জাগ্রেব: ইতিহাস স্থাপত্য বিজ্ঞানে মানুষের গল্প
জুমার নামাজের পর বিদায় জানাতে হবে বসনিয়াকে। রাজধানী সারায়েভোতে হোটেলের পাশেই ছিল ঐতিহাসিক সম্রাট মসজিদ। শুক্রবার, ৭ জুন ২০২৪ জুমার নামাজ আদায় করলাম অটোমান আমলের এই মসজিদে। নামাজ শেষে ট্যাক্সি ডেকে বিমানবন্দরে যাত্রা। সামনে অপেক্ষা করছিল নতুন গন্তব্য, ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী জাগরেব।
ক্রোয়েশিয়া এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৩৪৭ ধরতে হবে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ট্যাক্সি এগিয়ে চলেছে আঁকাবাঁকা পথ ধরে। কখনো সরু অলিগলি, কখনো পাহাড়ের গায়ে ছড়িয়ে থাকা ঘরবাড়ি, আবার কখনো চোখের সামনে খুলে যাচ্ছে সবুজ পাহাড়ের বিস্তৃত দৃশ্য। ইউরোপের অনেক শহরই দেখেছি, কিন্তু সারায়েভোর সৌন্দর্যে রয়েছে এক স্বতন্ত্র মাধুর্য। পাহাড় আর নগরজীবন এখানে পরস্পরের পরিপূরক। শহরের গায়ে লেগে আছে অটোমান ঐতিহ্য, মসজিদের মিনার আর ইউরোপীয় স্থাপত্যের ছাপ। আবার এই সৌন্দর্যের আড়ালেই রয়েছে যুদ্ধ, অবরোধ ও মানুষের অসীম দুর্ভোগের ইতিহাস।
শহর ছেড়ে বিমানবন্দরের দিকে এগোতে এগোতে নগরের কোলাহল ক্রমে পেছনে পড়ে রইল। অল্প সময়ের মধ্যেই সারায়েভোর সঙ্গে একধরনের মায়া তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বিদায়ের মুহূর্তে সেই মায়াই যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
বিমানবন্দরে পৌঁছে বোর্ডিং পাস নিয়ে সিকিউরিটি আর ইমিগ্রেশন পেরিয়ে চলে গেলাম ক্রোয়েশিয়া এয়ারলাইনসের এক্সিকিউটিভ লাউঞ্জে। ইউরোপের এই ছোট এয়ারলাইনস আবার বিশ্বের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর জোট স্টার অ্যালায়েন্সের (Star Alliance) সদস্য। বিশ্বব্যাপী স্টার অ্যালায়েন্সের যেকোনো এক্সিকিউটিভ ভিআইপি লাউঞ্জে আমার প্রবেশাধিকারের সুযোগ থাকার সুবাদে সারায়েভো বিমানবন্দরের এই লাউঞ্জে কিছুক্ষণ বিশ্রাম, খাওয়াদাওয়ার পাশাপাশি বোর্ডিংয়ের জন্য অপেক্ষা।
এক ঘণ্টার কম সময়ের এই আকাশযাত্রায় সময়মতো ছোট বিমানটি উড়াল দিল। বসনিয়া ছেড়ে অবশেষে নিচে ভেসে উঠল ক্রোয়েশিয়ার ভূখণ্ড। পাহাড়ি দৃশ্য পেছনে ফেলে পৌঁছে গেলাম জাগরেবের ফ্রাঞ্জো তুদমান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ক্রোয়েশিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট ও স্বাধীনতাপরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের অন্যতম রাষ্ট্রনায়ক ফ্রাঞ্জো তুদমানের নামানুসারে বিমানবন্দরটির নামকরণ। অবশ্য ক্রোয়েশিয়ার প্রধান আন্তর্জাতিক এই বিমানবন্দর রাজধানী জাগরেবে অবস্থিত হওয়ার কারণে এটি জাগরেব বিমানবন্দর নামেও পরিচিত।
জাগরেব: নতুন শহরে প্রথম সন্ধ্যা—
বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সিতে শহরের দিকে যেতে যেতে প্রথমেই চোখে পড়ল নগরটির ভিন্ন চরিত্র। সারায়েভো যেন পাহাড়ের কোলে আশ্রয় নেওয়া এক ঐতিহাসিক নগরী; আর জাগরেবের পরিচয় প্রশস্ত রাস্তা, সবুজ পার্ক, পুরোনো ইউরোপীয় স্থাপত্য এবং আধুনিক নগরজীবনের শান্ত সহাবস্থানে।
ক্রোয়েশিয়া হচ্ছে স্লোভেনিয়া, হাঙ্গেরি, সার্বিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং মন্টিনেগ্রোবেষ্টিত দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের একটি রাষ্ট্র। দেশটির আয়তন প্রায় ৫৬ হাজার ৫৪২ বর্গকিলোমিটার এবং সরকারি মুদ্রা ইউরো। ইউরোপের বলকান অঞ্চলে ও অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত একটি চমৎকার পর্যটনপ্রধান দেশ। সংসদীয় প্রজাতন্ত্রের দেশটি ১৯৯১ সালের ২৫ জুন যুগোস্লাভিয়া থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়।
ভূগোলের মানচিত্রে ক্রোয়েশিয়া বলকানের অংশ হলেও, ইতিহাস, ধর্ম, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্নে অনেক ক্রোয়েশীয় নিজেদের মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপের অংশ হিসেবে দেখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তবে সব ক্রোয়েশীয়র দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়; অনেকে নিজেদের বলকান পরিচয়ও স্বীকার করেন।এই দ্বিধার পেছনে রয়েছে কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস, অটোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে সংঘাত, অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় শাসনের উত্তরাধিকার, যুগোস্লাভিয়ার অভিজ্ঞতা এবং স্বাধীন ক্রোয়েশিয়ার ইউরোপমুখী যাত্রা।
পিৎজা ডেলিভারির কাজে প্রচুর ভারতীয় আছেন, কিছু বাংলাদেশিও আছেন। ক্রোয়েশিয়ায় আসতে সরকারি খরচের চেয়ে অনেক বেশি খরচ হয় যাঁদের মাধ্যমে আসেন, সেই এজেন্সিগুলোর চাহিদা মেটাতে। সরকারিভাবে কর্মসংস্থানের এই বিষয়গুলো দেখভাল করতে পারলে খরচ অনেক কম হতো।
স্বাধীন ক্রোয়েশিয়ার ইউরোপমুখী যাত্রার এই প্রবণতা বিমানবন্দর থেকে শহরকেন্দ্রে আসার পথেই যেন চোখে পড়ে। রাস্তার দুই পাশের স্থাপত্য, ভবনগুলোর নির্মাণশৈলী এবং নগরজীবনের বিন্যাসে মধ্য ইউরোপীয় ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায়। মনে হয়, স্থাপত্যের ভাষায় ক্রোয়েশিয়া তার ইউরোপীয় পরিচয়কে তুলে ধরতে চায়।
শহরে পৌঁছে উঠলাম আগে থেকে বুক করা এয়ারবিএনবির অ্যাপার্টমেন্টে। এয়ারবিএনবি (Airbnb) হলো অনলাইনে বাসা, অ্যাপার্টমেন্ট, কক্ষ বা অন্যান্য আবাসন স্বল্প মেয়াদে ভাড়া নেওয়ার একটি জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম। হোটেলের আনুষ্ঠানিক পরিবেশের বদলে এখানে স্থানীয় মানুষের আবাসিক জীবনের কাছাকাছি থাকার সুযোগ পাওয়া যায়।
কেন্দ্রীয় রেলস্টেশন থেকে হাঁটা দূরত্বে অবস্থিত বিঅ্যান্ডবি কনসেপ্ট নামের ছোট পরিসরের আবাসনটি ছিল পরিচ্ছন্ন, আধুনিক ও আরামদায়ক। কক্ষে প্রয়োজনীয় সব সুবিধাই ছিল। তবে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল শহরকে হেঁটে দেখার জন্য এর সুবিধাজনক অবস্থান।
হোটেলে ব্যাগ রেখে বেরিয়ে পড়লাম আশপাশটা দেখতে। প্রথম দিনের সন্ধ্যা, তাই খুব বেশি দূরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল না। পরদিন পুরো দিন হেঁটে হেঁটে জাগরেবকে আবিষ্কার করব—এই প্রত্যাশা নিয়েই শুরু হলো নতুন শহরের সঙ্গে পরিচয়।
জাগরেবের কেন্দ্রীয় রেলস্টেশন, শহরের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা একটি স্থাপনা। এখানকার রেলযোগাযোগ উনিশ শতকে গড়ে ওঠে। ইউরোপের অনেক শহরের মতো জাগরেবেও রেলপথ কেবল যাতায়াতের মাধ্যম ছিল না; বরং নগরায়ণ, বাণিজ্য ও মানুষের চলাচলের নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছিল।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে সামনে তাকাতেই চোখে পড়ল বিস্তৃত সবুজ চত্বর, কিং টমিস্লাভ স্কয়ার। চত্বরের মাঝখানে ঘোড়ার পিঠে রাজা টমিস্লাভের মূর্তি। তার ওপারে হলুদাভ রঙের দৃষ্টিনন্দন আর্ট প্যাভিলিয়ন। এই চত্বরের সৌন্দর্যের বিশেষত্ব হলো এর উন্মুক্ত বিন্যাস।
স্টেশনের কাছেই বিখ্যাত হোটেল এসপ্লানেড। ১৯২৫ সালে উদ্বোধিত এই হোটেল নির্মিত হয়েছিল মূলত ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসের যাত্রীদের বিলাসবহুল আবাসনের কথা মাথায় রেখে। ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস ছিল ইউরোপের অন্যতম বিখ্যাত বিলাসবহুল দূরপাল্লার ট্রেন, যা পশ্চিম ইউরোপের সঙ্গে মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের সংযোগ স্থাপনে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিল। ট্রেনটি ছিল বিলাসিতা, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, অভিজাত জীবনযাপন এবং ইউরোপের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক প্রতীক। প্যারিস–ভেনিস–ইস্তাম্বুল রুটের একটি পর্যায়ে জাগরেব গুরুত্বপূর্ণ স্টপেজ ছিল। হোটেলটির ইতিহাস সেই সময়েরই স্মারক। আগাথা ক্রিস্টির বিখ্যাত গোয়েন্দা উপন্যাস ‘মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস’ এই ট্রেনকে আরও পরিচিত করে তুলেছে।
জাগরেবে প্রথম সন্ধ্যায় আর বেশি দূর এগোলাম না। পরদিন সকাল থেকে শুরু হবে জাগরেবকে পায়ে হেঁটে চেনার দিনমান অভিযান।
হেঁটে হেঁটে জাগরেব—
পরদিন সকালেই বেরিয়ে পড়লাম। ভ্রমণে আমার সবচেয়ে প্রিয় পদ্ধতি হলো হেঁটে শহর দেখা। গাড়ির জানালা দিয়ে কোনো শহরের রাস্তা, ভবন কিংবা চত্বর দেখা যায়; কিন্তু হাঁটলে শহরকে অনুভব করা যায়। মানুষের কথাবার্তা, ক্যাফের কোলাহল, দোকানের সাজসজ্জা, ট্রামের শব্দ, রাস্তার গন্ধ—সবকিছু মিলিয়ে শহরের সঙ্গে গড়ে ওঠে এক ব্যক্তিগত সম্পর্ক।
জাগরেবকে মোটামুটি দুটি ঐতিহাসিক অংশে ভাগ করে দেখা যায় আপার টাউন আর লোয়ার টাউন।
লোয়ার টাউন অপেক্ষাকৃত সমতল। প্রশস্ত রাস্তা, বড় বড় চত্বর, সবুজ পার্ক, জাদুঘর এবং উনিশ ও বিশ শতকের ইউরোপীয় স্থাপত্যে সাজানো অংশ। অন্যদিকে আপার টাউন হলো পুরোনো জাগরেবের প্রাণ—সরু পাথরের রাস্তা, মধ্যযুগীয় প্রবেশপথ, পুরোনো গির্জা, সংসদ ভবন এবং উঁচু ঢালের ওপর গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক জনপদ।
হাঁটতে হাঁটতে লোয়ার টাউন থেকে এগিয়ে গেলাম আপার টাউনের দিকে। টিলা বেয়ে কিংবা সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে উঠতে মনে হলো, একই শহরের মধ্যে যেন দুটি আলাদা সময়ের বসবাস। নিচের শহরে আধুনিক নগরজীবনের গতি আর ওপরের শহরে ইতিহাসের ধীর পদচারণ।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
ওপরের শহরে সেন্ট মার্ক্স স্কয়ারের নান্দনিকতায় চোখ আটকে গেল, বিশেষ করে সেন্ট মার্ক্স চার্চের রঙিন ছাদে। বিভিন্ন রঙের টালি দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ক্রোয়েশিয়ার ঐতিহাসিক প্রতীক ও জাগরেবের পরিচিত চিহ্ন। চারপাশের ভবনগুলোর তুলনায় গির্জাটির ছাদ এতটাই স্বতন্ত্র যে সহজেই বোঝা যায়, কেন এটি শহরের অন্যতম পরিচিত দৃশ্য। আশপাশেই ক্রোয়েশিয়া সংসদ ভবনসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলো।
এরপর এগিয়ে গেলাম স্টোন গেটের দিকে। পুরোনো শহরের এই প্রবেশপথ জাগরেবের অন্যতম পরিচিত ঐতিহাসিক নিদর্শন। পাথরের পথ, পুরোনো দেয়াল আর চারপাশের স্থাপত্যের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, প্রতিটি বাঁক যেন শহরের অতীত ঐতিহ্যের স্মৃতি স্মারক।
কিন্তু আপার টাউনে আমার সবচেয়ে ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছিল একটি জাদুঘরে।
ভাঙা সম্পর্কের স্মৃতি জাদুঘর—
Museum of Broken Relationships—জাদুঘরটির নাম শুনেই কৌতূহল জাগে।
ইউরোপ হচ্ছে জাদুঘরে মহাদেশ। সাধারণত জাদুঘরে আমরা দেখি রাজা-বাদশাহদের স্মৃতিচিহ্ন, যুদ্ধের অস্ত্র, প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন কিংবা বিখ্যাত মানুষের ব্যবহৃত সামগ্রী; কিন্তু ভাঙা সম্পর্কের স্মৃতি নিয়ে একটি জাদুঘর! অভিনব আর চমকজাগানো বটে।
ভালোবাসার সম্পর্ক ভেঙে গেলে মানুষ কতভাবেই–না সেই অতীতকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে। কেউ পুরোনো ছবি সরিয়ে রাখে, কেউ চিঠি ছিঁড়ে ফেলে, কেউ উপহার তুলে রাখে বহুদিন অগোচরে। আবার কোনো কোনো স্মৃতি এতটাই গভীরে গেঁথে থাকে যে সম্পর্ক শেষ হলেও তার রেশ থেকে যায় দীর্ঘকাল।
এই জাদুঘরে মানুষের সেই ব্যক্তিগত স্মৃতিগুলোই জায়গা পেয়েছে।
কোথাও পুরোনো খেলনা, কোথাও কাপড়, কোথাও চিঠি, কোথাও এমন ছোট্ট কোনো বস্তু, যার বাইরের জগতে হয়তো তেমন কোনো মূল্যই নেই। অথচ তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কারও ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, অভিমান, অপেক্ষা কিংবা একসময় একসঙ্গে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন।
বস্তুগুলো নিজেরা কথা বলে না। কিন্তু তাদের পাশে লেখা মানুষের গল্পগুলো যেন নীরবে অনেক কিছু বলে যায়।
একটি সাধারণ জিনিস কীভাবে মানুষের জীবনের অসাধারণ স্মৃতির বাহক হয়ে উঠতে পারে, এই জাদুঘরে এসে তা নতুন করে উপলব্ধি করলাম। যে বস্তু একসময় দুজন মানুষের ভালোবাসার প্রতীক ছিল, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর সেটিই হয়তো হয়ে উঠেছে বিচ্ছেদের সাক্ষী।
আমার কাছে জাদুঘরটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ প্রদর্শিত বস্তুগুলো নয়, বরং সেগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের গল্প। এখানে ইতিহাস কোনো রাজা বা রাষ্ট্রের নয়; একান্ত ব্যক্তিগত জীবনের। অথচ সেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্যেই ধরা পড়ে মানুষের অনুভূতি।
ভালোবাসা, প্রত্যাশা, হতাশা, বিচ্ছেদ—ভাষা ও দেশের সীমা ছাড়িয়ে এসব অনুভূতি আমাদের সবারই চেনা। মানুষের সম্পর্কের ধরন আলাদা হতে পারে, সামাজিক বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা হারানোর বেদনা কিংবা অতীতকে আঁকড়ে ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা খুব একটা আলাদা নয়।
ইতিহাসের জাদুঘরে সাধারণত সময়ের বড় বড় ঘটনাকে সামনে রাখা হয়। কিন্তু এই জাদুঘর দেখাল, মানুষের ব্যক্তিগত জীবনও একেকটি ইতিহাস। রাষ্ট্রের ইতিহাসে যাদের নাম থাকে না, তাদের জীবনেও থাকে আনন্দ-বেদনা, অর্জন-হারানোর অসংখ্য অধ্যায়।
জাগরেবের ঐতিহাসিক স্থাপত্য দেখতে এসে এমন এক মানবিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হব, ভাবিনি। শহরটির স্মৃতিতে তাই ভাঙা সম্পর্কের স্মৃতি জাদুঘরটি আমার কাছে একেবারেই আলাদা হয়ে রইল।
পাহাড় থেকে নিচে—ফানিকুলার, ট্রাম আর নগরজীবন—
আপার টাউনে উঠতে গিয়ে বেশ কায়িক পরিশ্রম হলো। নামার সময় পরিশ্রম কম। ভাবলাম এবার একটু বিনোদন নেওয়া যাক।
জাগরেবের ঐতিহাসিক ফানিকুলার আপার আর লোয়ার টাউনকে যুক্ত করেছে মাত্র ৬৬ মিটার দীর্ঘ একটি খাড়া পথে। ১৮৯০ সালে চালু হওয়া এই ছোট্ট যন্ত্রচালিত রেলপথ শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, শহরের ঐতিহ্যেরও অংশ।
ফানিকুলারে মাত্র ৬৪ সেকেন্ডে লোয়ার টাউনে নেমে এলাম।
জাগরেবের ট্রামব্যবস্থার মধ্যেও একধরনের পুরোনো ইউরোপীয় সৌন্দর্য রয়েছে। রাস্তার মধ্য দিয়ে ট্রাম এগিয়ে যাচ্ছে, দুই পাশে ঐতিহাসিক ভবন, কোথাও ক্যাফের টেবিলে বসে মানুষ গল্প করছে, কোথাও দোকানের সামনে পথচারীদের আনাগোনা। দৃশ্যগুলোতে নেই কোনো কৃত্রিম জাঁকজমক; বরং রয়েছে একটি শহরের স্বাভাবিক ছন্দ।
কোনো শহরের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু তার বিখ্যাত স্থাপনাগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। শহরটি কীভাবে প্রতিদিন বেঁচে থাকে, তার মানুষ কীভাবে চলাফেরা করে, কোথায় বসে গল্প করে, কীভাবে পুরোনো আর নতুনকে একসঙ্গে ধারণ করে—এসবও শহরকে বোঝার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
টেসলার খোঁজে—
নিকোলা টেসলা—বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসে এক বিস্ময়কর নাম। বিদ্যুৎ–প্রযুক্তির বিকাশে, বিশেষ করে অলটারনেটিং কারেন্ট বা এসি (AC) ব্যবস্থার উন্নয়নে তাঁর অবদান বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।
নিকোলা টেসলাকে নিয়ে সার্বিয়া আর ক্রোয়েশিয়ার টানাটানি। সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি নিকোলা টেসলার নামে। সার্ব বংশোদ্ভূত টেসলার জন্ম কিন্তু বর্তমান ক্রোয়েশিয়ার স্মিলজানে (ক্রোয়েশীয় উচ্চারণের স্মিলিয়ান)। ক্রোয়েশিয়ায় জন্ম নেওয়া সার্ব বংশোদ্ভূত এই বিজ্ঞানী জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে। তাঁর জীবন ছিল আবিষ্কার, কল্পনা ও বৈজ্ঞানিক সাধনায় পরিপূর্ণ। অথচ জীবনের শেষ অধ্যায়ে নিউইয়র্কের একটি হোটেলে অনেকটা নিঃসঙ্গ অবস্থায় কাটাতে হয়েছিল তাঁকে। আজকের বিশ্বে জনপ্রিয় বৈদ্যুতিক গাড়ি টেসলার নামকরণ নিকোলা টেসলার স্মরণে।
জাগরেবে এসে টেসলাকে স্মরণ না করার অর্থ বিজ্ঞান আর ইতিহাসকে অবজ্ঞা করা। জাগরেবের বিখ্যাত স্থাপনা নিকোলা টেসলা টেকনিক্যাল মিউজিয়াম দেখার ইচ্ছা ছিল প্রবল। হেঁটে হেঁটে পৌঁছে গেলাম সেই জাদুঘরের ঠিকানায়; কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি, মিউজিয়াম বন্ধ। ভেতরে যাওয়া হলো না, ঘুরে ঘুরে চারপাশটা দেখলাম। কিছুটা হতাশ হলাম। ভ্রমণের আনন্দ তো শুধু পরিকল্পনা সফল হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোনো কোনো অপূর্ণতাও ভ্রমণের স্মৃতির অংশ হয়ে যায়।
ক্রোয়েশিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিশ্বব্যাপী সুনাম। সাগর আর পাহাড়ের নৈসর্গিকতায় ক্রোয়েশিয়ার অবকাশযাপনকেন্দ্রগুলো বেশ বিখ্যাত। সেই সঙ্গে জাগরেবকে মনে হলো একটি ভাইব্রেন্ট রাজধানী। শহর কেন্দ্রে ফেরার পথে চোখে পড়ল নান্দনিক সব স্থাপত্যের স্থাপনা।
হাঁটতে হাঁটতে এবার পৌঁছালাম জাগরেবের অন্যতম বিখ্যাত স্থাপনা ক্রোয়েশিয়া ন্যাশনাল থিয়েটারের সামনে।
হলুদাভ রঙের দৃষ্টিনন্দন ভবন, বিশাল গম্বুজ, অলংকৃত প্রবেশপথ—দূর থেকেই স্থাপনাটি নজর কাড়ে। দেখলেই মনে হয়, এটি একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয়। নাটক, অপেরা ও ব্যালে—তিনটি শিল্পধারাকে ধারণ করে ন্যাশনাল থিয়েটারটি ক্রোয়েশিয়ার প্রধান সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি।
রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদের বলে দেয়, একটি জাতি কীভাবে রাষ্ট্র গড়ে তুলেছে, কীভাবে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। আর তার শিল্পসংস্কৃতি আমাদের জানায়, সেই জাতির মানুষ কীভাবে নিজেদের অনুভূতি, স্বপ্ন, সংকট ও আত্মপরিচয় প্রকাশ করেছে।
টেসলার জাদুঘর দেখা হলো না ঠিকই, কিন্তু জাগরেবে তাঁর স্মৃতি খুঁজে পাওয়ার আরেকটি সুযোগ তখনো বাকি ছিল।
টেসলার স্মৃতির সামনে—
শহরের কেন্দ্রের দিকে ফিরে এসে পৌঁছালাম রেস্তোরাঁ পাড়ার কাছাকাছি। মাসারিকোভা, প্রেরাদোভিচেভা ও টেসলিনা সড়কের সংযোগস্থলের কাছে এসে চোখে পড়ল ব্রোঞ্জের তৈরি নিকোলা টেসলার মূর্তি। চারপাশে শহরের ব্যস্ততা, মানুষের আসা-যাওয়া—আর তারই মধ্যে বসে আছেন আধুনিক বিদ্যুৎ–প্রযুক্তির ইতিহাসে অসামান্য অবদান রাখা এই বিজ্ঞানী চিন্তামগ্ন ভঙ্গিতে। ভাস্কর্যটি বিখ্যাত ক্রোয়েশীয় শিল্পী ইভান মেস্ত্রোভিচের অমর কীর্তি।
জাগরেবের রাজপথে তাঁর এই উপস্থিতি মনে করিয়ে দিল, একজন মানুষের আবিষ্কার কীভাবে দেশ-কাল ছাড়িয়ে গোটা পৃথিবীর জীবন বদলে দিতে পারে। যে মানুষটি বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তির জগতে এমন গভীর প্রভাব রেখে গেছেন, তাঁর স্মৃতি আজও একটি শহরের পথচারীদের সামনে জীবন্ত হয়ে আছে। ভূখণ্ড, জাতিগত পরিচয়, কর্মক্ষেত্র—সবকিছু ছাপিয়ে একজন বিজ্ঞানীর আবিষ্কারের সুফল ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে। বিজ্ঞান ও জ্ঞান শেষ পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির সম্পদ, টেসলা তারই এক অসাধারণ উদাহরণ।
জাগরেব ডাউনটাউন—পুরোনো ইউরোপের জীবন্ত ছন্দ—
দিনভর হাঁটাহাঁটি করে ক্ষুধা বেশ চেপে বসেছে। টেসলার ভাস্কর্যের পাশেই রেস্তোরাঁ পাড়া। সেখানে পেয়ে গেলাম একটি ভারতীয় রেস্তোরাঁ, বেশ অভিজাত। অর্ডার দিলাম খাসির কাবাব।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সামনে এল খাবার। সারা দিনের ক্লান্তির পর পরিচিত মসলার গন্ধে ভরা গরম কাবাবের সামনে বসে মনে হলো, দূর ইউরোপে থেকেও উপমহাদেশের স্বাদ।
খাবার শেষে আবার বেরিয়ে পড়লাম শহরের প্রাণকেন্দ্রের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছালাম জাগরেবের প্রাণকেন্দ্র বান ইয়োসিপ ইয়েলাচিচ চত্বরে। চত্বরের মাঝখানে ঘোড়ার পিঠে বসা তাঁর ব্রোঞ্জের মূর্তি শহরের ইতিহাস ও ক্রোয়েশীয় জাতীয় পরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। তিনি ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর ক্রোয়েশীয় সেনানায়ক ও রাজনীতিবিদ।
চত্বরটি জাগরেবের কেন্দ্রস্থল। চারপাশে উনিশ শতকের দৃষ্টিনন্দন ভবন, দোকানপাট, ক্যাফে, ট্রাম আর মানুষের অবিরাম চলাচল। কোথাও মানুষ কেনাকাটা করছে, কোথাও বন্ধুরা বসে গল্প করছে, কোথাও পথচারীরা ট্রামের জন্য অপেক্ষা করছে। শহরটির প্রতিটি দৃশ্যেই যেন একটি স্বাভাবিক প্রাণচাঞ্চল্য।
জাগরেবের ডাউনটাউন আমার কাছে বিশেষভাবে ভালো লাগল এর জীবন্ত অথচ পরিমিত পরিবেশের জন্য। এখানে ইতিহাস আছে, কিন্তু ইতিহাস যেন বর্তমানকে আড়াল করে রাখেনি। পুরোনো ভবনের পাশেই আধুনিক দোকান, ঐতিহাসিক চত্বরের মধ্য দিয়ে ট্রামের চলাচল আর শত বছরের স্থাপত্যের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আজকের নগরবাসী—সব মিলিয়ে শহরটি নিজের অতীতকে সঙ্গে নিয়েই বর্তমানের পথে এগিয়ে চলেছে।
জাগরেবকে খুব বিশাল শহর বলে মনে হয় না। কিন্তু পায়ে হেঁটে যতই এগিয়েছি, ততই সামনে এসেছে নতুন কোনো ইতিহাস, কোনো স্থাপত্য, কোনো শিল্পকর্ম কিংবা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্য।
হঠাৎ বাংলাদেশ—
দিনের শেষ দিকে শহরের কেন্দ্রের বান ইয়োসিপ ইয়েলাচিচ চত্বরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখে পড়ল কয়েকজন বাংলাদেশিকে। বিদেশের মাটিতে নিজের দেশের মানুষ দেখার অনুভূতি ব্যাখ্যা করতে খুব বেশি শব্দের প্রয়োজন হয় না। অচেনা শহরের রাস্তায় হঠাৎ পরিচিত ভাষার শব্দ কানে এলে মনে হয়, দূরদেশের মধ্যেও যেন নিজের একটি ছোট্ট ঠিকানা খুঁজে পাওয়া গেল।
তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে গেলাম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই শুরু হলো আলাপ। জানতে চাইলাম, কত দিন ধরে জাগরেবে আছেন, কী কাজ করেন, কেমন আছেন।
কথা প্রসঙ্গে এল অভিবাসনের বিষয়। কে কীভাবে ক্রোয়েশিয়ায় এসেছেন, কাজের সুযোগ কেমন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের প্রক্রিয়া কী রকম—এসব বিষয়ে তাঁদের কাছ থেকে জানলাম।
পিৎজা ডেলিভারির কাজে প্রচুর ভারতীয় আছেন, কিছু বাংলাদেশিও আছেন। ক্রোয়েশিয়ায় আসতে সরকারি খরচের চেয়ে অনেক বেশি খরচ হয় যাঁদের মাধ্যমে আসেন, সেই এজেন্সিগুলোর চাহিদা মেটাতে। সরকারিভাবে কর্মসংস্থানের এই বিষয়গুলো দেখভাল করতে পারলে খরচ অনেক কম হতো।
পর্যটক হিসেবে আমরা একটি দেশে প্রবেশ করি। হোটেলে উঠি, শহরের দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখি। ছবি তুলি, স্থানীয় খাবার খাই। তারপর কয়েক দিনের মধ্যেই আবার অন্য গন্তব্যে চলে যাই। আমাদের কাছে শহরটি একটি ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা।
কিন্তু প্রবাসী বা অভিবাসী মানুষের কাছে একই শহরের অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তাঁদের কাছে জাগরেব কেবল ঐতিহাসিক স্থাপত্য আর সুন্দর চত্বরের শহর নয়। এটি জীবিকার শহর, কাজের শহর, সংগ্রামের শহর। এখানে প্রতিদিনের দায়িত্ব আছে, ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা আছে, আছে নিজের অবস্থান তৈরি করার লড়াই। পরিবার হয়তো হাজার হাজার মাইল দূরে, কিন্তু জীবনের প্রতিদিনের হিসাব মেলাতে হয় এই শহরের রাস্তায়, কর্মস্থলে, ছোট্ট বাসায়।
একজন পর্যটক যে রাস্তায় ছবি তুলে মুগ্ধ হন, একজন অভিবাসী হয়তো সেই রাস্তায় প্রতিদিন কাজে যাওয়ার জন্য হাঁটেন। পর্যটকের কাছে যে শহর কয়েক দিনের স্মৃতি, অভিবাসীর কাছে সেই শহরই হয়ে উঠতে পারে দীর্ঘ জীবনের বাস্তবতা।
রাতের জাগরেব—
সারা দিন হেঁটে হোটেলে ফেরার আগে দেখতে চাইলাম রাতের জাগরেব। আপার আর লোয়ার টাউনের সংযোগে প্রচুর রেস্তোরাঁ। রেস্তোরাঁয় বাইরে রাস্তায় অনেক জায়গা নিয়ে টেবিল–চেয়ার বসানো, বেশ জমজমাট রাতের জাগরেব। নৈশভোজ সেরে নিলাম এক ব্যস্ত রেস্তোরাঁয়, লম্বা লাইন দেখে জনপ্রিয়তা সম্পর্কে ধারণা নিলাম। লাইনে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে। জাগরেবে ভারতীয়দের উপস্থিতি বেশ।
নৈশভোজ শেষে যখন হোটেলে ফিরছিলাম, তখন শরীরে ক্লান্তি থাকলেও মনে ছিল পরিতৃপ্তি। একটি শহরকে দেখেছি তার ঐতিহাসিক স্থাপত্যে, শিল্পসংস্কৃতিতে, বিজ্ঞানীর স্মৃতিতে, ট্রাম আর ব্যস্ত চত্বরে। আবার অচেনা শহরে নিজের দেশের কয়েকজন মানুষের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি জীবনের অন্য এক বাস্তবতা।
নৈশভোজের পর রেস্তোরাঁ পাড়া ও শহরকেন্দ্রের ব্যস্ত, জমকালো পরিবেশ পেছনে ফেলে অলিগলির নীরবতা ভেঙে রাত ১০টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম হোটেলে। রাতের নির্জন সড়কে একাকী হেঁটে চলার মধ্যেও যে নিরাপত্তাবোধ কাজ করে, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকে একটি নিরাপদ রাষ্ট্রের নীরব শহর।
সারায়েভো থেকে জাগরেব—দুটি শহর, দুটি ইতিহাস। কিন্তু মানুষের গল্প প্রায় একই—কেউ স্মৃতি নিয়ে বাঁচে, কেউ নতুন ভবিষ্যতের খোঁজে শহর বদলায়। আর একজন পথিকের কাজ শুধু জায়গা দেখা নয়; সেই গল্পগুলোকে নিজের ভেতরে ধারণ করে ফিরে আসা।
পর দিন ট্রেনযাত্রায় ক্রোয়েশিয়া ছেড়ে যেতে হবে স্লোভেনিয়ায়, নতুন কিছু দেখার হাতছানিতে।
*লেখক: শোয়েব সাঈদ, কানাডার মন্ট্রিয়লে একটি বহুজাতিক করপোরেটে ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত।