জ্ঞান, সংস্কৃতি ও নাগরিক সচেতনতায় লাইব্রেরির ভূমিকা

ছবি: ব্রিটিশ কাউন্সিল

পাবলিক লাইব্রেরি শুধু বইয়ের সংরক্ষণাগার নয়; এগুলো শেখা, সংস্কৃতি এবং নাগরিক সম্পৃক্ততার প্রাণকেন্দ্র। আমার নিজস্ব যাত্রাই এ কথার প্রমাণ। আমি ঢাকার ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরির সদস্য হয়েছি ১৯৭৯ সালে এবং ২০২৩ পর্যন্ত তা চালিয়ে গিয়েছি। এ ছাড়া ইউএসআইএস (USIS) লাইব্রেরির সদস্য ছিলাম ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত। এই লাইব্রেরিগুলো আমাকে সাহিত্য, সামাজিক বিজ্ঞান, ইংরেজি ভাষা শেখা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে বই, জার্নাল ও অডিও-ভিজ্যুয়াল উপকরণের বিশাল সংগ্রহে প্রবেশাধিকার দিয়েছে। যদিও আমি নিজে মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করিনি, ব্রিটিশ কাউন্সিল দীর্ঘদিন ধরে এই ক্ষেত্রের শিক্ষার্থীদের বই, জার্নাল ও অডিও-ভিজ্যুয়াল উপকরণের মাধ্যমে দিকনির্দেশনা ও সহায়তা প্রদান করে। বাংলাদেশে শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং বৈশ্বিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে এর অবদান অসীম।

লাইব্রেরি কেবল জ্ঞান অর্জনের স্থান নয়, এটি দায়িত্ব এবং সততার শিক্ষা দেয়। আমি এখনো স্পষ্ট মনে করি যে ধার নেওয়া একটি চুরিকৃত ভিডিওর জন্য জরিমানা দিতে হয়েছিল—একটি ছোট কিন্তু স্মরণীয় শিক্ষা, যা দায়িত্বশীলতা এবং সততার গুরুত্ব বোঝায়। এই ছোট ছোট অভিজ্ঞতা এবং বৈশ্বিক জ্ঞানের প্রবাহ আমাকে কৌতূহলী, নিয়মশীল এবং নৈতিকভাবে সুসংগঠিত হতে সহায়তা করেছে।

এই ভিত্তি আমাকে করপোরেট পেশাজীবী, লেখক, ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং সংবাদ উপস্থাপক হিসেবে গড়ে তুলেছে। এই পেশাগত যাত্রায় আমি ছাত্র ও পেশাজীবীদের ব্যক্তিগত ও বৌদ্ধিক বিকাশে অবদান রাখার সুযোগ পেয়েছি। লাইব্রেরির প্রভাব ছাড়া আমার এই যাত্রা কল্পনা করা যায় না—এগুলো কৌতূহল উসকে দেয়, শেখার আগ্রহ জাগায় এবং দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করে।

নিউইয়র্কের কুইনস পাবলিক লাইব্রেরি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। শিশু থেকে প্রবীণ নাগরিক পর্যন্ত সবাইকে এখানে কম্পিউটার ক্লাস, দাবা ও অন্যান্য খেলা, ‘নিউ আমেরিকান’ প্রোগ্রাম, কর্মশালা, গল্পকথা, শিল্প ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং নাগরিক সচেতনতা কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়।

নিউইয়র্কের কুইনস পাবলিক লাইব্রেরি (QPL) আমাকে আরও অনুপ্রাণিত করেছে। শিশু থেকে প্রবীণ নাগরিক পর্যন্ত সবাইকে এখানে কম্পিউটার ক্লাস, দাবা ও অন্যান্য খেলা, ‘নিউ আমেরিকান’ প্রোগ্রাম, কর্মশালা, গল্পকথা, শিল্প ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং নাগরিক সচেতনতা কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়। এসব কার্যক্রম সাক্ষরতা, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা, নৈতিক দায়িত্ব এবং নাগরিক সচেতনতা গড়ে তোলে। কুইনস পাবলিক লাইব্রেরি প্রদর্শন করে যে লাইব্রেরি কেবল পড়ার স্থান নয়, এটি সামাজিক উন্নয়ন, সম্প্রদায় সংহতি এবং জীবনভর শিক্ষার কেন্দ্র হতে পারে।

বাংলাদেশের লাইব্রেরিগুলোও এই মডেল অনুসরণ করতে পারে। শুধুই বই ধার দেওয়া নয়, লাইব্রেরি জীবনদক্ষতা, নৈতিক মূল্যবোধ, পরিবেশ সচেতনতা, নাগরিক দায়িত্ব এবং সৃজনশীল শিল্প নিয়ে কর্মশালা পরিচালনা করতে পারে, পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্ঞানের প্রবাহ নিশ্চিত করতে পারে। শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং ব্যবহারিক দক্ষতাকে একত্রিত করে লাইব্রেরি হতে পারে ব্যক্তিগত বিকাশ, পেশাগত উন্নয়ন এবং সামাজিক দায়িত্বের সূতিকাগার। একটি লাইব্রেরিকেন্দ্রিক সমাজ জাতি গঠনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে—নৈতিক মূল্যবোধ, শিষ্টাচার এবং দায়িত্ববোধের বিকাশে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

কুইনস পাবলিক লাইব্রেরির উদাহরণ এবং ইউএসআইএস ও ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরির ঐতিহ্য বাংলাদেশের জন্য একটি রোডম্যাপ। লাইব্রেরি সচেতন, জ্ঞানী এবং সংস্কৃতিসচেতন নাগরিক গড়ে তুলতে পারে, যারা সমাজে অর্থবহভাবে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম। আমার ব্যক্তিগত যাত্রা—ব্রিটিশ কাউন্সিল ও ইউএসআইএস লাইব্রেরি থেকে কৌতূহলী শিশু থেকে করপোরেট পেশাজীবী, লেখক, প্রশিক্ষক, শিক্ষক এবং সংবাদ উপস্থাপক হওয়া—লাইব্রেরির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব প্রমাণ করে। লাইব্রেরি কেবল পড়ার স্থান নয়, এগুলো সুযোগ, নৈতিক শিক্ষা এবং নাগরিক সম্পৃক্ততার উৎস।

আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে, যেখানে তথ্য প্রচুর কিন্তু সমালোচনামূলক চিন্তা কম, লাইব্রেরি অপরিহার্য। এটি প্রজন্মকে সংযুক্ত করে, জ্ঞানগত ফাঁক পূরণ করে এবং সচেতন নাগরিকত্বের হাতিয়ার প্রদান করে। শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং ব্যবহারিক দক্ষতার সমন্বয়ী লাইব্রেরি প্রোগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ এমন একটি সমাজ গড়তে পারে, যেখানে নাগরিকেরা জ্ঞানী, নৈতিকভাবে সুসংগঠিত এবং জাতি গঠনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণকারী।

পাবলিক লাইব্রেরি কেবল ভবন নয়—এগুলো একটি উন্নত, সচেতন এবং সংস্কৃতিসমৃদ্ধ সমাজের দ্বারপ্রান্ত। ঢাকার ব্রিটিশ কাউন্সিল ও ইউএসআইএস লাইব্রেরি থেকে শুরু করে নিউইয়র্কের কুইনস পাবলিক লাইব্রেরি পর্যন্ত, এর প্রভাব ব্যক্তিগত জীবন এবং সমাজের ওপর গভীর ও স্থায়ী।

* লেখক: এম আহসান উল্লাহ খান, সাবেক ঊর্ধ্বতন ব্যাংকার, ইংরেজি সংবাদ উপস্থাপক বিটিভি ও বেতার, খণ্ডকালীন শিক্ষক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র