আব্বু এর বেশি ভালোবাসা যায় না
ছোট্ট বেলায় বাসায় হুজুর আসতেন কোরআন শিখাতে আমাকে আর আমার ভাইকে। স্কুলে গিয়ে জানতে পারলাম হুজুর কারি হুজুর, কারিয়ানা শেখান। হুজুরের কাছে বায়না ধরলাম আমিও শিখব। তিনি সরাসরি বলে দিলেন মেয়ে মানুষ, ওসব হবে না। তোমার ভাইকে শেখাতে পারি। তুমুল মন খারাপ করে আব্বুকে বললাম আমি সুন্দর করে কোরআন শরিফ পড়তে চাই। আব্বু একটু হেসে হুজুরকে বলে দিলেন আমার মা অনেক ছোট। ওকে আপনি শিখান, সমস্যা নাই। রাজ্য জয় করার আনন্দ ছিল সেদিন।
জীবনের সেই শুরু। আব্বু একজন এনথুসিয়াস্টিক মানুষ ছিলেন। নিজের জীবনে অনেক সংগ্রাম করে ওপরে উঠেছেন। পড়াশোনার মূল্য বুঝতেন তিনি। আমাদের স্বাধীনতা ছিল সহশিক্ষা কার্যক্রম সব করা কিন্তু পড়াশোনা বাদ দিয়ে না। জীবনের এ পর্যায়ে এসে বুঝি এটা কত জরুরি ছিল।
মাথার ওপর ছায়া হয়ে ছিলেন আমার আব্বু। মেডিক্যালে পড়তে গিয়ে হুটহাট টাকা মাসের আগে আগে শেষ করে ফেলতাম। বিকাশের আগের যুগ সেটা। ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা আসতে সময় লাগত কয়েক দিন। ফোনে একদিন বললাম আব্বু টাকা শেষ। খুলনা থেকে ২৪ ঘণ্টা জার্নি করে আব্বু টাকা দিয়ে গেছেন।
মেডিক্যালের দ্বিতীয় বর্ষ শেষে বিয়ে হয়েছিল, আব্বুর ইচ্ছার বাইরে। ক্যাম্পাসের ঝামেলায় আমার উপায় ছিল না। বিয়ের পর পর জানলাম কেউ কোনো দায়িত্ব নিতে পারবে না। আব্বুকে বললাম। সঙ্গে সঙ্গে বললেন মা তোমাকে ডাক্তার না বানিয়ে বিয়ে তো আমি দিতামই না। চিন্তা করো না, যা যা লাগে আমি করব।
‘দূর পরবাস’-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আমেরিকা আসার পরও পরীক্ষার ফি থেকে শুরু করে হাতখরচ তিনি দিলেন। এক সৎ অফিসারের জন্য অতটুকু করা অনেক কিছু ছিল। একটা ঘটনা না বললেই না। ২০০১ সালের কথা। আমার ছেলের জন্মের আগে ভীষণ অসুস্থ থাকতাম। একদিন শুনলাম আমার সাবেক শ্বশুর বড় সার্জারি করে চলে যাবেন, টাকা আব্বুকে দিতে হবে। আব্বু তখন রিটায়ার্ড, আমার হাতে ফোন ধরিয়ে দেওয়া হলো প্রাক্তনের বড় বোনের বিশাল বাসায়। আমার গলায় কি ছিল, জানি না শুধু বললাম আব্বু আপনি টাকাটা দিয়ে দেন। বললেন মা আমি দেব। তুমি নিজের খেয়াল রাখো।
কান্নাকাটি করলেই বলতেন, আমার মেয়ের মনোবলে এত কম হলে হবে? তারপর জীবনের কত চড়াই–উতরাই গেল। দুটো বাবু নিয়ে আলাদা জীবন যাপন শুরু করলাম। ফোনে শুধু শুনতাম, মা তুমি পারবে, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো, তোমার দায়িত্ব আমার নানুদের সুন্দর করে মানুষ করা।
সুন্দর স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন আল্লাহ আমাদের তিনজনকে দিয়েছেন। তারপর এল ডিসেম্বরের ১৩ তারিখ। কাজে বের হয়ে যাব, বোন ফোন করল। ও এসময় কখনো ফোন করে না। বলল তুই কই? বললাম এইতো কাজে বের হব। আপু বলল, লিসা আব্বু আর নাই। বাসায় কথা বলতে বলতে নাই, ওরা কাছের হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন, আমি আর তোমার দীনু ভাই একই সঙ্গে পৌঁছেছি। অ্যাগ্রেসিভ ম্যানেজমেন্টের আউটকাম ভালো হবে না। আমার বোন অনেক বড় ডাক্তার। মন মেনে নিল, ও যা বলছে, সেটাই আমার আব্বুর জন্য সবচেয়ে ভালো ডিসিশন। তারপর শুনলাম তুই আসবি না। বাবুদের তুই ছাড়া আর কেউ নাই। ওদের দেখতে হবে, নিজের জীবন চালাতে হবে।
২১ বছরে করা একটা ভুল মানুষকে বিয়ে করে তাঁর বিছানো কাঁটায় আজকে দেশে আমার আব্বুকে শেষবারের মতো দেখতে যেতে পারলাম না। আসলে কোন বয়সের ভুলের কোনো ক্ষমা নাই কঠিন পৃথিবীতে।
জীবনের সবচেয়ে কঠিন ডিসিশন নিলাম। বুঝে গেলাম, এখন না খেয়ে থাকলেও কেউ কোনো দিন হাজারবার দরজা নক করে বলবে না, মা খেয়ে নে। না খেলে এক চড়ুইয়ের রক্ত কমে যাবে। কেউ কোনো দিন সকাল সকাল চা খাবে না আমার সঙ্গে। দেশে গেলে ঠান্ডা লাগবে বলে নিজের চাদর কেউ আর বাড়িয়ে দেবে না। কেউ কোনো দিন বলবে না আমার মেয়ের মনোবল তো অত কম নয়। সে সব পারবে।
মাঝরাতে তীব্র কষ্টে ঘুম ভেঙে গেলে ফোন করতে ইচ্ছা করে। আগে যেমন বলতাম, আব্বু আপনি দোয়া করেন। বলেন সব ঠিক হয়ে যাবে মা। শুনতে ইচ্ছা করে। সারা জীবন ভীষণ সৎভাবে আপনি জীবন কাটিয়েছেন, বহু মানুষকে পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড় করাতে সাহায্য করেছেন। আমি চেষ্টা করব আব্বু সৎভাবে জীবনটা কাটাতে। মানুষের উপকার করতে না পারি, ক্ষতি করব না। আব্বু এর চেয়ে বেশি ভালোবাসা যায় না। আল্লাহ আপনাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আপনারা দোয়া করবেন। রায়ের বাজার কবরস্থানে আছেন আমার আব্বু। দূর থেকে রোজ জিয়ারত করি কবরটা। দেশে গেলে যাব।