আল্পসের ছায়ায় আমাদের বসন্ত
পৃথিবীর কিছু কিছু স্থান আছে, যেখানে পৌঁছালে মনে হয় প্রকৃতি তার নিত্যদিনের আবরণ সরিয়ে কোনো এক উৎসবের প্রভাতে নবীন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। সুইজারল্যান্ড আমার কাছে তেমনই এক ভূখণ্ড—যেখানে আকাশের নীল, হ্রদের জল, পাহাড়ের শুভ্রতা আর মানুষের সুশৃঙ্খল জীবন মিলেমিশে যেন এক অনির্বচনীয় সুর সৃষ্টি করেছে। ছবিতে সুইজারল্যান্ডকে কতবার দেখেছি—বরফে ঢাকা আল্পস, নীলাভ হ্রদ, সবুজ উপত্যকা, পাহাড়ের গায়ে ছোট্ট ছোট্ট ঘর, দূরে গির্জার চূড়া। কিন্তু ছবির সৌন্দর্য কেবল চোখে পৌঁছায়; জীবন্ত প্রকৃতির সৌন্দর্য এসে হৃদয়ে বসে। এ বছরের এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে আমরা দুটো পরিবার যখন জুরিখ ও লুসার্নে কয়েকটি দিন কাটাতে গেলাম, তখন সেই সত্যটিই নতুন করে অনুভব করলাম। সময়টি ছিল বসন্তের পূর্ণতা ছোঁয়া। শীত সদ্য বিদায় নিয়েছে, অথচ তার সামান্য শীতল স্পর্শ তখনো বাতাসে রয়ে গেছে। চারদিকে নতুন পাতার সবুজ, ফুলের কোমল উচ্ছ্বাস, নীল আকাশের নিচে ঝকঝকে রোদ। মনে হচ্ছিল, পৃথিবী যেন দীর্ঘ নিদ্রার পর সদ্য জেগে উঠে নিজেকে আয়নায় দেখছে। আমাদের ভাগ্যও যেন প্রকৃতির সঙ্গে এক গোপন সন্ধি করেছিল। দিনগুলো ছিল বৃষ্টিহীন ও নির্মল, আলোয় উজ্জ্বল এবং আশ্চর্য রকম কোমল।
জুরিখ-জলের আয়নায় এক নগর
জুরিখের নাম উচ্চারণ করলেই সাধারণত মনে পড়ে ব্যাংক, বাণিজ্য, আধুনিকতা আর সমৃদ্ধির কথা। অথচ আমার চোখে যে জুরিখ ধরা দিয়েছিল, সে যেন অর্থের নগরীর চেয়ে বেশি ছিল আলোর শহর, জলের শহর, সংযমী সৌন্দর্যের শহর। জুরিখ হ্রদের ধারে পৌঁছে প্রথম যে অনুভূতিটি হয়েছিল, তার ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন। বিশাল জলরাশি শান্ত, অথচ জীবন্ত। সূর্যের আলো তার বুকে পড়ে রুপালি কাঁপন তুলছে। দূরের পাহাড় যেন হালকা কুহেলির মধ্যে স্বপ্নের মতো দাঁড়িয়ে আছে। আকাশের নীল আর হ্রদের নীল একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে কোথায় আকাশ শেষ, কোথায় জল শুরু-মুহূর্তে বোঝা যায় না।
মানুষ কি শুধু দেশ দেখে? নাকি দেশও মানুষকে একে অন্যকে নতুন করে দেখতে শেখায়? জুরিখের সেই পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমার মনে হয়েছিল, ভালোবাসারও বোধহয় ঋতু আছে। তার প্রথম ঋতুতে থাকে আবিষ্কারের আলোড়ন, আর পরিণত ঋতুতে থাকে আশ্রয়ের নীরবতা। হ্রদের ওপর দিয়ে শীতল বাতাস ভেসে আসছিল। জলপাখিরা নির্বিকারভাবে ভাসছে। দূরে কোনো নৌকা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। শহরের মানুষজনও যেন এই সৌন্দর্যের অংশ—কেউ হাঁটছে, কেউ বসে আছে, কেউ কফি হাতে হ্রদের দিকে তাকিয়ে।
লুসার্নের উদ্দেশে ট্রেনযাত্রার দৃশ্য অসাধারণ ছিল। পরে চার ঘণ্টার ফেরিতে লুসার্ন হ্রদ ও আল্পসের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। এই ভ্রমণ তাদের জীবনের উজ্জ্বল স্মৃতি হয়ে থাকবে বলে মনে করেছেন লেখক।
জুরিখের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং অভিজাত সড়ক বানহফস্ট্রাশে শহরের প্রধান রেলস্টেশন ‘জুরিখ হাউফবানহফ’-এর কাছ থেকে শুরু হয়ে এই প্রশস্ত রাজপথটি এগিয়ে গেছে জুরিখ হ্রদের দিকে। এই রাস্তায় গিয়ে প্যারিসের শ্যঁজেলিজের কথা মনে পড়ে গেল। চরিত্রে দুটি সড়ক এক নয়, তবু আভিজাত্য, বিশ্বখ্যাত বিপণি আর নগরজীবনের সৌন্দর্যের দিক থেকে তাদের মধ্যে যেন এক দূরবর্তী আত্মীয়তা আছে। হাঁটতে হাঁটতে একসময় আমরা রাস্তার ধারের একটি ক্যাফেতে বসে পড়লাম। সামনে দিয়ে ট্রাম চলে যাচ্ছে, ফুটপাত ধরে নানা দেশের মানুষ হেঁটে চলেছে, দোকানের কাচের জানালায় সাজানো বিলাসবহুল পণ্য ঝলমল করছে। সেই কর্মচঞ্চলতার মাঝখানে আমরা কফির কাপ হাতে কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে বসে রইলাম।
শহর আর প্রকৃতির মধ্যে এখানে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। বরং মনে হয়, তারা বহুদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করতে করতে একে অন্যের ভাষা শিখে নিয়েছে। পুরোনো জুরিখের সরু পথ, শোভন স্থাপত্য, গির্জার চূড়া, জানালায় ফুল, পাথরে বাঁধানো পথ—সবকিছুতেই আছে সৌন্দর্যের এক মিতব্যয়ী সংস্কার। চোখধাঁধানো নয়, অথচ চোখ সরিয়ে নেওয়া যায় না। সন্ধ্যা নামতে থাকলে হ্রদের রং বদলে যায়। দিনের নীল ধীরে ধীরে গাঢ় হয়, শহরের আলো জলে এসে ভেঙে ভেঙে পড়ে। কিছু দৃশ্য ক্যামেরায় ধরে রাখা যায়। কিছু দৃশ্য কেবল স্মৃতি ধারণ করে। জুরিখের সেই সন্ধ্যা আমার কাছে দ্বিতীয়টিরই অন্তর্গত।
জুরিখ থেকে লুসার্নের পথে-বসন্তের এক ট্রেনযাত্রা
এপ্রিলের শেষ প্রহর। সুইজারল্যান্ডের বসন্ত তখন যেন শীতের দীর্ঘ অবগুণ্ঠন সরিয়ে ধীরে ধীরে নিজের রঙের পসরা মেলে বসেছে। সকালে জুরিখ ছেড়ে লুসার্নের উদ্দেশে ট্রেনে উঠলাম। ট্রেন মসৃণভাবে ছুটে চলেছে। কানে আসে শুধু এক ধরনের মৃদু শোঁ শোঁ শব্দ বাতাস কেটে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার সংযত সংগীতের মতো। আকাশ ছিল আশ্চর্য স্বচ্ছ-নীলের গভীরে ভেসে বেড়াচ্ছিল দু-এক টুকরা সাদা মেঘ। বাতাসে তখনো শীতের ক্ষীণ স্মৃতি, অথচ রৌদ্রের কোমলতায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে আসন্ন গ্রীষ্মের আভাস। মনে হলো, প্রকৃতি যেন ঋতু পরিবর্তনের এক অপূর্ব সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের জন্য পথ সাজিয়ে রেখেছে।
জুরিখের ব্যস্ত নগরপ্রান্ত পেরিয়ে ট্রেন যতই এগোতে লাগল, ততই বদলে যেতে থাকল জানালার বাইরের পৃথিবী। শহরের বহুতল ভবন ও কর্মচঞ্চল রাস্তা ক্রমে পিছিয়ে গেল; তাদের জায়গায় এসে দাঁড়াল সবুজ প্রান্তর, ঢেউখেলানো পাহাড়, ছায়াঘেরা বনভূমি আর দূরে দূরে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট সুইস জনপদ। কোথাও সবুজ মাঠের মধ্যে নিঃসঙ্গ একটি কাঠের বাড়ি, কোথাও গির্জার সরু চূড়া মাথা তুলে আছে আকাশের দিকে; আবার কোথাও গরুর পাল নিশ্চিন্তে ঘাস খাচ্ছে বিস্তীর্ণ চারণভূমিতে। সবকিছু এত পরিচ্ছন্ন, এত পরিমিত, যেন প্রকৃতি ও মানুষের বসতি এখানে দীর্ঘকাল ধরে এক অলিখিত সৌন্দর্যচুক্তিতে আবদ্ধ।
ট্রেনের জানালার পাশে বসে আমরা দুজন নির্বাক হয়ে সেই চলমান দৃশ্যপট দেখছিলাম। এপ্রিলের শেষের সুইস প্রকৃতিতে তখন সবুজের কত যে রূপ! নিচের উপত্যকায় বসন্তের সবুজ উৎসব, অথচ পাহাড়ের উচ্চ শিখরে তখনও শীতের শুভ্র উত্তরীয়। একই দৃশ্যপটে দুই ঋতুর এমন সহাবস্থান আগে খুব কমই দেখেছি। নিচে ফুল ও পাতার নবজন্ম, ওপরে বরফের অনন্ত নীরবতা-মাঝখান দিয়ে আমাদের ট্রেন ছুটে চলেছে লুসার্নের দিকে। পথে ছোট ছোট স্টেশন আসে। কয়েকজন যাত্রী নামে, কয়েকজন ওঠে; তারপর আবার নিঃশব্দ গতিতে ট্রেন এগিয়ে যায়। কোথাও অযথা কোলাহল নেই, নেই ব্যস্ততার বিশৃঙ্খলা। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা এই দেশের শৃঙ্খলার মধ্যেও একধরনের প্রশান্তি আছে।
লুসার্ন যত কাছে আসতে লাগল, প্রকৃতির বিন্যাসেও যেন এক সূক্ষ্ম পরিবর্তন অনুভব করলাম। পাহাড়গুলো আরও কাছে এসে দাঁড়াল, ভূদৃশ্য হয়ে উঠল আরও নাটকীয়। কোথাও পাহাড়ের ঢাল নেমে এসেছে জনপদের কাছে, কোথাও জল আর পাহাড় যেন পাশাপাশি বসে আছে বহু শতাব্দীর দুই পুরোনো বন্ধুর মতো। সেই মুহূর্তে বুঝতে পারছিলাম—আমরা এমন এক শহরের দিকে এগিয়ে চলেছি, যার সৌন্দর্যের মূল ভাষাই জল ও পাহাড়ের যুগলবন্দি। দেখতে-দেখতে, ভাবতে-ভাবতে ৫০ মিনিট নির্নিমেষে পার হয়ে গেল, কখন যেন আমরা লুসার্ন এসে পৌঁছলাম।
ট্রেনের জানালার পাশে বসে আমরা দুজন নির্বাক হয়ে সেই চলমান দৃশ্যপট দেখছিলাম। এপ্রিলের শেষের সুইস প্রকৃতিতে তখন সবুজের কত যে রূপ! নিচের উপত্যকায় বসন্তের সবুজ উৎসব, অথচ পাহাড়ের উচ্চ শিখরে তখনো শীতের শুভ্র উত্তরীয়।
লুসার্ন হ্রদের বুকে-চার ঘণ্টার এক স্বপ্নযাত্রা
লুসার্নকে স্থলভাগ থেকে দেখে যতটা মুগ্ধ হয়েছিলাম, মনে হলো তার আসল রূপটি বুঝি এখনো দেখা বাকি। কারণ এ শহরের প্রাণ তো তার হ্রদ-চারদিকে পাহাড়বেষ্টিত সেই বিস্তীর্ণ নীল জলরাশি, যার তীরে ছড়িয়ে আছে ছোট ছোট জনপদ, আর যার জলের আয়নায় প্রতিদিন নিজেদের মুখ দেখে আল্পসের শিখরগুলো। তাই আমরা ঠিক করলাম, লুসার্ন হ্রদের বুকে ফেরিতে কাটাব প্রায় চার ঘণ্টা-কোনো তাড়া নয়, কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যাকুলতাও নয়; শুধু জল, পাহাড় আর পথের সৌন্দর্যের কাছে নিজেদের কিছুক্ষণের জন্য সমর্পণ করে দেওয়া।
ঘাট ছেড়ে ফেরিটি যখন ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করল, লুসার্ন শহরটিও যেন একটু একটু করে আমাদের কাছ থেকে সরে যেতে লাগল। পেছনে রয়ে গেল শহরের পরিচিত আকাশরেখা, পুরোনো ভবন আর ব্যস্ত ঘাট; সামনে খুলে গেল নীল জলের এক বিস্তীর্ণ প্রান্তর। ফেরির পেছনে সাদা ফেনার দীর্ঘ রেখা তৈরি হচ্ছে, তারপর মুহূর্তেই তা হ্রদের জলে মিলিয়ে যাচ্ছে—যেন আমাদের যাত্রার ক্ষণস্থায়ী স্বাক্ষর।
আমরা উঠে গেলাম খোলা ডেকে। এপ্রিলের শেষের বাতাসে তখনো শীতের হালকা স্পর্শ। কিন্তু রোদ ছিল কোমল ও উজ্জ্বল। মুখে এসে লাগছিল পাহাড় ছুঁয়ে আসা ঠান্ডা বাতাস; তার মধ্যে ছিল জলের স্নিগ্ধ গন্ধ। আমার স্ত্রী পাশে দাঁড়িয়ে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে। বাতাসে তাঁর চুলের কয়েকটি গোছা উড়ে এসে মুখের ওপর পড়ছিল। আমি কখনো হ্রদের দিকে, কখনো তাঁর দিকে তাকাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল প্রকৃতি যখন এত উদার হয়ে সৌন্দর্য বিলিয়ে দেয়, তখন প্রিয় মানুষের পাশে থাকা সেই সৌন্দর্যকে আরও গভীর করে তোলে। হ্রদের জল কখনো গভীর নীল, কখনো সবুজাভ; আবার সূর্যের আলো পড়লে কোথাও কোথাও রুপালি। দূরে আল্পসের তুষারঢাকা শিখর, নিচে সবুজ পাহাড়ের ঢাল নেমে এসেছে প্রায় জলের কিনার পর্যন্ত। মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছিল, আমরা যেন কোনো বাস্তব ভূখণ্ডের মধ্যে নই—এক বিশাল নিসর্গচিত্রের ভেতর দিয়ে ভেসে চলেছি।
ফেরি যত এগোয়, হ্রদের দুই তীরে একের পর এক ছোট ছোট জনপদ চোখে পড়ে। পাহাড়ের সবুজ ঢালে ছড়িয়ে থাকা বাড়িগুলো দূর থেকে খেলনার ঘরের মতো লাগে—লাল কিংবা ধূসর ছাদ, সাদা দেয়াল, সামনে ছোট বাগান। কোথাও গির্জার সুউচ্চ চূড়া গাছপালার মাথার ওপর উঠে আছে, কোথাও ছোট্ট ঘাটে কয়েকজন মানুষ ফেরির অপেক্ষায়। ফেরি কোনো কোনো ঘাটে থামে; কয়েকজন যাত্রী নামে, নতুন কয়েকজন উঠে আসে; তারপর আবার শুরু হয় জলপথের যাত্রা।
সেই মুহূর্তেই প্রথম গভীরভাবে উপলব্ধি করলাম যে হ্রদ আমাদের কাছে অপার সৌন্দর্যের এক পর্যটনভূমি, স্থানীয় মানুষের কাছে সেটি তাদের দৈনন্দিন জীবনেরও অংশ। এই পাহাড়ঘেরা ছোট জনপদগুলোতে মানুষ বাস করে, সন্তানদের স্কুলে পাঠায়, বাজার করে, কাজে যায়, আবার দিনের শেষে ঘরে ফিরে আসে। ট্রেন, বাস ও সড়কের পাশাপাশি নৌপথও কোথাও কোথাও তাদের যোগাযোগের পরিচিত অনুষঙ্গ। আমাদের কাছে যে ফেরিযাত্রা চার ঘণ্টার রোমাঞ্চ, কারও কাছে সেই একই নৌযান হয়তো পরিচিত কোনো ঘাটে পৌঁছানোর স্বাভাবিক পথ।
একটি ছোট্ট ঘাট ছেড়ে ফেরি আবার যখন মাঝহ্রদের দিকে এগিয়ে গেল, আমি পেছনে ফিরে জনপদটির দিকে তাকিয়ে রইলাম। পাহাড়ের কোলে ছোট ছোট বাড়ি, নিচে নীল জল, মাঝখানে গাছপালার সবুজ আবরণ। মনে হলো মানুষ এখানে প্রকৃতিকে সরিয়ে দিয়ে নিজের বসতি গড়েনি; বরং প্রকৃতির কাছ থেকে সামান্য একটু জায়গা চেয়ে নিয়ে তার মধ্যেই বিনয়ের সঙ্গে ঘর বেঁধেছে।
ফেরির ডেকে নানা দেশের পর্যটক। কেউ ক্যামেরা হাতে ব্যস্ত, কেউ পরিবার নিয়ে গল্প করছে, কেউ নিঃশব্দে বসে পাহাড় দেখছে। অথচ এত মানুষের মধ্যেও আশ্চর্য এক প্রশান্তি। হ্রদের বিশালতা যেন মানুষের কোলাহলকে নিজের মধ্যে শুষে নিয়ে তাকে নরম করে দেয়। কখনো আমরা পাশাপাশি বসে থাকি, কখনো রেলিংয়ের কাছে দাঁড়াই। খুব বেশি কথা বলার প্রয়োজন হয় না।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
একসময় চারদিকে তাকিয়ে মনে হলো, পাহাড়গুলো যেন ক্রমশ আমাদের আরও কাছে চলে এসেছে। বিশেষ করে পিলাটুসের বিশাল অবয়ব কখনো মেঘের আড়ালে, কখনো রৌদ্রে স্পষ্ট। অন্যদিকে রিগির ঢাল হ্রদের দিকে নেমে এসেছে অপরূপ সবুজে। নিচে বসন্তের নবীন পত্রপল্লব, ওপরে তুষারের শুভ্রতা—একই দৃশ্যের মধ্যে যেন প্রকৃতি তার দুটি ঋতুকে পাশাপাশি ধরে রেখেছে। আমরা রিগি স্টপে নেমে এক ঘণ্টা বিরতি নিলাম। আমার বন্ধু পরিবার-ডা. হাসান রহমান এবং শাহীন আখতার-পাহাড়ি ট্রেনে চড়ে ‘মাউন্ট রিগি’-তে উঠে লুসার্ন হ্রদ ও চারপাশের আল্পসের বিস্তৃত দৃশ্য দেখে এসেছেন। এরই মধ্যে, আমি আর শিরিন রিগি পর্বতের কিছুটা উচ্ছতায় অবস্থিত একটি রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ সেরে নিলাম। বলা বাহুল্য, সুইজারল্যান্ড এমনিতেই ইউরোপের ব্যয়বহুল দেশগুলোর একটি; আর জুরিখ বা লুসার্নে সেই উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় পর্যটকের পকেটে বেশ ভালোভাবেই অনুভূত হয়। হোটেলে থাকা থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁয় খাওয়া—সবকিছুর মূল্যই তুলনামূলকভাবে বেশ চড়া।
চার ঘণ্টার যাত্রার মাঝামাঝি এসে সময়ের হিসাবটাই যেন হারিয়ে ফেলেছিলাম। ঘড়ির দিকে তাকানোর প্রয়োজন হচ্ছিল না। কোথা থেকে যাত্রা শুরু করেছি, কখন ফিরব—এসব প্রশ্ন তখন তুচ্ছ। সামনে শুধু হ্রদের বিস্তার, দূরের পাহাড় আর পাশে আমার দীর্ঘদিনের সহযাত্রী। একসময় ফেরিটি ফের লুসার্নের দিকে মুখ ফেরাল। দূরে শহরটি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। যে শহরটিকে কয়েক ঘণ্টা আগে পেছনে রেখে এসেছিলাম, তাকে এবার জল থেকে অন্য রকম লাগছিল। তীরের ভবন, গির্জার চূড়া, ঘাটের নৌকা—সবকিছুর পেছনে উঠে আছে পাহাড়ের বিশাল প্রেক্ষাপট। মনে হলো, লুসার্নকে সত্যিকার অর্থে দেখতে হলে অন্তত একবার হ্রদের বুক থেকে তার দিকে ফিরে তাকানো প্রয়োজন।
অবশেষে ফেরি ঘাটে এসে থামল। আমরা নেমে এলাম। পায়ের নিচে আবার স্থির ভূমি, সামনে লুসার্নের পরিচিত শহর। কিন্তু চার ঘণ্টা আগে যে আমরা ফেরিতে উঠেছিলাম, ফিরে এসে যেন আমাদের চোখে শহরটি আর আগের মতো রইল না। হ্রদের বুক থেকে আমরা তার আরেকটি অন্তরঙ্গ মুখ দেখে এসেছি। জীবনে কিছু ভ্রমণ শেষ হয়ে যায় গন্তব্যে পৌঁছে; আবার কিছু ভ্রমণ শেষ হয়েও মনের মধ্যে চলতে থাকে। লুসার্ন হ্রদের সেই চার ঘণ্টার ফেরিযাত্রা আমার কাছে তেমনই—সময় তাকে চার ঘণ্টায় বেঁধেছিল, কিন্তু স্মৃতি তাকে আজও শেষ হতে দেয়নি।
বিদায়ের পূর্বে
যে শহর প্রথম দিনে অপরিচিত, বিদায়ের দিন তাকেই আপন মনে হয়। এটাই ভ্রমণের এক আশ্চর্যতা। জুরিখের হ্রদ, লুসার্নের পুরোনো পথ, আল্পসের শুভ্রতা—সবই তখন পরিচিত হয়ে উঠেছে। ফিরে আসার আগে মনে হচ্ছিল, আরেকটি দিন যদি পাওয়া যেত! কিন্তু হয়তো ভ্রমণের সৌন্দর্য তার স্বল্প স্থায়িত্বেই। সবকিছু যদি স্থায়ী হতো, তবে স্মৃতি এত মূল্যবান হতো না। শেষবার পাহাড়ের দিকে তাকিয়েছিলাম। আল্পস তখনো একইভাবে দাঁড়িয়ে। হ্রদও শান্ত। শুধু আমরা ফিরে আসছি। মনে হলো, আমরা সঙ্গে নিচ্ছি অনেক ছবি, অনেক দৃশ্য, অনেক কথাহীন মুহূর্ত। মানুষ একটি দেশ থেকে ফিরে আসে, কিন্তু সেই দেশ পুরোপুরি তার কাছ থেকে ফিরে আসে না। তার কিছু আলো থেকে যায় চোখে। কিছু বাতাস থেকে যায় মনে। কিছু পথ থেকে যায় হৃদয়ের ভেতর। জুরিখ ও লুসার্ন তাই এখন আর কেবল দুটি শহরের নাম নয়। তারা আমাদের জীবনের কয়েকটি উজ্জ্বল দিনের নাম।
*লেখক: অধ্যাপক রাশিদুল হক: সাবেক সহ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী এবং সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র, ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়