বার্লিনের স্মৃতি: যেখানে দেয়াল ভেঙে ইতিহাস বদলেছিল—পর্ব ১

কিছু কিছু শহর আছে, যাদের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেবল ভ্রমণকারীর নয়—স্মৃতির। বহু বছর পর সেই শহরে ফিরে গেলে মনে হয়, শহরটি যেন আমাদের অপেক্ষায় ছিল। সময়ের ধুলা জমেছে তার রাস্তায়, বদলে গেছে মানুষের পোশাক, বদলে গেছে ভবনের রং, বদলে গেছে জীবনের গতি; কিন্তু কোথাও যেন লুকিয়ে থাকে পুরোনো সেই পরিচিত স্পন্দন। বার্লিন আমার কাছে তেমনই একটি শহর, ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের সামনে ফিরে আসা তেমনি একটি স্মৃতি।

২০১২ সালের জুলাই মাস। যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা থেকে আমি এসেছি জার্মানির রাজধানী বার্লিনে। উপলক্ষ ছিল চক্ষু গবেষণা সোসাইটির (ISER) এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আমার গবেষণামূলক কাজ উপস্থাপন করা। আমি তখন আটলান্টায় অবস্থিত ‘এমোরি’ বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন অধ্যাপক ও গবেষক। একজন বিজ্ঞানী হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সম্মেলনে অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছে, কিন্তু এই সফরটির অনুভূতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ, বার্লিন আমার কাছে শুধু একটি শহরের নাম নয়; এটি আমার জীবনের এক সুদূর অতীত অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক আবেগময় স্মৃতির নাম।

জুলাইয়ের বার্লিন ছিল অপূর্ব সুন্দর। নীল আকাশে ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘ, দীর্ঘদিনের সোনালি আলো, রাস্তার পাশে সারি সারি সবুজ গাছ, খোলা ক্যাফেতে মানুষের হাসি-আড্ডা—সব মিলিয়ে শহরটি যেন নতুন জীবনের উচ্ছ্বাসে ভরে উঠেছিল। স্প্রি নদীর শান্ত জল, পুরোনো স্থাপত্যের সৌন্দর্য আর আধুনিক নগরজীবনের প্রাণচাঞ্চল্য মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্য আবহ।

কিন্তু আমার চোখে শুধু বর্তমানের বার্লিন ধরা পড়ছিল না। এই ঝলমলে শহরের আড়ালে আমি দেখতে পাচ্ছিলাম আরেকটি বার্লিনকে—যে বার্লিনকে আমি দেখেছিলাম ৩০ বছর আগে। সেই শহর ছিল বিভক্ত, উদ্বিগ্ন, অদৃশ্য ভয়ের ছায়ায় ঢাকা। আজ যেখানে পর্যটকদের ভিড়, হাসি আর উৎসবের পরিবেশ, একসময় সেখানে ছিল কাঁটাতারের বেড়া, সশস্ত্র প্রহরী আর কংক্রিটের দেয়াল। সময়ের কী আশ্চর্য রূপান্তর!

সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর আমার প্রথম গন্তব্য ছিল ব্রান্ডেনবুর্গ গেট। বার্লিনে এসে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটির সামনে না দাঁড়িয়ে থাকা আমার পক্ষে অসম্ভব ছিল। ট্যাক্সি থেকে নেমে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম সেই গেটের দিকে। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর সেই মহিমান্বিত স্থাপত্য। প্রুশিয়ার রাজা ফ্রেডেরিক উইলিয়াম দ্বিতীয়র আমলে নির্মিত এই গেট আজ শুধু একটি স্থাপত্য নিদর্শন নয়; এটি জার্মান ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রতীক। কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলাম। চারপাশে পর্যটকদের ভিড়। কেউ ছবি তুলছে, কেউ ইতিহাসের গল্প শুনছে, কেউ ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে শহর দেখছে। রাস্তার শিল্পীরা গান গাইছে, স্যুভেনির বিক্রেতারা ব্যস্ত। অথচ আমার মনে তখন অন্য এক দৃশ্য ভেসে উঠছে। আমি যেন দেখতে পাচ্ছি, এই একই স্থানে একসময় দাঁড়িয়ে আছে বার্লিন প্রাচীর। কংক্রিটের সেই নিষ্ঠুর দেয়াল শুধু একটি শহরকে নয়, একটি জাতির হৃদয়কেও বিভক্ত করেছিল। এক পাশে পূর্ব জার্মানি, অন্য পাশে পশ্চিম জার্মানি। একই ভাষার মানুষ, একই সংস্কৃতির মানুষ—কিন্তু রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে তারা পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন।

ব্রান্ডেনবুর্গ গেট সেই বিভক্তির নীরব সাক্ষী ছিল। আবার সেই গেটই হয়ে উঠেছিল পুনর্মিলনের প্রতীক। ১৯৮৯ সালে যখন বার্লিন প্রাচীর ভেঙে পড়ল, তখন মানুষের উচ্ছ্বাসে এই স্থান পরিণত হয়েছিল স্বাধীনতার উৎসবে। ইতিহাস যেন একই স্থাপনাকে একই সঙ্গে বেদনা ও আনন্দের প্রতীক করে তুলেছিল। ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আমার মনে হলো—মানুষ দেয়াল তৈরি করে, কিন্তু সময় সেই দেয়াল ভেঙে দেয়। হঠাৎ করেই স্মৃতির দরজা খুলে গেল। আমি আর ২০১২ সালের বার্লিনে নেই। ফিরে গেছি ১৯৮২ সালের সেই শীতের দিনে। তখন আমি তরুণ গবেষক, সোভিয়েত ইউনিয়নের সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণায় ব্যস্ত। পৃথিবী তখন শীতল যুদ্ধের উত্তেজনায় বিভক্ত। বার্লিন তখনো দুই জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক অস্থির শহর। সেই সময় আমার জীবনে এসেছিল এক অসাধারণ বন্ধুত্ব—ডিটারের সঙ্গে। আর সেই বন্ধুত্বই আমাকে নিয়ে গিয়েছিল বিভক্ত বার্লিনের পথে।

১৯৮২ সালের শীতের কথা। সেন্ট পিটার্সবার্গের আকাশ তখন প্রায় সব সময় ধূসর। বরফে ঢাকা রাস্তায় মানুষের চলাফেরা সীমিত, দিনের আলো অল্প সময়ের জন্য আসে, তারপর আবার নেমে আসে দীর্ঘ রাত। সেই সময় গবেষণাগারের ব্যস্ততা আর শীতের একঘেয়েমির মাঝেও আমার মনে ছিল পৃথিবীকে দেখার প্রবল আগ্রহ। ঠিক তখনই ডিটার বলল, ‘চলো, ছুটিতে বার্লিন ঘুরে আসি।’

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

ডিটার ছিল পূর্ব জার্মানির নাগরিক। সে হুমবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সিনিয়র প্রভাষক এবং একই সঙ্গে সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি কোর্সে গবেষণারত ছিল। আমাদের পরিচয় হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমিটরিতে। ডর্মের একই রুমে থাকার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। ডিটার ছিল শান্ত, ভদ্র এবং জ্ঞানী একজন মানুষ। সন্ধ্যায় গবেষণার কাজ শেষ হলে আমরা নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম—বিজ্ঞান, সাহিত্য, রাজনীতি, সংস্কৃতি। মাঝে মাঝে সে আমাকে জার্মান ভাষা শেখাত।

জার্মান ভাষা শেখা সহজ ছিল না। দীর্ঘ শব্দ, জটিল ব্যাকরণ, উচ্চারণের ভিন্নতা—সব মিলিয়ে ভাষাটি আমার কাছে কঠিন মনে হতো। ডিটার হাসতে হাসতে বলত, ‘একটি ভাষাকে সত্যিকার অর্থে জানতে হলে শুধু শব্দ শেখা যথেষ্ট নয়; সেই ভাষার মানুষের জীবনকেও জানতে হয়।’ আজ মনে হয়, সে কথাটি কত গভীর ছিল। ডিটারের মাধ্যমে আমি শুধু জার্মান ভাষার কিছু শব্দ শিখিনি; শিখেছিলাম একজন জার্মান মানুষের মন, তার ইতিহাসের বেদনা এবং তার সংস্কৃতির সৌন্দর্য। আর সেই বন্ধুত্বের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল আমার বার্লিন–যাত্রা।

বরফের দেশ পেরিয়ে বার্লিনের পথে—

সেই যাত্রার কথা মনে পড়লে আজও আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে বরফে ঢাকা রাশিয়ার বিস্তীর্ণ প্রান্তর, ট্রেনের জানালায় জমে থাকা বরফের নকশা আর অজানা এক উত্তেজনায় ভরা তরুণ গবেষকের মুখ। ১৯৮২ সালের সেই শীতের সকালে আমরা সেন্ট পিটার্সবার্গ রেলস্টেশনে এসে দাঁড়িয়েছিলাম। গন্তব্য—বার্লিন। দূরত্ব শুধু মানচিত্রের কয়েকটি রেখা নয়; এটি ছিল এক ভিন্ন রাজনৈতিক পৃথিবীতে প্রবেশের যাত্রা। তখন ইউরোপ বিভক্ত। একদিকে ন্যাটো জোটের পশ্চিমা দেশগুলো, অন্যদিকে সোভিয়েত প্রভাবাধীন পূর্ব ইউরোপ। আর সেই বিভক্ত পৃথিবীর সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক ছিল বার্লিন শহর।

আমাদের সামনে অপেক্ষা করছিল প্রায় ৩০ ঘণ্টার দীর্ঘ ট্রেনযাত্রা। ট্রেনটি ছিল আন্তর্জাতিক মানের—আরামদায়ক, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এবং সুসজ্জিত। বাইরে তখন রাশিয়ার কঠিন শীত। জানালার ওপারে সাদা বরফের চাদরে ঢাকা মাঠ, পাইন ও বার্চগাছের সারি, দূরে ছোট ছোট গ্রাম আর ধোঁয়া উড়তে থাকা কারখানার চিমনি—সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন এক বিশাল সাদা ক্যানভাসে আঁকা ছবি। আমি জানালার পাশে বসে সেই দৃশ্য দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমি শুধু একটি দেশের সীমানা অতিক্রম করছি না; আমি যেন ইতিহাসের একটি অধ্যায় থেকে আরেকটি অধ্যায়ে প্রবেশ করছি।

ডিটার মাঝে মাঝে জানালার বাইরে তাকিয়ে পুরোনো গল্প বলত। সে পূর্ব জার্মানির মানুষ—বার্লিনে বেড়ে ওঠা মানুষ। তার কণ্ঠে ছিল নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসা, আবার কোথাও কোথাও ছিল সীমাবদ্ধতার এক চাপা দীর্ঘশ্বাস। তার কাছ থেকেই প্রথম বুঝতে শুরু করেছিলাম—রাজনীতি কখনো শুধু সরকার বা রাষ্ট্রের বিষয় নয়; তা মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, বন্ধুত্ব, স্বপ্ন এবং চলাফেরার স্বাধীনতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

ভিলনিউসে (লিথুয়ানিয়ার রাজধানী) ট্রেন প্রথমে ছোট্ট একটি বিরতি নিয়ে ১০ মিনিটের একটি বিরতি নিল বেলারুশের রাজধানী মিনস্কে। তুষারে ঢাকা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ, ভারী কোটে মোড়ানো যাত্রী, সামরিক পোশাক পরা কর্মকর্তাদের আনাগোনা—সবকিছুতেই ছিল সোভিয়েত যুগের এক স্বতন্ত্র আবহ। মিনস্ক স্টেশনের বিস্তৃত প্ল্যাটফর্মে সেখানকার ছেলেমেয়েদের ছুটোছুটি চোখে পড়ল। ওদের মেয়েদের মধ্যে যেন এক ধরনের নীরব সৌন্দর্য—শান্ত চোখ, পরিমিত হাসি আর আত্মমর্যাদাপূর্ণ উপস্থিতি—যা অপরিচিত পথিকের মনেও একটি মৃদু স্মৃতি রেখে যায়। মিনস্ক পেরিয়ে ট্রেন এগিয়ে চলল পোল্যান্ডের দিকে। ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল দৃশ্যপট। ভাষা বদলাচ্ছে, স্থাপত্য বদলাচ্ছে, মানুষের পোশাক ও চলাফেরাতেও আসছে পরিবর্তন। কিন্তু তখনো আমরা ছিলাম এক নিয়ন্ত্রিত পৃথিবীর ভেতরে, যেখানে সীমান্ত মানে ছিল শুধু একটি রেখা নয়—বরং কঠোর পরীক্ষা, অনুমতি ও অপেক্ষার আরেক নাম।

ওয়ারশ স্টেশনের বিস্ময়—

পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ ছিল আমাদের যাত্রার সবচেয়ে স্মরণীয় একটি বিরতি। সেন্ট পিটার্সবার্গ ছেড়ে এসেছি প্রায় ২০ ঘণ্টা হলো। ট্রেন সেখানে পৌঁছানোর পর হঠাৎ থেমে গেল দীর্ঘ সময়ের জন্য। প্রথমে বুঝতে পারিনি কারণটি কী। পরে জানতে পারলাম, এর পেছনে রয়েছে রেলপথের এক প্রযুক্তিগত পার্থক্য—যা সেই সময় পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের বিভক্ত ইতিহাসেরই এক প্রতিচ্ছবি। সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে ওয়ারশ পর্যন্ত রেললাইন ছিল ব্রডগেজ (দুটি পাতের মধ্যবর্তী দূরত্ব থাকে ১৫২৪ মিলিমিটার), আর ওয়ারশ থেকে জার্মানি পর্যন্ত ব্যবহৃত হতো স্ট্যান্ডার্ড গেজ (১৪৩৫ মিমি) । ফলে একই ট্রেন সরাসরি পশ্চিম ইউরোপের রেলপথে চলতে পারত না।

তারপর শুরু হলো এক অবিশ্বাস্য প্রকৌশল দৃশ্য। বিশাল ট্রেনের বগিগুলোকে একে একে ভারী জ্যাকের সাহায্যে ওপরে তুলে নেওয়া হলো। মনে হচ্ছিল, কয়েক শ টন ওজনের একটি দৈত্যাকৃতির যন্ত্রকে মানুষ নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলেছে। নিচ থেকে পুরোনো হুইলসেট সরিয়ে নতুন গেজের উপযোগী চাকা বসানো হলো। আমরা জানালার পাশে থেকে সেই দৃশ্য দেখছিলাম বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে। আজকের দ্রুতগতির বিমান যুগে হয়তো এই অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই সাধারণ মনে হবে, কিন্তু আমাদের জন্য সেটি ছিল এক অসাধারণ প্রযুক্তিগত বিস্ময়। কিন্তু এই বিস্ময়ের পাশাপাশি ছিল শীতল যুদ্ধের বাস্তবতা। পাসপোর্ট পরীক্ষা, কাগজপত্র যাচাই, সীমান্ত কর্মকর্তাদের কঠোর দৃষ্টি—সবকিছুতেই অনুভব করছিলাম, আমরা এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করছি, যখন পৃথিবীর মানচিত্র শুধু ভূগোল দিয়ে নয়, রাজনীতি দিয়েও বিভক্ত।

আরও পড়ুন

প্রথম দেখা পূর্ব বার্লিন—

পরদিন বিকেলে অবশেষে আমরা পৌঁছালাম পূর্ব বার্লিনে। স্টেশন (বার্লিন ওস্টবানহফ) থেকে বেরিয়ে প্রথম যে অনুভূতিটি আমাকে স্পর্শ করেছিল, তা ছিল—একধরনের নীরবতা। শহরটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল। প্রশস্ত রাস্তা, পুরোনো স্থাপত্য, নিয়ন্ত্রিত যানবাহন—সবকিছুতেই ছিল পরিকল্পনার ছাপ। কিন্তু কোথাও যেন এক অদৃশ্য ভার অনুভব করছিলাম। মনে হচ্ছিল, শহরটি যেন নিজের চারপাশে তৈরি করা অদৃশ্য সীমারেখার মধ্যে বসবাস করছে।

বার্লিন তখন শুধু একটি শহরই ছিল না; এটি ছিল দুই পৃথিবীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রতীক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিজয়ী মিত্রশক্তির সিদ্ধান্তে জার্মানি বিভক্ত হয়। পশ্চিম অংশে গড়ে ওঠে ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানি—পশ্চিম জার্মানি, আর পূর্ব অংশে সোভিয়েত প্রভাবাধীন জার্মান ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক—পূর্ব জার্মানি। বার্লিন এর রাজধানী।

বার্লিনের ভাগ্য হয়েছিল আরও অদ্ভুত। শহরটি পূর্ব জার্মানির ভূখণ্ডের মাঝখানে অবস্থান করলেও সেটিকে ভাগ করা হয়েছিল পূর্ব ও পশ্চিম অংশে। পশ্চিম বার্লিন হয়ে ওঠে পশ্চিমা শক্তির নিয়ন্ত্রিত একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। এই বিভাজনের সবচেয়ে নির্মম প্রতীক ছিল বার্লিন প্রাচীর। ১৯৬১ সালে নির্মিত সেই দেয়াল শুধু ইট-কংক্রিটের কাঠামো ছিল না; এটি ছিল মানুষের স্বাধীন চলাচলের ওপর রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার দৃশ্যমান প্রতীক। অনেক পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, অনেক মানুষের জীবন আটকে গিয়েছিল একটি দেয়ালের দুই পাশে। চলবে...

* লেখক: অধ্যাপক রাশিদুল হক: সাবেক সহ–উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী এবং সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র, ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়