মালদোভায় মাটির নিচে লুকিয়ে আছে এক বিশাল রাজ্য

ছবি: লেখক

মালদোভা—গম, সূর্যমুখী আর আঙুরের দেশ। ইউরোপের মানচিত্রে ছোট্ট এই দেশটির আরেকটি পরিচয় আছে—এটি যেন মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা এক বিশাল মদের রাজ্য।

মিলেস্তি মিচি, মলদোভা ভূগর্ভস্থ ওয়াইনারিগুলোর অন্যতম। এটি শুধু একটি ওয়াইনারি নয়—এ যেন মাটির নিচে গড়ে ওঠা এক বিশাল মদের নগরী।

এয়ার কানাডায় মন্ট্রিয়ল থেকে টরন্টো হয়ে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা। ভিয়েনা বিমানবন্দরে অস্ট্রিয়ান এয়ারলাইনসের লাউঞ্জে প্রায় চার ঘণ্টা লে-ওভার কাটিয়ে অস্ট্রিয়ান এয়ারলাইনসে উড়ে গেলাম মলদোভার রাজধানী কিসিনাওতে।

রোমানিয়া ও ইউক্রেনের মাঝখানে পূর্ব ইউরোপের ছোট্ট স্বাধীন রাষ্ট্র মলদোভা। আয়তনে মাত্র ৩৩,৮৪৩ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যাও তিন মিলিয়নের কম। কৃষ্ণসাগরের কাছাকাছি হলেও সমুদ্রের সঙ্গে কোনো সরাসরি সীমান্ত নেই—অর্থাৎ, মলদোভা একটি স্থলবেষ্টিত দেশ। উত্তরে, পূর্বে ও দক্ষিণে ইউক্রেন, পশ্চিমে রোমানিয়া। ভৌগোলিক আয়তন ছোট হলেও ইতিহাস ও ভূরাজনীতিতে দেশটির অবস্থান ছোট নয়।

মলদোভার সবচেয়ে পরিচিত সাংস্কৃতিক পরিচয়—ওয়াইন। এই অঞ্চলে হাজার বছরের বেশি সময় ধরে আঙুর চাষ ও ওয়াইন তৈরির ঐতিহ্য রয়েছে। উর্বর মাটি, উপযোগী ভূপ্রকৃতি এবং তুলনামূলক মৃদু জলবায়ু আঙুর চাষের জন্য অনুকূল। কিসিনাও থেকে দেশের বিখ্যাত ওয়াইনারিগুলোও খুব দূরে নয়। ফলে পর্যটন মানচিত্রে মলদোভা যতটা অচেনা, ওয়াইন-জগতের কাছে দেশটি ততটাই পরিচিত।

চুনাপাথর উত্তোলনের জন্য তৈরি দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গগুলো পরে রূপ নেয় ওয়াইন সংরক্ষণের বিশাল ভান্ডারে। আজ এই ভূগর্ভস্থ গ্যালারিগুলোর বিস্তার ২০০ কিলোমিটারের বেশি; তার প্রায় ৫৫ কিলোমিটার ওয়াইন সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয়। ভূগর্ভের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা সারা বছর প্রায় স্থিতিশীল থাকায় ওয়াইন পরিপক্ব করার জন্য এটি এক অসাধারণ প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি করেছে।

মিলেস্তি মিচি এখনো ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট নয়। ২০২৫ সালে ক্রাইকোভা ও মিলেস্তি মিচির ভূগর্ভস্থ ওয়াইনারিগুলোকে একত্রে দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াইনারিজ অব মলদোভা নামে ইউনেসকোর টেনটেটিভ লিস্টে রাখা হয়েছে। ইউনেসকোর বিবেচনায় এগুলো শুধু ওয়াইন সংরক্ষণের স্থান নয়; শিল্প–ঐতিহ্য, ভূতত্ত্ব, মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক এবং মলদোভার দীর্ঘ মদ তৈরির ঐতিহ্যের এক অসাধারণ সম্মিলন।

রাজধানী কিসিনাও শহর থেকে মিলেস্তি মিচি যাওয়ার দূরত্ব খুব বেশি নয়—ট্যাক্সিতে প্রায় ৩০ মিনিটের পথ পেরিয়ে যখন এখানে পৌঁছালাম, তখনো কল্পনা করতে পারিনি, মাটির নিচে কী বিশাল এক জগৎ অপেক্ষা করছে! কিসিনাও থেকে মিলেস্তি মিচি আসার পথটুকুই যেন আমাকে মলদোভার আরেকটি মুখের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। রাজধানীর ব্যস্ত রাস্তা, ভবন আর শহুরে কোলাহল ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে রইল। জায়গা নিল খোলা মাঠ, কৃষিজমি, ছোট ছোট বসতি আর দূরে ছড়িয়ে থাকা আঙুরের বাগান। পথের দৃশ্য খুব জাঁকজমকপূর্ণ নয়; বরং শান্ত, সরল ও গ্রামীণ। এই সরলতাই আমার কাছে মলদোভার বিশেষ আকর্ষণ।

মিলেস্তি মিচিকে বাইরে থেকে খুব একটা অসাধারণ মনে হলো না। অথচ এই সাধারণ প্রবেশপথের নিচেই লুকিয়ে আছে এক বিস্ময়কর ভূগর্ভস্থ জগৎ। টিকিট কেটে প্রবেশের পর কর্তৃপক্ষের গাড়িতে উঠতেই শুরু হলো সেই অন্য রকম যাত্রা। ধীরে ধীরে আমরা ঢুকে গেলাম অন্ধকার লাইমস্টোনের সুড়ঙ্গের ভেতর। সোভিয়েত আমলে পুরোনো পাথরখনির পথকে কাজে লাগিয়ে গড়ে ওঠা এই ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্কের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২০০ কিলোমিটার; এর মধ্যে প্রায় ৫০ কিলোমিটার ওয়াইন সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছিল। দুই পাশে সারি সারি পাথরের খোপ—কোথাও শত শত বোতল, কোথাও পুরোনো ভিনটেজের বিশেষ সংগ্রহ। সংখ্যায় এই মজুত প্রায় ১৫ লক্ষ বোতল। ভাবতেই বিস্ময় লাগে—একটি ছোট দেশের মাটির নিচে এত বিপুল পরিমাণ ওয়াইন বছরের পর বছর নীরবে অপেক্ষা করছে! ওয়াইনের এই গোল্ডেন কালেকশন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ওয়াইন সংগ্রহ হিসেবে গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্থান পায়। এখানে ওয়াইন শুধু বোতলে সংরক্ষিত নয়; প্রতিটি গ্যালারি, প্রতিটি পথ, প্রতিটি সারি যেন মলদোভার দীর্ঘ মদ-সংস্কৃতির একেকটি অধ্যায়।

এই ভূগর্ভস্থ জগতের সবচেয়ে চমৎকার বিষয় হলো, এখানে প্রকৃতিই অনেকটা সংরক্ষণাগারের কাজ করে। লাইমস্টোনের গভীরে সারা বছর তাপমাত্রা প্রায় ১০ থেকে ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং আর্দ্রতা প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশের মধ্যে থাকে। আধুনিক ওয়াইনারিতে যে পরিবেশ কৃত্রিমভাবে তৈরি করতে শক্তি ও প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়, এখানে মাটি ও পাথর নিজেই সেই পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে।

গাড়ি চলতে চলতে আমাদের গাইড মলদোভার ওয়াইন-ইতিহাস, সোভিয়েত আমলের উৎপাদনব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের নানা গল্প বলছিলেন। অন্ধকার পাথুরে পথের দুই পাশে মদের বোতলের সারি আর গাইডের কণ্ঠ—পুরো অভিজ্ঞতার মধ্যে একধরনের রহস্যময়তা তৈরি হয়েছিল। মনে হচ্ছিল, আমরা কোনো ওয়াইনারি ঘুরছি না; বরং ইতিহাসেরই একটি ভূগর্ভস্থ অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছি।

ভূগর্ভের সেই অন্ধকার ওয়াইন নগরীর এক জায়গায় এসে গাড়ি থামল। চোখে পড়ল প্রধান একটি মূর্তিসহ কিছু ভাস্কর্য। জানা গেল, মূল মূর্তিটি ওয়াইনের দেবতা—রোমান পুরাণের ব্যাক্কাস। ব্যাক্কাস রোমান পুরাণের মদ, আঙুর, উল্লাস ও উৎসবের দেবতা। গ্রিক পুরাণে যাঁর নাম ডায়োনিসাস। আঙুরলতা, আঙুর, মদ, নৃত্য ও উচ্ছ্বাস—সবকিছুর সঙ্গেই তাঁর প্রতীকী সম্পর্ক। প্রাচীন শিল্পে তাঁকে প্রায়ই হাতে আঙুরের গুচ্ছ বা মদের পাত্র এবং মাথায় আঙুরলতা বা পাতা নিয়ে দেখানো হয়েছে। মিলেস্তি মিচির সরকারি ওয়েবসাইটেও ব্যাক্কাস নামটি ব্যবহার করা হয়েছে—সেখানে সাত ধরনের ওয়াইন নিয়ে একটি বিশেষ ব্যাক্কাস মেনু রয়েছে। একই সাইটের বর্ণনায় তাদের ঐতিহ্যকে দ্য লেজেন্ড অব ওয়াইন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

মনে হচ্ছিল আঙুর, মদ, আনন্দ আর উৎসবের এই দেবতার মূর্তিকে চারিদিকে ঘিরে আছে হাজার হাজার বোতল, শত শত ব্যারেল আর দীর্ঘ সুড়ঙ্গজুড়ে বহু বছরের পরিপক্ব হয়ে ওঠা ওয়াইন। এই দেবতায় বিশ্বাসীরা মনে করেন, ওয়াইনের এই প্রাচীন রাজ্যে নীরব প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দেবতা ব্যাক্কাস। অনেক পর্যটককে দেখালাম এই দেবতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে।

প্রায় এক ঘণ্টার এই ভূগর্ভস্থ ভ্রমণের পর পৌঁছালাম ওয়াইন টেস্টিং কক্ষে।

এতক্ষণ যে বোতলগুলোকে অন্ধকার, ঠান্ডা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে নীরবে পড়ে থাকতে দেখেছি, এবার তাদেরই কয়েকটি আমাদের সামনে গ্লাসে এসে হাজির হলো। মুহূর্তটির মধ্যে আমার কাছে এক অদ্ভুত সংযোগ তৈরি হলো—মাটির গভীরে বছরের পর বছর অপেক্ষা করা আঙুরের রস এবার মানুষের ইন্দ্রিয়ের কাছে ফিরে এসেছে।

টেবিলে গ্লাস সাজানো হলো। গাইড ওয়াইনের ধরন ও বয়স সম্পর্কে বলছিলেন। আঙুর থেকে ওয়াইন, ওয়াইন থেকে বোতল, তারপর বছরের পর বছর লাইমস্টোনের সুড়ঙ্গে অপেক্ষা—শেষ পর্যন্ত সেই বোতল খুলে মানুষের খাবারের টেবিলে বা কোনো আড্ডায়।

সূর্যের আলোয় ফিরে এসে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলাম। মাটির ওপরে আছে গমের মাঠ, সূর্যমুখীর হলুদ সমুদ্র আর আঙুরের বাগান; আর মাটির নিচে—শত শত বছরের স্বাদ, শ্রম ও স্মৃতি নিয়ে নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে এক বিশাল মদের রাজ্য।

মলদোভার ওয়াইনের ইতিহাসও শুধু তার ভূগর্ভস্থ ভান্ডারের ইতিহাস নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক পরিবর্তন। রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং পরবর্তী নিষেধাজ্ঞার প্রভাবের পর মলদোভার ওয়াইন রপ্তানির বাজারে পরিবর্তন এসেছে। ইউরোপের পাশাপাশি চীন, জাপানসহ এশিয়ার বাজারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ইউরোপের এত রাজধানী ঘুরে যখন কিসিনাওতে এলাম, আমার কৌতূহলও ছিল অন্য রকম। ইউরোপের ৪৪টি দেশের রাজধানীর মধ্যে প্রায় ৪০টিতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। কিসিনাওকে নিজের চোখে না দেখে কী করে বলি—শহরটি সত্যিই এতটা অনাকর্ষণীয় কি না?

আমার হাঁটার অভিজ্ঞতায় কিসিনাও প্যারিস, ভিয়েনা কিংবা প্রাগের মতো চোখধাঁধানো নয়। কিন্তু তার সৌন্দর্য অন্য জায়গায়। এখানে শহরকে শুধু দেখতে হয় না, কিছুটা বুঝতেও হয়। রাস্তার স্থাপত্য, পুরোনো ভবন, সোভিয়েত আমলের প্রশস্ততা, জাতীয় স্মৃতির প্রতীক, পার্ক, মানুষের চলাফেরা—সব মিলিয়ে শহরটি ধীরে ধীরে নিজের গল্প বলতে শুরু করে।

মন্টেনিগ্রোর রাজধানী পডগোরিকায় আমার যে একঘেয়েমি লেগেছিল, কিসিনাওতে তা হয়নি। কিসিনাও অন্তত তার ইতিহাস, ওয়াইন, নগরজীবন এবং পূর্ব-পশ্চিমের সাংস্কৃতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে একটি গল্প বলে।

শহরের কেন্দ্রের দিকে তাকালে মলদোভার অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সহজে বোঝা যায় না। সংসদ ভবন, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, মলদোভা স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং নাগরিক সুবিধার বিভিন্ন আয়োজন—সবকিছুতেই একটি আধুনিক ইউরোপীয় রাষ্ট্রের স্বাভাবিক ছাপ রয়েছে। মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ, নগরজীবনের গতি এবং কিছু স্থাপত্যের রুচি দেখে প্রথম দেখায় দেশটির অর্থনৈতিক বাস্তবতা সব সময় ধরা পড়ে না।

কিন্তু শহরের অভিজাত কেন্দ্র থেকে একটু বাইরে গেলেই চিত্রটি বদলে যায়। সমৃদ্ধি আর দারিদ্র্য এখানে পাশাপাশি বাস করে। মলদোভার গ্রামাঞ্চল ও শহরের মধ্যে অর্থনৈতিক ব্যবধানও চোখে পড়ার মতো।

আমার কিসিনাও অভিজ্ঞতার সবচেয়ে মনে থাকার মতো দৃশ্যগুলোর একটি ঘটেছিল এক রোববার দুপুরে। হাঁটতে হাঁটতে একটি চার্চের সামনে শতাধিক প্রবীণ মানুষের ভিড় দেখলাম। কৌতূহল হলো—কী হচ্ছে এখানে? জানতে পারলাম, দরিদ্র ও প্রবীণ মানুষের জন্য সেখানে বিনা মূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।

দৃশ্যটি আমাকে থামিয়ে দিয়েছিল।

ইউরোপ বললেই আমরা অনেক সময় সমৃদ্ধি, কল্যাণরাষ্ট্র, সাজানো শহর আর সামাজিক নিরাপত্তার কথা ভাবি। কিন্তু কিসিনাও সেই ধারণাকে একটু থামিয়ে দেয়। এখানে ইউরোপীয় সৌন্দর্যের পাশেই আছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা; আধুনিক ভবনের পাশেই আছে সামাজিক সহায়তার প্রয়োজন; আর শহরের কেন্দ্রের আভিজাত্যের আড়ালেই আছে মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম।

স্বাধীনতার পর মলদোভা ধীরে ধীরে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়েছে। ২০২২ সালে দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদের জন্য আবেদন করে এবং একই বছর প্রার্থী মর্যাদা লাভ করে। ২০২৩ সালে সদস্যপদ আলোচনার পথ আরও এগিয়ে যায়। ফলে কিসিনাও এখন শুধু সাবেক সোভিয়েত বিশ্বের একটি রাজধানী নয়; এটি ইউরোপের দিকে এগিয়ে চলা একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কেন্দ্রও। তবে সেই যাত্রা সহজ নয়। একদিকে ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার বাস্তবতা—সব মিলিয়ে ছোট্ট দেশটির সামনে রয়েছে জটিল ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য।

ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাতও মলদোভার ওপর পড়েছে। কৃষিনির্ভর এই দেশ ইউরোপের বাজারে শস্য, তেলবীজ এবং অন্যান্য কৃষিপণ্য রপ্তানি করে। ফলে মলদোভার অর্থনীতি, কৃষি ও ভবিষ্যৎ ইউরোপের বৃহত্তর অর্থনৈতিক পরিসরের সঙ্গে ক্রমেই আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হচ্ছে। কিসিনাও তাই শেষ পর্যন্ত আমার কাছে ‘অনাকর্ষণীয়’ কোনো রাজধানী হয়ে থাকেনি।

মলদোভা ভ্রমণ শেষে এবার ফেরার পালা। সামনে আবার সাত দিনের পেশাগত ব্যস্ততা—গন্তব্য বাল্টিক অঞ্চলের দেশ এস্তোনিয়ার রাজধানী তালিন। কিসিনাওতে আসার সময় বিমানবন্দরটি দেখে মনে হয়েছিল বেশ ছোট; কিন্তু ফেরার পথে সেই ছোট বিমানবন্দরটিকেই নতুন চোখে দেখলাম। আয়তনে ছোট হলেও এর ব্যবস্থাপনা আধুনিক, পরিপাটি ও যাত্রীবান্ধব। বিশেষ করে মূল বিমানবন্দরে সাধারণত যে বোর্ডিং ব্রিজ দেখা যায়, এখানে তার অনুপস্থিতি প্রথমে একটু বিস্মিত করেছিল। তবে বিমানে ওঠার পুরো প্রক্রিয়াটি এত দ্রুত, সুশৃঙ্খল ও গতিশীল যে সেই ঘাটতিটুকু একেবারেই অসুবিধা মনে হয়নি। বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে সরাসরি বিমানে ওঠার ব্যবস্থায় বরং ছোট বিমানবন্দরের জন্য একধরনের কার্যকর মডেল দেখতে পেলাম। ঝকঝকে-তকতকে টার্মিনাল, দ্রুতগতির নিরাপত্তা ও বোর্ডিং–ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে ছোট হলেও কিসিনাও বিমানবন্দরটির ব্যবস্থাপনায় ছিল বেশ আধুনিকতার ছাপ। বিজনেস লাউঞ্জটিও তখন বেশ ব্যস্ত; ছোট্ট পরিসরের মধ্যেই নানা দেশের যাত্রীদের আনাগোনা।

কিসিনাও থেকে ওয়ারশ, তারপর তালিন—যাত্রাপথটি খুব দীর্ঘ নয়, কিন্তু রাতের ভ্রমণের নিজস্ব একধরনের মায়া আছে আমার কাছে। এক শহর থেকে আরেক শহরে মাত্র দু-তিন ঘণ্টার উড়ান হলেও রাতের আকাশে বিমানের জানালার পাশে বসে থাকার অনুভূতিটি আমার সব সময়ই ভালো লাগে। নিচে অন্ধকারে হারিয়ে যায় শহর, রাস্তা আর জনপদ; ওপরে কালো আকাশের গায়ে মেঘ আর তারার লুকোচুরি। কখনো মেঘের সাদা স্তর চাঁদের আলোয় আবছা হয়ে ওঠে, আবার কখনো জানালার ওপারে শুধু গভীর অন্ধকার—মাঝে দূরের দু-একটি তারা। সেই দৃশ্যের মধ্যে একধরনের নিঃশব্দ মায়া আছে।

রাতের বিমানবন্দরও আমার কাছে আলাদা এক অভিজ্ঞতা। দিনের কোলাহল নেই, অথচ ব্যস্ততা থেমে নেই। কোথাও ক্লান্ত যাত্রী চুপচাপ বসে আছেন, কোথাও বোর্ডিংয়ের ঘোষণা, কোথাও দ্রুত পায়ে ছুটে চলেছেন কেউ। ক্লান্তির সঙ্গে ব্যস্ততার এই অদ্ভুত মিশ্রণের মধ্যেও রাতের বিমানবন্দরে যেন একধরনের শান্ত, স্নিগ্ধ আবহ তৈরি হয়। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্ত শরীরও তখন অদ্ভুতভাবে সেই পরিবেশের সঙ্গে মিশে যায়।

কিসিনাও থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টা উড়ে পৌঁছালাম পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে। সেখানে তিন ঘণ্টার ট্রানজিট। রাতের বিমানবন্দরে অপেক্ষার সেই সময়টুকু কেটে গেল নিজের মতো করে—কখনো হাঁটাহাঁটি, কখনো বসে থাকা, কখনো পরবর্তী ফ্লাইটের সময়ের দিকে তাকানো। তারপর আবার আকাশে ওঠা। ওয়ারশ থেকে আরও প্রায় দেড় ঘণ্টার উড়ান শেষে বাল্টিক সাগরঘেঁষা এস্তোনিয়ার রাজধানী তালিনে পৌঁছালাম।

তখন রাত প্রায় আড়াইটা। হোটেলে পৌঁছে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে শরীর তখন ভ্রমণের ক্লান্তিতে অবসন্ন। ঘুমাতে যেতে যেতে প্রায় সাড়ে চারটা।

সামনে সাত দিনের পেশাগত ব্যস্ততা। আমার কাছে তালিন—ইউরোপের এক অতি পরিচিত নগরী। ম্যানুফ্যাকচারিং প্লান্ট, আরঅ্যান্ডডি সেন্টার এবং কাস্টমার সার্ভিস সেন্টার থাকায় পেশাগত কাজে অর্ধশতাধিকবারের বেশি আসতে হয়েছে। অতি পরিচিত তালিনকে নিয়ে তেমন বিস্তারিত লেখা হয়নি, লিখব অবশ্যই।

*লেখক: শোয়েব সাঈদ, কানাডার মন্ট্রিয়লে একটি বহুজাতিক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত