লাইভ ওয়েট বা জীবিত ওজন নির্ণয়ের মাধ্যমে কোরবানির পশু কেন কিনব?
বর্তমানে বাংলাদেশে কোরবানির পশুর অর্থনীতি ৫০ থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে প্রতিবছর ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশের হাটবাজারগুলোয় কমবেশি ১ কোটির মতো পশু বেচাকেনা হয়ে থাকে। অথচ এত বড় এই বাজারে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পশুর দাম নির্ধারণ করা হয় আন্দাজ, অভিজ্ঞতা ও দর-কষাকষির ভিত্তিতে। ফলে একজন সাধারণ ক্রেতার মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে-তিনি কি সঠিক দামে পশুটি কিনতে পারছেন, নাকি কোনোভাবে ঠকে যাচ্ছেন?
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ প্রশ্নের একটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে লাইভ ওয়েট বা জীবিত ওজনভিত্তিক পশু ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এই পদ্ধতিতে পশু ক্রয়-বিক্রয় ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বিশেষ করে খামারভিত্তিক পশু বিক্রি, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বিস্তার এবং বেঙ্গল মিটের মতো বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে লাইভ ওয়েট পদ্ধতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। শহুরে ব্যস্ত মানুষ, অনলাইনে পশু ক্রয়কারী ক্রেতা, পশুর ওজন ও প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে কম অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা এবং হাটে গিয়ে ঝামেলা এড়াতে ইচ্ছুক মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের ক্রেতাদের মধ্যে এই পদ্ধতির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
এ প্রসঙ্গে বেঙ্গল মিট কোম্পানির কোরবানি প্রজেক্ট-২০২৬-এর প্রধান নাদিম হোসাইন বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে ২০১৪ সালে মাত্র ৮০টি পরিবারের কাছে লাইভ ওয়েট পদ্ধতিতে অনলাইনে কোরবানির গরু বিক্রি এবং হালাল উপায়ে জবাই প্রক্রিয়া সম্পন্নের পর মাংস পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে তাদের কোরবানি কার্যক্রম শুরু হয়। সর্বশেষ কোরবানি ঈদে প্রায় ১ হাজার ২০০ পরিবারের কাছে তাঁরা একই পদ্ধতিতে মানসম্মত কোরবানির গরুর মাংস পৌঁছে দেন। আসন্ন ঈদেও প্রায় ১ হাজার ৭০০ পরিবারের কাছে এ সেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। গত এক দশকে তাদের এ কার্যক্রমের পরিধি হাজার গুণ বেড়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
লাইভ ওয়েটে কোরবানির গরু ক্রয় বিষয়ে শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা মুহা. নাজমুল হক জানান, তিনি তিন বছর ধরে অনলাইনের মাধ্যমে রাজশাহীর একটি খামার থেকে এ পদ্ধতিতে গরু কিনছেন। চলতি বছরেও তিনি লাইভ ওয়েটে প্রায় ৪০০ টাকা কেজি দরে একটি গরু কেনার পরিকল্পনা করেছেন। এ পদ্ধতিতে গরু কেনার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, লাইভ ওয়েটে গরু কিনলে দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা কম থাকে এবং ঠকে যাওয়ার ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে কম। পাশাপাশি ঘরে বসেই গরু কেনা সম্ভব হওয়ায় হাটে যাওয়ার ঝামেলা এড়ানো যায়। তাঁর মতো ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের শহরাঞ্চলের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের একটি অংশ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় লাইভ ওয়েট পদ্ধতিতে পশু ক্রয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
লাইভ ওয়েটে পশুর ওজন নির্ণয় পদ্ধতি কী এবং এ পদ্ধতিতে কীভাবে ওজন নির্ধারণ করা হয়?
বৈজ্ঞানিকভাবে পশুর লাইভ ওয়েট নির্ণয়ের দুটি পদ্ধতি রয়েছে। প্রথমটি হলো ডিজিটাল বা যান্ত্রিক স্কেলের সাহায্যে সরাসরি জীবিত পশুর ওজন নির্ণয় করা। দ্বিতীয়টি হলো ফিতার সাহায্যে পশুর বুকের বেড় ও শরীরের দৈর্ঘ্য মেপে একটি সূত্রের মাধ্যমে পশুর আনুমানিক ওজন নির্ধারণ করা।
ক. ডিজিটাল স্কেলের সাহায্যে ওজন নির্ণয়
লাইভ ওয়েট পদ্ধতিতে পশুর ওজন নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ডিজিটাল স্কেলের মাধ্যমে জীবিত অবস্থায় পশুর মোট ওজন সরাসরি নির্ধারণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে পশুকে স্কেলের ওপর দাঁড় করিয়ে ওজন নেওয়া হয়।
উদাহরণস্বরূপ, একটি গরুকে ডিজিটাল স্কেলে ওজন করার পর যদি তার লাইভ ওয়েট ৪০০ কেজি পাওয়া যায়, তবে সেটিই হবে তার প্রকৃত জীবিত ওজন। উল্লেখ্য, এ পদ্ধতিতে প্রাপ্ত ৪০০ কেজি ওজনের মধ্যে গরুর নাড়িভুঁড়িসহ শরীরের সব অংশের ওজন অন্তর্ভুক্ত থাকে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
খ. ফিতার সাহায্যে ওজন নির্ণয়
ফিতার সাহায্যে পশুর ওজন নির্ণয়ের ক্ষেত্রে গরুর বুকের বেড় (Heart Girth) ও শরীরের দৈর্ঘ্য (Length) মেপে নির্ধারিত সূত্র প্রয়োগ করা হয়। এ ক্ষেত্রে পশুকে সমতল স্থানে চার পায়ে সমানভাবে ও স্থির অবস্থায় দাঁড় করাতে হয়। প্রথমে সামনের দুই পায়ের ঠিক পেছন দিয়ে বুকের চারপাশ ঘুরিয়ে বুকের বেড় সঠিকভাবে মাপ নিতে হয়। এরপর কাঁধের হাড়ের সংযোগস্থল থেকে লেজের গোড়া পর্যন্ত শরীরের দৈর্ঘ্য মাপা হয়। পরে নির্ধারিত সূত্র প্রয়োগ করে আনুমানিক লাইভ ওয়েট নির্ণয় করা হয়।
ফিতার সাহায্যে ওজন নির্ণয়ের সূত্র হলো:
পশুর ওজন (কেজি) = (বুকের বেড় × বুকের বেড় × শরীরের দৈর্ঘ্য) ÷ ৬৬০
এখানে, পশুর বুকের বেড় ও শরীরের দৈর্ঘ্যের মাপ ইঞ্চিতে নিতে হয় এবং ফলাফল কেজিতে পাওয়া যায়।
উদাহরণস্বরূপ, একটি গরুর শরীরের দৈর্ঘ্য ৮০ ইঞ্চি এবং বুকের বেড় ৭০ ইঞ্চি হলে-
আনুমানিক ওজন হবে (৮০ × ৭০ × ৭০) ÷ ৬৬০ = ৫৯৩.৯৩ কেজি (প্রায়)
উল্লেখ্য, এ পদ্ধতিতে প্রাপ্ত ৫৯৩.৯৩ কেজি ওজনের মধ্যে গরুর নাড়িভুঁড়িসহ শরীরের সব অংশের ওজন অন্তর্ভুক্ত থাকে।
ড্রেসিং পারসেন্টেজ কী? এর মাধ্যমে কীভাবে লাইভ ওয়েট থেকে পশুর মাংসের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়? ÷
ড্রেসিং পারসেন্টেজ (Dressing Percentage-DP) হলো কোনো পশুর জীবিত অবস্থার মোট ওজনের (Live Weight) তুলনায় জবাইয়ের পর প্রাপ্ত খাওয়াযোগ্য হাড়সহ মাংসের (Carcass Weight) শতকরা হার। সহজভাবে বলতে গেলে, একটি পশু জবাই করার পর যে পরিমাণ খাওয়াযোগ্য মাংস ও হাড় পাওয়া যায়, তা জীবিত অবস্থার মোট ওজনের কত শতাংশ—তাই হলো ড্রেসিং পারসেন্টেজ।
ড্রেসিং পারসেন্টেজ নির্ণয়ের সূত্র হলো—
Dressing Percentage= (Carcass Weight ÷ Live Weight) × 100
এখানে,
Carcass Weight = জবাইয়ের পর প্রাপ্ত হাড়সহ খাওয়াযোগ্য মাংসের ওজন
Live Weight = পশুর জীবিত অবস্থার মোট ওজন
এই সূত্রের মাধ্যমে পশুর লাইভ ওয়েটের তুলনায় কত শতাংশ হাড়সহ খাওয়াযোগ্য মাংস পাওয়া যাবে, তা নির্ণয় করা হয়।
ড্রেসিং পারসেন্টেজ সাধারণত পশুর ধরন, জাত, বয়স, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক অবস্থা এবং বডি কন্ডিশন স্কোরের ওপর নির্ভর করে।
আমাদের দেশে ভালো বডি কন্ডিশন স্কোরের কোরবানির ষাঁড় গরুর ক্ষেত্রে ড্রেসিং পারসেন্টেজ সাধারণত ৫৬ থেকে ৬২ শতাংশের মধ্যে থাকে। তবে এটি মোটামুটি ৫২ থেকে ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত পরিবর্তিত হতে পারে।
ষাঁড় মহিষের ক্ষেত্রে ড্রেসিং পারসেন্টেজ সাধারণত ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ। অন্যদিকে খাসি ছাগল ও ভেড়ার ক্ষেত্রে এটি প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ হয়ে থাকে। তবে গাভি, পাঁঠি ছাগল/ভেড়া ও মাদি মহিষের ড্রেসিং পারসেন্টেজ ক্ষেত্রে সাধারণত ষাঁড় গরু, ষাঁড় মহিষ ও খাসি ছাগল/ভেড়ার তুলনায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কম হয়। অর্থাৎ, স্ত্রী পশু থেকে তুলনামূলকভাবে কম মাংস পাওয়া যায়।
পশুর লাইভ ওয়েট জানার পর সেই ওজনের সঙ্গে ড্রেসিং পারসেন্টেজ প্রয়োগ করে আনুমানিক কত কেজি খাওয়াযোগ্য হাড়সহ মাংস পাওয়া যাবে, তা নির্ধারণ করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, ভালো বডি কন্ডিশন স্কোরের একটি ষাঁড় গরুর লাইভ ওয়েট ডিজিটাল স্কেল বা ফিতার মাধ্যমে মেপে ৩০০ কেজি পাওয়া গেল। যদি গরুটির ড্রেসিং পারসেন্টেজ ৬০ শতাংশ ধরা হয়, তাহলে—
খাওয়াযোগ্য হাড়সহ মাংস পাওয়া যাবে, ৩০০ কেজি × ০.৬০ = ১৮০ কেজি
অর্থাৎ, ৩০০ কেজি লাইভ ওজনের একটি গরু থেকে আনুমানিক ১৮০ কেজি খাওয়াযোগ্য হাড়সহ মাংস পাওয়া সম্ভব।
একইভাবে, একটি খাসি ছাগলের লাইভ ওয়েট যদি ৩০ কেজি হয় এবং ড্রেসিং পারসেন্টেজ ৫০ শতাংশ ধরা হয়, তাহলে—
খাওয়াযোগ্য হাড়সহ মাংস পাওয়া যাবে, ৩০ কেজি × ০.৫০ = ১৫ কেজি
অর্থাৎ, ৩০ কেজি লাইভ ওজনের একটি খাসি ছাগল থেকে আনুমানিক ১৫ কেজি খাওয়াযোগ্য হাড়সহ মাংস পাওয়া যেতে পারে।
ড্রেসিং পারসেন্টেজ ব্যবহার করে কীভাবে লাইভ ওয়েট থেকে পশুর আনুমানিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়?
এই পদ্ধতিতে সাধারণত লাইভ ওয়েটের সঙ্গে ড্রেসিং পারসেন্টেজ (Dressing Percentage) প্রয়োগ করে একটি পশু থেকে কী পরিমাণ খাওয়াযোগ্য হাড়সহ মাংস পাওয়া যাবে, তার হিসাব নির্ণয় করা হয়। এরপর প্রাপ্ত মাংসের পরিমাণকে বাজারে প্রচলিত প্রতি কেজি মাংসের দামের সঙ্গে গুণ করে পশুর আনুমানিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, ভালো বডি কন্ডিশন স্কোরের একটি ষাঁড় গরুর লাইভ ওয়েট ডিজিটাল স্কেল বা ফিতার মাধ্যমে মেপে ৩০০ কেজি পাওয়া গেল। সাধারণভাবে এ ধরনের গরু থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ ড্রেসিং পারসেন্টেজ বা হাড়সহ মাংস পাওয়া সম্ভব। সে হিসাবে ৩০০ কেজি ওজনের একটি গরু থেকে আনুমানিক ১৮০ কেজি হাড়সহ মাংস পাওয়া যাবে।
এখন যদি বাজারে প্রতি কেজি মাংসের মূল্য ৮০০ টাকা ধরা হয়, তাহলে গরুটির আনুমানিক মূল্য দাঁড়ায়—
১৮০ কেজি × ৮০০ টাকা = ১,৪৪,০০০ টাকা।
অর্থাৎ, ওই গরুর সম্ভাব্য বাজারমূল্য হবে প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।
অনুরূপভাবে, উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, ভালো বডি কন্ডিশন স্কোরের একটি খাসি ছাগলের লাইভ ওয়েট ডিজিটাল স্কেল মেপে ৩০ কেজি পাওয়া গেল। সাধারণভাবে এ ধরনের খাসি ছাগল থেকে প্রায় ৫০ শতাংশ ড্রেসিং পারসেন্টেজ বা হাড়সহ মাংস পাওয়া সম্ভব। সে হিসাবে ৩০ কেজি ওজনের একটি খাসি ছাগল থেকে আনুমানিক ১৫ কেজি হাড়সহ মাংস পাওয়া যাবে।
এখন যদি বাজারে প্রতি কেজি মাংসের মূল্য ১ হাজার ২০০ টাকা ধরা হয়, তাহলে খাসি ছাগলটির আনুমানিক মূল্য দাঁড়ায়—
১৫ কেজি × ১২০০ টাকা = ১৮,০০০ টাকা।
অর্থাৎ, ওই খাসি ছাগলের সম্ভাব্য বাজারমূল্য হবে প্রায় ১৮ হাজার টাকা।
লাইভ ওয়েট পদ্ধতিতে পশুর ওজন নির্ণয় কতটা বৈজ্ঞানিক এবং কতটা নির্ভুল?
লাইভ ওয়েট পদ্ধতিতে পশুর ওজন নির্ণয় বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই খামার, ফিডলট ও মাংস শিল্পে জীবিত পশুর ওজন এবং কারকাস ওজনের ভিত্তিতে পশুর মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
দেশে বর্তমানে ব্যবহৃত ডিজিটাল স্কেলের মাধ্যমে লাইভ ওয়েট নির্ণয়ে সাধারণত ৯৫ থেকে ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত নির্ভুল তথ্য পাওয়া সম্ভব। তবে পশুর ভরা পেট, অতিরিক্ত পানি পান, গর্ভাবস্থা, জাতভেদ কিংবা স্কেলের ত্রুটির কারণে কিছুটা পার্থক্য দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে বুকের বেড় ও শরীরের দৈর্ঘ্য মেপে ফিতার সাহায্যে ওজন নির্ণয়ের পদ্ধতিতেও তুলনামূলকভাবে ভালো ফল পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে সাধারণত ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত নির্ভুলতা অর্জন সম্ভব। তবে সঠিক ফল পেতে পশুকে সমতল স্থানে চার পায়ে সমানভাবে ও স্থির অবস্থায় দাঁড় করিয়ে বুকের বেড় ও শরীরের দৈর্ঘ্যের সঠিক মাপ নিতে হয়।
লাইভ ওয়েট পদ্ধতিতে পশু কেনার সময় ক্রেতার কী কী সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত?
লাইভ ওয়েট পদ্ধতিতে পশুর ওজন নির্ধারণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে, যেগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ না করলে প্রকৃত ওজন নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। বাস্তবে অনেক বিক্রেতা পশুর ওজন কোন অবস্থায় নেওয়া হয়েছে, সেটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন না। ফলে ক্রেতার পক্ষে প্রকৃত লাইভ ওয়েট সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ডিজিটাল স্কেলে একটি পশুকে খালি পেটে ওজন করলে যে ওজন পাওয়া যায়, ভরা পেটে ওজন করলে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। কেননা খালি পেট ও ভরা পেট অবস্থায় ওজন নেওয়ার কারণে পশুর ওজনে ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত পার্থক্য দেখা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ৩০০ কেজি লাইভ ওয়েটের একটি গরুকে যদি ১২ ঘণ্টা খাবার না দিয়ে ওজন করা হয়, তবে সেটিকে তার প্রকৃত ওজনের কাছাকাছি ধরা যায়। কিন্তু একই গরুকে ভরা পেটে ওজন করলে তার ওজন প্রায় ৩২০-৩৩০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে অর্থাৎ পশুকে খাদ্য খাওয়ানোর ফলে ২০-৩০ কেজি পর্যন্ত ওজন বাড়তে পারে। অনুরূপভাবে, ছাগলের ক্ষেত্রে ৫-৬ কেজি পর্যন্ত ওজন বৃদ্ধি পেতে পারে।
এ কারণে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি অনুযায়ী, লাইভ ওয়েট নির্ধারণের আগে পশুকে অন্তত ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত খাবার প্রদান থেকে বিরত (অফ-ফিড) রাখা উচিত। সাধারণত পশুকে রাতে খাবার বন্ধ রেখে পরদিন সকালে খালি পেটে ওজন নেওয়াকে সবচেয়ে নির্ভুল পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তাই লাইভ ওয়েটে পশু কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতার অবশ্যই নিশ্চিত হওয়া উচিত যে পশুটির ওজন নেওয়ার অন্তত ১২ ঘণ্টা আগে তাঁকে খাবার প্রদান থেকে বিরত রাখা হয়েছে। অন্যথায় প্রকৃত ওজন ও ন্যায্যমূল্য নির্ধারণে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে এবং ক্রেতাকে অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ করতে হতে পারে।
অনুরূপভাবে ফিতার সাহায্যে পশুর ওজন নির্ধারণের ক্ষেত্রে পশুকে সমতল স্থানে চার পায়ে সমানভাবে ও স্থির অবস্থায় দাঁড় করানো জরুরি। এরপর সামনের দুই পায়ের ঠিক পেছন দিয়ে বুকের চারপাশ ঘুরিয়ে বুকের বেড় সঠিকভাবে মাপ নিতে হবে। পাশাপাশি কাঁধের হাড়ের সংযোগস্থল থেকে লেজের গোড়া পর্যন্ত শরীরের দৈর্ঘ্য সঠিকভাবে মাপা হয়। এসব ধাপ সঠিকভাবে অনুসরণ না করলে প্রকৃত ওজন ও ন্যায্যমূল্য নির্ধারণে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে এবং ক্রেতাকে অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধের ঝুঁকি থেকে যেতে পারে।
লাইভ ওয়েট পদ্ধতিতে পশুর ক্রয়-বিক্রয় কতটা শরিয়তসম্মত?
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে ক্রয়-বিক্রয়ের মৌলিক শর্ত হলো পণ্য বৈধ হতে হবে, মূল্য ও পণ্যের পরিমাণ স্পষ্ট হতে হবে, কোনো ধরনের প্রতারণা বা অস্পষ্টতা থাকা যাবে না এবং উভয় পক্ষের পূর্ণ সম্মতি থাকতে হবে।
লাইভ ওয়েট পদ্ধতিতে যেহেতু পশুর ওজন সরাসরি মেপে তার ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণ করা হয়, তাই এতে পণ্যের পরিমাণ ও দাম—উভয়ই তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট থাকে। এ কারণে অনেক ইসলামি আলেম ও ফিকহ বিশেষজ্ঞের মতে, এটি শরিয়তসম্মত এবং বৈধ (জায়েজ) লেনদেনের আওতাভুক্ত। বরং প্রচলিত আন্দাজনির্ভর বিক্রয় পদ্ধতির তুলনায় এটি বেশি স্বচ্ছ ও অস্পষ্টতামুক্ত।
তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে এ পদ্ধতি বৈধ হওয়ার জন্য কিছু শর্ত অবশ্যই মানতে হবে। যেমন—
—ওজন মাপার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ভুয়া বা অতিরিক্ত দেখানো যাবে না
—স্কেলে কারচুপি বা প্রতারণা করা যাবে না
—ওজন নেওয়ার পদ্ধতি (খালি পেট বা ভরা পেট) আগে থেকেই পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করতে হবে
—ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে দাম ও শর্ত আগেই স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হতে হবে
অতএব, সততা, স্বচ্ছতা এবং পারস্পরিক সম্মতি বজায় থাকলে লাইভ ওয়েট পদ্ধতিতে পশু ক্রয়-বিক্রয়ে শরিয়তের কোনো বাধা নেই।
লাইভ ওয়েট পদ্ধতিতে পশুর ওজন নির্ণয় ও আনুমানিক মূল্য নির্ধারণ বিষয়ে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুরের অ্যানিমেল সায়েন্স অ্যান্ড নিউট্রিশন বিভাগের অধ্যাপক ড. এ বি এম রুবাইয়াত বোস্তামী বলেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত আন্দাজনির্ভর পদ্ধতিতে পশুর ওজন ও মূল্য নির্ধারণ মূলত অভিজ্ঞতা, চোখের আন্দাজ ও দর-কষাকষির ওপর নির্ভরশীল। ফলে এতে স্বচ্ছতা তুলনামূলকভাবে কম এবং নতুন ক্রেতাদের জন্য বিভ্রান্তি ও প্রতারণার ঝুঁকি বেশি থাকে। অন্যদিকে, লাইভ ওয়েট পদ্ধতিতে পশুর প্রকৃত জীবিত ওজনের ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণ করা হয়, যা তুলনামূলকভাবে বেশি বৈজ্ঞানিক, স্বচ্ছ ও পরিমাপযোগ্য। এতে প্রতারণার সুযোগ কমে আসে এবং ক্রেতা সহজেই বুঝতে পারেন তিনি কতটুকু সম্ভাব্য মাংসের মূল্যের বিপরীতে পশুর মূল্য পরিশোধ করছেন। তিনি মনে করেন, বর্তমানে এই পদ্ধতিতে কোরবানির পশু ক্রয়ের প্রবণতা বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে এটি আরও বিস্তৃত হবে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, পশুর প্রকৃত ওজনভিত্তিক মূল্য নির্ধারণে লাইভ ওয়েট পদ্ধতি একটি অধিক স্বচ্ছ, ন্যায্য ও বাজারবান্ধব ব্যবস্থা। এটি ক্রেতার ঝুঁকি কমিয়ে আনে এবং পশুর বাজার ব্যবস্থাপনায় একটি স্বচ্ছ ও ন্যায্যমূল্য নির্ধারণপ্রক্রিয়া গড়ে তুলতে সহায়তা করে। তাই আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর পশুর বাজারব্যবস্থায় লাইভ ওয়েট পদ্ধতির আরও সম্প্রসারণ দরকার। এ লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগে এ পদ্ধতির সুবিধা নিয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো এবং হাটসহ সব পশু বিক্রয়কেন্দ্রে ডিজিটাল স্কেলে ওজন নির্ধারণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
লেখক: ব্যবস্থাপক, পিকেএসএফ।