‘প্রেশার কুকার’: শহরের মেয়েদের অসহায়ত্বের গল্প
প্রেশার কুকার যন্ত্রটার সঙ্গে শহরের মানুষের কমবেশি পরিচয় আছে। খাবার সেদ্ধ করার জন্য প্রেশার কুকার খুবই কার্যকর, বিশেষ করে মাংসজাতীয় খাবার। এই যন্ত্রে অধিক চাপে খাবার দ্রুত সেদ্ধ হয়। আর সেই চাপ ছেড়ে দেয় হুইসেল দিয়ে। খাদ্যের প্রকরণের ওপর হুইসেলের সংখ্যা নির্ভর করে। যে খাদ্য সেদ্ধ হতে বেশি সময় লাগে, তার হুইসেলের সংখ্যা বেশি লাগে। ছায়াছবির এমন একটা নাম নিঃসন্দেহে আগ্রহ তৈরি করে। সেই আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছিল এর ফার্স্ট হুইসেল। তার বর্ণনাতে লেখা ছিল, ‘প্রেশার ঠিক আছে তো? কারণ, এই কুকারে রান্না হচ্ছে ভয়ংকর কিছু...’। দিন শেষে সমাজ মেয়েদের মনকে প্রাধাণ্য না দিয়ে শরীরকে প্রাধাণ্য দেওয়ার কারণেও কি এমন নামকরণ? তাদের শরীরের কারণেই তাদের চাপে রাখা হয়, যেমন প্রেশার কুকারের মধ্যে চাপে থাকে মাংস।
আরেকটা বিষয় আমাকে আগ্রহী করে তোলে। সেটা হলো, ছবিটা উৎসর্গ করা হয়েছে অকালপ্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদকে, যাঁর হাত ধরে বাংলা চলচ্চিত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছিল। ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আবহমান বাংলাদেশের যে ছবি তিনি এঁকেছিলেন, সেটা বাংলা ছবির ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। সেখানে একই সঙ্গে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যেমন উঠে এসেছিল, তেমনি উঠে এসেছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনও। ‘প্রেশার কুকার’ ছবির শুরুতে যে দৃশ্য দেখানো হয়, তাতে শুরুতেই মাথায় আসে ‘মাটির ময়না’র আনুর কথা। বলা হয়ে থাকে, ‘মাটির ময়না’ ছিল তারেক মাসুদের নিজের জীবনের গল্প। তারেক মাসুদ যেমন মাদ্রাসাতে তার প্রাথমিক পাঠ নিয়েছিলেন, তেমনি রায়হান রাফীও মাদ্রাসা থেকেই তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু করেছিলেন।
রায়হান রাফী ‘প্রেশার কুকার’–এর অভিনেতা অভিনেত্রীদের দিয়ে একেবারে খাঁটি গালাগাল দিয়েছেন যখন যেটা দরকার মনে করেছেন। তাই ভদ্রলোকেদের জন্য এই ছবি হজম করা একটু কঠিনই হবে। এই ছবিতে শহরের চার প্রকার মেয়েদের গল্পই বলা হয়েছে—নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত।
আসি চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে। অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম অস্ট্রেলিয়ায় কবে মুক্তি পাবে। অবশেষে মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই টিকিট করে ফেলেছিলাম। এরপর নির্দিষ্ট দিন আগেই উপস্থিত হয়ে গিয়েছিলাম। ছবি শুরু হওয়ার পর থেকেই আপনি এক অজানা অস্বস্তিতে ভুগতে থাকবেন। আমার মনে হয়েছে, ‘প্রেশার কুকার’–এর আসল সাফল্য এটাই। বিষয়টা সবাই জানে, কিন্তু কেউ প্রকাশ করে না। ভদ্রসমাজের রীতি হচ্ছে এটাই। আমি অবশ্য ভদ্রলোকদের একটা সন্ধি বিচ্ছেদ করি এভাবে—‘ভণ্ড + লোক = ভদ্রলোক’। যে যত বড় ভণ্ড, সে তত বড় ভদ্রলোক। এরা কথা বলে মেপে মেপে। এরা গালি দেয় না। বিষয়টা এমন যে গালি দিলেই মানবসমাজ তাকে ত্যাজ্য করে দেবে। তখন কীভাবে একঘরে হয়ে টিকে থাকবে।
রায়হান রাফী ‘প্রেশার কুকার’–এর অভিনেতা–অভিনেত্রীদের দিয়ে একেবারে খাঁটি গালাগাল দিয়েছেন যখন যেটা দরকার মনে করেছেন। তাই ভদ্রলোকেদের জন্য এই ছবি হজম করা একটু কঠিনই হবে। এই ছবিতে শহরের চার ধরনের মেয়েদের গল্পই বলা হয়েছে—নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত। মেয়েদের সামাজিক অবস্থান যেটাই হোক না কেন, শহরের মেয়েরা যে অসহায়, সেটাই দেখানো হয়েছে। মূল কাহিনি নিম্নবিত্ত মেয়ে রেশমাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। এর পাশাপাশি অন্য মেয়েরাও এসেছে। রেশমার কাহিনি আপনাকে নিম্নবিত্ত মেয়েদের সংগ্রামের গল্পটাকেই বারবার মনে করিয়ে দেবে। মেয়েরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েও স্বামীর পরিচয় ছাড়া নিজেরদের অসহায় মনে করে। এই মানসিকতা এখনো আমাদের সমাজে রয়ে গেছে।
নিম্নবিত্ত মেয়েদের মনের ভালোবাসার দিকটাও চমৎকারভাবে এসেছে। স্বামীর ভালোবাসার জন্য অন্য মেয়েদের সঙ্গে ঝগড়া, এমনকি মারামারি করতেও তাদের বাঁধে না। আবার স্বামীর একটু আদর–সোহাগেই আগের সব অপরাধ ক্ষমা করে দিতে প্রস্তুত তারা। আর সন্তানের প্রতি ভালোবাসা তাদের চিরন্তন। সংসার, স্বামী, সন্তানের জন্য তারা সবকিছু ত্যাগ করতে তৈরি থাকে। এই অসহায় মেয়েরাই আবার একবার ভয় কাটিয়ে উঠতে পারলে তারা হয়ে পড়ে অসম সাহসী। তখন আবার তারা মানুষ খুন করতেও পিছপা হয় না। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ের ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে চলে যাওয়ার ঘটনাও আমাদের সমাজেরই অংশ। মধ্যবিত্ত মেয়েদের ক্ষমতার চাপে নিজেদের পরিবর্তনের গল্পও পুরোনো। আর মেয়ে যতই উচ্চবিত্তের হোক, শুধু মেয়ে হওয়ার কারণে বিপদ তাদের পিছু ছাড়ে না।
এই ছবির প্রতি আরেকটা কারণে ভীষণ আকর্ষণ বোধ করছিলাম। সেটা হলো এটা একটা নায়কবিহীন ছবি। আমাদের ছোটবেলায় একটা ছবি দেখেছিলাম, নাম ‘পালাবি কোথায়’। সেই ছবিতে হুমায়ুন ফরীদি ভিলেন আর তিনজন নায়িকা ছিলেন—সুবর্ণা মুস্তাফা, চম্পা ও শাবানা। তখন পর্যন্ত আমরা ছবিতে নায়ক–নায়িকা দেখেই অভ্যস্ত ছিলাম। কিন্তু এই ছবিটা ছিল ব্যতিক্রম। হাস্যরসের মাধ্যমে সমাজে মেয়েদের তখনকার সময়ের অবস্থানকে সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। সেটা ছিল ১৯৯৭ সালের ঘটনা। আর ‘প্রেশার কুকার’ ২০২৬ সালের ছবি। মাঝে সময়ের ব্যবধান প্রায় ৩০ বছর। কিন্তু এই ৩০ বছরের মেয়েদের জীবনের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। শুধুই প্রেক্ষাপট বদলেছে, কিন্তু তাদের ওপর সমাজের চাপ এখনো সেই একই রকম আছে। ‘প্রেশার কুকার’ রায়হান রাফী ‘পালাবি কোথায়’ ছবিটাকেও শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়েছেন। এটা একটা দারুণ যোগসূত্র তৈরি করেছে।
প্রবাসে আসার পর এখন বুঝি জীবনের নিত্যকার নানান ঝামেলাও একধরনের বিনোদন, কারণ এটা আমাদের ভাবনাকে ব্যস্ত করে রাখে। নিজেকে অন্যদের তুলনায় ভাগ্যবান ভাবতে সাহায্য করে। বিদেশিদের জীবনে তেমন কোন ঝামেলা থাকে না। তাদের জীবন অনেকটা হ্রদের পানির মতো। টলটলে কিন্তু কোনো স্রোত নেই। যেখানে গতি নেই, সেটা আসলে ঠিক কতখানি জীবন, সেটাই প্রশ্নসাপেক্ষ একটা ব্যাপার। তাই এসব দেশের মানুষেরা নানা রকমের কৃত্রিম ঝামেলা তৈরি করে নিজেদের ব্যস্ত রাখার ভান করে। প্রবাসীদের জীবনও বছর চারেক পরে একই রকম হয়ে পড়ে। তখন আবার তারা বিনোদনের জন্য দেশের দুর্নীতি এবং রাজনীতির কাছে ফিরে যায়। এই ছবির বাস্তবতা নিশ্চয় দেশের এবং প্রবাসের সব দর্শককে ধাক্কা দিবে বলেই আমার বিশ্বাস। এ ধাক্কাটা খুবই জরুরি ছিল বলে আমার মনে হয়। প্রেসার কুকার দেখার পুরো সময়টা সিনেমা হলের পরিবেশ ছিল থমথমে।
রায়হান রাফিকে ধন্যবাদ এমন একটা সময়োপযোগী ছবি তৈরি করার দুঃসাহস দেখানোর জন্য। মেয়েদের কেন্দ্র করে এমন থ্রিলার বানানোর জন্য অবশ্যই তিনি ধন্যবাদ পাবেন। তবে কাহিনির যোগসূত্রের দিকে আরও একটু নজর দেওয়া যেত। অবশ্য যে পরিসরের কাহিনি এটা নিয়ে কুড়ি পর্বের ধারাবাহিক নির্মাণ সম্ভব, সেটাকে তিন ঘণ্টার ব্যাপ্তিতে দেখানো বেশ ঝক্কির। ‘হাওয়া’ ছবি থেকেই আমি নাজিফা তুষির অভিনয়ের বিশাল ভক্ত। এই ছবিতে নাজিফা তুষি এত বেশি বাস্তব অভিনয় করেছেন যে আপনার রেশমাকেই বেশি মনে থাকবে। হাঁটাচলা থেকে শুরু করে কথা বলা, অভিব্যক্তি, গালাগাল—সবই যেন শহরে আপনার সামনে ঘটে যাওয়া রূঢ় বাস্তবতা। পরিশেষে পথ প্রোডাকশনকে ধন্যবাদ অস্ট্রেলিয়ার দর্শকদের ছবিটা দেখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]