দারিদ্র্যের নতুন ঢেউ ও নীতির চ্যালেঞ্জ

১.

গত নভেম্বরে বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের দারিদ্র্য ও বৈষম্য মূল্যায়ন ২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে। এর আগের বছরও ৩০ লাখের বেশি মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন। অর্থাৎ দুই বছরে প্রায় অর্ধকোটি মানুষ দারিদ্র্যের বলয়ে ঢুকে পড়েছেন।

ওই প্রতিবেদনে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের কাছাকাছি থেকে নেমে ২০২৫ সালে প্রায় ৪ শতাংশে দাঁড়ানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। প্রবৃদ্ধি কমে গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে, আয় বাড়ার সুযোগ সংকুচিত হয়, আর নিম্নআয়ের মানুষ প্রথম ধাক্কাটা সামলান—কখনো নীরবে, কখনো ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে।

এর আগে গত এপ্রিলে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করে বলেছিল, অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ধীরগতির কারণে বাংলাদেশে চলতি বছর নতুন করে ৩০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের কবলে পড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা—দৈনিক ২ দশমিক ১৫ ডলার আয়ের নিচে—ব্যবহার করে বিশ্বব্যাংক বলছে, হতদরিদ্রের হার ২০২২ সালের ৫ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৯ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, জাতীয় দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২ দশমিক ৯ শতাংশে যেতে পারে। দুটি ভিন্ন মানদণ্ড হলেও বার্তাটি এক—দারিদ্র্য বাড়ছে।

নব্বইয়ের দশক থেকে বিভিন্ন সরকারের আমলে দারিদ্র্য বিমোচনের নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। বিশেষ করে ২০০০ সালের পর এই কর্মসূচিগুলোর গতি বাড়ে। এর ফল হিসেবে দারিদ্র্য হ্রাসে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।

২.

সাধারণত দারিদ্র্যকে সংজ্ঞায়িত করা হয় সমাজস্বীকৃত জীবনযাত্রার মান বজায় রাখার মতো সম্পদের অভাব হিসেবে। কিন্তু এই ‘স্বীকৃত মান’দেশ ও সময়ভেদে বদলায়। সরকারগুলো কখনো কখনো নিজেদের সাফল্য দেখাতে দারিদ্র্যসীমা নিয়েও কারসাজি করে। বিশ্বব্যাংক দৈনিক মাথাপিছু ২ দশমিক ১৫ ডলার (চরম দারিদ্র্য), ৩ দশমিক ৬৫ ডলার ও ৬ দশমিক ৮৫ ডলার—এমন কয়েকটি বৈশ্বিক সীমা নির্ধারণ করেছে। সময়ের সঙ্গে চরম দারিদ্র্য কিছুটা কমলেও উচ্চতর সীমায় দরিদ্রের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। যেমন ২০১৯ সালে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ দৈনিক ৩ দশমিক ৬৫ ডলারের নিচে বেঁচেছে আর প্রায় অর্ধেক পৃথিবীর মানুষ ৬ দশমিক ৮৫ ডলারের নিচে।

অন্যদিকে সম্পদের বিস্তার অবিশ্বাস্য হারে বেড়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী আটজনের সম্পদ সমান নিচের ৪০০ কোটির মোট সম্পদ।

আমাদের দেশে দারিদ্র্য বৃদ্ধির মোটাদাগে তিনটি কারণ আছে। প্রথমত, জিনিসপত্রের দাম যে হারে বেড়েছে, সেই হারে আয় বাড়েনি। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) সাম্প্রতিক এক জরিপ বলছে, শহরের একটি পরিবারের গড়ে মাসিক আয় ৪০ হাজার ৫৭৮ টাকা। খরচ হয় ৪৪ হাজার ৯৬১ টাকা। জাতীয়ভাবে একটি পরিবারের মাসে গড় আয় ৩২ হাজার ৬৮৫ টাকা। খরচ হয় ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা। সঞ্চয় নেই বললেই চলে। ক্রয়ক্ষমতার এই অবক্ষয় মানুষকে ধীরে ধীরে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়।

দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থানের সংকট। সংখ্যায় কর্মসংস্থান বাড়লেও মানসম্মত ও স্থায়ী চাকরি বাড়েনি। শিক্ষিত বেকারের হার উদ্বেগজনক—স্নাতকদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ বেকার। মোট বেকার প্রায় ২৬ লাখের বেশি। চাহিদা অনুসারে কর্মসংস্থান হয়নি, বরং কমেছে। ২০১৬ সালের পর শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের অংশীদারত্ব আনুপাতিক হারে বাড়েনি। শুধু সংখ্যা বেড়েছে।

তৃতীয়ত, কোভিড মহামারির পর কৃষি খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে। এ ছাড়া অনানুষ্ঠানিক ও স্বল্পমজুরির কাজে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এর মানে, নিম্ন মজুরির কর্মসংস্থান বেশি হয়েছে, যা দারিদ্র্য কমাতে ভূমিকা রাখতে পারেনি। ফলে নিরঙ্কুশ দারিদ্র্য কিছুটা কমলেও আপেক্ষিক দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্য বাড়ছে।

সম্প্রতি যেসব উন্নয়নশীল দেশে দারিদ্র্যের হার হ্রাস পেয়েছে, সেসব দেশে কৃষির উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়েছে দ্রুত গতিতে। এই বাস্তবতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো চীন ও ভিয়েতনাম।

৩.

স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি। ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষই ছিল অতি দরিদ্র। সে সময় অতি দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৪৮ শতাংশ এবং সার্বিক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত প্রায় সাড়ে ৮২ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী তখন মৌলিক চাহিদা পূরণে সংগ্রাম করছিল।

এরপর পরবর্তী কয়েক দশকে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে। নব্বইয়ের দশক থেকে বিভিন্ন সরকারের আমলে দারিদ্র্য বিমোচনের নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। বিশেষ করে ২০০০ সালের পর এই কর্মসূচিগুলোর গতি বাড়ে। এর ফল হিসেবে দারিদ্র্য হ্রাসে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৪৯ শতাংশ। পরবর্তী ২২ বছরে এই হার প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। নিঃসন্দেহে এটি বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার একটি বড় অর্জন।

কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে আরেকটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে, আয় ও সম্পদের বৈষম্য দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩-৭৪ সালে দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে মোট আয়ের প্রায় সাড়ে ২৮ শতাংশ ছিল। একই সময়ে সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ মানুষের হাতে ছিল মোট আয়ের প্রায় ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। কিন্তু ২০২২ সালের হিসাবে এই বৈষম্য অনেক বেশি বেড়েছে। বর্তমানে দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে মোট আয়ের প্রায় ৪১ শতাংশ, আর সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ মানুষের ভাগে রয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৩১ শতাংশ। এই প্রবণতা স্পষ্ট করে যে অর্থনীতিতে সামগ্রিক আয় বাড়লেও সেই আয়ের বণ্টন সমানভাবে ঘটছে না।

আয়বৈষম্য পরিমাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো গিনি সহগ (Gini Coefficient)। এই সূচক শূন্য হলে ধরে নেওয়া হয় যে দেশে সম্পূর্ণ সমতা রয়েছে, অর্থাৎ সবার আয় সমান। অন্যদিকে সূচক যদি ১ হয়, তাহলে বোঝায় যে দেশের সব আয় একজন ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত। সাধারণত গিনি সূচক যত বাড়ে, আয় বৈষম্য তত তীব্র হয়। বাংলাদেশে গিনি সহগ ক্রমাগত বেড়েছে। ২০১০ সালে এই সূচক ছিল শূন্য দশমিক ৪৫৮। ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৪৮২-এ। আর ২০২২ সালের ‘হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে’ অনুযায়ী গিনি সহগ দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৪৯৯-এ। অর্থাৎ বাংলাদেশ প্রায় উচ্চ বৈষম্যের সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

এই বাস্তবতা উদ্বেগজনক। কারণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি সবার জীবনে সমানভাবে সুফল না আনে, তবে সেই উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। অর্থনীতিবিদ সায়মন কুজনেটস একসময় বলেছিলেন, উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে আয়বৈষম্য কিছুটা বাড়তে পারে, কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে তা কমে আসার কথা। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কুজনেটসের এই তত্ত্বের প্রথম অংশটিই সত্য হয়েছে, বৈষম্য বেড়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় অংশের প্রতিফলন এখনো দেখা যাচ্ছে না।

এর মানে হলো, দেশে আয় বৃদ্ধি পেলেও সমান সুযোগ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং সম্পদে প্রবেশাধিকার—এই ক্ষেত্রগুলোয় বৈষম্য এখনো প্রকট। অথচ, সুশিক্ষার সুযোগ, কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রসারিত করে এবং দারিদ্র্য নিরসনমূলক কর্মসূচির বিস্তার ঘটিয়ে আপেক্ষিক দারিদ্র্য কমিয়ে আনা সম্ভব।

সারা দেশে যখন দারিদ্র্য কমেছে ৭ শতাংশ, তখন কুড়িগ্রামে দারিদ্র্য বেড়েছে ৭ শতাংশ। এই জেলার ৭১ শতাংশ মানুষই গরিব।
প্রথম আলো ফাইল ছবি

৪.

সম্প্রতি যে সব উন্নয়নশীল দেশে দারিদ্র্যের হার হ্রাস পেয়েছে, সে সব দেশে কৃষির উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়েছে দ্রুত গতিতে। এই বাস্তবতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো—চীন ও ভিয়েতনাম। গত তিন দশকে এই দুই দেশে কৃষি উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি গড়ে ৪ শতাংশেরও বেশি ছিল। এর ফলাফল হিসেবে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে এবং দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। বর্তমানে এই দুই দেশে দারিদ্র্যের হার বিশ্বের সর্বনিম্ন পর্যায়ের মধ্যে রয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কৃষির উন্নয়ন দারিদ্র্য হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে জনপ্রতি খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়ে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়, কৃষকের আয় বৃদ্ধি পায় এবং খাদ্যশস্যের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে। একই সঙ্গে গ্রামীণ অঞ্চলে কৃষিবহির্ভূত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও প্রসার লাভ করে। ফলে সামগ্রিকভাবে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হয় এবং দারিদ্র্য কমতে শুরু করে।

বিভিন্ন গবেষণা বলছে, দারিদ্র্য হ্রাসে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি অন্যান্য খাতের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি এক শতাংশ বৃদ্ধি পেলে দারিদ্র্যের হার প্রায় ০.৪ শতাংশ কমে যায়। অর্থাৎ কৃষিতে সামান্য অগ্রগতিও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

আরেকটা বিষয় এখানে আলোচনায় আসতে পারে। বিশ্বের অধিকাংশ দরিদ্র মানুষ গ্রামে বাস করেন। বর্তমানে বিশ্বে দরিদ্র মানুষের প্রায় ৭৫ শতাংশই গ্রামীণ অঞ্চলে বসবাস করে। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এই হার প্রায় ৭২ শতাংশ, আফ্রিকায় ৭৫ শতাংশ এবং এশিয়ায় প্রায় ৮০ শতাংশ। এই জনগোষ্ঠীর বড় অংশই কৃষির ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল।

এই গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের সামনে বেশ কিছু বড় বাধা রয়েছে। তাঁদের অধিকাংশের জমি খুবই সীমিত, উন্নত কৃষিপ্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান কম এবং কৃষি উপকরণ সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের অভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা সামাজিকভাবেও অবহেলিত।

এই বাস্তবতায় দারিদ্র্য হ্রাসে একটি কার্যকর কৌশল হতে পারে—গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে কৃষির উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা। তাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা এবং আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ দিলে তারা পারিবারিক শ্রম ব্যবহার করে দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারে। এতে তাদের আয় বাড়বে এবং দারিদ্র্যও কমবে।

বাংলাদেশে এখনো গ্রামীণ দারিদ্র্যের হার তুলনামূলকভাবে বেশি।

২০২২ সালের এইচআইইএম-এর সমীক্ষা অনুযায়ী গ্রামীণ এলাকায় নিরঙ্কুশ দারিদ্র্যের হার ২০ দশমিক ৫ শতাংশ, যেখানে শহরে এর হার ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখায় যে দারিদ্র্য সমস্যার মূল কেন্দ্র এখনো গ্রামাঞ্চলেই।

৫.

ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক পলিসি ও রাজনৈতিক বিজ্ঞানের অধ্যাপক অনিরুদ্ধ কৃষ্ণ, দরিদ্রতা নিয়ে তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, দারিদ্র্য কোনো স্থির অবস্থা নয়, বরং এটি একটি গতিশীল প্রক্রিয়া। তাঁর বই ‘One Illness Away (২০১০)’ -তে তিনি দেখিয়েছেন, অনেক মানুষ একটি বড় অসুখ বা আকস্মিক আর্থিক ধাক্কার কারণে হঠাৎ করেই দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যায়। অর্থাৎ দারিদ্র্য শুধু আয় কম থাকার বিষয় নয়; এটি সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

অন্যদিকে আরেক অর্থনীতিবিদ ডার্ক ফিলিপসেন তাঁর আলোচিত বই 'The Little Big Number (২০১৫)' -এ জিডিপির সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, জিডিপি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণ মাপে, কিন্তু মানুষের কল্যাণ বা সামাজিক অগ্রগতির পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না। একটি দেশের জিডিপি বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধি যদি সমাজের বড় অংশের জীবনে উন্নতি না আনে, তাহলে সেই উন্নয়নকে অর্থবহ বলা কঠিন।

অনিরুদ্ধ কৃষ্ণ কয়েক দশক ধরে কেনিয়া, উগান্ডা, মালাউই, ভারত, বাংলাদেশ, জ্যামাইকা, পেরু এবং যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয় গবেষকদের দল নিয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা বোঝার জন্য কাজ করে আসছেন।

আর, ডার্ক ফিলিপসেন, একজন রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ, যিনি এমন একটি বৈশ্বিক চিন্তাধারার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত, যার লক্ষ্য অর্থনৈতিক চিন্তাকে নতুনভাবে গড়ে তোলা, যাতে মানুষের কল্যাণ এবং পৃথিবীর পরিবেশ উভয়ই সমান গুরুত্ব পায়।

এই দুই গবেষকের মতে, দারিদ্র্য নিয়ে আমাদের তিনটি প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। এর প্রথমটি হচ্ছে দারিদ্র্য চিরন্তন। দ্বিতীয়টি হচ্ছে: দারিদ্র্য মানেই টাকার অভাব। আর তৃতীয়টি হচ্ছে দারিদ্র্য স্বসৃষ্ট। তাদের মতে এই ধারণার কোনোটাই পুরোপুরি সঠিক নয়।

তাঁদের মতে, দারিদ্র্যতা হলো পছন্দ তথা সুযোগের অভাব যা সমাজে কার্যকরভাবে অংশগ্রহণ করার মৌলিক ক্ষমতার অভাবকে বোঝায়। এই অভাবের মধ্যে রয়েছে, পরিবারের জন্য খাবার ও পোশাকের অপর্যাপ্ততা, স্কুল এবং ক্লিনিকের অভাব, খাদ্য উৎপাদনের জন্য জমি বা জীবিকা নির্বাহের জন্য চাকরি কিংবা ঋণ গ্রহণের ব্যবস্থা না থাকাকে বোঝায়।

তাঁরা আরও মনে করেন, অধিকাংশ মানুষ কঠোর পরিশ্রম করেও অনিশ্চয়তার কারণে দরিদ্র হয়ে পড়ে। সমাজই ঝুঁকি বাড়ায়, সুযোগ কমায়। অনেকে জন্মগতভাবে দরিদ্র নয়, কিন্তু অসুখ, চাকরি হারানো, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা পারিবারিক বিপর্যয়ে দরিদ্র হয়ে পড়ে। তা ছাড়া এক বিশাল ‘প্রিকারিয়েট’ শ্রেণি-মধ্যবিত্তেরও বড় অংশ—সব সময় প্রান্তসীমায় বাস করে।

আরও পড়ুন

৬.

দারিদ্র্যকে অনেক সময় ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু বাস্তবে এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, জমি ও পুঁজিা—এসব সুযোগের অসম বণ্টনের কারণেই দারিদ্র্য দীর্ঘস্থায়ী হয়। তাই দারিদ্র্য কমাতে হলে শুধু অর্থসহায়তা নয়; বরং একটি সমন্বিত নীতি প্রয়োজন। নীতির মধ্যে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো থাকতে হবে -

প্রথমত, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা দারিদ্র্য কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ দক্ষতা অর্জন করে এবং ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। বিশেষ করে কারিগরি ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণ করলে তরুণদের কর্মবাজারে অংশগ্রহণ বাড়বে।

দ্বিতীয়ত, টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। শিল্পায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন, এবং গ্রামীণ অর্থনীতির শক্তিশালীকরণ নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারে। শুধু শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন নয়, গ্রামীণ এলাকাতেও বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।

তৃতীয়ত, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, খাদ্যসহায়তা ও নগদ সহায়তা কর্মসূচি দরিদ্র মানুষের জীবনের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এসব কর্মসূচি যেন প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে পৌঁছে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা জরুরি। একটি পরিবারের একজন সদস্য গুরুতর অসুস্থ হলে পুরো পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে যেতে পারে। তাই দরিদ্র মানুষের জন্য সহজ ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করা দরকার।

আরও পড়ুন

৭.

গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নতুন সরকার হিসেবে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। বিএনপি (২০২৬ সালের) নির্বাচনী ইশতেহারে দারিদ্র্য বিমোচনের মূল লক্ষ্য হিসেবে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর ওপর জোর দিয়েছে:

• টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি: দারিদ্র্য-পীড়িত ও পশ্চাৎপদ অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা।

• দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূরীকরণ: দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে বৈষম্য কমানো।

• অর্থনৈতিক উন্নয়ন: উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে দারিদ্র্য কমানোর রোডম্যাপ।

নিঃসন্দেহে ভালো ও সময়োপযোগী পরিকল্পনা। আশা করি, সরকারে গিয়ে এখন তারা বিষয়গুলো বাস্তবায়নে জোর দেবে। সেই সঙ্গে আমাদের এটিও মনে রাখতে হবে, সুশাসন ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া দারিদ্র্য কমানো সম্ভব নয়। উন্নয়নমূলক কর্মসূচির সুফল যদি মাঝপথে হারিয়ে যায়, তবে দারিদ্র্য দূর করার সব পরিকল্পনাই ব্যর্থ হবে। স্বচ্ছ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলেই উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরে পৌঁছাবে।

* লেখক: কলামিস্ট

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]