আত্মশুদ্ধির পথে অনন্য এক যাত্রা: মক্কা পর্ব-২
মক্কার পথে হাঁটতে হাঁটতে কিছু দৃশ্য দেখে মন ভালো হয়ে যায়। যখন দেখি কোনো সন্তান হুইলচেয়ার ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে মা–বাবাকে, যখন দেখি কোনো বৃদ্ধ স্বামী তাঁর স্ত্রীর হাত ধরে হাঁটছেন মসজিদের দিকে, যখন দেখি তাওয়াফ করার সময় স্বামী ঢাল হয়ে ভিড় আর ধাক্কা থেকে রক্ষা করছেন স্ত্রীকে, তখন এক অপার্থিব ভালো লাগায় আপ্লুত হই।
আমাদের হজ যাত্রায় মদিনার ৫ দিন যেমন শান্তিপূর্ণ কেটেছে, মক্কার গত এক সপ্তাহ সে রকমটি নয়। এখানে তাপমাত্রা বেশি, মানুষ বেশি, ঘটনা ও দুর্ঘটনাও বেশি। দুই সেকেন্ডের জন্য আমি মৃত্যুর মুখোমুখি হতে গিয়ে বেঁচে গিয়েছি, সেই গল্পে পরে আসছি।
মক্কায় প্রবেশের বিস্তারিত আগের পর্বে লিখেছি। সেই রাতে এশার নামাজ ও রাতের খাবার শেষে আমাদের কাফেলা তালবিয়া পড়তে পড়তে ওমরাহর উদ্দেশ্যে হোটেল থেকে রওনা হলো। ৭৯ নম্বর গেটে নুসুক কার্ড চেক করে সবাইকে পুলিশ ভেতরে ঢুকতে দিলেও আমাকে আটকে দিল। আমার পিঠের ব্যাগ তার পছন্দ হয়নি। ওটা জমা দিতে হবে লাগেজ জমার কাউন্টারে। একই ব্যাগ নিয়ে আমার স্ত্রী প্রবেশাধিকার পেলেও আমার কারণে সে আর প্রবেশ করল না। প্রথম ধাক্কা ছিল এটা। দ্বিতীয় ধাক্কা, লাগেজ জমার কাউন্টার খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কারণ, সেটা ছিল ৬ নম্বর হাম্মামের (বেজমেন্টের ওয়াশ রুম) পেছনে। সেটা খুঁজে পেতে সময় লাগল। অনেক হুজ্জত করে দুজন পিঠের ব্যাগ জমা দিলাম, বিনিময়ে পেলাম একটা করে কবজির ব্যান্ড স্টিকার, ওটা পরে থাকতে হবে এবং ওমরাহ শেষ করে ওটা ফেরত দিলে ব্যাগ ফেরত পাওয়া যাবে। পিঠের ব্যাগ থেকে স্যালাইন পানি ও জরুরি জিনিসপত্র বুকের ছোট ব্যাগে নিতে হলো।
আমাদের মোয়াল্লিম আগেই বলে দিয়েছিলেন, কেউ দলছুট হলে নিজের মতো ওমরাহ করে নিতে। এখানে সময় সীমিত, দুয়েকজনের জন্য গোটা কাফেলা অপেক্ষা করে না৷ আমি আর আমার স্ত্রী তাই ইরানি একটা কাফেলার সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে তাওয়াফ করতে ঢুকে গেলাম। কাবা শরিফ প্রথম দেখার অনুভূতি নিয়ে মহাকাব্য লেখা যায়, অনেকেই লিখেছেন। কিন্তু সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা আমার জন্য কঠিন। জানি না কি জাদুকরি আকর্ষণ আছে এই ঘরে। এর থেকে দৃষ্টি ফেরানো কঠিন। কঠিন একে প্রদক্ষিণরত অবস্থায় চোখের পানি ধরে রাখা।
আমরা দেখলাম, হাজরে আসওয়াদ (যাকে অপার্থিব পাথর বলা হয়) এর প্রতি মানুষের আবেগ সবচেয়ে তীব্র। তাকে একবার চুম্বন করার জন্য কেউ কেউ মনে হলো জীবন বাজি রাখতে রাজি! আমরা মাঝেমধ্যে কাবার খুব কাছে যাচ্ছিলাম, মাঝেমধ্যে একটু দূরত্বে। আমাদের লক্ষ্য ছিল মানুষকে ধাক্কা না দিয়ে যতটা সম্ভব আল্লাহর ঘরের কাছাকাছি থেকে তাওয়াফ করার। মাকামে ইব্রাহিম, যে পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) এই ঘর তৈরির কাজ তদারকি করতেন, সেটার কাচের বাক্স স্পর্শ করার সুযোগ পেয়েছি দুইবার। অভূতপূর্ব সেই অনুভব!
আপনজনেরা দেশে আছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করি কিন্তু ভিডিও কল কেন? তাও আবার মাসজিদে? অডিও কল কি যথেষ্ট নয়? তাদের সঙ্গে আমাদের কী কথা হচ্ছে, তারা ঘরে কী পোশাক পরে আছে, তারা কী খাচ্ছে—এসব ব্যক্তিগত বিষয় চলে আসছে জনসম্মুখে। সেই সঙ্গে মসজিদ, বাস/ট্রেন/বিমানে এভাবে কথা বলে অন্য হাজিদের ইবাদত ও মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে৷ সবকিছু লাইভ দেখাতে হবে কেন? এটা কি ঠিক?
আমাদের তাওয়াফ শেষ হলে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে আর পানি খেয়ে চলে গেলাম সাফা পাহাড়ের দিকে। সেখানে পেয়ে গেলাম আমাদের কাফেলাকে। কাফেলার সঙ্গে সাফা ও মারওয়া সাঈ করা হলো। মা হাজেরা (রা.) তাঁর দুধের শিশু ইসমাইলের জন্য পানি খুঁজতে যেভাবে দৌড়েছিলেন, তার মতো কি আমরা পারলাম? তা সম্ভব নয়। তবু তাঁর সেই আকুতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হাজিরা সবাই এই দুই পাহাড়ের মধ্যে সাতবার যাতায়াত করেন, দোয়া করেন আর কেউ কেউ সেখানেই কেবলামুখী হয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে যান। আমাদের ওমরাহ শেষ হলো রাত দেড়টায়। এরপর চুল ছেটে ইহরাম ছাড়লাম। সাধ মিটল না। মনে মনে নিয়াত করলাম আরেকবার ওমরাহ করার।
পরের দিন মক্কার তাপমাত্রা ছিল ৫১ ডিগ্রি। তবু মন হোটেলে থাকতে চায় না। নামাজ পড়লাম হারাম শরিফের ভেতরে বা চত্বরে, যখন যেখানে জায়গা পেয়েছি। মসজিদ আল হারামের চাকচিক্য মাসজিদে নববির চেয়ে অনেক বেশি৷ এর গেট, দেওয়াল আর সিলিংয়ের স্থাপত্য ও নকশা শুধু দৃষ্টিনন্দন নয়, রাজকীয়। এর প্রতিটি মিনার ও গম্বুজ যেন শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক। নামাজ ও কোরআন পড়ার পাশাপাশি আমি বেশ কিছু ছবি তুললাম এই বরকতময় ভবনের, যেখানে ১ ওয়াক্ত নামাজ অন্য মসজিদের লক্ষ ওয়াক্ত নামাজের সমতুল্য।
তবে প্রথম দিনই আমার স্ত্রীকে দুইবার হারিয়ে ফেললাম। নারীদের নামাজের স্থান আলাদা। সকালে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে কথা ছিল নামাজ শেষ করে আমরা ৯০ নম্বর গেটে অপেক্ষা করব। কিন্তু যথা সময়ে তাকে পেলাম না। ভুল করে সে ফোন ফেলে এসেছিল হোটেলে। তাই তার সঙ্গে যোগাযোগ করতেও পারছিলাম না। আধঘণ্টা অপেক্ষা করে আমি হোটেলে ফিরে এলাম; কারণ, চাবি আমার কাছে। একটু পর সে ফিরে পথ চিনে ফিরে এল। ভাগ্যিস তাকে আগেই রাস্তার কিছু দোকান ও হোটেল চিনিয়ে রেখেছিলাম। মাগরিবের নামাজেও প্রায় একই ঘটনা। আমরা স্থান পেয়েছিলাম ছাদে। নামাজ শেষে যে গম্বুজটির কাছে তাকে দাঁড়াতে বলেছিলাম। সেখানে পুলিশ তাকে দাঁড়াতে দেয়নি। এবার দুজনের সঙ্গেই ফোন ছিল, তাই পরস্পরকে খুঁজে পেতে কষ্ট হয়নি। বরং এই বিচ্ছেদ, হারিয়ে যাওয়া, ফিরে পাওয়ার মধ্যেও মাধুর্য আছে।
এক দিন বিরতি দিয়ে আমরা এশার নামাজ শেষে চলে গেলাম মাসজিদে আইশায়৷ হারাম শরিফ থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে মিকাত (হারাম শরিফের সীমানা) এর বাইরে এই মাসজিদ। আল মিসফালাহ রোড থেকে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করলাম, সে বেশ ঘুর পথে ১৬ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে আমাদের এনে গাড়ি থামাল রাস্তার ওপারে। রাত তখন ১০টা। গাড়ি থেকে নেমে আমি দ্রুত রাস্তা পার হতে গিয়ে ভুলে গেলাম এখানে নিয়ম বাংলাদেশের বিপরীত। রাস্তার বাম দিক দিয়ে সবাই গাড়ি চালায়, আর ড্রাইভিং সিট থাকে বাম পাশে। বাম দিক ফাঁকা দেখে আমি যে পা বাড়িয়েছি, অমনি এক পুলিশ চিৎকার করে আমাকে বিরত করল। ডানে তাকিয়ে দেখি তীব্র বেগে ছুটে আসছে বড় বড় গাড়ি। ২ সেকেন্ডে ওরা আমাকে পেরিয়ে গেল। তরুণ পুলিশটি আমাদের লক্ষ্য করছিল এবং সময় মতো সতর্ক করেছিল। না হলে আমাকে এক ধাক্কায় উড়িয়ে নিয়ে দূরে কোথাও ছুঁড়ে ফেলে দিতো সেই দ্রুত গতির গাড়ি, আমার বুকের হাড় আর মাথের খুলি এক হয়ে যেতো সেই রাতেই। আমার স্ত্রী কিছুটা হতভম্ব হয়ে পড়েছিল সেই মুহূর্তে। সেই রাতে দুর্ঘটনাটা ঘটে গেলে আমার এই ভ্রমণ কাহিনির বদলে হয়তো আমার মৃত্যু সংবাদ পড়তেন পাঠকেরা।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: ns@prothomalo. com
ভালো লাগার বিষয় লিখে আজকের পর্ব শুরু করেছি। শেষ করব কিছু তেতো কথা দিয়ে। অবশ্য হজে আসার আগে মুরব্বিরা বলে দিয়েছেন, যা কিছুই ঘটুক, মুখ খোলা যাবে না। ধৈর্য ধারণ করতে হবে। ইসলাম ধর্মে সাম্যের যে একটা বিশেষ মাহাত্ম্য আছে, তার একটা সুন্দর দৃষ্টান্ত তৈরি করে হজ। এখানে ভি আই পি, সিআইপি বলে কিছু নেই। ধনী-দরিদ্র, সাদা-কালো, সবাই এখানে এক। কী আমেরিকান, কী আফ্রিকান। কী ইরানি, কী পাকিস্তানি-সবার পরনে দুই টুকরা ইহরামের কাপড়, সবার জন্য একই নিয়ম, সবাইকে মসজিদের পুলিশের তাড়া খেতে হয়, বকা শুনতে হয়। তবু যারা বিত্তবান, তারা ভালো হোটেল, মিনায় বাড়তি কিছু সুযোগ–সুবিধা ইত্যাদি পেয়ে থাকেন। হজের সেসব বিস্তারিত বর্ণনায় আজ যাব না।
আজকের পর্বে তিনটি বিষয় নিয়ে কথা বলব, যাতে ভবিষ্যতে যারা হজে যাবেন, তাদের হয়তো সচেতন করবে।
১. খাবার অপচয়-আমাদের দেশের মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে ভিক্ষুক ও হকার। আর এ দেশে দাঁড়িয়ে থাকে সৌদির অধিবাসী বা তাদের প্রতিনিধিরা। তাদের কেউ আমাদের পানি দেয়, কেউ খাবার দেয়, কেউ বা বিনা মূল্যে তসবিহ বিতরণ করে। আমরা হাজিরা হাত পেতে সেগুলো নিই। যার প্রয়োজন নেই, সেও খাবার/পানীয় নিই। তারপর কিছুটা খেয়ে বাকিটা নষ্ট করি। একই দৃশ্য হোটেলেও। যেসব হজ এজেন্সি বুফে আয়োজন করেছেন, সেখানে খাবার নেওয়ার বিষয়ে কোনো সীমা নির্দিষ্ট করা নেই, তাই আমরা চোখের ক্ষুধা মেটাতে বেশি বেশি খাবার নিয়ে প্লেট ভরি। পেট ভরার পর অনেক খাবার ফেলে দিই। এটা কি ভালো?
২. ভিডিও কল-আমাদের আপনজনেরা দেশে আছে, তাদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করি কিন্তু ভিডিও কল কেন? তাও আবার মাসজিদে? অডিও কল কি যথেষ্ট নয়? তাদের সঙ্গে আমাদের কী কথা হচ্ছে, তারা ঘরে কী পোশাক পরে আছে, তারা কী খাচ্ছে—এসব ব্যক্তিগত বিষয় চলে আসছে জনসমক্ষে। সেই সঙ্গে মসজিদ, বাস/ট্রেন/বিমানে এভাবে কথা বলে অন্য হাজিদের ইবাদত ও মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে৷ সবকিছু লাইভ দেখাতে হবে কেন? এটা কি ঠিক?
৩. জামাতে নামাজ আদায়: আমরা সবাই জানি, মসজিদের ভেতরে স্থান অপর্যাপ্ত। এত মানুষের ঠাঁই সেখানে হবে না৷ তবু আমরা আজানের পর ভেতরে ঢুকে নামাজরত ব্যক্তির সামনে/পেছনে দাঁড়িয়ে জায়গা তৈরির চেষ্টা করি। এতে তাঁর নামাজের মনঃসংযোগ নষ্ট হয়। অল্প জায়গায় বেশি মানুষ দাঁড়ালে কেউই ঠিকঠাক নামাজ আদায় করতে পারে না। তবু আমরা দেরি করে যাই, আবার ভেতরেই বসতে চাই, বাইরের চত্বরে অনেক জায়গাজুড়ে কার্পেট বিছানো আছে। তবু দেরি করে গিয়েও আমরা ভেতরে গিয়ে হুড়াহুড়ি করি। এটা কি সহিহ?
একটা তীর্থযাত্রায় অনেক ঘটনা ঘটে। কিছু প্রীতিকর, কিছু অপ্রীতিকর। এটাও ধৈর্য বা সবরের পরীক্ষা। আল্লাহ তাঁর ঘরে আমাদের মেহমান হয়ে আসার তাওফিক দিয়েছেন। আমরা নিজেরাই যদি নিজেদের মর্যাদা না রাখতে পারি, তাহলে কীভাবে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত তুলে কিছু চাইব? সেই মুখ কি আমাদের থাকবে? চলবে...
*লেখক: কাজী মনজুর করিম মিতুল, প্রকৌশলী