‘ও পারলে তুমি পারবে না কেন?’
ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে পরিচিত এক ছেলের বিদেশে বৃত্তি পাওয়ার পোস্ট চোখে পড়ল। নিচে মন্তব্যের ঘরে অভিনন্দন আর গর্বের কথার ভিড়। এমন ভালো খবর দেখে নিজেরও ভালো লাগল।
ঠিক এই পোস্টই হয়তো অন্য কোনো বাড়িতে কারও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। কেউ ফোনটা আরেকজনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলছেন, ‘দেখেছ, অমুক কত ভালো জায়গায় সুযোগ পেয়েছে? ও পারলে তুমি পারবে না কেন?’
কথাটা হয়তো উৎসাহ দিতেই বলা হয়। কিন্তু যাকে বলা হলো, তার কানে বাজে অন্য রকম: তাহলে এত দিন যা করেছি, তার কোনো দামই নেই?
অথচ ছেলেটা কাউকে তুলনা করতে বলেনি। সে শুধু নিজের একটা ভালো খবর জানিয়েছিল। আনন্দটা ছিল ওর। তুলনাটা অন্য কারও।
এমন তুলনা অবশ্য অন্য কেউ বলার আগেই আমরা নিজেরাও করে ফেলি। একটু স্ক্রল করলেই কারও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার খবর, কারও চাকরি, কারও নতুন ফ্ল্যাট। পাঁচ মিনিটে যেন কয়েকজন মানুষের কয়েক বছরের অর্জন দেখে ফেলি। তারপর নিজের জীবনটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হয়, সবাই এতদূর চলে গেল, আমি এখনো এখানেই কেন? আমরা ওদের হাইলাইট রিলের পাশে নিজের আন–এডিটেড ফুটেজ বসিয়ে দেখি। অন্যের জন্য খুশি হওয়া আর নিজের জন্য দুশ্চিন্তা করা, দুটো একসঙ্গেই হতে পারে।
স্ক্রিনে আমরা সাধারণত ফলটাই দেখি। কেউ হয়তো দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে সুযোগ পেয়েছে। আগের বছরের ব্যর্থতা আর অপেক্ষা পোস্টে আসে না। বৃত্তির ছবিটা দেখি, কিন্তু কত জায়গায় আবেদন করেছে, কোথায় উত্তর আসেনি, কোথায় ভুল হয়েছে, তার কতটুকুই বা জানি? রিজেকশন ই–মেইলের স্ক্রিনশট দিয়ে ‘ফিলিং গ্রেটফুল’ লেখা পোস্ট অবশ্য খুব একটা দেখা যায় না। আর সেই অসম্পূর্ণ ছবিই কখনো নিজের বিরুদ্ধে ব্যবহার করি, কখনো অন্য কারও বিরুদ্ধে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
ঈদের দাওয়াতেও রেহাই নেই। বিরিয়ানি খেতে বসেছেন, এমন সময় আত্মীয়স্বজনের কেউ জানতে চাইলেন, ‘অমুকের তো চাকরি হয়ে গেছে, তুমি এখনো কী করছ?’ বিরিয়ানির সঙ্গে নিজের ক্যারিয়ারের হিসাবও দিতে হবে, কে জানত!
আবার কারও নতুন ফ্ল্যাটের ছবি দেখে বলা হলো, ‘ওদের দেখো, কত গুছিয়ে নিয়েছে।’ ছবিতে সুন্দর বাড়িটা দেখা যায়। ব্যাংকের কত কিস্তি বাকি, সেটা তো আর ছবির ক্যাপশনে থাকে না।
যাকে নিয়ে এত হিসাব, সে হয়তো জানেই না, কারও খাবার টেবিলে সে এখন একটা মাপকাঠি।
বৃত্তি পাওয়া একজনের প্রস্তুতি থেকে অবশ্যই শেখা যায়। ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ পাওয়া কারও পড়ার কৌশলও কাজে লাগতে পারে। কিন্তু একজন সফল হয়েছে বলে তার পথটাই সফলতার নিশ্চিত ফর্মুলা হয়ে যায় না।
একইভাবে চেষ্টা করে যারা সুযোগ পায়নি, তাদের গল্প আমাদের সামনে কতবার আসে? শুধু সফলদের দেখে পুরো পথটা বিচার করার এ প্রবণতাকেই বলা হয় সারভাইভারশিপ বায়াস।
২০২১ সালে ‘জাজমেন্ট অ্যান্ড ডিসিশন মেকিং’ সাময়িকীতে প্রকাশিত জর্জ লিফচিটস ও তাঁর সহকর্মীদের এক গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের এক দলকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ না করা সফল উদ্যোক্তাদের উদাহরণ দেখানো হয়, আরেক দলকে দেখানো হয় পড়াশোনা শেষ করা সফল উদ্যোক্তাদের উদাহরণ। পরে নতুন একটি প্রতিষ্ঠানের সফলতার সম্ভাবনা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হলে দুই দলের উত্তরে বড় পার্থক্য দেখা যায়। উদাহরণগুলো যে বাছাই করা, তা বুঝতে পারার পরও পার্থক্যটা ছিল।
সফল মানুষের অভিজ্ঞতা থেকেও শেখার আছে। ও কীভাবে প্রস্তুতি নিল, কোথায় ভুল করল, কোন সিদ্ধান্ত কাজে দিল, সেসব নিজের জন্যও কাজে লাগতে পারে। কিন্তু কারও ফাইনাল স্কোর দেখে নিজের হাফটাইমের হিসাব মেলানো যায় না।
আর যাকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে, তার নিজের অবস্থাটা আমরা কতটা জানি? সে কতটা চেষ্টা করছে, কোথায় আটকে আছে, কী সুযোগ পেয়েছে বা পায়নি, এসব না জেনেই হয়তো কারও ভালো খবর সামনে ধরে প্রশ্ন করা হচ্ছে, তুমি এখনো কেন পারোনি?
যাঁরা ‘ও পারলে তুমি পারবে না কেন?’ বলেন, তাঁদের অনেকেই সত্যিই চান আমরা ভালো কিছু করি। কিন্তু ‘তুমি পারবে’ আর ‘ও পারলে তুমি পারবে’ এক কথা নয়। প্রথমটায় আমার ওপর বিশ্বাস, দ্বিতীয়টায় অন্য কারও গল্পের সঙ্গে আমাকে বেঁধে ফেলা।
বৃত্তি পাওয়া ছেলেটার পোস্টে তখনো অভিনন্দন জমছে। সে হয়তো মন্তব্যগুলোর উত্তর দিতে ব্যস্ত।
আর অন্য কোনো বাড়িতে সেই একই পোস্ট দেখিয়ে একজনকে বলা হচ্ছে, ‘ও পারলে তুমি পারবে না কেন?’
আমার গল্পটা এখনো লেখা হচ্ছে। ড্রাফটের স্ক্রিনশট কেউ পোস্ট করে না।
*লেখক: সাজিদুর রহমান তাহসিন, একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী, ঝাউতলা, কুমিল্লা সদর, কুমিল্লা