসনাত-আসিফদের কাছ থেকে এটা আশা করেনি।
আমার মতো আরও অনেকেই হয়তো মুখিয়ে ছিল যে সব মিথ্যা করে দিয়ে দলটি শেষ পর্যন্ত একাই লড়বে। অন্তত তাদের নিজস্ব একটি পরিচয় বা স্বকীয়তা বজায় থাকত। কিন্তু তা হলো না। এত তাড়াতাড়ি হার মানা দলটির কাছে আর কী আশা করা যায়!
রাজনীতিতে গতানুগতিক ধ্যান-ধারণা থেকে মুক্ত হয়ে উদার ও প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার সঙ্গে একটি ইতিবাচক নির্বাচন কাম্য ছিল। নির্বাচন সামনে রেখে ভোটার টানতে কমবেশি সব দলই রংবদলের খেলায় মত্ত। ধর্মকে ব্যবহার করে বিভাজনের রাজনীতি প্রকটতর। সমস্যা হলো আমরা সব ভুলে যাই। আমরা ভুলে গেছি জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০ প্রাণহানি; ৩১ হাজার অঙ্গহানি, হাজারো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ত্যাগের কথা। আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ইয়ামিন থেকে শুরু করে অতি সম্প্রতি হারিয়েছি অতি সম্ভাবনাময় অকুতোভয় তরুণ রাজনীতিবিদ ওসমান হাদিকেও। দুঃখের বিষয় গণ–অভ্যুত্থানটি আজ প্রায় ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।
এতকিছুর পরও আমরা আশাবাদী হতে চাই। কামনা করছি, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে একটি নিরাপদ, সুষ্ঠু, শান্তিমূলক ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যে নির্বাচন রাষ্ট্রের পরবর্তী চরিত্র নির্ধারণ করে দেবে। আশা রাখি, প্রাচীনপন্থা নীতি থেকে বের হয়ে একটি উদারপন্থী রাষ্ট্র ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে বিশ্বদরবারে।
*লেখক: সুরাইয়া সিদ্দিকী, টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]