ফুটপাতের বিস্ময়: যার চোখের মায়ায় থমকে দাঁড়ায় শহর

রাসেদ। জামগড়া, আশুলিয়া, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ছবি: লেখক

শহরের ব্যস্ততম ফুটপাতের এক কোণে, যেখানে ধুলা আর ধোঁয়ার রাজত্ব, সেখানে একজোড়া চোখ থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। নীল আর সবুজের এক অদ্ভুত মিশ্রণে গড়া সেই চোখ দুটো যেন কোনো নাম না–জানা গভীর সমুদ্রের গল্প বলে। এই চোখ দুটোর মালিক ছোট্ট ‘রাসেদ’। বয়স বড়জোর চার কি পাঁচ।

​রাসেদের পরনের মলিন পোশাক আর অবিন্যস্ত চুল বলে দেয় বিলাসিতা তার জীবন থেকে বহুদূরের পথ। তার বাবা একজন দিনমজুর এবং মা গৃহিণী। নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর সংসারে রাসেদের এই চোখগুলোই যেন একমাত্র মূল্যবান সম্পদ। কিন্তু এই সম্পদের চেয়েও দামি তার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা একচিলতে অকৃত্রিম হাসি।

​রাসেদের মা রহিমার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জন্মের পর থেকেই এই চোখ নিয়ে পাড়া-পড়শীর কৌতূহলের শেষ নেই। রহিমা বলেন, ‘মানুষ কয় ওর চোখ নাকি বিদেশিগো মতো। আমাগো মতো গরিবের ঘরে এমন চোখ আইলো কই থেইক্যা? আমি কই, আল্লা দিছে সুন্দর কইরা, হেইডাই বড় কথা।’ অভাবের সংসারে রাসেদ যখন খেলনা গাড়ির বদলে রাস্তার নুড়ি পাথর দিয়ে খেলে, তখন তার চোখের ওই গভীরতায় দারিদ্র্যের কোনো ছাপ দেখা যায় না। তার হাসিটা এতটাই সংক্রামক যে জ্যামে আটকে থাকা বিরক্ত যাত্রী কিংবা ক্লান্ত পথচারীও তার দিকে তাকিয়ে একবার অন্তত মুচকি হাসে।

​রাসেদের বাবা চান তাঁর ছেলে বড় হয়ে স্কুলে যাক। তিনি বলেন, ‘আমার তো পড়াশোনা নাই, কারখানায় সুতা কাটি। কিন্তু আমার পোলাডার চোখে আমি বড় স্বপ্ন দেখি। ওর এই উজ্জ্বল চোখ দুইটা যেন কোনোদিন অন্ধকারের ভিড়ে হারায় না যায়।’ রাসেদের এই চোখের প্রখর দৃষ্টি শুধু শৈশবের চপলতা নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক অদম্য আগামীর গল্প। তার বাবা স্বপ্ন দেখেন, রাসেদ বড় হয়ে এমন কিছু হবে যেন তাকে আর অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে না হয়। রাসেদ যখন রাস্তার ধারের বিলবোর্ডের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে কিছু দেখার চেষ্টা করে, তখন তার চোখের ওই নীল আভা যেন স্পষ্ট বলে দেয়—সে এই কংক্রিটের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে একদিন বিশাল আকাশের নিচে নিজের নাম লিখবে। দারিদ্র্য হয়তো তার বর্তমানকে শিকল দিয়ে বেঁধেছে, কিন্তু তার চোখের ওই জাদুকরি স্বপ্নকে আটকে রাখার সাধ্য কারও নেই।

আরও পড়ুন
নাগরিক সংবাদ–এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

শহরের ইট-পাথরের দেয়াল আর কঠোর বাস্তবতার মধ্যে রাসেদের এই হাসি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সুখ কোনো দামি আসবাব বা ব্যাংক ব্যালেন্সে থাকে না। সুখ থাকে অন্তরের প্রশান্তিতে আর একজোড়া উজ্জ্বল চোখের স্বচ্ছতায়। রাসেদ হয়তো জানে না তার এই চোখের মায়ায় কত মানুষ নতুন করে বাঁচার প্রেরণা পায়। সে শুধু জানে হাসতে, আর সেই হাসিতেই লুকিয়ে আছে আগামী দিনের এক সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন।

*লেখক: হামিম মন্ডল, আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা