‘এখানে রাজনৈতিক আলাপ জরুরি’—জটিল রাজনীতির সহজ পাঠ
অ্যারিস্টটল বলে গেছেন—‘মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই সামাজিক ও রাজনৈতিক জীব’। আর বাস্তবতা হলো আমাদের জীবনের প্রতিটি কাজকর্মই নিয়ন্ত্রিত হয় রাজনীতির দ্বারা। এমনকি আমাদের চিন্তাভাবনার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশগুলোও নিয়ন্ত্রণ করে রাজনীতি। আমি সহজ করে বলি, দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত আমরা রাজনীতির বেড়াজালে আটকে থাকি। আমরা যেমন বাতাসের সমুদ্রে ডুবে আছি, ঠিক একইভাবে ডুবে আছি রাজনীতির সমুদ্রেও। রাজনীতি ছাড়া আমাদের এক মুহূর্তও চলে না। সেই রাজনীতির প্রতি ঠিক কবে থেকে আমাদের বিমুখতা তৈরি হয়েছিল আমার জানা নেই। আমার এ–ও জানা নেই, আদৌ আমাদের রাজনীতির প্রতি আগ্রহ ছিল কি না। আমি নিজেও একসময় প্রচণ্ড রকম রাজনীতিবিমুখ মানুষ ছিলাম। এখনো যে নেই, সেটাই বা কীভাবে জোর দিয়ে বলি। যেকোনো আড্ডায় ধর্ম এবং রাজনীতির প্রসঙ্গ এলেই আমরা সন্তর্পণে এড়িয়ে যেতাম। কিন্তু আমরা জানি, এ দুটি বিষয়ই হাত ধরাধরি করে চলে এবং মানবজীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে।
এখন বুঝি রাজনীতি আসলে আমাদের নিত্যকার বিষয় হওয়ার কথা ছিল। সব বয়সী মানুষেরই আসলে রাজনীতি–সচেতন হওয়া জরুরি। রাষ্ট্র থেকে নাগরিক—যেকোনো অধিকার বুঝে নিতে চাইলে আমাদের রাজনীতি বুঝতেই হবে। দেশ নিয়ে আলাপ করলেই আমরা সবার আগে দোষ চাপাই রাজনীতিবিদ আর দ্বিতীয়ত আমলাদের ওপরে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্যের জন্য আসলে আমরা নিজেরাই দায়ী। যেহেতু খারাপ মানুষ রাজনীতি করে, তাই রাজনীতি নিয়ে এখন আমরা আর মাথা ঘামাই না। বিষয়টা কি আসলেও এতটা সহজ। আমরা আসলে নিজেদের দায়িত্ব এড়ানোর জন্যই ঢালাওভাবে রাজনীতি এবং রাজনৈতিক নেতাদের দোষারোপ করি। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, রাজনীতিই যেহেতু সভ্যতার গতিপথ ঠিক করে দেয়, তাই ইতিহাস চর্চার প্রধান নিয়ামকও রাজনীতি। তাই রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসেরও বাঁক বদলে যায়। আর আমরা রাজনীতির পাশাপাশি ইতিহাসের প্রতিও বিমুখ হয়ে উঠি।
যেহেতু রাজনীতি এবং ইতিহাস আমার আগ্রহের জায়গা, তাই ‘এখানে রাজনৈতিক আলাপ জরুরি’ নামটা স্বভাবতই আমাকে ছবিটার প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিল। তাই যখন জানতে পারলাম ছবিটা অস্ট্রেলিয়াতে মুক্তি পাচ্ছে, দেরি না করে টিকিট করে ফেলেছিলাম। ছবিটার প্রসঙ্গে পরিচালকের সাক্ষাৎকার থেকে জেনেছিলাম ছবিটা নির্মাণের প্রেক্ষাপট। এর পটভূমি বিষয়ে পরিচালক আহমেদ হাসান বলেছিলেন, ‘আমাদের একটা বিশাল প্রজন্ম আই হেট পলিটিকসের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে। এ কারণে দেশের ইতিহাস সম্পর্কে তাদের অতটা জানাশোনা নেই। কেন দ্বিজাতি তত্ত্ব হয়েছে, কেন বাংলাদেশ ভাগ হয়েছে, বাঙালি জাতি হয়েছে—আমাদের কতটা ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। আমি যদি আমার অতীত সম্পর্কে ঠিকঠাক না জানি, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎও বেশি দূর এগোবে না। সে কারণেই রাজনৈতিক আলাপটা জরুরি। আমাদের ইতিহাস জানতে হবে। আমরা গল্পটার মধ্যে বিভিন্ন কথোপকথনের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের ইতিহাস বলার চেষ্টা করেছি। সে কারণে ছবিটির নাম এটাই যথোপযুক্ত মনে হয়েছে।’
পরিচালক ছবির পর্দায় তাঁর কথার হুবহু চিত্রায়ণ করেছেন। মাত্র পঁচানব্বই মিনিট ব্যাপ্তির ছবিতে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম–পূর্ববর্তী ইতিহাস থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের বাস্তব চিত্র এঁকেছেন। ছবিটা দেখার পরই ভেবে রেখেছিলাম একটা রিভিউ লিখব, কারণ ছবিটা একেবারে যেন আমার মনের কথাগুলোই উগরে দিয়েছিল। বিভিন্ন ব্যস্ততায় আর সেটা হয়ে ওঠেনি। আমি চিন্তিত ছিলাম এমন বিষয়ের গল্পের গতিময়তা নিয়ে। পরিচালক খুবই সুন্দরভাবে সেটা কাটিয়ে মূল গল্প বলে গেছেন। রাজনীতি নিয়ে কথা শুরু হলেই আমরা বলি, এসব বস্তাপচা আলাপ বাদ দেন; কিন্তু এই ছবিটার সংলাপগুলোকে মোটেও বস্তাপচা মনে হয়নি। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৬৯ সালের গণ–অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণ–আন্দোলন থেকে শুরু করে সর্বশেষ ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম—সব বিষয় নিয়েই আলাপ করা হয়েছে। আর চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থান যেহেতু একেবারে সাম্প্রতিক বিষয়, তাই এটার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। চব্বিশের দম বন্ধ করা পরিবেশের সঙ্গে আপনি একাত্তরের পরিবেশের কিছুটা মিলও খুঁজে পেতে পারেন।
রাজনীতির গল্প বলার পাশাপাশি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের চিত্রও এসেছে। জীবনের কাছে আমরা আসলে কী চাই। এমন প্রশ্নও ঘুরেফিরে এসেছে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের একটা বিশাল প্রজন্ম আই হেট পলিটিকসের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে এবং উঠছে। আমরা তাই যেকোনো অজুহাতে দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টায় থাকি। কত রকম উপায়েই যে আমরা দেশ ছাড়ি সেগুলো রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। এইতো সেদিনের কথা, একজন মানুষ কোনোভাবে বিমানবন্দরে ঢুকে বিমানের চাকার ফাঁকে ঢুকে পড়ে দেশ থেকে পালাতে চেয়েছিলেন। এরপর মৃত্যুবরণ করেন। তখন এটা নিয়ে অনেক আলাপ হয়েছিল। তার কিছুদিনের মধ্যেই আবার বিষয়টা থিতিয়ে এসেছিল। এ ছাড়া আমরা বিভিন্ন উপলক্ষে বিদেশি সাহায্যের জন্য মুখিয়ে থাকি। আমাদের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ বাড়তে বাড়তে এখন যে কোথায় ঠেকেছে আমার জানা নেই। আর আমাদের পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে মানানসই করে তোলার জন্য বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে যে সহায়তা দেওয়া হয় সেটার উদ্দেশ্য এবং কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আমার সহজ বুদ্ধিতে একটা বিষয় বুঝি। বাংলাদেশে যে পরিমাণ এনজিও আছে, এরা যদি মাত্র এক শ জন মানুষের ভাগ্য বদলানোর দায়িত্ব নিত তাহলে কবেই বাংলাদেশ থেকে দারিদ্র্য জাদুঘরে স্থান করে নিত।
আমাদের জীবনপ্রণালি থেকে শুরু করে জীবিকা সবকিছুতেই আমরা এখন পশ্চিমাদের অনুকরণ করি। আমাদের কথাবার্তা, চলাফেরা, পোশাক-আশাক থেকে শুরু করে খাবারদাবার সবকিছুতেই আমরা তাদের দেখানো পথে চলি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফলে এই বিষয়টা আরও ত্বরান্বিত হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যাঁরা বিদেশে থাকেন, তাঁরা কিন্তু সেসব দেশে নিজের সংস্কৃতির চর্চা করে ছোট ছোট বাংলাদেশ তৈরি করে ফেলেন। এখনো দেশে কেউ ভুলভাল ইংরেজি বললেই তাকে আমরা সমীহের চোখে দেখি। আর কেউ একটু শিক্ষিত হলেই নিজেকে অন্যদের তুলনায় উঁচু প্রজাতির বোঝাতে পশ্চিমাদের মতো পোশাক পরা শুরু করেন। আমি নিজেও করতাম। এখন একটা প্রথম বিশ্বের দেশ তথা উন্নত দেশে থাকার ফলে ফাঁকিগুলো খুব কাছ থেকে দেখি। পশ্চিমা দেশের এসব চাকচিক্যের পেছনের ফাঁপা সৌন্দর্য এখন আর আমাকে আকর্ষণ করে না। আসলে জীবনের কোনো স্ট্যান্ডার্ড নেই। জীবন জীবনের মতো। অনেকেই বলেন জীবনে সুস্থ থাকাটাই আসল ব্যাপার। সুস্থতারও কিন্তু আসলে কোনো সংজ্ঞা নেই। আর বেঁচে থাকাটাই আমার কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে হয়।
পরিচালক এই ছবিতে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ের চিত্র এঁকেছেন। প্রান্তিক মানুষের জীবনের ওপরেও চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে পশ্চিমাদের প্রেসক্রিপশনের চাষাবাদ থেকে শুরু করে সবকিছুই। এটা যে ঠিক কত বড় ঝুঁকি, সেটা নিয়েও পরিচালক প্রশ্ন তুলেছেন। হাইব্রিড বীজ, কীটনাশকের আধিক্য, জলাশয়ে যত্রতত্র বাঁধ নির্মাণ—সব প্রসঙ্গেই আলো ফেলেছেন। প্রান্তিক মানুষের নিস্তরঙ্গ জীবনের সৌন্দর্যের কিছুটা অংশও তুলে ধরা হয়েছে। সংলাপগুলোর মধ্যে কোনো রকম গাম্ভীর্য না থাকায় সহজেই দর্শক নিজেও রাজনৈতিক আলাপের অংশ হয়ে গিয়েছেন। এমন ছবি বেশি বেশি নির্মাণ হওয়া দরকার। রাজনীতির আলাপ একেবারে হেঁশেল থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়া দরকার। আর এই বিষয়গুলো নিয়ে দরকার স্থানীয় গবেষণার। আসলে আমাদের দেশের সমস্যা বিদেশিদের ডায়াগনসিস দিয়ে সমাধান অসম্ভব যত দিন না আমরা নিজেরা নিজেদের মতো করে বুঝতে না শিখব।
ছবির অভিনেতা-অভিনেত্রী সবাই চমৎকার অভিনয় করেছেন। বঙ্গজ ফিল্মসের স্বত্বাধিকারী তানিম ভাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ ছবিটাকে অস্ট্রেলিয়ায় প্রদর্শন করার জন্য। আমি আশা করেছিলাম হলভর্তি দর্শক ছবিটা দেখবেন। কারণ, দিন শেষে প্রবাসীদের বিনোদন দেশের দুর্নীতি এবং রাজনীতি। কিন্তু আমি খুবই হতাশ হয়েছি। হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ আমরা ছবিটা দেখেছিলাম। আমরা কথায় কথায় দেশপ্রেমের বুলি আওড়াই; কিন্তু সেগুলো শেষ পর্যন্ত কথার কথাই থেকে যায়, কারণ আমরা সেগুলোর চর্চা করি না। আর যে চর্চা করে তাকে আমরা ভোদাই বলে গাল পাড়ি। রাজনীতির আলাপ আমাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠুক। তাহলেই আমরা আমাদের ন্যূনতম নাগরিক অধিকার বিষয়ে সচেতন হতে পারব। পরিশেষে পরিচালককে অন্তরের অন্তস্তল থেকে ধন্যবাদ এমন একটা বিষয়ের ওপর চলচ্চিত্র নির্মাণের ঝুঁকি নেওয়ার জন্য।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]