মক্কা মদিনার ডায়েরি-৬
১৯. মক্কার দিনলিপি: হেরা গুহা, আরাফাত, মুজদালিফা ও মিনায় গমন
পরদিন ভোরে আমরা জিয়ারায় বের হলাম। সকাল সাতটা, ইব্রাহিম খলিল রোডে ভর করে আছে এর চিরচেনা ব্যস্ততা। হোটেলের সামনে কালো রঙের বিলাসবহুল বাসটি অপেক্ষায় অলস বসে। কাফেলার সবাই চেপে বসতেই যাত্রা শুরু হলো। গলি পেরিয়ে রাস্তা পেরিয়ে দু-একটি মোড় ঘুরতেই ক্লক টাওরায় যেন আমাদের সকালের শুভেচ্ছা জানাল। ক্লক টাওয়ারের নিচেই তো আমাদের হোটেল, প্রতিদিন অন্তত পাঁচবার এর সামনে দিয়েই নামাজে যাই আর আসি, কিন্তু এত কাছে বলেই হয়তো এভাবে চোখে পড়ে না। অথচ একটু দূরে এলেই সে বেশ আড়ম্বর করেই দেখ দিবে। একবার বাসের ডানে আর একবার বাঁয়ে—এভাবে বেশ কিছু সময় লুকোচুরি চলল। নকশাটা এভাবেই করা, ৩৫ কিলোমিটার দূর থেকেই সে শুভেচ্ছা জানাবে, তোমরা এসে গেছ মক্কা নগরীতে, খানায়ে কাবার একেবারে কাছে।
ক্লক টাওয়ারেরে লুকোচুরি আর মক্কা নগরীর সুন্দর সুপরিসর রাস্তাঘাট, দালানকোঠা দেখতে দেখতে একসময় বাস দাঁড়িয়ে পড়ল। আমরা জাবালে নুর (আলোর পাহাড়) এর গোড়ায় এসে পড়েছি। এই পাহাড়ের ওপরেই বিখ্যাত ‘গারে হেরা’ বা ‘হেরা গুহা’ অবস্থিত। এই হেরা গুহাতেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর কাছে প্রথম ঐশী বাণী (কোরআনের প্রথম আয়াত) নাজিল হয়েছিল। নবুয়ত লাভের আগে, মহানবী (সা.) মক্কার কোলাহল থেকে দূরে, নির্জন স্থানে আল্লাহর ইবাদত ও ধ্যান করার জন্য হেরা গুহায় আসতেন।
জাবালে নুর এর অনেক ওপরে হেরা গুহা, আমার বাবা প্রায় ২৫ বছর আগে এই হেরা গুহায় ওঠার স্মৃতি রোমন্থন করলেন। সেবার ওপরে উঠত গিয়ে তাঁর পায়ের পেশিতে ক্ষত তৈরি হয়েছিল। সেই ব্যথা এখনো আছে, বেশি হাঁটাহাঁটি করতে কষ্ট হয়। আমাদের মোয়াল্লেম জানালেন, কেউ যদি ওপরে উঠতে চান, তবে পরে আসতে হবে, ওপরে উঠতে–নামতে প্রায় তিন–চার ঘণ্টা সময় লাগে। নিচ থকে ওপরে ওঠা মানুষগুলোকে বিন্দুর মতো দেখা যাচ্ছিল। নিচে দাঁড়িয়ে আমরা জিয়ারত করে আবার গাড়ি ছোটালাম, এবার আমাদের গন্তব্য আরাফাতের ময়দান।
বেলা বাড়ছে, রোদ চড়ছে। এত আলো, দূরের দিকে তাকালে চোখ ঝলসে যায়। আকাশের আলো পৃথিবীজুড়ে বিছিয়ে গেছে। ঝকঝকে চারিদিক। পাহাড়ের পর পাহাড় পেরিয়ে, রাস্তার পর রাস্তা গড়িয়ে আমাদের গাড়ি এক অফুরন্ত আকাশের নিচে পৌঁছে গেল, বিস্তৃর্ণ সমতল চারিদিক। এই সমতলের বুক চিরে মসৃণ পিচঢালা রাস্তার দুই পাশে আরাফাতের ময়দান। হজের সময় জিলহজ মাসের ৯ তারিখ হাজিরা দুপুরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এখানে অবস্থান করেন। এই দিনকে আরাফাত দিবস বলা হয়। আমাদের বাস পার্কিংয়ে দাঁড়ালে আমরা হেঁটে এই ময়দানের প্রান্তে অবস্থিত জাবালে রহমত নামক পাহাড়ের পাদদেশে আসলাম। ছোট গ্রানাইট পাথরের এই পাহাড়ের পাদদেশে আমাদের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন। আরাফাত শব্দের মূল অর্থ হলো চেনা, জানা বা পরিচয় লাভ করা। একটি বর্ণনায় এসেছে, হজরত আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) জান্নাত থেকে পৃথিবীতে আগমনের দীর্ঘকাল পর এই স্থানে এসে পুনরায় মিলিত হয়েছিলেন। জাবালে রহমত অর্থ রহমতের পাহাড়, আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) এখানে এসে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন এবং আল্লাহ তাঁদের ক্ষমা করেছিলেন। এই ঘটনাগুলোর আলোকে এই এলাকাগুলোর নামকরণ হয়। হজের আনুষ্ঠানিকতা অনুযায়ী, হাজিরা সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে এই স্থান ত্যাগ করে মুজদালিফায় চলে যান।
আমরা আরাফাতের ময়দানে জাবালে রহমতের নিচে বেশ কিছু সময় কাটালাম। উষ্ণ আবহাওয়া, মাথার ওপর উষ্ণ সূর্য, আমাদের চেতনা আরাফাতের বিস্তৃত সমতলের মতো দিগন্তপ্রসারিত। আমরা খুঁজে নিয়েছিলাম নিমগাছের নিচে একচিলতে ছায়া। আমাদের শরীরে বিশ্রামের শান্তি, যেন কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। আমাদের মনকে আমরা উড়িয়ে দিয়েছি মরুর লোনা হাওয়ায়। আমাদের মোয়াল্লেমরা তাড়া দিলেন ফিরতে হবে। বিশাল রাস্তা দখল করে ইন্দোনেশিয়ার একদল যাত্রী আসছে। সামনে পতাকা উচিয়ে একজন হাঁটছেন, তাঁর পেছনে আরও বহু মানুষ, একটা মিছিল। দেখতে ভালো লাগে। এদের কাফেলাগুলো বেশ বড়সড় হয়। তাওয়াফ আর সায়ি করার সময়ও ওরা দল বেঁধে চক্কর লাগায়। ওদের বড় দলের চাপে আমরা ছোট দলগুলো একটু কোণঠাসা হয়ে পড়ি সেখানে, একটু অসুবিধা হয়, হয় ঘেঁষাঘেঁষি, হয় ঠেসাঠেসি। এখানে এই সমস্যা নেই, খোলামেলা জায়গাটাতে ওদের হেঁটে চলা উপভোগ্য হয়ে উঠেছে।
আমরা রওনা হয়েছি মুজদালিফার পথে। মুজদালিফায় হাজিরা খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন করেন এবং মিনায় পাথর মারার জন্য নুড়ি পাথর সংগ্রহ করেন। মুজদালিফা হলো চারপাশে শুষ্ক পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত মিনা এবং আরাফাতের মাঝখানে অবস্থিত উপত্যকা। হজের সময় এই স্থান দ্রুত অতিক্রম করা সুন্নত।
আমরা রওনা হয়েছি মুজদালিফার পথে। মুজদালিফায় হাজিরা খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন করেন এবং মিনায় পাথর মারার জন্য নুড়ি পাথর সংগ্রহ করেন। মুজদালিফা হলো চারপাশে শুষ্ক পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত মিনা এবং আরাফাতের মাঝখানে অবস্থিত উপত্যকা। হজের সময় এই স্থান দ্রুত অতিক্রম করা সুন্নত।
মোয়াল্লেম জানিয়ে দিলেন এখানে গাড়ি থামবে না। গাড়ির গতি কিছুটা কমিয়ে তিনি দেখিয়ে দিলেন ইসমাইল (আ.) কে কোরবানি দেওয়ার জন্য কোথায় আনা হয়েছিল! পাহাড়ের ওপর একটি ছোট মিনারের আকার দিয়ে জায়গাটি চিহ্নিত করা আছে। চলন্ত যান থেকে আমরা দেখলাম জায়গাটা। একটু পরই সামনে এল বড় শয়তান, মেজ শয়তান, ছোট শয়তান! জামারাতুল কুবরা, জামারাতুল উসতা আর জামারাতুস সুগরা। শয়তানের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত তিনটি বিশাল থাম। ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে নিজপুত্র ইসমাইল (আ.) -কে যখন কোরবানি দিতে যাচ্ছিলেন, শয়তান তখন ইব্রাহিম (আ.)-কে তিনবার প্ররোচিত করার চেষ্টা করেছিল এবং প্রতিবারই তিনি তাকে পাথর মেরে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। শয়তানের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ এবং তার প্রলোভনকে প্রত্যাখ্যান করার প্রতীকী রূপে হজের সময় এগুলোতে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টা গাড়িতে চড়ে আমরা যেন পালিয়ে এসেছি বর্তমান থেকে আলোকিত কোনো অতীতে।
আমরা মিনা এলাকায় প্রবেশ করলাম। চারপাশে লক্ষ লক্ষ তাঁবুর সারি দেওয়া এই এলাকা, হজের সময় প্রায় ২০ লক্ষাধিক মানুষ এখানে অবস্থান করেন। এই বিপুলসংখ্যক হাজির থাকার ব্যবস্থা করার জন্যই এখানে এত তাঁবু স্থাপন করা আছে। ১৯৯৭ সালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর এই তাঁবুগুলো বর্তমানে অগ্নিরোধী ও শীতাতপনিয়ন্ত্রিত করে গড়ে তোলা হয়েছে। তাঁবুগুলো বছরে মাত্র পাঁচ-ছয় দিনের জন্য (হজের আনুষ্ঠানিকতার সময়) ব্যবহৃত হয়, বাকি সময় এই এলাকা কার্যত জনশূন্য থাকে। জনহীন তাঁবুময় এই প্রান্তর দিয়ে আমাদের গাড়ি ধীরগতিতে ছুটে চলেছে। অদ্ভুত নিস্তব্ধতা ঝুলে আছে তাঁবুর শহরজুড়ে। সারাটা দিন দারুণ একটা সময় পাড় করলাম। টাইম ট্রাভেলের মতো আমরা কল্পনায় ছুঁয়ে আসলাম বিশ্বাসীদের জন্য আল্লাহর নিদর্শনসমূহ। পথে যেতে যেতে জান্নাতুল মুয়াল্লা, রাসুল (সা.)-এর জন্মস্থান, বর্তমানে স্থানটি ‘মক্কা লাইব্রেরি’, বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো।
২০. মক্কার দিনলিপি: কবুতর চত্বর, দোকান, মল ও টাওয়ারে ঘোরাঘুরি
গাড়ি হোটেলের সামনে এসে আমাদের নামিয়ে দিয়ে গেল। জোহরের সময় হয়ে এল হোটেলে না উঠে হেরেম শরিফের দিকে যাওয়া ঠিক করলাম। যাওয়ার পথে কবুতর মাঠে কবুতরগুলোর সঙ্গে কিছু সময় পার করছি। ঝঁকে ঝাঁকে কবুতর পুরো মাঠজুড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে, উড়ে বেড়াচ্ছে। কিছু মানুষ কবুতরকে খেতে দিচ্ছেন, শান্ত ও পবিত্র পরিবেশের সঙ্গে একীভূত মনোরম দৃশ্য। মদিনায় একই সৌন্দর্য আমারা উপভোগ করেছি। আমি আর রুনা ঠিক করলাম, আজ আমরা আশপাশের দোকান আর শপিং মলগুলো ঘুরে দেখব। যে কথা, সেই কাজ। বেশির ভাগ দোকান খেঁজুর আর চকলেট বিক্রি করছে, বেশ কিছু দোকান আছে বিভিন্ন গিফট আইটেমের যেমন তসবি, টুপি, জায়নামাজ, মেয়েদের গয়না ও শোপিস সামগ্রী। এ ছাড়া আছে খাবারের হোটেল, আইসক্রিম আর জুসের দোকান, সোনার দোকান। সৌদিতে সোনার দাম কম শোনা যায়, তাই কাবা শরিফে এসেও কিছু মানুষ সোনা কিনে নিয়ে যান! জোহরের নামাজ শেষ করে আমরা ক্লক টাওয়ারের ভেতরের দোকান ও মলগুলো ঘুরে দেখলাম।
মক্কা রয়েল ক্লক টাওয়ার, যা ‘আবরাজ আল-বাইত কমপ্লেক্সের’ অংশ, এটি বিশ্বের অন্যতম সুউচ্চ ভবন। এর ওপরে বিশেষভাবে তৈরি একটি পর্যবেক্ষণ ডেক এবং ক্লক টাওয়ার মিউজিয়াম রয়েছে, যেখান থেকে মক্কা শহরের দৃশ্য দেখা যায়। ক্লক টাওয়ারের ঠিক নিচেই পবিত্র কাবা শরিফ। তাওয়াফরত হাজি ও ওমরাহ পালনকারীদের অবিরাম স্রোত এবং মসজিদুল হারামের বিশাল চত্বর এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। মসজিদুল হারামের স্থাপত্যশৈলী, মিনার এবং রাতের বেলায় এর আলোকসজ্জা ওপর থেকে অসাধারণ দেখায়। ওপর থেকে মক্কার জনবসতি ও পাহাড়ি উপত্যকার নৈসর্গিক রূপ, দূরে অবস্থিত জাবালে নূর (গারে হেরা) এবং জাবালে সাওর (গারে সাওর) এর মতো ঐতিহাসিক পাহাড়গুলো স্পষ্ট দেখা যায়। দিনের বেলার একরকম দৃশ্য এবং রাতের বেলায় পুরো শহর এবং মসজিদুল হারামের আলোকোজ্জ্বল দৃশ্য একেবারে অন্য রকম লাগে। ক্লক টাওয়ার থকে এই দৃশ্য দেখতে হলে ক্লক টাওয়ার মিউজিয়ামের টিকিট ক্রয় করে টাওয়ারের ওপরের দিকে অবস্থিত পর্যবেক্ষণ ডেকে যেতে হয়।
আমরা বিভিন্ন দোকানে খেঁজুর, চকলেট, জায়নামাজ, টুপি, তসবির দাম দেখছিলাম। দেশে ফেরার সময় উপহার হিসেবে নিতে হবে। কাবার আশপাশে অনেকগুলো শলিং মল। আমরা ঘুরে বেড়ালাম এক মল থেকে অন্য মলে। এক দোকান থেকে অন্য দোকানে। কেনার চেয়ে আমাদের উদ্দেশ্য দেখা, পরখ করা, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা। মলভেদে দোকানভেদে পণ্যের দাম ভিন্ন ভিন্ন। এখানে পণ্য কিনতে হলে প্রচুর দরদাম করে দেখে কিনতে হয়। একই খেঁজুরের বক্স এক দোকানে আমাদের থেকে ২০ রিয়াল রাখল আবার অন্য দোকানে আমরা ১২ রিয়াল দিয়ে একই জিনিস পেয়ে যাই। আমাদের হোটেলের ম্যনেজারের বাড়িও চট্টগ্রামে। সে জানাল, পাইকারি বাজার থেকে আরও কম দামে কেনা যাবে। ট্যাক্সিতে গেলে ১০ রিয়াল ভাড়া নেবে। আমরা সেই ঝামেলায় গেলাম না। আমারা ক্বাবার আশপাশেই থাকব, এখানে নামাজ পড়ব। তা ছাড়া মা–বাবা সঙ্গে আছেন, ওনাদের একা ছেড়ে যাওয়া যাবে না।
২১. মক্কার দিনলিপি: আয়েশা মসজিদ ও মক্কার সাহায্যপ্রার্থীরা
আমার বাবা সৌদি আরবের প্রসঙ্গ এলেই তায়েফে যাওয়ার স্মৃতিচারণা করেন। ওইখানের উঁচু উঁচু পাহাড়ের রাস্তা, সবুজ বৃক্ষরাজি, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও শহরেরে সৌন্দর্যের তারিফ করেন। তায়েফ শহরে মেঘের আনাগোনা, সেইখানের সুস্বাদু ফলমূল আর সবজির স্মৃতিময় বর্ণনা দেন। রাসুল (সা.) এর সঙ্গে ঘটে যাওয়া তায়েফবাসীর হৃদয়হীন নিষ্ঠুর আচরণের ঘটনা আর অন্যদিকে রাসুল (সা.) কর্তৃক তায়েফবাসীকে ক্ষমা করা ও তাঁদের জন্য দোয়া করার ঘটনাগুলো আবেগের সঙ্গে উল্লেখ করেন।
তায়েফ ঘুরে একটি ওমরাহ করার পরিকল্পনা আমাদের ছিল, কিন্তু বিভিন্ন জটিলতায় সেই পরিকল্পনা বাদ দিতে হলো। আমাদের মোয়াল্লেম আয়েশা মসজিদ থেকে নিয়ত করে একটি ওমরাহ সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করলেন। সকালের নাশতা শেষে কাফেলার সবাই ইহরাম বেঁধে আয়েশা মসজিদ চলে গেলাম। ওমরাহর নিয়ত করে আয়েশা মসজিদ থেকে হেরেম শরিফে প্রবেশ করলাম। প্রথম তাওয়াফ শেষ করেছি, মন দিয়ে দোয়া পড়ছি। এমন সময় পাশ থেকে সাদা শ্মশ্রুমণ্ডিত ইহরাম গায়ে জড়ানো এক ব্যক্তি উর্দুতে কিছু একটা বললেন। মনোযোগ তাওয়াফে নিবিষ্ট থাকায় কী বললেন খেয়াল করতে পারিনি। দেখে বুজুর্গ মনে হচ্ছে, হাঁটা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে মনোযোগ দিলাম ওনার কথায়। উর্দু ভাষায় বললেন, ওনার দেশে একটি মসজিদের উনি ইমাম, ওনার কন্যার বিয়ের সোনা কেনার টাকা নিয়ে মক্কায় এসেছিলেন। ঘটনাক্রমে টাকাপয়সা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। সোজা কথায় ওনার আর্থিক সাহয্যের প্রয়োজন। এমন সময় আর এমন স্থানে উনি কথাগুলো বললেন, ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হতবিহ্বল হয়ে রইলাম! অনেক চিন্তা একসঙ্গে মাথায় খেলে যাচ্ছে। উনি কি সত্য কথা বলছেন? কাবার সামনে মিথ্যা বলবেন কেন? আমি কীভাবে ওনাকে সাহায্য করব? সঙ্গে হয়তো শ-দুই শ রিয়াল আছে, তা কি দিয়ে দেব? এর মধ্যে আমার কাফেলার লোকজন সামনে চলে গেছেন, ভিড়ের মধ্যে অবচেতনে তাঁদের খুঁজছি! শরীরে ঝাঁকুনি খেয়ে বাস্তবে ফিরলাম। রুনা তাড়া দিচ্ছে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। সংবিৎ ফিরে পেয়ে লোকটির দিকে তাকালাম, তাকে ভিড়ের সঙ্গে মিশে যেতে দেখলাম! রুনা জিজ্ঞাসা করল, লোকটা আমাকে কী বলছিলেন? সংক্ষেপে উত্তর দিলাম, সাহায্য খুঁজছিলেন। আমরা আবার তাওয়াফ শুরু করলাম।
তাওয়াফ, সায়িসহ ওমরাহর সব বিধান পালন করে মাথা ন্যাড়া করলাম। আমার আম্মার পক্ষে হেঁটে তাওয়াফ আর সায়ি করা সম্ভব ছিল না, ওনার পায়ের ব্যথা বেড়ে গেছে। তাই হুইলচেয়ার ব্যবহার করে ওমরাহ সম্পন্ন করলেন। হুইলচেয়ারে যাঁরা ওমরা করেন, তাঁদের দোতলায় নিয়ে যাওয়া হয়, ওইখানে হুইলচেয়ারে তাঁদের তাওয়াফ সম্পন্ন করতে হয়। নিচে মাতাফে হুইলচেয়ার নিয়ে প্রবেশ করা যায় না। আম্মার একটু আফসোস হলো মাতাফে নামতে না পেরে। বয়স মানুষকে অপারগ করে দেয়। দুই দিন পর গভীর রাতে আমি, বাবা আর রুনা আম্মাকে নিয়ে মাতাফে আসি। আম্মা মাতাফে তাওয়াফ সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন সুস্থভাবে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
পরদিন সাহায্যপ্রর্থনার আরেকটি ঘটনা ঘটল। ফজরের নামাজ শেষ করে আমি আর রুনা মসজিদ থেকে বের হয়েছি, হোটেলে ফিরে নাশতা করব। রুনা বলল খুব খিদে পেয়েছে, কেএফসি থেকে কিছু কেনো। মসজিদুল হারামের সামনেই ক্লক টাওয়ারের নিচে কেএফসি আছে। ওদের চিকেন ব্রোস্ট অর্ডার করলাম। কিন্তু এখানে বসে খাওয়ার কোনো জায়গা নেই। সিকিউরিটি এস্কেলেটর দেখিয়ে ওপরে যেতে বললেন। ওপরে উঠে একটি নিরিবিলি জায়গা পেয়ে আমরা বসে গেলাম কেএফসির চিকেন খাওয়ার জন্য। খাওয়া শুরু করছি, ঠিক ওই সময় সুদর্শন এক যুবক এসে সালাম দিল। স্পষ্ট ইংরেজিতে সে জানাল, ইয়েমেন থেকে সে আর তার মা ওমরাত করতে এসেছে। কিন্তু তাদের সবকিছু চুরি হয়ে গেছে, এখন তারা দেশে ফিরে যেতে পারছে না। আমাদের কাছে সাহায্যের আবেদন জানাল। আমরা একটা চিকেন তাকে খেতে দিয়ে আর্থিক সাহায্যে অপারগতা প্রকাশ করলাম। সে তৎক্ষণাৎ সেই স্থান ত্যাগ করে গেল।
পরে জানতে পারলাম, এ ধরনের ঘটনার বেশির ভাগই মিথ্যা, একশ্রেণির মানুষের এটা ব্যবসা। বিষয়টা জেনে মন খারাপ হলো। আমার জানামতে আরবের মানুষেরা দানশীল। বিপদগ্রস্ত ও নিঃস্ব মানুষদের তারা উদারতার সঙ্গে সাহায্য–সহযোগিতা করেন। মক্কা আর মদিনায় বহু মানুষকে আমি খাবার, পানি, জুস বিতরণ করতে দেখেছি। হেরেম শরিফের গেটের বাইরে বস্তায় বস্তায় খাবার বিতরণ করতে দেখেছি। আরবদের দানশীলতা আর আতিথেয়তা নিয়ে সুন্দর সুন্দর গল্প প্রচলিত আছে। আশা রাখি এই পবিত্র জায়গায় বিপদগ্রস্ত মানুষ বিপদমুক্ত হবেন। কিছু মানুষের মিথ্যা অভিনয়ের কারণে সত্যিকার বিপদগ্রস্ত মানুষেরা যেন সাহায্যবঞ্চিত না হন। চলবে...
লেখক: মুহম্মদ কামরুল হাসান সিদ্দিকী, তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা