হারানো রেসিপির ভাষা
তাদের ছোট ঝগড়াটা শুরু হয় সন্দেশ নিয়ে। আরিফ বলে, ‘চিনি ঠিক গলেনি। দানাদার লাগছে।’
ফারিয়া রাগ করে বলে, ‘আমার এখন সময় কোথায়? কাল অফিসে জরুরি রিপোর্ট জমা দিতে হবে।’
তারা ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা ক্লারা শহরে থাকে। ঢাকা থেকে এসেছে পাঁচ বছর আগে। আরিফ সফটওয়্যার কোম্পানিতে চাকরি করে। ফারিয়া হাসপাতালে গবেষণা করে। সময়ের সঙ্গে ভালোবাসা যেন তালিকাভুক্ত একটা কাজ হয়ে গেছে। ঝগড়া শেষে আরিফ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।
আরিফ গাড়ি চালিয়ে সমুদ্রের ধারে যায়। সেখানে বসে ভাবে। সে ফারিয়ার হাতের কথা মনে করে। যে হাত রান্না করে, ল্যাপটপ চালায়, ক্লান্তিতে তার কপালে হাত বুলিয়ে দেয়। সে আজ সকালে সেই হাতের তৈরি সন্দেশের সমালোচনা করল কেন? তার মনে পড়ে, ঢাকায় থাকতে ফারিয়া প্রথম রান্না শিখছিল। তখন সে পুড়িয়ে ফেললেও আরিফ খেয়ে বলত, ‘অসাধারণ!’
এদিকে ফারিয়াও খুব কষ্ট পায়। সে তার নানির রান্নার বইটা বের করে। পাতায় পাতায় স্মৃতি জড়ানো। একটা পাতায় তার নিজের হাতে লেখা: ‘আরিফের জন্য চা—শক্ত করে, একটিমাত্র এলাচ দিয়ে।’ এর নিচে আরিফের হাতে লেখা: ‘ফারিয়ার স্যুপ—সর্দির জন্য ওষুধ।’ বইটা দেখে তার চোখে পানি চলে আসে। তারা কবে থেকে নিজেদের রেসিপি লেখা বন্ধ করে দিয়েছে?
সন্ধ্যায় আরিফ ফিরে আসে। দেখে, ফারিয়া নানির বই নিয়ে বসে আছে। আরিফ কাছে গিয়ে বসে। বলে, ‘আমি ভুল ছিলাম।’
ফারিয়া বইয়ের একটা পাতায় আঙুল দিয়ে দেখায়। লেখা আছে, ‘কোর্মা—মন খারাপ হলে বানাতে হয়। দুঃখ বেশি হলে দই একটু বেশি দিবে।’
আরিফ হাসে। বলে, ‘চলো, আজ আমরা একসাথে রান্না করি। তোমার নানির রেসিপি মতো।’
দুজন মিলে রান্নাঘরে যায়। আরিফ নারকেল কুটে। ফারিয়া দুধ চড়ায়। তারা নারকেলের নাড়ু বানায়। প্রথম নাড়ুটা একটু বাঁকা হয়। আরিফ সেটা খেয়ে বলে, ‘এটাই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর নাড়ু।’
ফারিয়া জিজ্ঞেস করে, ‘দানাদার লাগছে না?’
আরিফ বলে, ‘না। এতে তোমার হাতের ভালোবাসার স্বাদ লাগছে।’
রাতজুড়ে তারা পুরোনো দিনের গল্প করে। ঢাকার বৃষ্টিভেজা রাস্তার কথা মনে করে। প্রথম ক্যালিফোর্নিয়ায় এসে কীভাবে হারিয়ে গিয়েছিল সেই কথাও বলে।
সবশেষে তারা নানির বইয়ে নতুন একটা রেসিপি লেখে। শিরোনাম দেয়: ‘আমাদের ভালোবাসার রেসিপি।’
লেখে: ‘উপকরণ: একটু ধৈর্য, অনেক স্মৃতি, সময়ের থালি ভর্তি হাসি। প্রণালি: একসাথে মেশাতে হবে। মাঝে মাঝে চেখে দেখতে হবে। ভালোবাসা দিয়ে মিষ্টি করে নিতে হবে।’
দুটো নামের সই থাকে নিচে—আরিফ ও ফারিয়া।
তাদের জানালা দিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার তারাগুলো দেখা যায়। দূরে সমুদ্রের আওয়াজ আসে। রান্নাঘরের আলো নিভে যায়। কিন্তু তাদের হাতের স্পর্শ থেকে একটা নতুন রেসিপির শুরু হয়। যে রেসিপি কোনোদিন শেষ হবে না।
‘দূর পরবাস’-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]