নতুন বছরে কি শুধু ক্যালেন্ডার বদলাবে, না নিজেদের বদলানোর সাহস দেখাবে বাংলাদেশ

ছবি: এআই/প্রথম আলো

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নতুন বছর আসে বারবার। ক্যালেন্ডার বদলায়, তারিখ বদলায়, শুভেচ্ছার ভাষা বদলায়। কিন্তু মানুষের জীবনে কি সত্যিই নতুন কিছু শুরু হয়? প্রতিদিন যখন খবরের কাগজ খুললে দুর্নীতি, লুটপাট, হত্যা, দখলদারি আর বিচারহীনতার গল্প চোখে পড়ে, তখন নতুন বছর যেন আর আশার প্রতিশ্রুতি নয়, বরং পুরোনো ক্ষতের পুনরাবৃত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

তবু নতুন বছরের অর্থ এখানেই শেষ হওয়া উচিত নয়। নতুন বছর কেবল উৎসব নয়, এটি একটি জাতির আত্মসমালোচনার সময়। একটি প্রশ্ন করার সময়। আমরা কোন পথে যাচ্ছি, আর কেন যাচ্ছি।

বাংলাদেশের সবচেয়ে গভীর সংকট অর্থনৈতিক নয়, এটি নৈতিক। রাষ্ট্রের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে একটি ভয়ংকর সংস্কৃতি জমে উঠেছে যেখানে ক্ষমতা মানেই সুবিধা, দায়িত্ব নয়। যেখানে নিরাপত্তার নামে সহিংসতা স্বাভাবিক, উন্নয়নের নামে লুটপাট গ্রহণযোগ্য, আর রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে অপরাধ ক্ষমাযোগ্য হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতায় মানুষ ধীরে ধীরে মানুষ হয়ে থাকা ভুলে যাচ্ছে।

প্রতিদিন মানুষ লড়ছে। কেউ লড়ছে জীবিকার জন্য, কেউ লড়ছে ন্যায়বিচারের আশায়, কেউ লড়ছে শুধু টিকে থাকার জন্য। কিন্তু এই লড়াইগুলো বিচ্ছিন্ন। রাষ্ট্র যেন মানুষের পাশে নয়, মানুষ যেন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একা দাঁড়িয়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন বছরের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কোনো নতুন স্লোগান নয়, বরং একটি নতুন নৈতিক চুক্তি।

নতুন বছরের প্রথম অঙ্গীকার হওয়া উচিত সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ বন্ধ করা। হত্যা, গুম, দমন আর ভয়কে আর রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ না করা। নিরাপত্তা যদি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে, তবে সেই নিরাপত্তা কিসের। যে সমাজ মানুষকে দেয়ালের ভেতরে বন্দি করে শান্তি খোঁজে, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত শান্তি নয়, নিঃসঙ্গতা উৎপাদন করে।

অঙ্গীকার হওয়া উচিত মানুষকে আবার মানুষের মধ্যে ফিরিয়ে আনা। আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে মানুষ মানুষকে ভয় পায়। মতভিন্নতা মানেই শত্রুতা, প্রশ্ন মানেই ষড়যন্ত্র। এই মানসিক খাঁচা ভাঙা ছাড়া কোনো অগ্রগতি সম্ভব নয়। গণতন্ত্র শুধু ভোটের নাম নয়, এটি ভিন্ন কণ্ঠকে সহ্য করার সংস্কৃতি।

দ্বিতীয় অঙ্গীকার হওয়া উচিত দুর্নীতিকে আর চালাকির সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলা। বাংলাদেশে দুর্নীতি কেবল অর্থ চুরি নয়, এটি ভবিষ্যৎ চুরির নাম। এটি শিশুদের স্বপ্ন চুরি, তরুণদের সম্ভাবনা চুরি, সাধারণ মানুষের মর্যাদা চুরি। নতুন বছর মানে যদি পুরোনো চোরাই ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা হয়, তবে সেই নতুনত্ব অর্থহীন।

তৃতীয় অঙ্গীকার হওয়া উচিত মানুষকে আবার মানুষের মধ্যে ফিরিয়ে আনা। আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে মানুষ মানুষকে ভয় পায়। মতভিন্নতা মানেই শত্রুতা, প্রশ্ন মানেই ষড়যন্ত্র। এই মানসিক খাঁচা ভাঙা ছাড়া কোনো অগ্রগতি সম্ভব নয়। গণতন্ত্র শুধু ভোটের নাম নয়, এটি ভিন্ন কণ্ঠকে সহ্য করার সংস্কৃতি।

নতুন বছর আমাদের শেখাতে পারে যে রাষ্ট্র কোনো দূরের শক্ত কাঠামো নয়। রাষ্ট্র মানুষের সমষ্টিগত চেতনা। যখন মানুষ নীরব হয়ে যায়, তখন রাষ্ট্র অসুস্থ হয়। আর যখন মানুষ কথা বলে, প্রশ্ন করে, দায়িত্ব দাবি করে, তখনই রাষ্ট্র সুস্থ হওয়ার সুযোগ পায়।

বাংলাদেশের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মানুষ চাইলে পরিবর্তন অসম্ভব নয়। কিন্তু সেই পরিবর্তন আসবে না কেবল অপেক্ষা করলে। নতুন বছর তাই অপেক্ষার সময় নয়, এটি সিদ্ধান্তের সময়। আমরা কি আগের মতোই সব মেনে নেব, নাকি বলব যে এই পথ আর গ্রহণযোগ্য নয়।

আরও পড়ুন

নতুন বছরের সূচনা হোক এই অঙ্গীকার দিয়ে যে আমরা আর ভয় দিয়ে রাষ্ট্র চালাতে দেব না, লুটপাটকে উন্নয়ন বলে মেনে নেব না, আর মানুষকে অমানুষ করে রাখার কোনো ব্যবস্থার সঙ্গে আপস করব না।

নতুন বছর হোক কেবল ক্যালেন্ডারের নয়, বিবেকের নবায়ন। বাংলাদেশ তার চেয়ে কম কিছুর যোগ্য নয়।

বাংলাদেশের সবচেয়ে গভীর সংকট অর্থনৈতিক নয়, এটি নৈতিক। রাষ্ট্রের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে একটি ভয়ংকর সংস্কৃতি জমে উঠেছে, যেখানে ক্ষমতা মানেই সুবিধা, দায়িত্ব নয়। যেখানে নিরাপত্তার নামে সহিংসতা স্বাভাবিক, উন্নয়নের নামে লুটপাট গ্রহণযোগ্য, আর রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে অপরাধ ক্ষমাযোগ্য হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতায় মানুষ ধীরে ধীরে মানুষ হয়ে থাকা ভুলে যাচ্ছে।

কিন্তু এই নবায়ন কেবল রাষ্ট্রের কাছে দাবি নয়, এটি সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছেও আহ্বান। ইতিহাস বলে দেয়, কোনো রাষ্ট্র একদিনে নৈতিকভাবে ভেঙে পড়ে না, আবার একদিনে গড়েও ওঠে না। ভাঙন আসে নীরবতা থেকে, আর পুনর্গঠন আসে অংশগ্রহণ থেকে। আজ বাংলাদেশের সামনে যে প্রশ্নটি দাঁড়িয়ে আছে, তা শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি সভ্যতার প্রশ্ন। আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই যেখানে শক্তি সবকিছুর মানদণ্ড হবে, নাকি এমন একটি সমাজ যেখানে ন্যায্যতা ও সহমর্মিতা শক্তির ভিত্তি গড়ে দেবে।

নতুন ভোর, নতুন আশা
ছবি: যোসেফ গোমেজ

বিশ্ব আজ গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ, মেরুকরণ এবং ক্ষমতার আগ্রাসী ভাষা অনেক দেশেই মানবিক বোধকে সংকুচিত করে ফেলছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যদি নতুন বছরের শুরুতে একটি ভিন্ন পথ বেছে নেয়, তা শুধু নিজেদের জন্য নয়, বিশ্বের জন্যও একটি বার্তা হতে পারে। যে উন্নয়ন মানুষকে বাদ দিয়ে নয়, মানুষকে সঙ্গে নিয়েই সম্ভব। যে নিরাপত্তা ভয় নয়, আস্থা তৈরি করে। যে রাষ্ট্র মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে না, মানুষকে মর্যাদা দেয়।

বাংলাদেশের বর্তমান সংকট শুধু দেশীয় নয়; বিশ্বের অনেক দেশের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। উদাহরণস্বরূপ, কিছু উন্নত দেশ নিয়মতান্ত্রিক কাঠামো এবং সামাজিক নৈতিকতা বজায় রাখার জন্য শক্তিশালী নাগরিক অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছ প্রশাসন নিশ্চিত করেছে। সেসব দেশে, যদিও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ থাকে, তবু দুর্নীতি, সহিংসতা বা ক্ষমতার অপব্যবহার সামাজিকভাবে সহ্য করা হয় না। অন্যদিকে, যুদ্ধবিধ্বস্ত বা রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল অনেক দেশে রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং নিরাপত্তা মানুষের প্রতি নির্ভরশীল নয়, বরং ভয় ও নিয়ন্ত্রণের ওপর ভিত্তি করে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

এই তুলনামূলক দৃশ্য আমাদের শেখায় যে শুধু আইন বা রাষ্ট্রীয় কাঠামো নয়, মানুষের নৈতিক সচেতনতা, অংশগ্রহণ ও দায়িত্বশীলতা রাষ্ট্রকে সুস্থ রাখতে সবচেয়ে বড় উপাদান। বাংলাদেশ যদি নতুন বছরের সূচনায় এই শিক্ষা গ্রহণ করে, যেখানে রাষ্ট্র কেবল নিয়ন্ত্রণের বাহন নয়, মানুষকে মর্যাদা দেয় এমন কাঠামো হিসেবে কাজ করে, তাহলে শুধু দেশের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও এটি উদাহরণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে এখনো সুযোগ আছে। এই নতুন বছর সেই সুযোগকে কাজে লাগানোর সময়। কেবল নতুন তারিখ নয়, নতুন মানসিকতা নিয়ে সামনে এগোনোর সময়।

আরও পড়ুন