দীর্ঘদিন কুয়েতে আছি। এই দেশে পৃথিবীর প্রায় সব দেশের জনগণের বসবাস। দেশটিতে নিজ দেশের নাগরিক থেকে প্রবাসীদের সংখ্যা বেশি। একাধিকবার সুযোগ হয়েছিল দেশটির নাগরিকদের ঘরে ইফতার করার। চেষ্টা করেছি পাঠকদের জানাতে পবিত্র রমজানের সন্ধ্যায় কুয়েতের রান্নাঘরে ঐতিহ্যের ঘ্রাণ সম্পর্কে। রমজান মাসের ইফতার অর্থ কেবল রোজা ভঙ্গের মুহূর্ত নয়, এটি হচ্ছে পরিবার, আতিথেয়তা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক মিলনক্ষেত্র।
তেলসমৃদ্ধ ধনী দেশ কুয়েত। এই দেশে রোজাদারেরা ইফতারে বসে যে খাবার খান তাতে খাবারের ভিন্ন স্বাদ, ইতিহাস ও রেওয়াজের সমাহার লক্ষ করা যায়। এই মাসে খাবারের প্রস্তুতি পর্ব ও সৌন্দর্যই বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ইফতারের সময় সাধারণভাবে রোজাদারেরা পানীয় ও খেজুর নিয়ে রোজা ভঙ্গ করেন। খেজুর প্রাচীনকাল থেকেই শক্তিসম্পন্ন একটি খাবার হিসেবে ইফতারের মুহূর্তে গ্রহণ করা হয়। এটি শরীরকে দ্রুত শক্তি ও পুষ্টি প্রদান করে। এর সঙ্গে প্রায়শই থাকে দই বা লাবান, যা পেটকে স্নিগ্ধ করে রাখে।
ইফতার মানেই রোজার ক্লান্তি ভুলে সবাই একত্রে বসে খাবার ভাগাভাগি, কথাবার্তা ও আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। রোজাদারের দীর্ঘ অপেক্ষার পর সূর্যাস্তে এই ভোজনের আনন্দ ধারণ করে কুয়েতি আতিথেয়তার মূল মর্ম বুঝিয়ে দেয়।
এরপর শুরু হয় আড্ডায় বসা, যা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বৃহত্তর ইফতার ভোজের আসর। কুয়েতি পরিবারের ইফতার টেবিলে সাধারণত একাধিক ঐতিহ্যবাহী ও পুষ্টিকর খাবার থাকে, যা দিনভর রোজার পর শরীর ও মনকে পুনরায় শক্তি দেয়। এর মধ্যে মচবুস অন্যতম। এটি কুয়েতের জাতীয় থালার অন্যতম। মচবুস মূলত সুগন্ধি ভাত ও মাংসের মিশ্রণ। সাধারণত মুরগি বা দুম্বার মিশ্রণে তৈরি করে। এতে বিভিন্ন মসলা দারুচিনি, এলাচ, শুকনো লেবু স্বাদ মিশে থাকে। এটি ইফতারের মূল খাবারের মতো পরিমাণে পরিবেশিত হয়। থাকে হারিস, যা হৃদয় ছুঁয়ে যায়। হারিস হলো গম ও মাংস ধীরে ধীরে রান্না করে তৈরি একটি পানীয় ধরনের পোরিজ। এর নরম ও ক্রিমি গঠন ইফতারের জন্য খুবই উপযোগী ও সহজে হজমযোগ্য। আরেকটি হলো জিরিশ—চাল ও গমের মিশ্রিত একটি ঘন পোরিজ, সাধারণত মুরগি বা মাংস দিয়ে তৈরি। ভেজিটেবল, পেঁয়াজ ও মসলার সঙ্গে এটি রান্না করে খাওয়া হয়। ফাইবার ও প্রোটিনে ভরপুর থাকে জিরিশে।
আরও আছে তাশরিব নামের একটি খাবার। এটি রিচ স্টু, যেখানে নরম করা রুটি বা নানকে গরম মসলাদার স্টুর ওপর ঢেলে খাওয়া হয়। হালকা ও সহজে হজম হওয়ায় এটি ইফতারের প্রথম কোর্স হিসেবে জনপ্রিয়। আরও আছে এক অনন্য কুয়েতি ঐতিহ্যবাহী খাবার, যার নাম আল-কুবুত। ছোট ছোট ডো (গোল টোটা), রান্না করা টমেটো স্যুপ থালাবদ্ধ করে পরিবেশিত হয়। মাঝেমধ্যে এর মধ্যে গাজর, আলু বা লুমি যোগ করা হয়, ফলস্বরূপ এর স্বাদ মিষ্টি ট্যাংগি থাকে। থাকে নানা ডাল, ডাল স্যুপ ও লেন্টিল স্যুপসহ নানা স্বাদের অভিজাত পানীয়। রোজা ভঙ্গের সঙ্গে তাদের লাগবে ডাল বা লেন্টিল স্যুপ খাওয়া খুব সাধারণ। এটি হালকা, পুষ্টিকর ও দ্রুত হজম হয়। লাবান তো আছেই।
শরবতের মধ্যে ভিম্টো ও তমারিন্দ জুস রমজান মৌসুমে বিশেষভাবে জনপ্রিয় পানীয়। ভিম্টো আসলে একটি মিষ্টি ফ্রুটি ড্রিংকস, আর তমারিন্দ জুস হালকা টক স্বাদের জন্য প্রিয়। ইফতার–পরবর্তী ডেজার্ট হিসেবে নানা মিষ্টান্ন খাবার। এতে খাবারের আনন্দ আরও বাড়ানোর জন্য কুয়েতে বিশেষ মিষ্টান্ন উপস্থাপন করা হয়, যা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। লুকাইমাত, গেরস ওগাইলি, বালালিত কত কী নাম।
লুকাইমাত বলতে ছোট গা-ভরা ডো বল, ভাজা এবং চিনি বা খেজুর সিরাপ দিয়ে পরিবেশিত হয় মিষ্টি, কর্কট ও মুখরোচক। গেরস ওগাইলি হলো সাফরান, কার্ডামম ও গোলাপ জল দিয়ে তৈরি একটি ঐতিহ্যবাহী কুয়েতি কেক রমজান এবং ঈদে বিশেষভাবে পরিবেশিত হয়। মিষ্টি ভদকা চাল বা নুডলস ওপরে ফেটা দিয়ে পরিবেশিত হয় বালালীত এটি স্ন্যাকস বা হালকা সাইড হিসেবে খাওয়া হয়।
আবার যখন পার্টি হয় তখন আস্ত দুম্বা কিংবা উটের মসবুচ পরিবেশন করা হয়। তা ছাড়া কাবাব, টিক্কা, হাম্মুছ, মোতাব্বা আরও কত কী।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
কুয়েতের নাগরিকদের কাছে ইফতার পরিবার ও সম্প্রদায়ের মিলনের এক সামাজিক অনুষ্ঠান। ইফতার মানেই দুপুরের পরে সন্ধ্যায় রোজার ক্লান্তি ভুলে সবাই একত্রে বসে খাবার ভাগাভাগি, কথাবার্তা ও আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। রোজাদারের দীর্ঘ অপেক্ষার পর সূর্যাস্তে এই ভোজনের আনন্দ ধারণ করে কুয়েতি আতিথেয়তার মূল মর্ম বুঝিয়ে দেয়। কুয়েতের ইফতার খাবারগুলো রোজাদারের দেহ ও মনকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য পুষ্টিকর ও সুস্বাদু। এতে একদিকে আছে ঐতিহ্যবাহী ভাতের ডিশ, অন্যদিকে রয়েছে মিষ্টি ও পানীয় বৈচিত্র্য, যা প্রতিটি ভোজকে স্মরণীয় করে তোলে। প্রাচীন রেওয়াজ থেকে আধুনিক পথ ধরে আজকের ইফতার টেবিল কুয়েতবাসীদের ঐতিহ্য ও আতিথেয়তার এক অনন্য চিত্র ফুটে ওঠে।
লেখক: মঈন উদ্দিন সরকার সুমন, সভাপতি, বাংলাদেশ প্রেসক্লাব কুয়েত