মক্কা-মদিনার ডায়েরি-৭
২২. মক্কার দিনলিপি: জুমার আগের রাত ও জুমার দিনের পরিবেশ
মসজিদুল হারামে প্রায়ই মাগরিবের নামাজের আগে মুসল্লিদের মধ্যে খাবারের প্যাকেট বিতরণ করা হয়। বিশেষত সোমবার আর বৃহস্পতিবার। প্যাকেটগুলোয় কিছু সুস্বাদু খেজুর, একটি বানরুটি, একটি দইয়ের কাপ আর পানির বোতল দেওয়া থাকে। খাবার পরিবেশনের পর সৌদি আরবের পানীয় গাওয়া পরিবেশন করা হয়।
বৃহস্পতিবার মাগরিবের নামাজের পর মসজিদুল হারামের চিত্র যেন পাল্টে যায়! মানুষ গিজগিজ করছে সব জায়গায়। ভিড়টা যেন বেড়েই চলেছে। মসজিদ কক্ষগুলোর মাঝামাঝি জায়গায় চেয়ারে বসে একজন মাওলানা (শায়খ) আলাপ-আলোচনা করছেন, তাঁকে ঘিরে বসে মনোযোগ দিয়ে আলোচনা শুনছেন মানুষজন। কিছু সাহায্যকারী ফ্লাস্কে করে সৌদি চা (গাওয়া) পরিবেশন করছেন। জুমার আগের রাতের আয়োজন এটি। এ আলোচনায় শায়খ ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। হেরেম শরিফের নামাজের বিভিন্ন কক্ষে আলাদা মাওলানা (শায়খ) আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন, এ জন্য লাউডস্পিকার বা মসজিদের সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহৃত হচ্ছে না।
মদিনার মসজিদে নববিতে ও বৃহস্পতিবার একই চিত্র দেখেছিলাম। তবে সেখানে আরও দেখেছিলাম ছোট বাচ্চা ও বিভিন্ন বয়সী যুবক মাওলানার সামনে কোরআন মুখস্থ করতে। বাচ্চারা কেমন হেলেদুলে কোরআন পড়ছিল, কেউ কেউ মাওলানা সাহেবকে পড়া দিচ্ছিল। মসজিদে নববিতে বহু খ্যাতিমান আলেম ও শায়খ থাকেন, যাঁরা নির্দিষ্ট খুঁটির (উস্তুওয়ানাহ) কাছে বা দরজার কাছে বসে নিয়মিত ছাত্রদের হাদিস, ফিকাহ এবং কোরআন শিক্ষা দেন। শিশুরা সাধারণত এদের কাছেই হিফজ শেখে।
এখানে সবাই পরিণত বয়সের মানুষ আলোচনা শুনছে, খেজুর খাচ্ছে, গাওয়া পান করছে। পুরো দোতলার এদিক থেকে ওদিক হেঁটে দেখলাম, সব নামাজের কক্ষগুলোর একই অবস্থা।
আগামীকাল জুমার নামাজ, মসজিদুল হারামে আমার প্রথম জুমা। আম্মাকে কীভাবে নিয়ে আসব ভাবছি। মদিনার মসজিদের তুলনায় মক্কার মসজিদের নকশা ভিন্ন। মদিনায় হুইলচেয়ারসহ নামাজ পড়া সহজ ছিল। মক্কায় হুইলচেয়ার নিয়ে দোতলায় নামাজ কীভাবে আসা যায় বোঝার চেষ্টা করছি। মক্কার ভিড় মদিনার চেয়ে অনেক বেশি, রুনা ভয় পাচ্ছে একা আম্মাকে নিয়ে হুইলচেয়ারসহ কীভাবে ঢুকবে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
পরদিন সকাল সকাল প্রস্তুত হয়ে রওনা হলাম মসজিদুল হারামে। আমরা সাধারণত বাব-আল-ওমরাহ গেট দিয়ে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করতাম। সেটি বন্ধ করে দিয়ছে, মানুষজন আরও পূর্ব দিকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল পার হয়ে কিং ফাহাদ গেটের দিকে যাচ্ছে। আমরাও সেই দিকে চললাম। কিং ফাহাদ গেটে ইহরাম পরাদের এক দিকে আর ইহরাম ছাড়াদের অন্য দিকে প্রবেশ করতে দিল। আমি খুশি হলাম, কারণ আমরা সবাই একসঙ্গে মসজিদের ভেতর প্রবেশ করতে পারলাম। মসজিদের এই অংশটি একেবারে নতুন করা হয়েছে। মার্চ ২০২৫ সালে এই অংশের কাজ শেষ হয়। এ অংশের নকশা, মার্বেল, টাইলস, ঝাড়বাতি সব একেবারে নতুন আর ঝকঝকে, খুবই সুন্দর। নারী ও পুরুষ আলাদা নামাজের কক্ষ। আম্মা আর রুনাকে পৌঁছে দিয়ে পাশে পুরুষদের জন্য নামাজকক্ষে প্রবেশ করলাম। আম্মকে নিয়ে যা ভয় পাচ্ছিলাম, তা দূর হয়ে গেল। আল্লাহ চাইলে সবকিছু সহজ হয়ে যায়। নামাজ শেষে ফিরে গেলাম রুমে।
২৩. শেষের কথা—
ফিরে যাওয়ার নির্দিষ্ট ঘর আছে বলেই ভ্রমণ সুখকর। আমাদের ছেলে তাসিন আর মেয়ে ইরিনা দিন গুনছে, কখন বাবা, মা, দাদা আর দাদি ফিরে আসবে। প্রতিদিন ভিডিওকলে কথা হচ্ছে, যখন-তখন যোগাযোগ হচ্ছে, তবু কাটে না মনের শূন্যতা।
সময় শেষ হয়ে এল, আমরা ফিরে যাব যার যেখানে ঘর। মন পড়ে থাকবে এই মক্কা শহরে। মনে পড়বে মসজিদে নববিতে কাটানো সময়গুলোকে। আমাদের কাফেলার সবাই মালপত্র বাঁধা আর গোছানোতে ব্যস্ত, আমরাও। নতুন করে অনেক কিছু কি না হয়েছে সব গুছিয়ে নিতে হবে, যা কিছু নিয়ে এসেছিলাম তা-ও বাদ দেওয়া যাবে না। সবকিছুই নিয়ে যাচ্ছি তবু কেমন যেন সব হারানোর সুর করুণ হয়ে মনে বাজছে। মোয়াল্লেম সাহেব দেখা করে গেলেন, কয়টায় বিমানবন্দরে রওনা হব জানিয়ে গেলেন। নিজ থেকেই বললেন, আগামী কয়েক দিন মক্কা আর মদিনার জন্য মন খারাপ লাগবে। আমাদের অতিথিরা দেশে ফিরে আমাদের ফোন করে বলে ভাই, ‘ঘুমাতে পারছি না, চোখ বন্ধ করলে মসজিদুল হারাম ভেসে ওঠে, মসজিদে নববি ভেসে ওঠে চোখে। বিভিন্ন স্মৃতি মনে পড়ে। আবার কখন আসতে পারব জানি না, আল্লাহর ঘরে আমার জন্য দোয়া করবেন।’
এ কয়েকটা দিন ভালোই ছিলাম, জানতে চাইনি পৃথিবী কেমন চলছে। দেশ আর বিশ্বের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কিছুই মনে আসেনি। কাবা শরিফে কয়েকজন আরব ডেকে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কোথা থেকে এসেছেন?’ শুনে অবাক হয়েছিলাম! আরবরা তো ইংরেজি বলতে পারে না বা বলতে পছন্দ করে না। উত্তর দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলাম, ‘তোমরা?’ উত্তর ছিল, ‘ইরান।’ অজান্তেই বলেছিলাম, তোমরা সাহসী, তোমাদের সাহস সুপারসনিক মিসাইলগুলোর মতো চমৎকার। ওরা খুশি হয়েছিল কি না বোঝা যায়নি। তবে আমি খুশি হয়েছি আরবরা ইংরেজি বলছে দেখে, আমি খুশি হয়েছি সৌদি আরবের সার্বিক ব্যবস্থাপনা দেখে। আবার যদি আসার সুযোগ হয়, তবে হয়তো দেখব ওরা আরও বিশ্বজনীন হয়ে উঠেছে। ওদের ব্যবস্থাপনা আরও শৈল্পিক রূপ নিয়েছে।
আরবের মানুষগুলোর ব্যবহার মাঝেমধ্যে একটু কঠোর মনে হয়েছে, বিশেষ করে মসজিদুল হারাম আর মসজিদুল নববির নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত কিছু আরবের ব্যবহারে মনে কষ্ট লেগেছে। নিরাপত্তার খাতিরে তাদের একটু কঠোর হতে হয়, মেনে নিয়েছি। বিশেষ করে সেই ট্যাক্সিচালক আরবটার ব্যবহার মনে গাঁথা থাকবে, যাঁকে হোটেলের কার্ড দেখিয়ে ভাড়া করার পর অন্য একটি গলিতে জোর করে নামতে বলেছিল। মানুষের মনে খারাপটাই বেশি মনে থাকে! অন্য চালকগুলো সবাই ভালোই ছিল, বেশির ভাগ পাকিস্তানি। একজন মাত্র বাংলাদেশি চালকও পেয়েছি—উত্তরবঙ্গের। খুব ভালো লেগেছিল ছেলেটাকে। হয়তো নিজের দেশের ছেলে বলে! আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধা। মদিনার বাসিন্দা আরব ট্যাক্সিচালকের কথা মনে থাকবে। বেশ মজার ছিল, ড. মুহাম্মদ ইউনূছ, শেখ হাসিনা সবাইকে চেনেন! আরবি ইংরেজি মিশিয়ে জানতে চাইল, কে ভালো।
সৌদি আরব বিশাল দেশ, ঘোরার জায়গার অভাব নেই। ইচ্ছা থাকলেও যাওয়া হলো না তায়েফ, রিয়াদ এমনকি মক্কার একদম পাশে জেদ্দায়। তাবুক যাওয়ার ইচ্ছা ছিল, সেখানে নাকি বরফ পড়ে। দিক শূন্য মরুপ্রান্ত ঘুরে বেড়াতে চেয়েছি, আল-উলা যাতে চেয়েছি। সময় হয়ে ওঠেনি। মক্কা আর মদিনাতেই কত কিছু না দেখা রয়ে গেল। কোথা থেকে একটা মায়া যেন জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে আবার কখন ফেরা হবে? শেষ...
লেখক: মুহম্মদ কামরুল হাসান সিদ্দিকী, তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা