সুখী, আরো সুখী এবং সবচেয়ে সুখী

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

কিছুদিন আগে ‘প্রকৃত সুখ ও সুখী মানুষ’ নিয়ে একটি কলাম লিখেছিলাম। আমি বুঝতে পেরেছি, পাঠকদের বেশ পছন্দ হয়েছে। তাই এবার দ্বিতীয় পর্ব, সুখেরও যে প্রকারভেদ আছে, তা নিয়ে।

চুরি করে চোর অবশ্যই সুখী বোধ করে। সেটা ক্ষণস্থায়ী সুখ। তেমনি যারা সঠিক পথ অনুসরণ না করে, অর্থাৎ দুর্নীতি করে অর্থ উপার্জন করে, তাদেরকে সর্বদা সুখী বলে মনে করা হয়। সেই সুখও আসল সুখ নয়।

যুক্তরাষ্ট্রে নব্বইয়ের দশকে একজন সিরিয়াল কিলার একেকজন টার্গেটকে হত্যা করার পরে খুশি হতো। এই ‘হ্যাপি ফেস’ কিলারের নাম ছিল কিথ হান্টার জেসপারসন এবং সে আটজন নারীকে হত্যা করার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পরে। সেই থেকে জেল খাটছে।

গণহত্যাকারীদের বেলায় কী হয়? ১৯৭১ পাকিস্তান আর্মি এবং দেশের রাজাকাররা নৃশংসভাবে বাঙালিদের হত্যা করে উল্লাস করেছে। এদের পরিণতিও আমরা দেখেছি।

একজন মনোরোগবিশেষজ্ঞের মতে, তাদের লক্ষ্যবস্তুতে গুলি করার উত্তেজনা থাকে, তাই তারা গুলি চালানোর সময় এবং পরে অবশ্যই খুশি থাকে।

কিন্তু তারা কি সত্যিই খুশি বা সুখী, নাকি কেবল আপাতদৃষ্টে সুখী? বিশ্বের একমাত্র সুখীবিশেষজ্ঞ, ম্যাথিউ রিকার্ডের মতে, সুখ সর্বজনীন সমবেদনা-মায়ার ওপর নির্ভর করে।

আমি যেমন বুঝতে পারি, ওপরে উল্লিখিত উদাহরণগুলোর কোনটাতেই সর্বজনীন সমবেদনা-মায়া জড়িত ছিল না।

অনেক আগে আমি ‘দ্য ডিসপ্যাচ’–এ একটি কলাম লিখেছিলাম, যার শিরোনাম ছিল, ‘আপনার শক্তি সম্পর্কে জানুন এবং সে অনুসারে সুখী থাকুন।’ একজন শিক্ষক হিসেবে এবং আমি যা কিছু করছি, আমি আমার সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকার চেষ্টা করি এবং আমি সর্বদা খুশি থাকার চেষ্টা করি। আমার মনে প্রায় কোনো রাগ নেই, হয়তো দুঃখও নেই। তবে সহমর্মিতা আর সে কারণে প্রচণ্ড দুঃখ বোধ কাজ করে।

পৃথিবীর সবারই সুখী থাকার অধিকার আছে, দেশ, সম্প্রদায় বা পরিবেশ যা–ই হোক না কেন। ২০১৬ সাল থেকে ফিনল্যান্ড সবচেয়ে সুখী দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের স্থান হয়তো অনেক নিচে নেমে গেছে। দু-তিন বছর আগে ১৫তম স্থানে ছিল এবং শীর্ষ রাজ্য হিসেবে হাওয়াই এবং এর পরে ইউটা।

কেন এবং কীভাবে ফিনল্যান্ড বছরের পর বছর বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশ হয়ে উঠছে? এর উত্তর দেওয়া হলো নিম্নলিখিত ফিনিশ প্রবাদ দিয়ে: Onnellisuus on se paikka puuttuvaisuuden ja yltäkylläisyyden välill, অর্থাৎ সুখ হলো অভাব ও প্রাচুর্যের মাঝামাঝি স্থান।

এ ছাড়া অন্তর্ভুক্ত রয়েছে কম অপরাধের হার, দুর্নীতির নিম্ন স্তর, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ, প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া এবং ৩৭ ঘণ্টা পূর্ণকালীন কর্মসপ্তাহ, যাতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আরও বেশি সময় কাটানো যায়।

মজার ব্যাপার হলো, হার্ভার্ডের ‘সুখের ল্যাবে’ কাজ করা আলেক্সা ভন টোবেলের মতে, সুখকে চালিত করে, এমন প্রথম জিনিস অর্থ নয়, এটা হলো সম্প্রদায় ও সংযোগ তৈরি করা।

যা–ই হোক, বিশ্বের সবচেয়ে সুখী ব্যক্তি কে? কেউ কি আছেন?

আরও পড়ুন

দু–এক বছর আগে নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক, ডেভিড মার্চেস ‘বিশ্বের সবচেয়ে সুখী মানুষ’ সম্পর্কে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। এই ব্যক্তি আর কেউ নন, ম্যাথিউ রিকার্ড, প্রায় ৮০ বছর বয়সী এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, একজন সৃজনশীল লেখক, দালাই লামার শিষ্য, মূলত ফ্রান্সের বাসিন্দা কিন্তু নেপালে বসবাস করেন। তিনি উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেলুলার জেনেটিকসে পিএইচডি করেছেন। তিনি বিশ্বজুড়ে মানবিক কাজের জন্য ফরাসি জাতীয় মেরিট অর্ডার পেয়েছেন।

মজার ব্যাপার হলো, উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ বছর ধরে তাঁর মস্তিষ্ক পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং দেখা গেছে যে গামা তরঙ্গ তৈরি করে, যার অর্থ উচ্চতর চেতনাসম্পন্ন একজন সুখী ব্যক্তি। এভাবেই ডক্টর রিকার্ড মিডিয়ার কাছে বিশ্বের সবচেয়ে সুখী মানুষ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

জীবনে সুখী হওয়ার জন্য তিনি মাত্র দুটি শব্দের ওপর জোর দিয়েছিলেন—মেডিটেশন (ধ্যান) এবং সমবেদনা বা মায়া। তিনি একটানা ১৫টি বছর প্রতিদিন দুই বেলা মেডিটেশন করেছেন। মার্চেসের লেখায় তিনি ডক্টর রিকার্ডকে জিজ্ঞাসা করেছেন যে তিনি কোন ব্যক্তির সঙ্গে ২৪ ঘণ্টা একা কাটাতে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করবেন। মার্চেস লিখেছেন:

‘দূর পরবাস’-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

‘সাদ্দাম হোসেন। হয়তো, হয়তো, তার মধ্যে কিছু ছোটখাটো পরিবর্তন করা সম্ভব হতে পারে।’

-আমি মাঝেমধ্যে কল্পনা করি ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প হাসপাতালে যাচ্ছেন, মানুষের যত্ন নিচ্ছেন, অভিবাসীদের তাঁর বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন।’

রিকার্ড আরও বলেন, ‘আপনি চাইতে পারেন যে এসব মানুষের মন থেকে নিষ্ঠুরতা, উদাসীনতা, লোভ দূর হয়ে যাক। এটাই সমবেদনা-মায়া, এটাই নিরপেক্ষ থাকা।’ আর ম্যাথিও রিকার্ডের আধ্যাতিক গুরু, দালাই লামা বলেছেন, ‘সুখ তৈরির মতো কিছু নয়। এটা আপনার নিজের কর্ম থেকে আসে।’

ডক্টর ম্যাথিউ রিকার্ডের ওপর বেশ কিছু তথ্যচিত্র রয়েছে, তবে ‘from stress to happiness’ মন ছুঁয়ে যাওয়া একটি ভিডিও। তিনি এক ডজনের বেশি বই লিখেছেন এবং বিশেষ উল্লেখযোগ্য তাঁর স্মৃতিকথা, ‘Notebooks of a Wandering Monk’।

আরও পড়ুন

বিশ্বের সবচেয়ে সুখী মানুষের মা শতবর্ষী ছিলেন। ম্যাথিউ তাঁর শেষ চারটা বছর মায়ের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। আর সে জন্য নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেন। তিনি পুরাপুরি ভেজিটেরিয়ান। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, মাংস ও মাছ না খাওয়ার প্রধান কারণ হলো অন্যদের জীবন বাঁচানো। এটি কোনো চরম দৃষ্টিভঙ্গি নয়। এটি একটি অত্যন্ত যুক্তিসংগত ও সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি।

পরিশেষে আমি একটি চায়নিজ প্রবাদ তুলে ধরছি, ‘আপনি যদি এক ঘণ্টা সুখ চান, তবে একটি ঝাঁকুনি নিন। আপনি যদি এক দিনের জন্য সুখ চান, মাছ ধরতে যান। আপনি যদি এক বছরের জন্য সুখ চান, একটি ভাগ্যের উত্তরাধিকারী হন। যদি আপনি আজীবন সুখ চান, তবে অন্য কারও সাহায্য করুন।’