আমি বৃষ্টি ভালোবাসি
এখন আষাঢ়। আকাশজুড়ে ঘন কালো মেঘ। চারপাশ ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসে। তারপর শুরু হয় টিপটিপ বৃষ্টি। কখনো আবার মুষলধারে। কী অপূর্ব সেই দৃশ্য! আষাঢ় যেন প্রকৃতির এক অনন্ত রূপকথা। কখনো শান্ত, কখনো উচ্ছ্বসিত, কখনো উদাস, কখনো দুরন্ত।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। হঠাৎ বৃষ্টির ফোঁটা এসে গালে ছুঁয়ে গেল। বারান্দায় দাঁড়ালেও ভিজে যায় শরীর। কিন্তু তারও আগে ভিজে যায় মন। সেই স্পর্শে হৃদয়জুড়ে নেমে আসে এক অদ্ভুত শান্তি।
রাতে ঘুমানোর আগে জানালা বন্ধ করতে ভুলে গেছেন। গভীর রাতে বৃষ্টির ঠান্ডা ফোঁটা এসে আপনাকে জাগিয়ে দিল। তারপর আর ঘুম নয়। বৃষ্টির সঙ্গে গল্প করতে করতে কেটে গেল বাকি রাত। এর চেয়ে নির্মল আনন্দ আর কী হতে পারে?
কিন্তু এই শহরের মানুষগুলো যেন বৃষ্টিকে ভয় পায়। বৃষ্টি নামলেই ঘরে গুটিয়ে বসে থাকে। আর কেউ যদি ভালোবেসে বৃষ্টিতে ভিজে, তাকে এমনভাবে দেখে যেন সে মহা অপরাধ করেছে। ছেলে ও মেয়ে একসঙ্গে বৃষ্টিতে হাঁটলে, হাসলে কিংবা খুনসুটি করলে কত অদ্ভুত দৃষ্টিই না তাদের সহ্য করতে হয়!
অথচ আমাদের শৈশব ছিল অন্য রকম। চাচাতো ভাই–বোন মিলে বৃষ্টিতে ভিজেছি। কাদামাঠে ফুটবল খেলেছি। সন্ধ্যায় পড়তে বসে ঘুমিয়ে পড়েছি। তারপর মায়ের বকুনি খেয়েছি। আজ বুঝি, সেই বকুনির মধ্যেও ছিল ভালোবাসা, ছিল জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলোর গন্ধ।
বৃষ্টি পবিত্র। বৃষ্টি না হলে ফসল ফলত না। নদী বাঁচত না। পুকুর ভরত না। পৃথিবী সবুজ হতো না। তবু সামান্য জলাবদ্ধতা হলেই আমরা বৃষ্টিকে দোষ দিই। অথচ শহরের খাল ভরাট করেছি আমরা। নদী দখল করেছি আমরা। ড্রেনে ময়লা ফেলে পানি চলার পথ বন্ধ করেছি আমরা। তারপর বলি, ‘বৃষ্টির জন্যই মানুষ কষ্ট পাচ্ছে।’ সত্যিই কি তা–ই? নাকি দায় আমাদেরই?
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
আমাদের কাছে বৃষ্টি যেন শুধু বাংলা সিনেমার নায়ক–নায়িকার রোমান্টিক দৃশ্য হয়ে গেছে। অথচ শৈশবে বৃষ্টির দিনে আম কুড়ানোর আনন্দ কোথায় হারিয়ে গেল? বৃষ্টির পানিতে জাল ফেলে মাছ ধরার উচ্ছ্বাস? মেঘ ডাকলে অগভীর পানিতে উঠে আসা কই মাছ ধরার সেই রোমাঞ্চ? টিনের চালের ওপর বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে অজানা স্বপ্নে হারিয়ে যাওয়ার দিনগুলো?
আজ শিশুরা সেই শৈশব পাচ্ছে না। তাদের স্মৃতিতে বৃষ্টির গন্ধ নেই। কাদামাটির স্পর্শ নেই। ভেজা মাঠ নেই। তাই বৃষ্টি তাদের কাছে আনন্দ নয়, কেবল ভোগান্তি।
আমাদেরই এই দূরত্ব ভাঙতে হবে। সন্তানকে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজুন। মাঠ না থাকলে ছাদে দাঁড়ান। তাকে আপনার শৈশবের গল্প শোনান। তাকে শেখান, বৃষ্টি মানে শুধু ছাতা নয়; বৃষ্টি মানে জীবন, স্মৃতি ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক গভীর আত্মীয়তা।
আমি এতটাই বৃষ্টিপ্রেমী ছিলাম যে, এক বন্ধুর নামই বদলে দিয়েছিলাম। তার আসল নাম ছিল শীলা। আমি তাকে ডাকতাম ‘বৃষ্টি’ বলে। আর নিজের নাম বলেছিলাম ‘আকাশ’। নিছক ছেলেমানুষি। কিন্তু সেই নামের মধ্যেও ছিল বৃষ্টিকে আপন করে পাওয়ার এক অদ্ভুত আনন্দ।
আমরা যাঁরা নব্বইয়ের দশকে গ্রামে বড় হয়েছি, তাঁদের কাছে আষাঢ় শুধু একটি মাস নয়; একটুকরা জীবন। এক গভীর ভালোবাসা। এক অনন্ত হাহাকার। আজও টিনের চালের ওপর বৃষ্টির শব্দ শুনলে মনে হয়, শৈশব দরজায় কড়া নাড়ছে। মনে হয়, কোথাও একজন হারিয়ে যাওয়া আমি এখনো ভিজে চলেছি অবিরাম বৃষ্টিতে।
আসুন, বৃষ্টিকে আর শুধু দুর্ভোগের চোখে না দেখি। তাকে ভালোবাসি। তাকে আপন করে নিই। কারণ, বৃষ্টি শুধু আকাশ থেকে ঝরে পড়া জল নয়; বৃষ্টি আমাদের স্মৃতি, আমাদের শিকড়, আমাদের মায়া, আমাদের জীবনের সবচেয়ে নির্মল অনুভূতিগুলোর একটি।