এক শ্রমিক নেতা আরেক পিয়ানোবাদকের দেশে

সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান প্রাসাদ।ছবি: লেখক

২০২৪-এর জুনের প্রথম সপ্তাহে হল্যান্ডের ব্রেডা আর দ্য হেগে তিন দিনের করপোরেট মিটিং। পরের সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডে আরেকটি করপোরেট মিটিং। মাঝখানে চার দিনের গ্যাপ। এই অবসরটুকুকেই সুযোগ হিসেবে নিলাম—ইউরোপের কয়েকটি দেশ ঘোরার।

ওয়ারশের পথে—

ব্রেডা থেকে ট্রেনে ঘণ্টাখানেকেই সিফল বিমানবন্দর। পোলিশ এয়ারলাইনসের রাত আটটার ফ্লাইটে ওয়ারশ যেতে হবে। সিফল ডাচ পতাকাবাহী বিমান সংস্থা কেএলএমের প্রধান হাব। বিমানবন্দরটির নিজস্ব একটা আলাদা চরিত্র আছে। বিমান চলাচলের ইতিহাস, পুরোনো উড়োজাহাজের স্মারক, প্রদর্শনী—সব মিলিয়ে যাত্রাপথে একধরনের মিউজিয়াম–মিউজিয়াম আবহ তৈরি হয়। মনে হয়, এখানে বিমান চলাচল শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়—নিজেই যেন একটি ইতিহাস।

সিকিউরিটি পেরিয়ে সোজা চলে গেলাম পোলিশ এয়ারলাইনসের স্টার অ্যালায়েন্স বিজনেস লাউঞ্জে। হাতে তখনো বেশ কিছু সময়। লাউঞ্জে বসে প্রায় তিন ঘণ্টা অফিস করলাম। ই-মেইল, জরুরি কাজ, কয়েকটি ফোন—পর্যটনের মধ্যেও করপোরেট জীবনের ব্যস্ততা থেমে থাকে না।

তারপর বোর্ডিং ঘোষণা।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

রাতের ফ্লাইটে সিফল ছেড়ে উড়লাম পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশের দিকে।

পোল্যান্ডের কথা উঠলেই আমার প্রজন্মের মানুষের মনে প্রথমেই যে নামটি আসে, তিনি লেস ওয়ালেসা। আমাদের ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন এক অসাধারণ রাজনৈতিক প্রতীকের নাম—শ্রমিক নেতা থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠা মানুষ। গদানস্কের শিপইয়ার্ডের শ্রমিক আন্দোলন, সলিডারিটি আন্দোলনের নেতৃত্ব, কমিউনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে গণ–আন্দোলন—সব মিলিয়ে ওয়ালেসা তখন শুধু পোল্যান্ডের নন, পূর্ব ইউরোপের পরিবর্তনেরই এক প্রতীক।

সেই লেস ওয়ালেসার দেশ পোল্যান্ডে গিয়েছি কয়েকবার। কিন্তু এবার খানিকটা সময় নিয়ে ইতিহাসের পাতায় পড়া এই দেশের কয়েকটি বিখ্যাত জায়গা দেখার ইচ্ছা হলো।

ওয়ারশ বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি
ছবি: লেখক

ওয়ারশ—প্রথম রাত

রাতের ওয়ারশ আমার কাছে প্রথমে খুব বেশি কথা বলল না। বিমানবন্দর থেকে হোটেলে যেতে যেতে জানালার বাইরে আলো-আঁধারিতে আধুনিক নগরীর রেখাচিত্র দেখছিলাম। থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল আইবিস স্টাইলস ওয়ারশ হোটেলে। হোটেলে পৌঁছে ক্লান্ত শরীর নিয়ে কিছুক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়ালাম।

ঘুমানোর আগে মনে হলো—এ শুধু আরেকটি ইউরোপীয় রাজধানী নয়। এই শহর যুদ্ধ দেখেছে, ধ্বংস হয়েছে, আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। নাৎসি দখল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, ওয়ারশ বিদ্রোহ, প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহর—তারপর আবার নিজের পুরোনো চেহারাকে ফিরিয়ে আনার এক অসাধারণ প্রয়াস।

রাতের নীরবতায় সেই ইতিহাস যেন আরও বেশি অনুভব করা যায়।

সকালে ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম পছন্দের প্রথম গন্তব্য—ওয়ারশ বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে।

আরও পড়ুন

ওয়ারশ বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি—বইয়ের ছাদে এক টুকরা সবুজ পৃথিবী

ওয়ারশ ভ্রমণে আমার মূল আকর্ষণ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি। ভিস্তুলা নদীর কাছাকাছি এই লাইব্রেরি তার অসাধারণ রুফটপ গার্ডেনের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। ভবনের ছাদে বাগান, সবুজের মধ্যে হাঁটার পথ, আর ওপরে দাঁড়িয়ে নিচে তাকালে দূরে ভিস্তুলা নদী—স্থাপত্য ও প্রকৃতির এমন মেলবন্ধন শহরের আধুনিকতার সঙ্গে অন্য রকম সৌন্দর্য তৈরি করেছে।

ভিস্তুলা নদী যেন ওয়ারশকে প্রকৃতির আঁচলে ধরে রেখেছে। নদীর দুই তীরের আধুনিক স্থাপত্য, সবুজ অঞ্চল আর ঐতিহাসিক নগরকাঠামো মিলিয়ে শহরটির একটি নিজস্ব চরিত্র তৈরি হয়েছে। কোথাও সমাজতান্ত্রিক যুগের বিশাল ভবন ও প্রশস্ত রাস্তার ছাপ, কোথাও আধুনিক ইউরোপীয় নগরায়ণের রূপ, আবার কোথাও পুরোনো পোলিশ ঐতিহ্য।

লাইব্রেরির ভবনটি ১৯৯৯ সালে চালু হয়। কংক্রিট, কাচ ও তামার সঙ্গে সবুজ উদ্ভিদকে স্থাপত্যের অংশ করে নেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো এর ছাদবাগান—BUW Garden।

সিঁড়ি বেয়ে ছাদবাগানে উঠতে উঠতে মনে হলো, লাইব্রেরির ছাদে নয়, যেন একটি ছোট্ট উদ্যানের ভেতরে ঢুকে পড়ছি। চারদিকে নানা রঙের ফুল ও গাছপালা, হাঁটার পথ, সেতু আর সবুজের নকশা। একসময় ওপরে দাঁড়িয়ে নিচে তাকালে শহর, দূরে ভিস্তুলা নদী—আর মনে হলো, বইয়ের জগৎ আর প্রকৃতির জগৎ এখানে এসে একই জায়গায় মিশে গেছে।

ভবনের সামনের তামার প্যানেলগুলোও আমাকে থামিয়ে দিল। সেখানে বিভিন্ন ভাষা ও লিপির উপস্থিতি—গ্রিক, হিব্রু, আরবি, সংস্কৃতসহ নানা সভ্যতার জ্ঞান-ঐতিহ্যের প্রতি ইঙ্গিত করে। আমার কাছে এটি ভবনটির সবচেয়ে সুন্দর বার্তাগুলোর একটি—জ্ঞানের কোনো একক দেশ নেই; সভ্যতার পর সভ্যতা মিলে তার ভান্ডার তৈরি করেছে। লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে তাই শুধু বইয়ের কথা মনে হলো না। মনে হলো, পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, ভাষা ও অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়েই তো মানুষের জ্ঞানভান্ডার।

ওয়ারশের এই লাইব্রেরি যেন সেই কথাটিই স্থাপত্যের ভাষায় বলে। ভবনের ভেতরে রয়েছে Chashitsu Kaian—একটি ঐতিহ্যবাহী জাপানি চা-প্যাভিলিয়ন বা চা–চক্রের কক্ষ। জাপানের বাইরে এমন স্থাপত্যের উপস্থিতিও বেশ ব্যতিক্রমী।

দূর থেকে ভবনটি আলাদা করে চোখে পড়ে। কংক্রিট, কাচ আর সবুজে মোড়া আধুনিক স্থাপত্য। কিন্তু কাছে গিয়ে বোঝা গেল, এটি শুধু একটি লাইব্রেরি নয়—স্থপতিরা যেন একটি ভবনের মধ্যে বই, জ্ঞান, প্রকৃতি ও মানুষের কল্পনাকে একসঙ্গে বসিয়েছেন। শহরের ইতিহাস আর স্থাপত্যের পাশাপাশি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সৃজনশীলতার এক সুন্দর মেলবন্ধন।

ভিস্তুলার পারে

লাইব্রেরি থেকে চলে গেলাম ভিস্তুলা নদীর পারে। নদীর পাড়ের নান্দনিক ওয়াকওয়ে ধরে হাঁটলাম কিছুক্ষণ। হাঁটতে হাঁটতে ইচ্ছে হলো নদীর পানিতে হাত ভেজাই। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলাম। দুহাত ভরে তুলে নিলাম ভিস্তুলা নদীর জল। ইউরোপের অন্যতম দীর্ঘ নদী ভিস্তুলা পোল্যান্ডের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে এবং ওয়ারশের জীবন ও ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

নদীর ধারে দাঁড়িয়ে শহরটিকে অন্য রকম মনে হলো। একদিকে পুরোনো ওয়ারশ, অন্যদিকে আধুনিক নগরীর উঁচু ভবন। মাঝখানে প্রশস্ত নদী। প্রকৃতি আর নগরসভ্যতার এই পাশাপাশি অবস্থান ওয়ারশকে দিয়েছে আলাদা এক সৌন্দর্য।

ওয়ারশ—ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিরে আসা শহর

ভিস্তুলার পাড়, সেতু আর আশপাশের পার্কে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে ট্যাক্সি নিয়ে চলে গেলাম পুরোনো শহরের দিকে। ওয়ারশ ওল্ড টাউনে এসে প্রথম যে অনুভূতিটি হলো, তা হলো—এ যেন কয়েক শতাব্দী আগের একটি ইউরোপীয় শহর। সরু রাস্তা, রঙিন বাড়ির সারি, ছোট ছোট ক্যাফে, চার্চের চূড়া, পাথর বসানো পথ—সব মিলিয়ে অপূর্ব এক ঐতিহাসিক আবহ। কিন্তু ওয়ারশের এই সৌন্দর্যের সবচেয়ে আশ্চর্যের দিকটি হলো—এর বড় একটি অংশই আসলে পুনর্নির্মিত ইতিহাস।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ওয়ারশের পুরোনো শহর কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। ভবনগুলো ভেঙে পড়েছিল, রাস্তাঘাট ধ্বংস হয়েছিল, মানুষের জীবন ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আজ যে পুরোনো শহরের রঙিন বাড়িগুলো দেখে মনে হয় এগুলো বুঝি শত শত বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে, তার বড় অংশই যুদ্ধের পর পুরোনো নকশা, ছবি ও দলিল অনুসরণ করে পুনর্নির্মাণ করা।

সিফল বিমানবন্দর লাউঞ্জে লেখক
ছবি: লেখকের পাঠানো

ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে শহরটি নিজেকে আবার তৈরি করেছে।

হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম ক্যাসল স্কয়ারে। সামনে রয়্যাল ক্যাসল, আর চত্বরের মাঝখানে রাজা সিগিসমুন্ড তৃতীয়ের স্মৃতিস্তম্ভ। একসময় পোলিশ রাজতন্ত্রের কেন্দ্র ছিল এই এলাকা। আজ পর্যটকদের ভিড়, ক্যাফে আর পথচারীদের ব্যস্ততায় প্রাণবন্ত। কিন্তু এই পাথরের চত্বরের নিচে যেন চাপা পড়ে আছে বহু শতাব্দীর ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাস।

এরপর ঢুকে পড়লাম মার্কেট স্কয়ারে। চারপাশে রঙিন বাড়ি, মাঝখানে বিখ্যাত মারমেইড—ওয়ারশের প্রতীক। ছোট্ট এই চত্বরটি যেন শহরের হৃদয়। পর্যটক, স্থানীয় মানুষ, রাস্তার শিল্পী, ক্যাফের টেবিল—সব মিলিয়ে প্রাণের স্পন্দন।

কিন্তু কয়েক দশক আগে এই জায়গাটিও ছিল ধ্বংসস্তূপ।

ভাবতে অবাক লাগে—যে শহর একসময় মানচিত্র থেকে প্রায় মুছে যাওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছেছিল, তারই পুরোনো কেন্দ্র আজ এত প্রাণবন্ত।

হয়তো এটাই ওয়ারশের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—ঐতিহ্য শুধু সংরক্ষণ করা যায় না, প্রয়োজনে তাকে পুনর্গঠনও করা যায়।

সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান প্রাসাদ—

ওয়ারশের কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় ২৩৭ মিটার উঁচু Palace of Culture and Science—Pałac Kultury i Nauki—শহরটির সবচেয়ে পরিচিত স্থাপত্যগুলোর একটি। ১৯৫৫ সালে সম্পন্ন এই বিশাল ভবনটি সোভিয়েত যুগের স্থাপত্য-ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। সোভিয়েত স্থপতি লেভ রুদনেভের নকশায় তৈরি ভবনটির স্থাপত্যে মস্কোর ‘Seven Sisters’-এর স্ট্যালিনিস্ট স্থাপত্যশৈলীর স্পষ্ট প্রভাব রয়েছে।

ভবনটির ইতিহাসও প্রতীকী। সোভিয়েত নেতৃত্বের উদ্যোগে পোল্যান্ডকে উপহার হিসেবে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। আজকের ওয়ারশে দাঁড়িয়ে তাই ভবনটি একই সঙ্গে অতীতের স্মারক এবং বর্তমানের নগরদৃশ্যের অংশ।

চারপাশের আধুনিক কাচের skyscraper-এর মাঝখানে এটি যেন অন্য এক সময়ের সাক্ষী—একদিকে সমাজতান্ত্রিক যুগের স্মৃতি, অন্যদিকে আজকের প্রাণবন্ত, আধুনিক ওয়ারশ।

লেস ওয়ালেসা—

ওয়ারশ শহরকেন্দ্র থেকে হোটেলে ফেরার পথে ভাবছিলাম ছাত্রজীবনের বৈশ্বিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব লেস ওয়ালেসার কথা। ১৯৮০ সালে গদানস্কে শুরু হওয়া সলিডারিটি আন্দোলন শুধু শ্রমিকদের মজুরি বা কর্মপরিবেশের আন্দোলন ছিল না; সময়ের সঙ্গে এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়। ওয়ালেসা হয়ে উঠলেন সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ। ১৯৮৯ সালে পোল্যান্ডে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা এবং কমিউনিস্ট শাসনের অবসানের পর ১৯৯০ সালে লেস ওয়ালেসা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। আমার ছাত্রজীবনে দূরের ইউরোপের একটি দেশের খবরের কাগজে পড়া সেই মানুষটি যেন আজ ওয়ারশের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ খুব কাছের হয়ে উঠলেন।

পোল্যান্ডের আধুনিক ইতিহাসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৮ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দ্বিতীয় পোলিশ প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ছিল গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, নাৎসি দখল, যুদ্ধোত্তর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৮৯-এর রাজনৈতিক পরিবর্তন—গত এক শতাব্দীর ইতিহাস যেন এই শহরের স্থাপত্য, স্মৃতি ও মানুষের জীবনজুড়ে ছড়িয়ে আছে।

ওয়ারশ আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে—একটি শহর ধ্বংস হতে পারে, কিন্তু মানুষের স্মৃতি, আত্মপরিচয় আর ফিরে দাঁড়ানোর ইচ্ছাকে সহজে ধ্বংস করা যায় না।

ফ্রেদেরিক শপাঁ বিমানবন্দর
ছবি: লেখক

পিয়ানোবাদকের নামে এক বিমানবন্দর—

বিকেলের ফ্লাইটে উড়তে হবে ওয়ারশ থেকে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার রাজধানী সারায়েভোতে। হোটেল থেকে শাটল বাসে চলে গেলাম ওয়ারশ শপাঁ বিমানবন্দরে। নামটির দিকে তাকিয়েই মনে হলো—এটি শুধু একটি বিমানবন্দর নয়; এর নামের মধ্যেই যেন পোল্যান্ডের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের একটি অংশ জড়িয়ে আছে।

বিশ্বজুড়ে অনেক বিমানবন্দরের নাম রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা জাতীয় নেতাদের নামে। কিন্তু পোল্যান্ডের প্রধান বিমানবন্দরের নাম একজন সুরের জাদুকরের নামে—ফ্রেদেরিক শপাঁ।

ফ্রেদেরিক শপাঁ (Frédéric Chopin, ১৮১০–১৮৪৯) ছিলেন পোল্যান্ডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুরকার ও পিয়ানোবাদক। ১৮১০ সালের ১ মার্চ তাঁর জন্ম। জন্মের পরপরই তাঁর পরিবার ওয়ারশে চলে আসে। শৈশব ও কৈশোরের গুরুত্বপূর্ণ সময় তিনি এই শহরেই কাটান এবং এখানেই তাঁর সংগীতশিক্ষার ভিত্তি তৈরি হয়। ১৮৩০ সালে তিনি পোল্যান্ড ছেড়ে চলে যান এবং পরবর্তী জীবনের বড় অংশ কাটান প্যারিসে।

তাঁর সংগীতে পোল্যান্ড বারবার ফিরে এসেছে। পোলিশ লোকগীতি, স্বদেশের স্মৃতি, ভালোবাসা ও বিচ্ছেদের বেদনা মিশে গেছে তাঁর সৃষ্টিতে। পোলোনেজ, মাজার্কা, নকটার্ন, প্রেলুড, ব্যালাড—পিয়ানোর জন্য তাঁর অসংখ্য রচনা আজও বিশ্বসংগীতের অমূল্য সম্পদ।

শপাঁর জীবনের সঙ্গে ওয়ারশের সম্পর্ক এতটাই গভীর যে প্যারিসে তাঁর মৃত্যু হলেও তাঁর হৃদয় ফিরে এসেছে এই শহরে। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী বোন লুদভিকা তাঁর হৃদয় (হৃদপিণ্ড) পোল্যান্ডে নিয়ে আসেন। আজ তা ওয়ারশের Holy Cross Church-এর একটি স্তম্ভে সংরক্ষিত।

যেন মৃত্যুর পরও শপাঁ ফিরে এসেছেন তাঁর প্রিয় শহরে। একজন শিল্পীর জন্য এর চেয়ে গভীর স্বদেশ-ফেরা আর কী হতে পারে!

বিমানবন্দরটির ইতিহাসও বেশ পুরোনো। ১৯৩৪ সালে Okęcie Airport হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই বিমানবন্দর পরে ফ্রেদেরিক শপাঁর নামে নামকরণ হয়। আজ প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এখান দিয়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে উড়ে যায়; কিন্তু নামটির মধ্যে পোল্যান্ডের এক শিল্পীর স্মৃতি অম্লান হয়ে আছে।

বিমানবন্দরে পৌঁছে ইমিগ্রেশন ও নিরাপত্তার আনুষ্ঠানিকতা শেষে চলে গেলাম পোলিশ এয়ারলাইনসের বিজনেস লাউঞ্জে। যথাসময়ে বোর্ডিংয়ের ঘোষণা এল।

বিমানে উঠে জানালার পাশে বসে শেষবারের মতো ওয়ারশের দিকে তাকালাম।

একটি শহর ছেড়ে যাচ্ছি—যে শহর যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। যে শহরের রাস্তায় রাজাদের স্মৃতি, সমাজতান্ত্রিক যুগের স্থাপত্য, আধুনিক ইউরোপের উঁচু ভবন আর ভিস্তুলার শান্ত প্রবাহ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। আর সেই শহর তার গর্বের পিয়ানোবাদককে শুধু স্মৃতিস্তম্ভে নয়, নিজের প্রধান বিমানবন্দরের নামের মধ্যেও ধরে রেখেছে।

মনে হলো, সুরেরও তো একটি স্বদেশ থাকে।

ফ্রেদেরিক শপাঁর সুরে সেই স্বদেশের নাম—পোল্যান্ড।

আর ওয়ারশ ছেড়ে যখন আকাশে উঠছি, সেই সুরের শহর ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে রইল।

সামনে এবার আরেক ইতিহাসের শহর—বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার রাজধানী সারায়েভো।

  • শোয়েব সাঈদ, কানাডার মন্ট্রিয়লে একটি বহুজাতিক করপোরেটে ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত