ভালোবাসা, যার আর কোনো নাম নেই
ঘটনাটা শুরু দুই সপ্তাহ আগে। বিভিন্ন কারণে হাসপাতালে চরম ব্যস্ততা চলছে। এর মধ্যেই একজন রোগী এলেন, ৪৮ বছর বয়স। সাধারণত ইমার্জেন্সি থেকে হাসপাতালে রোগী ভর্তি হওয়ার দরকার না থাকলে ওরা কল করে না। সকাল সকাল এক চিকিৎসক কল করলেন। বললেন, ‘ফারহানা, রোগীটা একটু দেখবে? চলে যেতে চাইছেন বাসায়, কিন্তু সব ল্যাব টেস্ট অ্যাবনরমাল।’
গেলাম দেখতে। গিয়ে দেখি, গম্ভীর ভঙ্গিতে রোগী বসা। সাথে কান্না কান্না চেহারার বউ তাঁর হাত ধরে বসা। আমি ঢুকতেই বউ বলে উঠলেন, ‘একটু দেখুন, কী হয়েছে ওর। আমাদের বিয়ে হয়েছে এতগুলো বছর, কোনো দিন এত বাজে ঝগড়া করেনি ও আমার সাথে।’ আমি অবাক হয়ে বললাম, এ জন্য হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন? বউ বলল, ‘হ্যাঁ। হাইস্কুল সুইটহার্ট আমরা। বিয়ের পর থেকে সকালের কফি কোনো দিন নিজে বানিয়ে খাইনি। সবকিছু একসাথে করি। এক মাস আগেও কাজের তাড়া থাকায় কফি না নিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। রিয়ার ভিউ মিররে দেখি, খালি পায়ে ও দৌড়ে রাস্তা পর্যন্ত চলে এসেছে কফি হাতে। আর এই ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে ও আমাকে প্রথম বকা দিল। বলল, “নিজের কফি নিজে বানিয়ে খাও। সব সময় এত অলসতা কেন করো?”’ আমি হাসব না–হাসব না করেও হেসে ফেললাম।
তারপর মাথার সিটি স্ক্যানের অর্ডার দিয়ে এককাপ কফি খেলাম। সিটি স্ক্যান দেখে অবাক হলাম। মনে হলো, একটা অ্যাবনরমাল গ্রোথ নাকের অনেক গভীরে। সাথে সাথে বায়োপসির জন্য যোগাযোগ করলাম। বায়োপসি করা গেল না। নাকের খুব গভীরে বেকায়দা একটা জায়গায় গ্রোথের জন্য।
আমি রোগীকে বিষয়টা জানাতে গেলাম। দেখি বউটা কাঁদছেন। মেরি ওর নাম। রোগী বলছেন, ‘মেরি, কেন যে এতটা ঝামেলা করে! ডাক্তার, আমাদের চলে যেতে দিন।’ আমি বললাম, আরেকজন চিকিৎসক আছেন, যাঁর মতামত নিতে হবে। তিনি আপনাদের চলে যেতে বললে আমি ছেড়ে দেব, সমস্যা নেই।
আমার বন্ধু অনকোলজিস্ট, ভীষণ মেধাবী। ওকে ফোন করলাম, একসাথে রিভিউ করলাম সিটি স্ক্যান। ও বলল, ‘ফারহানা, ভীষণ অ্যাগ্রেসিভ একটা ক্যানসার মনে হয়। আমরা খুব আর্লি স্টেজে ধরে ফেলেছি। দেখতে আসছি রোগীকে।’
সেই রোগী ভর্তি হলেন। পুরো শরীরে স্ক্যান করা হলো জরুরি ভিত্তিতে। তারপরের কয়েক দিন রেডিয়েশন পেলেন, তারপর কেমোথেরাপি।
সপ্তাহ দুই পর ভ্যালেন্টাইনস ডের সকালে রোগীকে দেখতে গেলাম। ঝলমলে আনন্দিত একজন মানুষ বসে আছেন। একটু পর নার্সের সাথে কথা–কাটাকাটি করতে করতে মেরি এলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দেখুন তো ডাক্তার, জীবনে এই প্রথম ভালোবাসা দিবসে আমার স্বামীর জন্য ফুল এনেছি। নার্স ফুল রুমের ভেতরে আনতে দেবে না।’ কেমো রোগীকে ফুল, ফল, সবজি কিচ্ছু দেওয়া যায় না। রোগী হাসছেন। আমি বললাম, আপনি তো ওনাকে সুস্থ করে বাসায় নিয়ে যেতে চান, তা–ই না? মেরি বললেন, হ্যাঁ।
—তাহলে ফুল নার্সদের স্টেশনে থাকুক।
রোগী বললেন, ‘তাহলে ডাক্তার, আপনার বাসায় নিয়ে যান না কেন!’ মেরি চোখ মুছতে মুছতে বললেন, ‘নিয়ে যান বাসায়, ডাক্তার। আপনাকে ধন্যবাদ, আমার হাবিকে আগের মতো করে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য।’ মনে মনে আল্লাহকে ধন্যবাদ জানালাম। তারপর হেসে বললাম, আমার বাসায় দুটো বিড়ালছানা আছে। অনেক ফুল ওদের জন্য ক্ষতিকর। একগুচ্ছ টিউলিপ ফুল কে যেন দিয়েছিল সেদিন। বাসার পেছনে রাখায় সেই ফুলগাছ মারা গেছে। আমার বোনের সে কী রাগ শুনে। ‘কেন, গাছেরও তো প্রাণ আছে। তুই কী মনে করে গাছ মেরে ফেললি?’ আমি যতই বোঝাই, ব্যাপারটা সেটা নয়, আমি চেষ্টা করেছি পানি দিয়ে, সে ততই রাগ করে। বাবা! একই ঝামেলায় দুবার যাব না। আমাদের রমজান আসছে । আমি আপনাদের জন্য মন খুলে দোয়া করব, আপনি সুস্থ হলেই আমার সবকিছু পাওয়া হবে।
ওরা দুজনই খুব হাসছেন। রোগীর রুম থেকে বের হয়ে দেখি, অপূর্ব কিছু ফুল সাজানো। ভালোবাসার রঙে রাঙানো। ভালোবাসা, যার আর কোনো নাম নেই।