বাল্টিকের নীল জলরেখায় ফিরে দেখা এক তরুণ গবেষকের দিনগুলো
জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ যখন অতীতের দিকে ফিরে তাকাই, তখন দেখি অসংখ্য দিনের ভিড়ে কিছু মুহূর্ত আজও অবিকল জেগে আছে। মানুষের স্মৃতিরও বোধ হয় নিজস্ব একটি জাদুঘর থাকে—যেখানে অসংখ্য ঘটনা হারিয়ে যায়, কিন্তু কিছু দৃশ্য, কিছু মুখ, কিছু গন্ধ, কিছু অনুভূতি চিরদিনের জন্য সংরক্ষিত থাকে। আমার জীবনের তেমনই একটি উজ্জ্বল স্মৃতির নাম—বাল্টিক সাগরের বুকে সেই প্রথম ক্রুজযাত্রা, হেলসিঙ্কি ও স্টকহোম ভ্রমণের সেই দিনগুলো। সময়টা আশির দশকের প্রথম দিক। তখন আমি রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণায় ব্যস্ত। আজকের দৃষ্টিতে সেই সময়টিকে ফিরে দেখলে মনে হয়, সেটি ছিল আমার জীবনের এক স্বর্ণালি অধ্যায়। একদিকে ছিল বিজ্ঞানের কঠোর সাধনা, গবেষণাগারের দীর্ঘ সময়, বই ও পাণ্ডুলিপির সঙ্গে নিরন্তর বসবাস, অন্যদিকে ছিল এক অদম্য কৌতূহল—এই বিশাল পৃথিবীকে নিজের চোখে দেখার, তার মানুষ, সংস্কৃতি ও প্রকৃতিকে জানার আকাঙ্ক্ষা।
বিদেশে ছাত্রজীবনের দিনগুলো মানুষকে অদ্ভুতভাবে বদলে দেয়। পরিচিত পরিবেশের নিরাপত্তা থেকে দূরে গিয়ে মানুষ নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে শেখে। সেন্ট পিটার্সবার্গের তুষারঢাকা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে চলতে চলতে, কতবার যে মনে হয়েছে—জ্ঞান অর্জন শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, পৃথিবী নিজেই এক বিশাল পাঠশালা। সেই সময় এক ছুটিতে আমরা তিন বন্ধু সিদ্ধান্ত নিলাম—ফিনল্যান্ড ও সুইডেন ভ্রমণে যাব। আমার সহযাত্রী ছিল শফিক, সেই সময় প্রকৌশলের ছাত্র এবং ডিটার, বার্লিনের ‘হুমবোল্ট’ বিশ্ববিদ্যায়ের পদার্থবিজ্ঞানের প্রভাষক। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ডর্মে ডিটার ছিল আমার রুমমেট। আজ এত বছর পর মনে হয়, সেটি শুধু একটি ভ্রমণ ছিল না, বরং তরুণ বয়সের স্বপ্ন, সাহস ও স্বাধীনতার এক ছোট্ট উদ্যাপন ছিল।
আমাদের যাত্রাপথ নির্ধারিত হলো—সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে ট্রেনে হেলসিঙ্কি, সেখান থেকে সমুদ্রপথে স্টকহোম এবং ফেরার পথে বিমানে আবার সেন্ট পিটার্সবার্গ। একটি ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে সব ব্যবস্থা করলাম। সেই সময়ের বিদেশ ভ্রমণ আজকের মতো সহজ ছিল না। প্রতিটি যাত্রাই ছিল একধরনের অভিযান, প্রতিটি নতুন দেশ ছিল এক নতুন আবিষ্কার।
সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে হেলসিঙ্কি যাওয়ার ট্রেনযাত্রা আজও মনে আছে। এক্সপ্রেস ট্রেনটির নাম ছিল ‘রেপিন’, যার নামকরণ করা হয়েছিল রুশ চিত্রশিল্পী ইলিয়া রেপিনের নামে। জানালার বাইরে ছুটে চলা প্রকৃতি, ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া ভূদৃশ্য এবং অজানা এক দেশের দিকে এগিয়ে যাওয়ার উত্তেজনা—সব মিলিয়ে মন ছিল একধরনের আনন্দময় প্রত্যাশায় পূর্ণ। পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম হেলসিঙ্কিতে। দুই দেশের মধ্যে ছিল বর্ডার ক্রসিং ও চেকিং—সেখানে কিছুটা সময় বাহুল্য গেল। বাল্টিক সাগরের তীরে অবস্থিত হেলসিঙ্কিকে প্রথম দেখায় মনে হয়েছিল—এ যেন নীরব সৌন্দর্যের এক শহর। এখানে প্রকৃতি ও মানুষের নির্মাণশৈলী পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছে যে শহরটিকে শুধু দেখা যায় না, অনুভব করা যায়। হারবারের কাছে ফিনিশ ‘সালুহল’ (স্থানীয় খাবার, ঐতিহ্যবাহী জলখাবার এবং হস্তশিল্পের এক সামাজিক কেন্দ্র) এ গিয়ে দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম। সাধারণ এক দুপুরের সেই খাবারও আজ স্মৃতিতে বিশেষ হয়ে আছে। কারণ, তখন প্রতিটি নতুন অভিজ্ঞতাই ছিল জীবনের একেকটি মূল্যবান অধ্যায়।
হেলসিঙ্কি ছিল ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। সুইডিশ শাসন, রুশ সাম্রাজ্যের বিস্তার এবং পরে স্বাধীন ফিনল্যান্ডের জন্ম—এই দীর্ঘ ইতিহাস যেন শহরের স্থাপত্য, রাস্তাঘাট ও মানুষের জীবনধারার মধ্যে মিশে আছে। রুশ সম্রাট আলেকসান্দার প্রথম যখন ফিনল্যান্ডের রাজধানী টুর্কু থেকে হেলসিঙ্কিতে স্থানান্তর করেন, তখন হয়তো তিনি কল্পনাও করেননি যে এই শহর একদিন আধুনিক, শান্তিপূর্ণ ও জ্ঞানচর্চার এক আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হয়ে উঠবে। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে ফিনল্যান্ড একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।
হেলসিঙ্কি ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘সুয়োমেনলিনা দুর্গ’। শহরের কেন্দ্র থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে বাল্টিক সাগরের বুকে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি ছোট দ্বীপের ওপর অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এই বিশাল সামুদ্রিক দুর্গ নির্মিত হয়েছিল। সে সময় ফিনল্যান্ড ছিল সুইডিশ সাম্রাজ্যের অংশ, আর রুশ সাম্রাজ্যের ক্রমবর্ধমান শক্তির মোকাবিলায় বাল্টিক উপকূল রক্ষার জন্যই এই দুর্গ গড়ে তোলা হয়। পরে ফিনল্যান্ড রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হলে দুর্গটি রুশ সামরিক ঘাঁটি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছিল। অর্থাৎ সুয়োমেনলিনার প্রতিটি প্রাচীর যেন সুইডেন, রাশিয়া ও ফিনল্যান্ড—এই তিনটি ইতিহাসের স্তর একসঙ্গে ধারণ করে আছে। আমরা ফেরিতে করে দ্বীপে পৌঁছালাম। চারদিকে নীল সমুদ্র, পাথুরে তটভূমি, সবুজ ঘাসে ঢাকা ঢাল আর পুরোনো কামানঘেরা প্রাচীর—সব মিলিয়ে পরিবেশটি ছিল একাধারে শান্ত, আবার ইতিহাসের ভারে গম্ভীর। দুর্গের সরু পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, তিন শতাব্দী আগের সৈনিকদের পদধ্বনি যেন এখনো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। কোথাও বিশাল পাথরের দেয়াল, কোথাও ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ, কোথাও পুরোনো ব্যারাক—প্রতিটি স্থাপনা অতীতের একেকটি নীরব দলিল। আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় লেগেছিল এই কারণে যে সুয়োমেনলিনা শুধু একটি সামরিক দুর্গ নয়, এটি মানুষ ও প্রকৃতির এক অনন্য সহাবস্থানের উদাহরণ। সমুদ্রের অবিরাম ঢেউ, শেওলাঢাকা পাথর, উড়ে চলা সি-গাল আর শতাব্দীপ্রাচীন দুর্গ—সব মিলিয়ে সেখানে ইতিহাস কখনো প্রকৃতিকে ছাপিয়ে যায় না, আবার প্রকৃতিও ইতিহাসকে আড়াল করে না। দুইয়ে মিলে সৃষ্টি করেছে এক অনন্য সৌন্দর্য।
আজ যখন বয়সের দূরত্ব থেকে সেই দিনগুলোর দিকে তাকাই, তখন মনে হয়—সেই তরুণ গবেষকটি আসলে শুধু ফিনল্যান্ড ও সুইডেন ভ্রমণ করেনি, সে পৃথিবীকে একটু বেশি চিনেছিল, নিজেকেও একটু বেশি আবিষ্কার করেছিল। বাল্টিকের নীল জলরেখা তাই আমার কাছে শুধু একটি সমুদ্র নয়, এটি আমার যৌবনের স্বপ্ন, জ্ঞানসন্ধানের পথ এবং হারিয়ে যাওয়া এক সুন্দর সময়ের প্রতীক।
ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে কাটানো সময় আমার কাছে বিশেষ অর্থবহ ছিল। জাদুঘরে প্রবেশ করেই মনে হয়েছিল, যেন পৃথিবীর কোটি কোটি বছরের জীবনের ইতিহাসের ভেতর দিয়ে হাঁটছি। বরফযুগের বিশাল স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে শুরু করে উত্তর ইউরোপের বনভূমির নেকড়ে, ভালুক, রেইনডিয়ার, আর্কটিক পাখি, সামুদ্রিক প্রাণী, অসংখ্য কীটপতঙ্গ, খনিজ ও জীবাশ্ম—সবকিছুই এমন সুনিপুণভাবে সাজানো যে প্রতিটি প্রদর্শনী যেন নিজস্ব একটি গল্প বলছে। বিশেষভাবে মুগ্ধ হয়েছিলাম ফিনল্যান্ডের অরণ্য ও আর্কটিক অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য নিয়ে নির্মিত ডায়োরামাগুলো দেখে। ‘ডায়োরামা’ হলো এমন একটি ত্রিমাত্রিক বাস্তবধর্মী প্রদর্শনী, যেখানে কোনো প্রাণী, উদ্ভিদ, প্রাকৃতিক পরিবেশ বা ঐতিহাসিক দৃশ্যকে এমনভাবে সাজানো হয়, যেন দর্শকের মনে হয় সেটি সত্যিই চোখের সামনে ঘটছে। প্রাণীগুলোর সংরক্ষিত নমুনা এতটাই স্বাভাবিক ও জীবন্ত মনে হচ্ছিল যে যেন তারা এইমাত্র বন থেকে বেরিয়ে এসেছে। একজন প্রাণীবিজ্ঞানী হিসেবে উপলব্ধি করেছিলাম, একটি ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম কেবল মৃত নমুনার সংগ্রহশালা নয়, এটি প্রকৃতি, বিবর্তন, জীববৈচিত্র্য এবং পৃথিবীর দীর্ঘ জীবনের ইতিহাসকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ও আকর্ষণীয় করে তুলে ধরার এক অনন্য শিক্ষাঙ্গন। সেদিন সেখানে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়েছিলাম, কিন্তু বেরিয়ে আসার পরও মনে হচ্ছিল, দেখার অনেক কিছুই যেন এখনো বাকি রয়ে গেল।
হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে একধরনের আবেগ অনুভব করেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে হাঁটতে হাঁটতে আমার মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সব বিশ্ববিদ্যালয়েরই যেন এক অদৃশ্য আত্মীয়তা রয়েছে। ভাষা, দেশ কিংবা সংস্কৃতি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু জ্ঞান সন্ধানের পরিবেশ সর্বত্রই একই রকম নিবিড় ও অনুপ্রেরণাময়। প্রখ্যাত রসায়নবিদ নোবেলজয়ী আর্তুরি ভিটানেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। গবেষণাগারের নীরবতা, পুরোনো ভবনের স্থির সৌন্দর্য, গ্রন্থাগারের গাম্ভীর্য এবং ছাত্রছাত্রীদের প্রাণচাঞ্চল্য—সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি যেন জ্ঞানের এক জীবন্ত নগরী। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কয়েকজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে, সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতির এক দেশে দাঁড়িয়ে বাংলায় দু-চারটি কথা বলার যে স্বস্তি ও আপনত্ব অনুভব করেছিলাম, তা আজও ভুলি না। বিদেশে নিজের দেশের মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়া যেন হঠাৎ করেই দূর আকাশে পরিচিত কোনো নক্ষত্রকে খুঁজে পাওয়ার মতো।
বাল্টিকের বুকে এক নীল স্বপ্নযাত্রা
পরদিন বিকেলে শুরু হলো আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় যাত্রা। হেলসিঙ্কি হারবার থেকে জাহাজ যখন ধীরে ধীরে বিদায় নিল, তখন বিকেলের আলো সবে নরম হতে শুরু করেছে। বন্দরের ব্যস্ততা, মানুষের কোলাহল, শহরের পরিচিত মুখগুলো ধীরে ধীরে পেছনে সরে যেতে লাগল। মনে হলো, আমরা যেন শুধু একটি শহর ছেড়ে যাচ্ছি না—বরং পরিচিত পৃথিবীর সীমানা অতিক্রম করে প্রবেশ করছি এক নতুন, নীরব ও রহস্যময় জগতে।
জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে আমি দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম পেছনে ফেলে আসা হেলসিঙ্কির দিকে। দূরে শহরের ভবনগুলো ক্রমেই ছোট হয়ে আসছিল, আর বাল্টিকের নীল জলরাশি চারদিকে আরও বিস্তৃত হয়ে উঠছিল। আকাশ ও সমুদ্র যেন এক অসীম নীলতায় একাকার হয়ে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে দূরে কোনো ছোট দ্বীপ, কোনো বাতিঘর কিংবা কোনো অচেনা জাহাজ দেখা যাচ্ছিল—যেন বিশাল জলরাশির বুকে আঁকা ক্ষুদ্র অথচ অর্থবহ কিছু চিহ্ন। বাল্টিক সাগরের সেই সন্ধ্যা ছিল এক অপার্থিব অভিজ্ঞতা। সমুদ্র উত্তাল ছিল না, বরং ছিল গভীর, শান্ত ও ধ্যানমগ্ন। মৃদু ঢেউগুলো জাহাজের গায়ে এসে আছড়ে পড়ছিল এক ছন্দময় সুরে। মনে হচ্ছিল, সাগর যেন তার নিজস্ব কোনো প্রাচীন সংগীত গেয়ে চলেছে—যে সংগীত শুনতে হয় হৃদয় দিয়ে, কানে নয়।
ঠান্ডা সমুদ্রের বাতাস মুখে এসে লাগছিল। সেই বাতাসে ছিল উত্তরের দেশের এক বিশেষ গন্ধ—লবণাক্ত জল, দূরদেশের অজানা পথ আর মুক্তির এক অদ্ভুত অনুভূতি। ডেকের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মনে হচ্ছিল, মানুষ আসলে কত ক্ষুদ্র, আর প্রকৃতি কত বিশাল! কয়েক হাজার টন ওজনের সেই বিশাল জাহাজও তখন বাল্টিকের অসীম বুকে যেন এক ক্ষুদ্র ভাসমান বিন্দু মাত্র। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। সূর্য পশ্চিম দিগন্তের কাছে নেমে গিয়ে আকাশে ছড়িয়ে দিল সোনালি, কমলা ও বেগুনি রঙের অপূর্ব আলোকচ্ছটা। সাগরের কালচে নীল জলের ওপর সেই আলো পড়ে তৈরি করেছিল এক স্বপ্নময় পথ—মনে হচ্ছিল, সূর্য যেন বিদায়ের আগে সমুদ্রের বুকে তার শেষ স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছে।
রাত নামার পর দৃশ্যটি আরও রহস্যময় হয়ে উঠল। চারদিকে গভীর অন্ধকার, মাথার ওপর অসংখ্য নক্ষত্রের মৃদু আলো, আর নিচে অসীম সমুদ্রের কালো বিস্তার। দূরে জাহাজের আলো ছাড়া আর কোনো আলোর অস্তিত্ব ছিল না। মাঝে মাঝে বাতাসের তীব্রতা বেড়ে যাচ্ছিল, ঢেউয়ের শব্দ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল—মানুষের সভ্যতা, শহর, ব্যস্ততা সব যেন বহু দূরে পড়ে আছে, আমরা যেন প্রকৃতির এক আদিম ও বিশুদ্ধ উপস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। সেই রাতে জাহাজের কেবিনে ফিরে এলেও মন পড়ে ছিল বাইরে—সেই অসীম জলরাশি, নক্ষত্রভরা আকাশ আর অজানা গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলা জাহাজের সঙ্গে। মনে হয়েছিল, এই যাত্রা শুধু এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়া নয়, এটি যেন নিজের ভেতরের এক অজানা ভূগোল আবিষ্কারের যাত্রা।
আজ বহু বছর পরও বাল্টিক সাগরের সেই রাত আমার স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে। জীবনের অনেক ঘটনা সময়ের সঙ্গে ম্লান হয়ে যায়, কিন্তু কিছু দৃশ্য মানুষের অন্তরে স্থায়ী ঠিকানা তৈরি করে নেয়। বাল্টিকের সেই নীল জল, শীতল বাতাস, শান্ত ঢেউ আর নক্ষত্রভরা আকাশ—আমার জীবনের স্মৃতিপটে তেমনই এক অমলিন অধ্যায় হয়ে আছে।
স্টকহোম: জ্ঞান, ইতিহাস ও সৌন্দর্যের শহর
পরদিন সকালে আমরা পৌঁছালাম স্টকহোমে। শহরটিকে দেখে প্রথম যে অনুভূতি হয়েছিল, তা হলো—এটি যেন জল ও স্থাপত্যের এক অপূর্ব কবিতা। অসংখ্য দ্বীপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই শহর মানুষের সৃষ্টিশীলতার এক অনন্য উদাহরণ। আমরা পুরোনো শহর গামলা স্ট্যানে থাকলাম। পাথরের রাস্তা, পুরোনো ভবন, ইতিহাসের গন্ধ—সব মিলিয়ে জায়গাটি ছিল যেন অতীতের দরজা খুলে দেওয়া একটি অধ্যায়।
স্টকহোম ভ্রমণের দিনগুলোর মধ্যে স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনের স্মৃতিও আজও আমার মনে বিশেষ জায়গা করে আছে। পৃথিবীর বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ছাত্রজীবনেই শুনেছি, কিন্তু কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে পা রাখলে একধরনের অদ্ভুত অনুভূতি হয়—মনে হয়, জ্ঞানচর্চার যে দীর্ঘ ঐতিহ্যের কথা বইয়ের পাতায় পড়েছি, তারই এক জীবন্ত পরিসরের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছি। স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়—এটি সুইডেনের আধুনিক জ্ঞানচর্চা, প্রকৃতিবিজ্ঞান, পরিবেশ গবেষণা এবং আন্তর্জাতিকতার প্রতীক। ক্যাম্পাসটির চারপাশে সবুজ বনভূমি, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে মিশে থাকা এর অবস্থান আমার কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল। একজন জীববিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে এই বিষয়টি আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল—এখানে মনে হয়েছিল, প্রকৃতি ও জ্ঞানচর্চা যেন পাশাপাশি পথ চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি অনুভব করেছিলাম, তা হলো একধরনের শান্ত একাগ্রতা। কোথাও অযথা আড়ম্বর নেই, বরং আছে অনুসন্ধানের স্বাধীনতা এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টির এক নিবিড় প্রচেষ্টা। এটি মানুষের কৌতূহল, স্বপ্ন ও সৃষ্টিশীলতার এক জীবন্ত প্রবাহ। চারজন রসায়নবিদ এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
স্টকহোমে থাকার সময় আরেকটি বিষয় আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল—সেখানকার পাতালরেলব্যবস্থা। সাধারণত আমরা পাতালরেলকে কেবল দ্রুত ও সুবিধাজনক যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবেই ভাবি। কিন্তু স্টকহোমে এসে দেখলাম, একটি রেলস্টেশনও মানুষের নান্দনিক বোধ, সৃজনশীলতা ও শিল্পচেতনার প্রকাশ ঘটাতে পারে, যার অনেকটা দেখেছি সেন্ট পিটার্সবার্গ ও মস্কোর পাতালরেলস্টেশনগুলোয়। মাটির গভীরে নেমে যখন প্রথম স্টেশনগুলো দেখলাম, তখন মনে হয়েছিল—আমি কোনো রেলস্টেশনে নয়, বরং এক বিশাল ভূগর্ভস্থ শিল্পপ্রদর্শনীতে প্রবেশ করেছি। এ যেন এক অনন্য ভূগর্ভস্থ শিল্প গ্যালারি। পাথুরে গুহার মতো স্টেশনগুলোর দেয়াল ও ছাদে আঁকা ম্যুরাল, ভাস্কর্য, রঙের ব্যবহার এবং বিভিন্ন শিল্পকর্ম প্রতিটি স্থানকে আলাদা এক পরিচয় দিয়েছে। কোথাও প্রাচীন ইতিহাসের ছাপ, কোথাও প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতীক, কোথাও আধুনিক মানুষের জীবন ও স্বপ্নের প্রতিফলন।
‘ভাসা’ মিউজিয়াম: সমুদ্রের অতল থেকে ফিরে আসা ইতিহাসের এক বিস্ময়
স্টকহোমে ঘুরে দেখা স্থানগুলোর মধ্যে ‘ভাসা মিউজিয়াম’ আমার মনে সবচেয়ে গভীর ছাপ ফেলেছিল। পৃথিবীর অনেক জাদুঘরেই আমরা প্রাচীন নিদর্শন দেখি, কিন্তু ভাসা মিউজিয়ামের অভিজ্ঞতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন—এখানে শুধু কোনো পুরোনো বস্তু প্রদর্শিত হয়নি, বরং একটি সমগ্র যুগ, একটি রাজকীয় স্বপ্ন এবং ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায় যেন আমাদের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল।
জাদুঘরের বিশাল অন্ধকারাচ্ছন্ন হলঘরে প্রবেশ করতেই চোখ আটকে গেল সেই বিশাল কাঠের জাহাজটির দিকে—‘ভাসা (Vasa)’। মনে হলো, কয়েক শতাব্দীর দীর্ঘ নিদ্রা শেষে একটি হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস আবার আমাদের সামনে ফিরে এসেছে। বিশালাকায় সেই জাহাজটি দাঁড়িয়ে আছে নীরব অথচ গর্বিত ভঙ্গিতে, যেন সে নিজেই তার অতীতের গল্প বলতে চায়। ভাসা ছিল সুইডেনের রাজা দ্বিতীয় গুস্তাভ অ্যাডলফের আমলে নির্মিত এক রাজকীয় যুদ্ধজাহাজ। সপ্তদশ শতাব্দীতে সুইডেন যখন ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছিল, তখন এই জাহাজ নির্মাণ ছিল তাদের সামুদ্রিক ক্ষমতা ও রাজকীয় মর্যাদার প্রতীক। অসংখ্য দক্ষ কারিগরের শ্রম, উৎকৃষ্ট কাঠের ব্যবহার এবং অসাধারণ অলংকরণে নির্মিত হয়েছিল এই জাহাজ।
কিন্তু ইতিহাস কখনো কখনো মানুষের পরিকল্পনাকে অদ্ভুতভাবে পরীক্ষা নেয়। ১৬২৮ সালের ১০ আগস্ট, স্টকহোম বন্দর থেকে প্রথম যাত্রা শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে প্রবল বাতাসে ভারসাম্য হারিয়ে ‘ভাসা’ ডুবে যায়। যে জাহাজকে ঘিরে ছিল এত গর্ব ও প্রত্যাশা, তার প্রথম যাত্রাই পরিণত হয়েছিল এক করুণ ব্যর্থতায়। সমুদ্রের গভীরে হারিয়ে গেল রাজকীয় সেই স্বপ্ন।
কিন্তু গল্প সেখানেই শেষ হয়নি। প্রায় ৩৩৩ বছর পর, ১৯৬১ সালে, সমুদ্রের তলদেশ থেকে ভাসাকে পুনরুদ্ধার করা হয়। ঠান্ডা ও অপেক্ষাকৃত কম লবণাক্ত বাল্টিক সাগরের পানির কারণে আশ্চর্যজনকভাবে জাহাজটির কাঠের কাঠামো অনেকাংশেই সংরক্ষিত ছিল। আধুনিক বিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ প্রচেষ্টার মাধ্যমে ধ্বংসপ্রায় সেই জাহাজকে আবার মানুষের সামনে ফিরিয়ে আনা হয়। জাহাজটির সামনে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছিল—এ শুধু একটি নৌযান নয়, এটি সময়ের সঙ্গে মানুষের এক সংলাপ। একটি জাহাজ, যা একদিন ব্যর্থতার প্রতীক ছিল, শতাব্দী পরে হয়ে উঠেছে জ্ঞান, গবেষণা ও মানবিক অধ্যবসায়ের এক অসাধারণ উদাহরণ।
ভাসার কাঠের গায়ে আজও খোদাই করা অলংকরণ, ভাস্কর্য ও নকশা দেখা যায়। প্রতিটি অংশ যেন সপ্তদশ শতকের শিল্প, প্রযুক্তি ও রাজকীয় সংস্কৃতির সাক্ষ্য বহন করছে। সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল, ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশাহের কাহিনি নয়, ইতিহাস আসলে মানুষের সৃষ্টিশীলতা, ভুল, সংগ্রাম এবং পুনরুত্থানের গল্প। আজ বহু বছর পরও ‘ভাসা’ মিউজিয়ামের সেই প্রথম দর্শনের কথা মনে পড়ে। অন্ধকার হলঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল কাঠের জাহাজটি যেন আমাকে নীরবে বলেছিল—মানুষের সৃষ্টি ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু জ্ঞান, অনুসন্ধান ও স্মৃতির শক্তি তাকে শতাব্দীর পর শতাব্দী অমর করে রাখতে পারে। স্টকহোমের সেই ভ্রমণে অনেক কিছু দেখেছিলাম, কিন্তু ভাসা মিউজিয়াম ছিল এমন একটি অভিজ্ঞতা, যা শুধু চোখে দেখা নয়—মনের গভীরে অনুভব করা।
স্টকহোমের আরেকটি পরিচয় ছিল সুরের শহর হিসেবে। ইতিহাস, স্থাপত্য ও বিজ্ঞানের পাশাপাশি এই শহর বিশ্বসংগীতের মানচিত্রেও এক উজ্জ্বল নাম—কারণ এখানেই জন্ম নিয়েছিল জগদ্বিখ্যাত সংগীত দল ‘অ্যাবা (ABBA)’। আশির দশকের শুরুতে যখন আমি স্টকহোমে পা রেখেছিলাম, তখন পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রান্তেই তাদের সুরের মায়া ছড়িয়ে পড়েছিল। রেডিওর তরঙ্গে, ক্যাসেট প্লেয়ারের ফিতায়, তরুণ-তরুণীদের হৃদয়ে—‘অ্যাবা’-এর গান যেন এক নতুন যুগের আনন্দ, প্রেম ও স্বপ্নের ভাষা হয়ে উঠেছিল।
স্টকহোমের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমার মনে হতো, এই শহরের বাতাসে যেন কোথাও অদৃশ্যভাবে ভেসে বেড়াচ্ছে সুরের স্মৃতি। যে শহরের আকাশের নিচে জন্ম নিয়েছে ‘ড্যান্সিং কুইন’, বা ‘মামা মিয়া’-এর মতো গান, সেই শহরের সঙ্গে সংগীতপ্রেমীদের এক বিশেষ আবেগের সম্পর্ক তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। ‘অ্যাবা’-এর সুরে ছিল এক আশ্চর্য মিশ্রণ—আনন্দের উচ্ছ্বাস, ভালোবাসার কোমলতা, আবার কখনো বিচ্ছেদের বিষণ্নতা। তাদের গান শুধু শোনা হতো না, অনুভব করা হতো। পৃথিবীর নানা দেশের মানুষ ভাষা না বুঝেও সেই সুরের আবেগ বুঝতে পারত। সংগীতের এ এক অপূর্ব ক্ষমতা—যেখানে ভাষার দেয়াল ভেঙে মানুষকে মানুষের কাছে নিয়ে আসে।
আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে মনে হয়, স্টকহোম আমার কাছে শুধু একটি শহর নয়—এটি ছিল ইতিহাস, বিজ্ঞান ও সংগীতের এক মিলনভূমি। নোবেলের শহর, লিনিয়াসের দেশের রাজধানী, আর ‘অ্যাবা’-এর সুরের জন্মভূমি—এই সব পরিচয় মিলিয়ে স্টকহোম আমার স্মৃতিতে এক বহুমাত্রিক নগরী হয়ে আছে। কখনো কখনো কোনো শহরকে মনে রাখার জন্য তার স্থাপত্য বা রাস্তার ছবি যথেষ্ট নয়, মনে থাকে তার শব্দ, তার সুর, তার আবহ। স্টকহোমের ক্ষেত্রে আমার স্মৃতিতে আজও ভেসে আসে বাল্টিকের বাতাসের সঙ্গে মিশে থাকা সেই অদৃশ্য সংগীত—যেন দূর অতীত থেকে ভেসে আসা এক মধুর সুর, যা সময়ের ব্যবধান পেরিয়েও হৃদয়ে অনুরণিত হয়।
উপসালা: বিজ্ঞানের তীর্থভূমি
স্টকহোম থেকে উপসালার পথে ট্রেনে যাত্রা শুরু করার সময় আমার মনে একধরনের বিশেষ উত্তেজনা কাজ করছিল। এটি কেবল একটি নতুন শহর দেখার আগ্রহ ছিল না, বরং সুইডেনের এমন একটি প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিল, যার নাম আমার জীবনের অনেক আগের এক অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিদ্যার ছাত্র থাকাকালে ট্যাক্সোনমি পড়ার সময় প্রথম উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম শুনেছিলাম। জীবজগতের শ্রেণিবিন্যাস, উদ্ভিদ ও প্রাণীর বৈজ্ঞানিক নামকরণ এবং ক্যারোলাস লিনিয়াসের অবদানের প্রসঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বারবার সামনে আসত। পরবর্তীকালে জানতে পেরেছিলাম, আমাদের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক প্রয়াত অধ্যাপক মুন্সী আব্দুল কাইয়ুম এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান থেকেই ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তাই উপসালায় পা রাখার অনুভূতি ছিল আমার কাছে অন্য অনেক দর্শনীয় স্থানের চেয়ে আলাদা—এ যেন নিজের একাডেমিক শিকড়ের সঙ্গে দূরদেশে এসে এক অদৃশ্য সংযোগ স্থাপন করা।
বিশেষ করে ক্যারোলাস লিনিয়াসের স্মৃতি উপসালার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অষ্টাদশ শতাব্দীর এই মহান প্রকৃতিবিদ জীবজগতের শ্রেণিবিন্যাস এবং দ্বিপদী নামকরণ পদ্ধতির (Genus ও Species) মাধ্যমে জীববিজ্ঞানের ভাষাকে একটি সুসংবদ্ধ রূপ দিয়েছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি আজও জীববিজ্ঞানের ভিত্তির অন্যতম স্তম্ভ। উপসালার ‘লিনিয়াস গার্ডেন’ এবং তাঁর স্মৃতিবাহী বাড়ি পরিদর্শন করতে গিয়ে মনে হয়েছিল, আমি যেন শুধু একটি বাগানে নয়, বিজ্ঞানের ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়ে প্রবেশ করেছি। বাগানের প্রতিটি গাছ, প্রতিটি পথ যেন লিনিয়াসের সেই অপরিসীম কৌতূহলের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল—যে কৌতূহল একজন মানুষকে সমগ্র জীবজগৎকে বোঝার এক মহৎ প্রচেষ্টায় নিয়োজিত করেছিল। একজন জীববিজ্ঞানী হিসেবে সেই অনুভূতি ছিল গভীরভাবে স্পর্শকাতর। উপসালা শুধু জীববিজ্ঞানের জন্যই বিখ্যাত নয়। এখানেই সুইডিশ জ্যোতির্বিদ অ্যান্ডার্স সেলসিয়াস তাপমাত্রা পরিমাপের বিখ্যাত সেলসিয়াস স্কেল উদ্ভাবন করেছিলেন। অর্থাৎ এই শহরের বাতাসে যেন বিজ্ঞানের বহু শাখার স্মৃতি মিশে আছে। উপসালার শান্ত রাস্তা, ফাইরিস নদীর তীর, ঐতিহাসিক ক্যাথেড্রাল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন প্রাঙ্গণে হাঁটতে হাঁটতে আমার মনে হয়েছিল—বিশ্ববিদ্যালয় আসলে শুধু শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষাগারের সমষ্টি নয়, এটি মানবসভ্যতার স্মৃতি, স্বপ্ন ও অনুসন্ধানের এক ধারাবাহিক প্রবাহ।
আজ যখন বয়সের দূরত্ব থেকে সেই দিনগুলোর দিকে তাকাই, তখন মনে হয়—সেই তরুণ গবেষকটি আসলে শুধু ফিনল্যান্ড ও সুইডেন ভ্রমণ করেনি, সে পৃথিবীকে একটু বেশি চিনেছিল, নিজেকেও একটু বেশি আবিষ্কার করেছিল। বাল্টিকের নীল জলরেখা তাই আমার কাছে শুধু একটি সমুদ্র নয়—এটি আমার যৌবনের স্বপ্ন, জ্ঞানসন্ধানের পথ এবং হারিয়ে যাওয়া এক সুন্দর সময়ের প্রতীক।
* লেখক: অধ্যাপক রাশিদুল হক: সাবেক সহ–উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী এবং সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র, ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]