করপোরেট বল গেমের নেপথ্যে
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন দায়িত্বে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাকে করপোরেট–জগতের এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। বাহ্যিক চাকচিক্য, আকর্ষণীয় স্লোগান আর তথাকথিত মোটিভেশনাল বক্তব্যের আড়ালে যে চিত্রটি দেখা যায়, তা অনেক ক্ষেত্রেই হতাশাজনক ও উদ্বেগজনক।
করপোরেট পরিসরে প্রায়শই সুশাসন, নৈতিকতা, কর্পোরেট সংস্কৃতি, স্বচ্ছতা কিংবা উচ্চ কর্মদক্ষতাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান (HPO)—এ শব্দগুলো উচ্চকণ্ঠে উচ্চারিত হয়। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগের বেলায় এসব ধারণা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। নীতি ও চর্চার মধ্যে এই বিস্তর ফারাকই করপোরেট অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ।
তাত্ত্বিকভাবে স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হলেও বাস্তবে সেটিই অনেক সময় অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়। কর্মদক্ষতার কথা বলা হলেও পদোন্নতি ও সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণে যোগ্যতার চেয়ে তোষামোদ ও আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পায়। প্রশিক্ষণ ও পুনঃ প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়, অথচ কর্মীদের সেই প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময় বা সুযোগ দেওয়া হয় না।
আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে বড় বড় দাবি থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তা অনুপস্থিত। ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে নৈতিকতার সীমারেখা অতিক্রম করা হয়। বোর্ড অব ডিরেক্টরসকে তুষ্ট করতে নানা অনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি এর সুফল ভোগ করেন। ফলে অযোগ্যতা পুরস্কৃত হয়, আর চাটুকারিতাই হয়ে ওঠে ক্যারিয়ার গঠনের প্রধান যোগ্যতা।
বাংলাদেশের করপোরেট খাত, বিশেষত ব্যাংক ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের চর্চা থেকে সরে না এলে টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়। করপোরেট সংস্কৃতি মানে শুধু নীতিমালা নয়; এটি কর্মপরিবেশে ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার বাস্তব প্রতিফলন হওয়া উচিত।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আরও উদ্বেগজনক হলো, অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের বোর্ড অব ডিরেক্টরস প্রকাশ্য সভায়ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক কিংবা জ্যেষ্ঠ নির্বাহীদের অপমান করতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। বিশেষত যখন তাঁদের ব্যক্তিগত বা অনৈতিক প্রত্যাশা পূরণ হয় না। প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হলেও এই ক্ষমতার দম্ভ বছরের পর বছর ধরে চলতে থেকেছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ভূমিকাও অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ। প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঠিক পথে পরিচালনা ও পরামর্শ দেওয়ার বদলে ব্যক্তিস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সুশাসন, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিয়ে অসংখ্য নীতিপত্র থাকা সত্ত্বেও জেনেশুনেই সেগুলো পাশ কাটানো হয়।
এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসার সময় এখনই। করপোরেট জগতে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে সর্বস্তরে—প্রধান নির্বাহী থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মচারী পর্যন্ত। লিঙ্গ, বর্ণ, ধর্ম বা বিশ্বাসের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্যের স্থান নেই একটি আদর্শ কর্মক্ষেত্রে।
বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ জনসংখ্যাগত সুবিধা ভোগ করছে—তরুণ, কর্মক্ষম ও সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ আমাদের বড় শক্তি। নৈতিক ও স্বচ্ছ করপোরেট পরিবেশে যদি এই মানবসম্পদকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে তারা শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, পুরো জাতিকেই এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে।
লেখক: এম আহসান উল্লাহ খান, সাবেক ঊর্ধ্বতন ব্যাংকার, ইংরেজি সংবাদ উপস্থাপক বিটিভি ও বেতার, খণ্ডকালীন শিক্ষক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র