প্রথম উপহার: সম্পর্কের সূক্ষ্ম রেখা—শেষ পর্ব

ফাইল ছবি

সাবিত নামও বলে না, নম্বরও দেয় না। নাম বললে ফোন থেকে নম্বর নেবে। ভাবিরা কয়েক দিন জিজ্ঞাসা করেও সাবিতের থেকে নাম জানতে পারেনি, যদি ফোন দিয়ে বসে। আর ফোন দিয়ে কী-বা কী জিজ্ঞাসা করবে। রুবা বিষয়টা যদি নেতিবাচকভাবে নেয়। নানা বিষয় ভেবে সাবিত ভাবিদের কথায় কান দেয় না। রাজশাহীতে আসার দিন সকালে সাবিত নাম বলে দেয়। তখন খাবার খেতে বসেছে। ভেবেছিল এখন নাম বললে আর এমন কী হবে। ঘর থেকে মেজ ভাবি বের হয়ে গেলে একটু পর সিনহা খাওয়ার ঘরে আসে।

সিনহা: চাচ্চু, তোমার ফোনটা দাও, দাদিমা দাদার সঙ্গে কথা কইব।

সাবিত: কই গেছে তোমার দাদু?

সিনহা: বাজারে মনে হয়।

ফোন নেওয়াটা ছিল কৌশল মাত্র। কোনো দরকারই ছিল না। দাদিমার কথা বলে সিনহাকে মেজ ভাবি ফোন নিয়ে যেতে বলে। সাবিতের খাবার তখনো শেষ হয়নি। ভাবি খাবার ঘরে এসে মিষ্টি মিষ্টি হাসতে থাকে।

মেজ ভাবি: নাম্বার তো নিলাম।

সাবিত: ওরে শয়তান মহিলা!

মেজ ভাবি: তোমার ভাইয়ের ফোন দিয়ে ফোন দিমুনি।

সাবিত: যাই করেন উল্টাপাল্টা কিছু কইরেন না।

রাজশাহীতে আসার তিন চার দিন হয়। এর মধ্যে ভাবিদের সঙ্গে সাবিতের কথা হইছে কিন্তু রুবার বিষয় উল্লেখ করেনি। সাবিত ইচ্ছা করেই উল্লেখ করেনি কারণ ভাবিরা রঙের আলাপ শুরু করবে। এর দু-একদিন পর রাতে মেজ ভাইয়ের ফোন দিয়ে ভাবি ফোন দেয়।

মেজ ভাবি: (উৎফুল্লের সঙ্গে) হ্যালো সাবিত, আমরা তো মেলা কাম আগাইলাম।

সাবিত বুঝতে পারে, ভাবি কোন প্রসঙ্গে কথা বলবে।

সাবিত: (না বোঝার ভান করে) কিসের কাম?

মেজ ভাবি: রুবারে ফোন দিছিলাম, ১৬ মিনিট কথা কইলাম।

সাবিত: ধুর, ফোন রাখেন তো।

মানুষের জীবনে বিশেষ কারও সঙ্গে পরিচয় হয় যার সান্নিধ্য সত্যিই ভোলার মতো না। সাবিত রুবাকে পছন্দ করে ঠিকই। কখনো বলতে পারেনি, রুবার পছন্দের সঙ্গে ব্যবধান থাকায়।

সাবিত সঙ্গে সঙ্গে ফোন রেখে দেয়। আবার ফোন দিলে রিসিভ না করেই কেটে দেয়। তৃতীয়বার রিসিভ করতেই ভাবির বাজখাঁই গলার স্বর।

মেজ ভাবি: এই, ফোন কাইডা দেও ক্যা, কথা শেষ না কইরা?

সাবিত: আপনি কী কইবেন আমি জানি।

মেজ ভাবি: কথা হইছে নাকি ওর সঙ্গে?

সাবিত: না হইলেও বোঝা যায় কী কইবেন।

মেজ ভাবি: কথাবার্তা তো আমাগো মতোই লাগল, আর কিছু জিজ্ঞাসা করলেই খালি হাসে।

ভালোই মনে হইল মেয়েটারে।

সাবিত: ভালো মেয়ে বলেই তো এত দিন যোগাযোগ রাখছি।

ভাবিদের সঙ্গে কথা শেষ হতে না হতেই রুবা সাবিতকে ফোন দিয়ে জানায় ভাবিরা ফোন দিয়েছিল। একই কথা রুবাও বলে যা ভাবিদের সঙ্গে হয়েছে। কথা হয়েছে পারিবারিক বিষয় নিয়ে; ভাবিরাই জানতে চেয়েছে। বাড়িতে কে কে আছে, মা–বাবা কী করেন, রিলেশন করে কিনা, খাওয়াদাওয়াত হয়েছে কি না প্রভৃতি। গ্রামের মহিলাদের এগুলো কমন প্রশ্ন। অন্যের প্রতি এদের জানার আকাঙ্ক্ষা বেশি। নাড়িনক্ষত্র না জানলে ভেতরটা খজখজ করে।

অনেক দিন হলো সাবিত দূরে কোথাও ঘুরতে যায়নি। সেই জুলাই আন্দোলনের আগে জুনের প্রথম সপ্তাহে চাঁপাইনবাবগঞ্জ গিয়েছিল। এখনো ঢাকা যাওয়া হয়নি। সাব্বির বহুবার ঢাকা যেতে আহ্বান জানালেও সুযোগ হয়নি। সাবিতেরও খুব ইচ্ছে কয়েক দিন সময় পেলেই এবার ঢাকা যাবে। ডিসেম্বরে চতুর্থ সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা। পরীক্ষার মাঝে সপ্তাহখানেক বন্ধ। এটাই মোক্ষম সুযোগ তিন-চার দিন জমিয়ে ঘুরাঘুরি করার। কাল বিলম্ব না করে সাবিত ১২ ডিসেম্বর ঢাকা যাওয়ার দিন নির্ধারণ করে।

ইদানীং রুবার সঙ্গে তেমন কথা হয় না। সব সময় অনলাইনে দেখায় কিন্তু এসএমএস করলে রিপ্লাই আসে অনেক পরে। সাবিত এসএমএস নিজ থেকে দিলে দেয়; রুবা দেয় না বললেই চলে। সাবিতের কাছে বিষয়টা বেশ খারাপ লাগতে থাকে। রুবা আগে তো কখনো এমন করেনি। সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই দিতো, নিজ থেকে টেক্সট করত, কত কত সময় যেত কথা শেষ হতো না। রুবার কথাবার্তায় কেমন যেন রহস্য আর ব্যস্ততা। জিজ্ঞাসা করলেও স্পষ্ট করে কিছু বলে না। সাবিত ভেবে ইয়ত্তা পায় না।

সাবিত মনে মনে ঠিক করেছে রুবার সঙ্গে যত দিন দেখা হবে তত দিনই অন্তত একটা বই গিফট করবে। যেহেতু ঢাকা যাবে টাঙ্গাইল হয়েই, ভেবেছিল স্টেশন নেমে রুবার সঙ্গে দেখা করে যাবে। এ বিষয়ে রুবার সঙ্গে কয়েক দিন আগে কথা হয়।

সাবিত: ১২ তারিখ ঢাকা যাবো ঘুরতে, ভাবছি টাঙ্গাইল নেমে তোমার সঙ্গে দেখা করব।

রুবা: ওমা, তাই নাকি!

পূর্বনির্ধারণ অনুযায়ী আজ সাবিতের ঢাকা ছাড়ার পালা। রুবা সাবিতকে বলে রাখে টাঙ্গাইল স্টেশন পৌঁছানোর কয়েক মিনিট আগে ফোন দিতে। সাবিত আগেই জানায় না। স্টেশনে পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে তারপর রুবাকে আসতে বলে।

সাবিত: হ্যাঁ, ১১টার দিকে আসিও স্টেশন।

রুবা: দেখা কি করা খুব জরুরি, এর আগে তো আসছিলা একটা উদ্দেশ্যে?

সাবিত: অনেক দিন ধরে দেখাও হয় না, আর ওখান দিয়েই যাব ভাবলাম দেখা করেই যাই। তোমার জন্য বই নিয়েছি দুটো।

রুবা: বুঝতে পারছি। কেন যে এত বই দাও, দিছোই তো আগে কয়েকটা?

সাবিত: তোমাকেই তো দিই, আর দেখা করব বই দেব না তা কি হয়।

১২ তারিখ দেখা করার কথা থাকলেও সম্ভব হয় না। হঠাৎ রুবা জানায় বিশেষ কারণবশত দেখা করা সম্ভব হবে না।

রুবা: সরি সাবিত, আমাকে বাসাইল যেতে হবে, দেখা করতে পারব না।

সাবিত: হঠাৎ বাসাইল?

রুবা: দরকার আছে, পরে বলবোনি।

সাবিত: দেখা করে গেলে হয় না?

রুবা: না, আগেই যেতে হবে। তুমি ফিরবা কবে?

সাবিত: হয়তো ১৫-১৬ তারিখ।

সাবিতের ইচ্ছে ছিল বইয়ের সঙ্গে বিশেষ কিছু দেবে; এক তোড়া ফুটন্ত কাঠগোলাপ। ক্যাম্পাস থেকে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। মমতাজউদ্দিন ভবনের পাশে কয়েকটি গাছে অনেক ফুটে থাকে। আগেই রুবাকে জানায়নি বিষয়টি। মনটা ভীষণ খারাপ, সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেল। কি আর করার, যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ কাজ না আসাটাই স্বাভাবিক। মন খারাপের বহিঃপ্রকাশ স্বরূপ সাবিত ম্যাসেঞ্জার নোটে ‘ফেইস হোল্ডিং ব্যাক টিয়ারস’ ইমোজি দেয়। তৎক্ষনাৎ রুবার নজরে পড়ে।

রুবা: সাবিত, কিছু হইছে তোমার?

সাবিত: না।

রুবা: তাইলে এই ইমোজি দিলা যে?

সাবিত: দিলাম এমনি।

রুবা: একটা কথা বলব?

সাবিত: হ্যাঁ, বলো।

রুবা: কিছু না, থাক।

সাবিতের বুঝতে বাকি নেই রুবা কি জিজ্ঞাসা করতে পারে।

আরও পড়ুন

সাবিত এবারই প্রথম ঢাকায়। এর আগে কখনো সুযোগ হয়নি আসার, সুযোগ হলেও ইচ্ছে করে আসেনি। একি অবস্থা! খালি মানুষ আর মানুষ। বাংলাবাজার, বাবুবাজার, গুলিস্তানে মাটি দেখে পা ফেলতে হয়। অসুস্থ যানবাহনে রাস্তা অচল। বিনোদন কেন্দ্রগুলোয়ও স্বস্তি নেই; ঠাসাঠাসি ভিড়। এ শহর মানুষের না, দূষণের। তবুও মানুষই বাস করে জীবিকার তাগিদে। সাবিত বরাবরই স্থিতিশীল স্থান পছন্দ করে। সব দিক বিবেচনা করলে সাবিতের সঙ্গে রাজশাহী শহরই প্রাসঙ্গিক। সুস্থ-সুন্দর জীবন যাপনের জন্য কোনো কিছুর ঘাটতি নেই। পুরো রাজশাহী বাদ, ক্যাম্পাসই যথেষ্ট।

সন্ধ্যার পর সাব্বির আর সাবিত বের হয়। বসে বাহাদুর শাহ পার্কে। চা খেতে খেতে প্রসঙ্গ আসে রুবার।

সাব্বির: রুবার কি অবস্থা, কথা হয় তোমার সঙ্গে?

সাবিত: হয় তো মাঝেমধ্যে, তবে আগের মতো নয়।

সাব্বির: আমার মনে হয় ও তোমাকে পছন্দ করে।

সাবিত: (গোপনীয়তা রক্ষা করে) কি জানি এমন কিছু তো ইঙ্গিত পাই নাই।

সাব্বির: তোমরা যে হারে কথা কইছো, এটাই তো মিন করে পছন্দ করে। মেয়ে মানুষ সহজে বলে না। তুমিও মনে হয় পছন্দ করতা?

সাবিত পছন্দ করে কি করে না এ প্রশ্নের উত্তর সাব্বিরকে দেয় না। একগাল হেসে এড়িয়ে যায়।

১৬ ডিসেম্বর। পূর্বনির্ধারণ অনুযায়ী আজ সাবিতের ঢাকা ছাড়ার পালা। রুবা সাবিতকে বলে রাখে টাঙ্গাইল স্টেশন পৌঁছানোর কয়েক মিনিট আগে ফোন দিতে। সাবিত আগেই জানায় না। স্টেশনে পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে তারপর রুবাকে আসতে বলে। স্টেশন থেকে রুবার বাসা কয়েক মিনিটের পথ, আসতে বেশি সময় লাগে না। কোলাহল মুক্ত স্টেশনের উত্তর পাশে পাতানো চেয়ারে একাকী বসে থাকে সাবিত। একটু পরপর তাকায় স্টেশনের প্রধান ফটকের দিকে। এই বুঝি আসছে রুবা! খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয় না। সাবিত আড়চোখে খেয়াল করে রুবার প্রতিটি কদম।

রুবা: কি খবর বলো, কেমন ঘুরলা ঢাকা?

সাবিত: সব মিলিয়ে খারাপ না, তবে আমার জন্য এ শহর না।

রুবা: হা হা, ঢাকা তো ঢাকাই।

সাবিত: সেদিন কী এমন কাজে ছিলা, আসতে পারলা না?

রুবা: পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য বাসাইল গেছিলাম।

সাবিত: পুলিশ ভেরিফিকেশন মানে, বুঝলাম না?

রুবা: পাসপোর্ট করতাছি, বাহিরে যাওয়ার ইচ্ছা আছে। আইএলটিএস কোর্স করতাছি অনলাইনে।

আরও পড়ুন

বাহিরে যাওয়ার কথা শুনে সাবিতের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। রুবা পাশে বসা থাকলেও সাবিতের ভেতরে যে দুমড়ে–মুচড়ে যাচ্ছে, তা বুঝতে পারে না।

সাবিত: এই ব্যাপার! তার জন্য বুঝি তোমাকে আগের মতো অনলাইনে পাওয়া যায় না?

রুবা: অনেকটা তাই, এ দেশে থাইকা কী করমু কও। পারলে তুমিও ট্রাই করো।

সাবিত: তোমার যে অনেক গ্যাপ পড়ে গেল?

রুবা: উপযুক্ত কারণ দেখাইলে মেলা দেশ ৪-৫ বছর স্টাডি গ্যাপ অ্যাকসেপ্ট করে।

সাবিত: (নরম স্বরে) চলেই যাবে তাহলে?

রুবা: এখনো মেলা দেরি, মেলা প্রসেস বাকি।

সাবিত: বিদেশে যাওয়ার ভুত চাপাইলো কে?

রুবা: (হেসে) দেশের যা পরিস্থিতি, বিদেশে চইলা যাওয়াই ভালো।

রুবা মিনিট ত্রিশেক সময় নিয়ে আসে। ততক্ষণে সময় পাড় হয়ে যায়। সাবিত চেয়েছিল রুবা বেশ কিছুক্ষণ থাকুক। কিন্তু কোনোভাবেই সম্ভব হয় না। ওর আম্মু একটু পরপর ফোন দিয়ে তাড়া দিচ্ছে দ্রুত ফিরতে। সাবিতের অনুরোধে দুজন একটু হাঁটাহাঁটি করে প্ল্যাটফর্মে। তারপর চা খাওয়ার জন্য আসে স্টেশনের বটতলায়। এ সময় সাবিত রুবার জন্য আনা বই দুটি গিফট দেয়। রুবা প্যাকেট খুলতে চাইলে সাবিত মানা করে, বইয়ের ভাঁজে চিঠি থাকায়। সাবিত চায়নি রুবার নজরে তখন চিঠিটা পড়ুক।

রুবার চা শেষ হলেও সাবিতের তখনো বাকি। চা হাতে নিয়ে সাবিত রুবাকে এগিয়ে দিতে যায়। ওরা পাশাপাশি হাঁটে।

সাবিত: বাহিরে যাবে বলে রিলেশন করছ না?

রুবা: ব্যাপারটা তা না, আসলে আমি রিলেশন করতে আগ্রহী নয়। এক্সট্রা বার্ডেন; ভয় করে।

সাবিত: ভয়, নাকি বেকার ছেলে বলে আগ্রহী নয়?

রুবা: কোনো মেয়ের মা–বাবা কি চায় তার মেয়েকে বেকার ছেলের হাতে তুলে দিতে?

সাবিত: বেকার তো আর সব সময় থাকবে না। নিশ্চয়ই ভালো কিছু করবে। এর জন্য একটু সময় তো দিতে হবে।

রুবা: তোমার মেয়ে হলে হয়তো তুমিও বেকার কারও কাছে বিয়া দিবা না।

সাবিত: আগে তো জানা–বোঝা দরকার। যদি তার দ্বারা ভালো কিছু করার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে কেন দেব না?

রুবা: বাস্তবতা আসলে ভিন্ন। এতটা সহজ না রে। থাক বাদ দাও এসব। বাহিরে যাও, দেশে থাকার দরকার নাই। তোমাদের যথেষ্ট স্কোপ আছে।

সাবিত: তুমি যেহেতু বললা ভেবে দেখব।

রুবা: বেশি ভাবার কিছু নাই, এটাই ভালো হবে।

একটা খালি রিকশা আসে। ইশারা করতেই থেমে যায়। রিকশায় উঠে রুবা হাত নাড়িয়ে বিদায় জানায়। সাবিত স্থিরদৃষ্টিতে রিকশা চলে যাওয়া দেখে যতক্ষণ দেখা যায়।

কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে রাজশাহীগামী ‘সিল্ক সিটি এক্সপ্রেস’ টাঙ্গাইল থেকে ছেড়ে যাবে বিকেল সাড়ে চারটার দিক। এখনো অনেক সময় বাকি। একজন নিরীহ বালকের মতো সাবিত বসে থাকে প্ল্যাটফর্মে। ওর ভীষণ একাকিত্ব লাগে। কারও সঙ্গে কথা বলতে পরলে ভালো লাগত ভেবে বেশ কয়েকজনকে নক দেয়। কাউকে না পেয়ে আবার রুবাকেই এসএমএস দেয়।

সাবিত: বাসায় গেছো?

রুবা: হ্যাঁ, আসলাম।

সাবিত: তাড়াতাড়ি চইলা গেলা, আমি একা একা বসে আছি। একদম ভালো লাগছে না।

রুবা: আমার তাড়া ছিল রে।

কয়েক মিনিট কোনো বার্তা আদান-প্রদান হয় না দুজনের। এরপর কিছুক্ষণ পর রুবা সাবিতকে নক দেয়।

রুবা: সাবিত?

সাবিত: বলো।

রুবা: কিছু না এমনি।

সাবিত জানে এভাবে ডাক দিয়ে কিছু না বলে এড়িয়ে যাওয়ার মানে। এর আগেও বেশ কয়েকবার রুবা কথা বলার একপর্যায়ে কখনো নাম ধরে নক করত, কখনো ‘একটা কথা জিজ্ঞাসা করি’, কখনো–বা ‘একটা প্রশ্ন করি, মাইন্ড করো না’ বলতো। বলতোই যা, প্রশ্ন কখনো করেনি। পরে করবে বলে এড়িয়ে গেছে নয়তো ‘থাক কিছু না’ বলে থেমে গেছে। রুবার বারংবার এমন প্রশ্নে এটাই স্পষ্ট সাবিত ওকে পছন্দ করে কি না নিশ্চিত হওয়া।

টাঙ্গাইল স্টেশনে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’–এর স্টপেজ নেই। চাঁপাইনবয়াবগঞ্জ থেকে কমলাপুর পর্যন্ত চারটি স্টপেজ মাত্র। চলে ঝড়ের বেগে। ‘কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস’ কে ক্রসিং দিতে পাঁচ মিনিটের ব্রেক নেয় এখানে। সিট ব্যতীত কারও দাঁড়িয়ে যাওয়ার অ্যাকসেস নেই। ধরতে পারলেই ডাবল জরিমানা। সিল্ক সিটি আসবে দেড় ঘণ্টা পর। সাবিত স্টেশন মাস্টারকে পরিচয় দিয়ে অনুরোধ করে ব্যবস্থা করে দিতে। কোনো বোঝাপড়া ছাড়াই যথারীতি ব্যবস্থা হয়ে যায়।

ট্রেনের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সাবিত দূরদেশে তাকিয়ে থাকে। ঝাপটা হওয়ার সঙ্গে ধুলা লাগে গায়। সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। আবারও বিভোর ভাবনার জগতে। ‘সেদিন যদি রুবা বই না চাইতো; হোক না সে মজা করে, বিনিময়ে আমাকেও যদি বই না দিত তাহলে কি এমন সম্পর্ক গড়ে উঠত? হয়তো উঠত না।’ গুরুত্বের বহিঃপ্রকাশ বিনিময় আর যোগাযোগ। হতে পারে সামান্য কিছু, তবে গভীরতা অতল। কেউ তল স্পর্শ করতে পারলেও অনেকে বোধদয় না। হাজার মাইল দূর থেকেও যেন পাশাপাশি। কিন্তু ক্ষণিকের দূরত্বও যদি বিনিময় আর যোগাযোগের আড়ালে থাকে তার ব্যবধানও অসীম।

মানুষের জীবনে বিশেষ কারো সঙ্গে পরিচয় হয় যার সান্নিধ্য সত্যিই ভোলার মতো না। সাবিত রুবাকে পছন্দ করে ঠিকই। কখনো বলতে পারেনি, রুবার পছন্দের সঙ্গে ব্যবধান থাকায়। সাবিতের ভাবনাজুড়ে শুধু রুবার স্মৃতি ঘুরপাক খেতে থাকে। ওর খুব অস্থির লাগে। যেন কী হারিয়েছে। কিন্তু কী হারিয়েছে সেটা জানা নেই। স্বাভাবিকের চেয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে থাকে। সাবিত নিজেকে প্রশ্ন করে, ‘রুবা সত্যি বিদেশ চলে যাবে? তাহলে কি ওর সঙ্গে আর দেখা হবে না? চাইলেও আগের মতো জমিয়ে কথা হবে না?’ সাবিত এ ভাবনার কোনো কূল-কিনারা পায় না।

*উৎসর্গ গল্পের রুবাকে।

*লেখক: মো. সবুজ আহমেদ, শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]