নেভা নদী: আমার নীরব সহযাত্রী

ছবিঃ নেভা নদী: নদীর ওপারে প্রখ্যাত আর্ট গ্যালারি-হেরমিটেজ

বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে অচেনা মানুষ, অচেনা ভাষা, অচেনা আকাশ। চারদিকে সুশৃঙ্খল স্থাপত্য, প্রশস্ত সড়ক, ট্রামলাইন আর ইতিহাসের ভার বহন করে দাঁড়িয়ে থাকা গম্ভীর সব ভবন। সবকিছুই নতুন, সবকিছুই বিস্ময়কর। রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া একটি নদী—নেভা, আমার যৌবনকালের চারটি বছর আমার সবচেয়ে নীরব, অথচ সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযাত্রী হয়ে উঠেছিল। হ্যাঁ, আমি আশির দশকের কথা বলছি। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, ডরমিটরি, নতুন সহকর্মী, অচেনা ভাষা ও ভিন্ন সংস্কৃতির ভিড়ে দিনগুলো দ্রুত কেটে যেত। কিন্তু দিনের ব্যস্ততা শেষ হলে রাত নেমে আসত এক গভীর নিঃসঙ্গতা নিয়ে।

প্রথম দিকে নেভা ছিল শুধু জানালার বাইরে দেখা একটি নদী। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে, ফেরার পথে, কখনো বাসের জানালা দিয়ে, কখনো সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে। মাঝেমধ্যে সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে কয়েক মিনিট তাকিয়ে থাকতাম, তারপর আবার নিজের কাজে ফিরে যেতাম। তখনো তার নামের চেয়ে তার উপস্থিতিই বেশি অনুভব করতাম। নেভা—একটি শান্ত, সংযত, গম্ভীর নদী। দূর থেকে তাকে দেখে মনে হতো, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সে এই শহরের নীরব ইতিহাস বয়ে নিয়ে চলেছে, অবশেষে পতিত হয়েছে ফিনল্যান্ড উপসাগরে (বাল্টিক সাগরে)। আমি তাকে দেখতাম, কিন্তু তখনো জানতাম না আগামী চার বছরে এই নদীই আমার আনন্দ, বিষাদ, একাকিত্ব, আশা আর স্বপ্নের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সাক্ষী হয়ে উঠবে। সঙ্গে ধীরে ধীরে এ–ও অনুভব করলাম, তাকে আমার দেখা যেন একতরফা নয়। নদীটিও যেন প্রতিদিন নীরবে আমাকে চিনে নিচ্ছে।

আজ পৃথিবীর বহু নদীর তীরে দাঁড়ানোর সুযোগ হয়েছে—পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, ভলগা, স্প্রি, টেমস। প্রতিটিরই নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। কিন্তু নেভা আমার কাছে শুধু একটি নদী নয়; সে আমার যৌবনের নীরব সহযাত্রী, আমার একাকিত্বের শ্রোতা, আমার স্বপ্নের রক্ষক।

তারপর একসময় অজান্তেই একটি অভ্যাস তৈরি হলো। দিনের কাজ শেষ হলেই মনে হতো, যেন কেউ নীরবে আমাকে ডাকছে। পা আপনাতেই ঘুরে যেত নেভার তীরের দিকে। প্রথমে হয়তো ৫-১০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতাম, তারপর ধীরে ধীরে সেই সময় বাড়তে লাগল। কখনো সেতুর রেলিংয়ে ভর দিয়ে জলের দিকে তাকিয়ে থাকতাম, কখনো নির্জন কোনো বেঞ্চে বসে থাকতাম। কোনো কথা বলতাম না, তবু মনে হতো এই নীরবতারও একটি ভাষা আছে।

গবেষণাগারে কোনো পরীক্ষায় সাফল্য পেলে সেই আনন্দ প্রথমে যেন নেভার সঙ্গেই ভাগ করে নিতে ইচ্ছা হতো। আবার কোনো ফল প্রত্যাশামতো না এলে, মন খারাপ নিয়েও চলে আসতাম তার কাছে। বাংলাদেশের কোনো চিঠি হাতে পেলে কিংবা প্রিয়জনের কথা হঠাৎ গভীরভাবে মনে পড়লে, সেই অনুভূতিরও নীরব সাক্ষী হতো এই নদী। কখন যে নদীটি নিঃসঙ্গতার নীরব সঙ্গী হয়ে উঠেছিল, নিজেও বুঝতে পারিনি।

নভেম্বরের শেষ দিকে সেন্ট পিটার্সবার্গে শীত তার প্রকৃত রূপ প্রকাশ করল। এক সকালে জানালার বাইরে তাকিয়ে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। গতকালও যেখানে কালচে নীল জল ছিল, সেখানে আজ সাদা বরফের অসীম বিস্তার। রাস্তা, গাছ, সেতু, ছাদ—সবকিছু যেন এক রাতেই অন্য এক জগতে চলে গেছে। পৃথিবীর রং মুছে গিয়ে শুধু সাদা, ধূসর আর নীলের এক অপূর্ব সমাহার।

ছবিঃ নেভা নদী: ড্র -ব্রিজের সামনে

সেই শীতেই নেভাকে নতুনভাবে চিনলাম। বরফে ঢেকে গেলেও সে অস্থির হয় না। বাইরে নিশ্চুপ, অথচ ভেতরে তার স্রোত অবিরাম বয়ে চলে, যেন নির্ঝরিণী স্রোতস্বিনী। একদিন হঠাৎ মনে হলো, আমার জীবনও যেন নেভার মতো। মানুষের জীবনেও এমন কিছু শীত আসে, যা কোনো সাফল্য দিয়ে পূরণ করা যায় না। বুকের ওপর জমে থাকা বরফের নিচেও কিন্তু জীবনের প্রবাহ থেমে থাকে না। সেদিন মনে হয়েছিল, পৃথিবীতে যদি কেউ আমার নিঃসঙ্গতা বুঝে থাকে, তবে সে এই নদী। আমরা দুজনেই যেন জানতাম—বরফ কখনো চিরস্থায়ী নয়।

গবেষণার দিনগুলো সব সময় সমান ছিল না। কোনো কোনো পরীক্ষার ফল প্রত্যাশামতো আসত, আবার কখনো দীর্ঘদিনের শ্রম মুহূর্তে ব্যর্থ হয়ে যেত। এমনই এক সন্ধ্যায় হতাশ মন নিয়ে নেভার তীরে বসে ছিলাম। নদীর দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তার স্রোত কোথাও সরলরেখায় বয়ে যায় না। কোথাও ঘূর্ণি, কোথাও ঢেউ, কোথাও বাঁক—তবু সে থেমে থাকে না। মনে হলো, নেভা যেন নীরবে বলছে, ‘গন্তব্যে পৌঁছানোর পথ সব সময় সোজা হয় না; গুরুত্বপূর্ণ হলো চলে যাওয়া।’ কোনো অলৌকিক সমাধান পাইনি, কিন্তু মন অনেক হালকা হয়ে গিয়েছিল।

আরেক সময় দীর্ঘদিন ধরে দেশের কারও কোনো খবর পাই না। প্রতিদিন অপেক্ষা করতাম, হয়তো আজ খবর আসবে। সেই অপেক্ষার সন্ধ্যাগুলোও কেটেছে নেভার তীরে। নদীর জলে ছোট ছোট তরঙ্গ উঠত, মিলিয়ে যেত, আবার ফিরে আসত। তখন মনে হয়েছিল, অপেক্ষাও যেন নদীর ঢেউয়ের মতো; আসে, ভাঙে, আবার ফিরে আসে। কিন্তু যেমন নদী শেষ পর্যন্ত সাগরের পথ ভুলে যায় না, তেমনি সত্যিকারের ভালোবাসাও অপেক্ষার পথ হারায় না।

সেন্ট পিটার্সবার্গ ছেড়ে যাওয়ার আগের সন্ধ্যায় শেষবারের মতো নেভার তীরে গেলাম। গ্রীষ্ম শেষের পথে, বাতাসে হালকা শীতের ইঙ্গিত। নদীটি তার স্বাভাবিক ছন্দে বয়ে চলেছে। তাকে দেখে মনে হলো না, সে জানে আজ আমার শেষ দেখা।

দীর্ঘ শীতের অন্ধকার ধীরে ধীরে পিছু হটতে শুরু করল। মে মাসের শেষ দিকে লক্ষ করলাম, সন্ধ্যা যেন আর শেষ হতে চায় না। প্রথমে বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিইনি। গবেষণাগারের কাজ শেষ করে ডরমিটরিতে ফিরতাম, কিন্তু সূর্য তখনো আকাশে। মনে হতো, দিনটি যেন একটু বেশি দীর্ঘ হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই বুঝলাম, এটি কেবল দীর্ঘ দিন নয়; প্রকৃতি যেন নিজেই সময়ের নিয়ম বদলে দিয়েছে।

একদিন রাত ১০টার দিকে জানালার পাশে বসে একটি গবেষণাপত্র পড়ছিলাম। হঠাৎ চোখ পড়ল বাইরে। আকাশে তখনো ম্লান আলো। মনে হলো, নিশ্চয়ই ঘড়ি ভুল দেখাচ্ছে। কিন্তু না, ঘড়ির কাঁটা ঠিকই এগিয়ে চলেছে। রাত ১১টা, তারপর ১২টা; তবু অন্ধকার নেমে এল না। আলো শুধু নরম হয়ে এল, যেন দিনের শেষ আলো আর রাতের প্রথম অন্ধকার হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে। সেদিনই প্রথম উপলব্ধি করলাম, ‘হোয়াইট নাইটস’কোনো কল্পকাহিনি নয়; এটি প্রকৃতির এক অনন্য বিস্ময়।

পরদিন রাতে আর ঘরে থাকতে পারলাম না। পা আপনাতেই চলে গেল নেভার তীরে। সেখানে পৌঁছে মনে হলো, পৃথিবী যেন আলো আর জলের মাঝখানে কোথাও থেমে আছে। আকাশে সূর্য নেই, আবার রাতও নয়। রুপালি আলো নেভার বুকে পড়ে হাজারো কাঁপতে থাকা আলোকরেখায় ভেঙে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল, নদীটি জল নয়, গলিত রুপা বয়ে নিয়ে চলেছে।

সেই মুহূর্তে মনে হলো, নেভা যেন আমাকে বলছে-

‘অন্ধকার সব সময় রাতের পরিচয় নয়। কখনো কখনো আলোও নিঃসঙ্গ হতে পারে।’

নদী সত্যিই কথা বলেছিল কি না, জানি না। কিন্তু মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন প্রকৃতির নীরবতাই ভাষা হয়ে ওঠে।

এরপর জুন মাসের প্রায় প্রতিটি রাতই কেটেছে নেভার তীরে। সারা দিন গবেষণাগারের সূক্ষ্ম জগতের ভেতরে কাটিয়ে রাতের এই হাঁটাগুলো ছিল আমার মানসিক মুক্তির সময়। নদীর তীর তখন প্রাণবন্ত। কোথাও তরুণদের গিটার আর গান, কোথাও কোনো শিল্পী ক্যানভাসে আঁকছেন নেভার ছবি, কোথাও প্রেমিক-প্রেমিকা নীরবে বসে আছে, কোথাও শিশুদের হাসি ভেসে আসছে।

আমি তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভাবতাম, এই শহরের মানুষের কাছে হয়তো এ দৃশ্য প্রতিবছরেরই পরিচিত। কিন্তু আমার মতো এক বাংলাদেশি গবেষকের কাছে এটি এক অলৌকিক অভিজ্ঞতা। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের একটি দেশের মানুষ হয়েও সেই মুহূর্তে নিজেকে আর সম্পূর্ণ বিদেশি মনে হতো না। প্রকৃতির সৌন্দর্যের সামনে মানুষের জাতীয়তা, ভাষা কিংবা পরিচয়ের ভেদরেখাগুলো যেন মিলিয়ে যেত। রাত যত গভীর হতো, মানুষের ভিড় তত বাড়ত। সবাই অপেক্ষা করত এক বিস্ময়কর দৃশ্যের জন্য। নদীর ওপরের বিশাল সেতুগুলো ধীরে ধীরে ওপরে উঠত। দূরে সাইরেন বেজে উঠত, তারপর ইস্পাতের সেই বিশাল কাঠামো দুই দিকে খুলে যেত। কিছুক্ষণ পর নীলাভ আলো ভেদ করে বিশাল জাহাজ এগিয়ে আসত। মনে হতো, মানুষ আর প্রকৃতি প্রতি রাতে মিলে যেন এক অনবদ্য নাটক মঞ্চস্থ করছে।

আরও পড়ুন

এই রাতগুলোয় আমি প্রায়ই একা হাঁটতাম। কখনো সেতুর রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতাম, কখনো পরিচিত বেঞ্চটিতে বসে থাকতাম। এমনই এক রাতে হঠাৎ মনে হলো, আজ যদি আমার প্রিয় মানুষটি এখানে থাকত! বুকের ভেতর নিঃশব্দ এক হাহাকার জেগে উঠল। আমি নদীর দিকে তাকালাম। নেভা নিশ্চুপ। শুধু বয়ে চলেছে। কিন্তু তার অবিরাম প্রবাহ যেন আমাকে মনে করিয়ে দিল, ‘দূরত্ব ভালোবাসাকে কমায় না। নদীর দুই তীর আলাদা হয়েও তো একই জলের সঙ্গে যুক্ত থাকে।’

আমি আকাশের দিকে তাকালাম। একই চাঁদ হয়তো সেই মুহূর্তে বাংলাদেশের আকাশেও আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। সেই উপলব্ধির পর আর কখনো নিজেকে সম্পূর্ণ একা মনে হয়নি।

ধীরে ধীরে বুঝতে শিখলাম, হোয়াইট নাইটসের সবচেয়ে বড় বিস্ময় এই নয় যে রাতেও আলো থাকে; তার প্রকৃত বিস্ময় হলো, মানুষের অন্তরের অন্ধকারকেও সে ধীরে ধীরে আলোকিত করে।

চার বছরের প্রতিটি ঋতু আমার প্রথম শীত, প্রথম সাফল্য, ব্যর্থতা, অপেক্ষা, আনন্দ, বিষণ্নতা—সবকিছুর নীরব সাক্ষী ছিল নেভা।

অবশেষে বিদায়ের দিন এল। চার বছর কখন যে কেটে গেল, তা বুঝতেই পারিনি। যে শহরে প্রথম এসেছিলাম এক অচেনা গবেষক হিসেবে, সেই শহরই অজান্তে আমার জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল। গবেষণাগারের অসংখ্য দিন, দীর্ঘ শীত, সাদা বরফ, হোয়াইট নাইটস, নতুন বন্ধু, সাফল্য, ব্যর্থতা—সবকিছু যেন এক অদৃশ্য সুতোয় গেঁথে ছিল। সেই সুতোর সবচেয়ে নীরব, অথচ সবচেয়ে দৃঢ় বন্ধন ছিল নেভা।

সেন্ট পিটার্সবার্গ ছেড়ে যাওয়ার আগের সন্ধ্যায় শেষবারের মতো নেভার তীরে গেলাম। গ্রীষ্ম শেষের পথে, বাতাসে হালকা শীতের ইঙ্গিত। নদীটি তার স্বাভাবিক ছন্দে বয়ে চলেছে। তাকে দেখে মনে হলো না, সে জানে আজ আমার শেষ দেখা। সেই পরিচিত বেঞ্চটিতে গিয়ে বসলাম। এখানেই কত সন্ধ্যা কেটেছে—কখনো হাতে গবেষণাপত্র, কখনো বাংলাদেশের চিঠি, কখনো প্রিয়জনের স্মৃতি, কখনো ভবিষ্যতের স্বপ্ন, কখনো গভীর নিঃসঙ্গতা। আজ হাত খালি। তবু মনে হচ্ছিল, আমার পুরো যৌবন যেন অদৃশ্য হয়ে এই বেঞ্চটির চারপাশে বসে আছে। শুধু স্মৃতিতে ভরা।

দীর্ঘক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে হলো, চার বছরের প্রতিটি দিন যেন নেভার জলের ওপর ভেসে উঠছে। তখন উপলব্ধি করলাম, মানুষের জীবনে এমন কিছু স্থান থাকে, যেখানে সে শুধু সময় কাটায় না, নিজের একটি অংশ রেখে আসে। নেভার তীরে আমি রেখে যাচ্ছি আমার যৌবনের সবচেয়ে মূল্যবান চারটি বছর, একজন বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার প্রথম স্বপ্ন, প্রথম একাকিত্ব ও প্রথম আত্ম-আবিষ্কারের দিনগুলো।

মনে মনে বললাম, ‘ধন্যবাদ’। ধন্যবাদ, নিঃসঙ্গতার দিনগুলোয় নীরবে পাশে থাকার জন্য। ধন্যবাদ, আমাকে ধৈর্য শেখানোর জন্য। ধন্যবাদ, আমাকে বোঝানোর জন্য যে বরফের নিচেও নদী বয়ে চলে। নদী কোনো উত্তর দিল না। নদীরা কখনো শব্দে উত্তর দেয় না; তাদের উত্তর লুকিয়ে থাকে প্রবাহে। সেই কারণেই আজও রবীন্দ্রনাথের সেই ‘নির্ঝরিণী’ কবিতার পঙ্‌ক্তিটি মনে পড়লে মনে হয়, তিনি যেন শুধু কোনো নদীর কথা বলেননি; মানুষের আত্ম-আবিষ্কারের কথাই বলেছেন, ‘তোমার প্রবাহে মনেরে জাগায়, নিজেরে চিনি।’

আরও পড়ুন

নেভার তীরেই আমি শিখেছিলাম, মানুষকে বড় করে তার সাফল্য নয়, তার পথচলা। জীবনের মূল্য গন্তব্যে পৌঁছানোর মধ্যে নয়, অবিরাম প্রবাহের মধ্যে। নদীর মতোই মানুষও সামনে এগিয়ে চলে—কখনো বরফের নিচে, কখনো রৌদ্রের আলোয়, কখনো নিঃসঙ্গতায়, কখনো আনন্দে। কিন্তু সে যদি তার প্রবাহ হারিয়ে না ফেলে, তবে কোনো যাত্রাই বৃথা যায় না।

ঠিক সেই মুহূর্তে হালকা বাতাস বইল। নদীর বুকে ছোট ছোট ঢেউ উঠল। অস্তগামী সূর্যের আলো সেই ঢেউয়ের ওপর ভেঙে অসংখ্য সোনালি রেখায় ছড়িয়ে পড়ল। মনে হলো, নেভা তার নিজস্ব ভাষায় আমাকে শেষবিদায় জানাল।

আজ পৃথিবীর বহু নদীর তীরে দাঁড়ানোর সুযোগ হয়েছে—পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, ভলগা, স্প্রি, টেমস। প্রতিটিরই নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। কিন্তু নেভা আমার কাছে শুধু একটি নদী নয়। সে আমার যৌবনের নীরব সহযাত্রী, আমার একাকিত্বের শ্রোতা, আমার স্বপ্নের রক্ষক। কিছু সম্পর্ক পরিচয়ে গড়ে ওঠে, কিছু সময়ের সঙ্গে। আর কিছু সম্পর্কের কোনো আনুষ্ঠানিক শুরুই থাকে না, একদিন হঠাৎ মানুষ বুঝতে পারে, তার নীরবতারও একজন শ্রোতা আছে।

আমার জীবনে নেভা নদী ঠিক তেমনই এক অনুচ্চারিত, অথচ চিরন্তন সহযাত্রী।

* লেখক: অধ্যাপক রাশিদুল হক: সাবেক সহ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী এবং সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র, ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]