বিবর্ণ ভালোবাসা: দক্ষিণ কোরিয়ার এক অনামা বন্ধুত্বের স্মৃতিকথা

মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক আসে নিঃশব্দে, কোনো ঘোষণা ছাড়াই। তাদের পরিচয় হয়তো বন্ধুত্ব, কিন্তু অনুভূতির গভীরতা অনেক সময় ভাষারও ঊর্ধ্বে। সময়ের দীর্ঘ ব্যবধান, হাজার হাজার কিলোমিটারের দূরত্ব কিংবা জীবনের ব্যস্ততা—কিছুই সেই সম্পর্কের আলোকে নিভিয়ে দিতে পারে না। স্মৃতির ভাঁজে তারা বেঁচে থাকে এক অনন্ত বসন্তের মতো।

এই গল্প তেমনই এক মানুষের—দক্ষিণ কোরিয়ার আমার সহকর্মী ইয়াং মি রিকে নিয়ে।

প্রথমবার কর্মজীবনের উদ্দেশ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় গিয়েছিলাম একরাশ স্বপ্ন নিয়ে। নতুন দেশ, নতুন ভাষা, নতুন মানুষ—সবকিছুই ছিল অচেনা। চাকরিতে যোগদানের আগে আমার সাক্ষাৎকার হয় সম্পূর্ণ কোরিয়ান ভাষায়। চোখের পরীক্ষা, অঙ্ক, হিসাব-নিকাশ, কর্মদক্ষতা—সব মিলিয়ে ছিল কঠিন এক পরীক্ষা। সৌভাগ্যবশত কোরিয়ান ভাষায় আমার অভিজ্ঞতা থাকায় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পেরেছিলাম। সেই দিনই শুরু হয়েছিল আমার নতুন জীবনের পথচলা।

প্রথম কর্মদিবসেই পরিচয় হয় মি রির সঙ্গে। ছিপছিপে গড়ন, তুষারের মতো শুভ্র মুখ, শান্ত দুটি চোখ আর মায়াভরা হাসি—মনে হয়েছিল, মানুষটি যেন ভদ্রতা আর সৌন্দর্যের এক নিঃশব্দ প্রতিচ্ছবি।

কোরিয়ান সমাজে একটি চমৎকার রীতি আছে। নতুন কারও সঙ্গে পরিচয় হলে প্রথমেই জানতে চায় তার নাম ও বয়স। কারণ, সমবয়সীদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে খুব সহজে। আমাদের বয়সও ছিল সমান। সে মৃদু হেসে বলেছিল, ‘আজ থেকে তুমি আমার বন্ধু। কোনো সমস্যা হলে আমাকে বলবে। আমরা একসঙ্গে কাজ করব।’ সেই একটি বাক্যই ধীরে ধীরে রচনা করেছিল ৯ বছরের এক নির্মল সম্পর্কের ইতিহাস।

দুপুরে আমরা কাছের ছোট্ট একটি রেস্তোরাঁয় খেতে যেতাম। খাওয়া শেষে আমি ফ্যাক্টরির দ্বিতীয় তলায় আমার কক্ষে বিশ্রাম নিতাম। আর সে প্রতিদিন দাঁত ব্রাশ করে পাশের পাহাড়ি পথ ধরে হাঁটতে বেরিয়ে পড়ত। অনেক দিন আমাকেও সঙ্গে ডাকত। সবুজ পাহাড়ের ঢালে, নির্মল বাতাসে, আমরা হাঁটতে হাঁটতে গল্প করতাম—বাংলাদেশের নদী, গ্রাম, মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ নিয়ে।

বিদায়ের দিন ইনচন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যে দৃশ্যের জন্ম হয়েছিল, তা আজও আমার হৃদয়ের সবচেয়ে ভারী স্মৃতিগুলোর একটি। সে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদেছিল। সেই কান্নায় ছিল না কোনো দাবি, ছিল শুধু বিচ্ছেদের অসহায় বেদনা।

বাংলাদেশের কথা শুনতে সে ভীষণ ভালোবাসত। টেলিভিশনে বাংলাদেশের বড় বড় মাছ দেখে একদিন বলেছিল, ‘আমি একদিন বাংলাদেশে যাব। তোমাদের দেশের সেই বড় মাছ খেয়ে দেখব।’

তার চোখের সেই শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস আজও আমার মনে ভাসে।

সময় ধীরে ধীরে আমাদের বন্ধুত্বকে আরও গভীর করল। প্রতি শনিবার তার ফোন আসত—

‘হারুন, চলে আসো। আজ আমরা একসঙ্গে খেতে যাব।’

আমরা একসঙ্গে খেতাম, গল্প করতাম। তারপর চলে যেতাম নোরেবাং-কোরিয়ান কারাওকে। গান গাইতাম, হাসতাম, কখন যে রাত নেমে আসত, বুঝতেই পারতাম না।

কোরিয়ানদের একটি বিষয় আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। তারা বন্ধুত্বে আন্তরিক, কিন্তু আত্মসম্মানেও অটল। একসঙ্গে খাওয়া হলেও প্রত্যেকে নিজের বিল নিজেই পরিশোধ করে। সম্পর্কের উষ্ণতা সেখানে অর্থের ওপর নির্ভর করে না।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

দেখতে দেখতে কেটে গেল নয়টি বছর। দীর্ঘ এই সময়ে আমাদের মধ্যে কোনো তিক্ততা জন্মায়নি। ছিল না কোনো অহংকার, কোনো অভিযোগ—ছিল শুধু বিশ্বাস, শ্রদ্ধা আর নীরব মমতা।

কিন্তু জীবনের নিয়ম বড় নির্মম। একদিন দেশে ফেরার সময় এল।

আমি যখন বললাম, আমাকে বাংলাদেশে ফিরতেই হবে, তখন সে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর ভেজা চোখে বলেছিল, ‘তুমি চলে গেলে তোমার শূন্যতা আমি কীভাবে সহ্য করব?’

আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম, মানুষের শিকড় শেষ পর্যন্ত নিজের দেশেই থাকে। পরিবার, আপনজন, দায়িত্ব—সব আমাকে ফিরিয়ে ডাকছে।

বিদায়ের দিন ইনচন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যে দৃশ্যের জন্ম হয়েছিল, তা আজও আমার হৃদয়ের সবচেয়ে ভারী স্মৃতিগুলোর একটি। সে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদেছিল। সেই কান্নায় ছিল না কোনো দাবি, ছিল শুধু বিচ্ছেদের অসহায় বেদনা।

আমার জন্য, এমনকি আমার পরিবারের সদস্যদের জন্যও সে অনেক উপহার কিনে দিয়েছিল।

আরও পড়ুন

একবার তার জন্মদিনে আমি তাকে একটি হীরার আংটি উপহার দিয়েছিলাম। আংটিটি হাতে নিয়ে তার চোখে যে আনন্দের আলো দেখেছিলাম, তা আজও আমার স্মৃতির অ্যালবামে উজ্জ্বল হয়ে আছে। পরে সেও আমাকে অনেক মূল্যবান উপহার দিয়েছিল। কিন্তু বস্তুগত মূল্যের চেয়ে বড় ছিল তার আন্তরিক ভালোবাসা।

আজ বহু বছর পেরিয়ে গেছে।

আমি এখন নিজের দেশ, পরিবার ও ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত। তবু পৃথিবীর অন্য প্রান্ত থেকে মাঝেমধ্যে তার বার্তা এসে পৌঁছায়—‘আমি তোমাকে সত্যিই খুব মিস করি।’ কখনো আবার লেখে, ‘ভালোবাসি...আবার ফিরে এসো।’

প্রতিবার এই কয়েকটি শব্দ পড়লে মনে হয়, সময়ের ক্যালেন্ডার বদলেছে, কিন্তু কিছু অনুভূতি কখনো পুরোনো হয় না।

আজও আমি তার জন্য নীরবে প্রার্থনা করি—

ভালো থেকো, সুখে থেকো, প্রিয় বন্ধু। পৃথিবীর সব আনন্দ তোমার হোক। আমার জীবনের সব দুঃখ যেন কখনো তোমার দরজায় গিয়ে কড়া না নাড়ে।

হয়তো আমাদের আর কোনো দিন দেখা হবে না। তবু কিছু মানুষকে দেখা নয়, মনে রাখাই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর প্রাপ্তি।

সারাংহে, প্রিয় বন্ধু। তুমি ভালো থেকো আমার স্মৃতির দক্ষিণ কোরিয়ায়, আর আমার হৃদয়ের গভীরে।

আরও পড়ুন