বাংলাদেশে নারীদের তাহলে ভবিষ্যৎ কী

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। ৫৪ বছর বয়সী বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশি সময়, অর্থাৎ প্রায় ৩০ বছরের বেশি, এ দেশে একজন নারী দেশ পরিচালনা করেছেন। আমাদের আশপাশের অনেক দেশেই নারীরা সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন বা করছেন। এমনকি বাংলাদেশের পরে গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর নেপালে দায়িত্ব নেওয়া একজন নারী সে দেশের আইনশৃঙ্খলাকে শক্তভাবে সামলেছেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে প্রথম নারী শহীদ প্রীতিলতা ওয়েদ্দেদারের কথা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধে অসাধারণ কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ডা. সেতারা বেগম ও তারামন বিবি ‘বীর প্রতীক’ উপাধি পেয়েছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময়ে এ দেশের সপক্ষে জনসমর্থন আদায়ে পশ্চিমা শক্তির রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে যিনি সারা বিশ্ব চষে বেড়িয়েছেন, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী, তিনিও একজন নারী। বর্তমানে ভারতের রাষ্ট্রপতিও একজন নারী।

প্রায় ৭০ বছর রানি থাকা যুক্তরাজ্যের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সন্তানসংখ্যা চার; ভারতের ইন্দিরা গান্ধীর সন্তানসংখ্যা দুই; পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর সন্তানসংখ্যা তিন, বাংলাদেশের সাবেক দুই নারী প্রধানমন্ত্রীও একাধিক সন্তানের জননী। এর মধ্যে বেনজির ভুট্টো প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় ১৯৯০ সালে সন্তান জন্ম দিয়েছেন। ২০১৮ সালে নিউজল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্নও রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ৩৭ বছর বয়সে সন্তান জন্ম দিয়েছেন। বেনজির ভুট্টো অস্ত্রোপচারের সন্তান জন্মদানের পরের দিন থেকে অফিস করেছেন, সরকারি কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে স্বাক্ষরও করেছেন। বাংলাদেশের অসংখ্য নারী মা হওয়ার পাশাপাশি সরকারি অফিস-আদালত, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, পোশাকশিল্পে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। সুতরাং নারীদের প্রতিষ্ঠানপ্রধান, রাষ্ট্রপ্রধান বা দলীয় প্রধান হওয়ার মতো করে তৈরি করা হয়নি, শুধু সন্তান জন্মদান ও লালন-পালনের জন্য তৈরি করা হয়েছে, এ কথা অসত্য। নারীদের পিছিয়ে রাখার ও শোষণের বয়ানমাত্র।

আরও পড়ুন

যেকোনো মানুষের কর্মজীবী হওয়ার জন্য দুই ধরনের দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রয়োজন হয়। একটি কায়িক পরিশ্রম করার যোগ্যতা, যা কেবল শ্রমভিত্তিক কাজের জন্য প্রযোজ্য হয়। অন্যটি বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মদক্ষতা, যা শ্রমভিত্তিক কাজের বাইরে সব কাজে প্রয়োজন হয়। রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে দলীয় প্রধান বা প্রতিষ্ঠানপ্রধান সব কাজই বুদ্ধিবৃত্তিক গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। নারীর ক্ষমতায়ন ও নারীদের যোগ্যতাভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বলতে নারীদের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকাকেই বোঝানো হয়, যেখানে নারীর শারীরিক গঠন বা পেশিশক্তির প্রয়োজনীয়তা নেই।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

এই যে দুই ধরনের কাজ, তাতে বিগত ২০০ বছর নারীদের অংশগ্রহণের ওপর গবেষণার জন্য ২০২৩ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ ও শ্রম অর্থনীতিবিদ ক্লডিয়া গোলডিন নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর গবেষণায় নারীদের সামগ্রিকভাবে শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ ও বেতনবৈষম্যের একটি ইতিহাসভিত্তিক চিত্র উঠে এসেছে। নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ সময় ও শিল্পায়নের সঙ্গে সম্পর্ক অনেকটা ইংরেজি অক্ষর ইউয়ের (U) আকৃতির মতো। অর্থাৎ গত ২০০ বছরের শুরুর সময়কালে বা তার আগে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বেশি ছিল, মাঝখানে কমে গিয়ে নির্দিষ্ট পর্যায়ে এসে স্থির হয়, এরপর আবার বাড়তে থাকে। গোলডিন তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, শুরুতে কৃষিভিত্তিক শ্রমব্যবস্থায় পরিবারের সবাই মিলে খাদ্য উৎপাদনের যে সমাজব্যবস্থা ছিল, তাতে নারীদের সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ ছিল। কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা ছেড়ে বিশ্ব যখন শিল্পভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় রূপান্তরিত হতে শুরু করল, তখন ভারী যন্ত্রভিত্তিক শিল্পকারখানা, কয়লাশিল্প, সড়ক নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজে শারীরিক শক্তির প্রয়োজনীয়তা ছিল, যা নারীদের কর্মসংস্থান থেকে ছিটকে ফেলে। সে সময়ের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও এ ক্ষেত্রে অনেক প্রভাব ফেলে। পরবর্তী সময় সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের উন্নতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ফলে নারীদের ঘরের বাইরে কাজে অংশগ্রহণের হার বেড়ে একটা ইউ (U) আকৃতি ধারণ করে। আধুনিক যুগে নারী শিক্ষার প্রসার, অধিকার আন্দোলন ও সামাজিক সচেতনতা, বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের প্রসার শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ পুরুষের সমান বা ক্ষেত্রবিশেষ অধিক।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশের মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় সাফল্যের হার, জিপিএ-৫ পাওয়ার হার, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হওয়াতে সাম্প্রতিক দশকে নারীদের সাফল্য পুরুষের তুলনায় বেশি। ২০২০ সালে সারা বিশ্ব যখন করোনা মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে দিশাহারা হয়েছিল, তখন বাংলাদেশে করোনা মহামারি মোকাবিলায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। বাংলাদেশের নারী ফুটবল টিম দক্ষিণ এশীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে দুবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার খ্যাতি অর্জন করেছে। নারী ক্রিকেট টিম আইসিসি নারী টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে টানা সাত ম্যাচ জিতে আসন্ন বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। গত মাসেই সাফ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে মালদ্বীপকে ১৪-২ গোলে উড়িয়ে দিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে বাংলাদেশ নারী টিম। নারীদের এত সাফল্য থাকলেও বৈশ্বিক আসরে পুরুষ টিমের জন্য বিনিয়োগ বেশি হলেও উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য নেই। শারীরিক দিক থেকে খুবই কষ্টসাধ্য কাজ হলেও পুরুষের পাশাপাশি এ দেশের দুজন নারী, নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়া নাজনীন, পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্ট জয় করেছেন। বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যে চারজন এমপি নির্বাচিত হয়েছেন, চারজনই নারী ও যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন নারী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। এ ছাড়া অসংখ্য বাংলাদেশি নারী দেশে-বিদেশে সাফল্যের চূড়ায় উঠে দক্ষতার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালন করছেন, দেশ ও বিশ্বকে এগিয়ে নিচ্ছেন।

বাংলাদেশের নারীদের এত এত সাফল্যের পরও একবিংশ শতাব্দীতে এসে, যখন বাংলাদেশ একটি পরিবর্তনের সুযোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখনই নারীর স্বাধীনতা, কাজের অধিকার না পাওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অথচ ২০২৪-এর আন্দোলনে সামনে থেকে ঢাল হিসেবে বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে সুরক্ষাবলয় তৈরি করে আন্দোলনকে পরিণতির দিকে নিয়ে গেছেন নারীরা। কিন্তু অধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের পিছিয়ে রাখা হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা সীমিত, এমনকি কোনো কোনো দলে সেটা শূন্য। ৫৪ বছরের বাংলাদেশে কোনো দলই শিক্ষার্থী সংগঠনের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নারী নেতৃত্ব দেয়নি। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয়ও নারীদের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক বানানো হয়নি, একমাত্র ছাত্রী হল ছাড়া। নারীদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেওয়া, করপোরেট নারীদের নিয়ে কটূক্তি, একই মঞ্চে নারীদের সঙ্গে বসে আলোচনায় অংশগ্রহণে অনীহা প্রকাশ, ভ্রাম্যমাণ আলট্রাসাউন্ড ও পিংক কালার টয়লেটের ব্যবস্থা করা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসুর নারীদের নিয়ে কটূক্তি করা, ঘরে থাকলে ভাতার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব, নারীদের দলীয় প্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে জন্মগতভাবেই অযোগ্য বিবেচনা করা আমাদের নতুন করে ভাবাচ্ছে, এ দেশে নারীদের আসলে ভবিষ্যৎ কী? আমরা কি এমন কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে যাচ্ছি, যেখানে আফগানিস্তানের মতো নারীশিক্ষায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া ও রাষ্ট্রকর্তৃক নারীদের বিয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়াটাকে সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে? সময়ই বলে দেবে।

লেখক: দেবারতি পান্থি, স্নাতোকত্তর শিক্ষার্থী, মিজৌরি বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র