আত্মার শুদ্ধতার পথে অনন্য এক যাত্রা: হজের মদিনা পর্ব

মসজিদে নববি। মদীনা. সৌদি আরবছবি: লেখক

পাইলট যখন বললেন, ‘মাগরিবের সময় হয়েছে, হাজিরা চাইলে এখন নামাজ আদায় করতে পারেন’, আমার ঘড়ি তখন বলছে, ঢাকায় রাত ৮টা। বিমানের জানালা দিয়ে বাইরে দেখছিলাম, আকাশের নীল বুকে লালিমার পোঁচ, যেন এক নিপুণ শিল্পী তুলি নিয়ে আকাশের বুকে মেঘ দিয়ে আঁকছেন বিমূর্ত চিত্র, অপরূপ তার সৌন্দর্য, অপার্থিব তার অনুভব।

আমাদের বিমান তখন ঢাকা থেকে পশ্চিমে মদিনার দিকে উড়ে চলেছে ভারতের ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে। আমরা যেহেতু পৃথিবীর আহ্নিক গতির বিপরীতে উড়ে চলেছি, সময় তাই পিছিয়ে যাচ্ছে। তাই ঢাকায় সূর্যাস্তের ঘণ্টা দেড়েক পর আমাদের মাগরিবের সময় হলো।

দেখতে দেখতে পবিত্র জিলহজ মাস এসে গেল। আমরা, মানে যারা পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে মদিনার পথে রওনা হয়েছি, আমাদের তায়াম্মুম করে নামাজ আদায় করতে হবে। বিমানে অজুর ব্যবস্থা নেই। কেন নেই? কাকে জিজ্ঞেস করব? টয়লেটে গিয়ে দেখলাম, অনেকেই বোতলে করে পানি নিয়ে পা ধুয়ে ফ্লোর থইথই করে রেখেছেন। এর সমাধান হতে পারত তায়াম্মুমের মাটি সঙ্গে রাখা। (মনে পড়ল, বল সাবানের আকারের একটুকরা মাটি কিনতে আমাকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের মার্কেটে যেতে হয়েছিল।)

থাক সে কথা। মদিনার বিমানবন্দরে আমাদের অভিজ্ঞতা বেশ ভালো, যদিও অনেক ভয় দেওয়া হয়েছিল। ভাষাগত সমস্যা ছাড়া আর কোনো কিছুই প্রতিকূল ছিল না। মোটামুটি সবার প্রায় সব লাগেজ পেয়ে গেলাম আমরা, মানে আমাদের কাফেলার ২৪ জন। বাসে উঠে হোটেলের পথে যখন রওনা হলাম, মদিনায় তখন রাত প্রায় ১১টা। ফ্লাইওভার, আন্ডারপাস আর ঝকঝকে সব অট্টালিকা দেখে মনে হচ্ছিল পশ্চিমের কোনো উন্নত দেশে এসেছি, প্রাচ্য নয়। অবশ্য রোড ডিভাইডারে খেজুরগাছগুলো আমাদের আরব্য স্বাগতম জানাচ্ছিল। হোটেলে পৌঁছে নুসুক কার্ড (এ বছর এই কার্ড ছাড়া হজ পালন নিষিদ্ধ করেছে সৌদি সরকার) ও সরকারি হাদিয়া (রাতের খাবার) পেয়ে গেলাম।

আমাদের হোটেলটা মসজিদে নববির কাছেই; তাই হেঁটেই যাওয়া-আসা করছিলাম। গরম এখানে ঢাকার তুলনায় অনেক বেশি, তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠে দুপুর বেলা। মসজিদ প্রাঙ্গণে তখন সুবিশাল ছাতা মেলে মুসল্লিদের ছায়ার ব্যবস্থা করা হয়, চালানো হয় মিস্ট ফ্যান (যা থেকে বাতাসের সঙ্গে জলীয়বাষ্প নির্গত হয়)।

বৃহস্পতিবার জোহরের নামাজ জামাতে আদায় করে আমরা ‘রিয়াজুল জান্নাত’ অর্থাৎ মহানবী (সা.)–এর মিম্বার ও পাক রওজা মোবারকের মধ্যবর্তী স্থান (যাকে বেহেশতের বাগান বা অংশ বলা হয়) এর ভেতর যাওয়ার সুযোগ পেলাম। এখানে ঢোকার অনুমতি এখন সোনার হরিণ।

নুসুকের মাধ্যমে আলাদাভাবে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয় এবং সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ভেতরে অবস্থান করা যায়। এখানে শুধু রাসুল (সা.)-এর একার নয়, তাঁর প্রিয় সাথি দুই খলিফার কবরও এই এক দেয়ালের ভেতর। তাই এখানে এসে সবাই আল্লাহর কাছে বাড়তি প্রার্থনা করেন, আশা করেন আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দার সুপারিশ মিলবে, আখেরাতে মুক্তি মিলবে, জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার পথ মিলবে। তবে এখানে পুলিশের তাড়া খেতে খেতে নামাজ পড়ার ব্যাপারটা আমার জন্য কঠিন ছিল। অবশ্য ভালোবাসা আর পুণ্য অর্জনের পথ কখনো সুগম হয় না। হাজিরা কষ্ট আর প্রতিকূলতা সহ্য করার মানসিকতা নিয়েই হজে আসেন। তবে এখানে আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলো থেকে আসা কাফেলাগুলো হজে যোগ করেছে বাড়তি মাত্রা। তাদের উজ্জ্বল ও রং-বেরঙের ছিট কাপড়ে তৈরি পোশাক পরে দলবেঁধে ঘোরা আর জামাত শুরুর আগে এসে ঘাড়ের ওপর এসে জায়গা দখলের প্রবণতা হজের মহিমার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জানি না, তাদের আচার এমন কেন। এখানে বাংলাদেশের কর্মীর দেখা মেলে মসজিদ, হোটেল, দোকান—প্রায় সবখানে। তবে পাকিস্তানিদের দৌরাত্ম্য অনেক বেশি।

আসা যাক আসল কথায়। সব মসজিদ আল্লাহর ঘর, কিন্তু এই মাসজিদে নববিতে নামাজের ফজিলত অনেক বেশি। সবাই তাই এখানে দীর্ঘ সময় ও আকুতি নিয়ে ইবাদত করেন। জুমার নামাজ ভেতরে পড়ার জন্য ৩-৪ ঘণ্টা আগে এসে জায়গা দখল করতে হয়। ভেতরের পরিবেশ অত্যন্ত শান্তিদায়ক। আভিজাত্য আর পবিত্রতার এক অনন্য সমন্বয় এখানে। বড় বড় কলাম, সুবর্ণখচিত তার মাথা! চোখধাঁধানো তার আলোকসজ্জা। সুবিশাল ঝাড়বাতি আর আরব স্থাপত্যের শৈল্পিক কারুকাজ চারিদিকে। মেঝেতে মোটা সবুজ গালিচা, যেন জান্নাতের ছোঁয়া।

কেউ এখানে জিকির করছেন, কেউ আল-কুরআন পড়ছেন নিচু স্বরে, কেউ নামাজে রত। কেউ–বা চোখের জলে পরম করুণাময়ের করুণা ভিক্ষা করছেন। আমাদের দেশের অধিকাংশ হাজির বয়স পঞ্চাশের ওপর। অন্যান্য দেশের হাজিরা অপেক্ষাকৃত কম বয়সী।

স্বভাবসুলভভাবেই আমি চ্যাটজিপিটিকে প্রশ্ন করলাম, ‘আমি মসজিদে নববির ভেতরে আছি আমাকে তুমি কী ইবাদত পড়ার পরামর্শ দেবে?’

সে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, ‘আল মসজিদ আন নাওয়াবির ভেতরে অবস্থান করা একজন মুসলিমের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৌভাগ্য। এখানে আপনার সময়কে ইবাদত, আত্মচিন্তা, দ্বীনি জ্ঞান অর্জন ও প্রশান্ত হৃদয়ে নীরবে বসে থাকার মধ্যে সুন্দরভাবে ভাগ করে নিন।’ তার এই জবাবে আমি অবাক হলাম।

১০টি পয়েন্ট দিয়ে সে আমাকে চমৎকার কিছু পরামর্শ দিল। সেগুলো প্রতিপালন করলাম যথাসাধ্য।

এখানে নামাজ পড়ার সময় আমার একটা নতুন উপলব্ধি হলো। সারা জীবন নামাজ পড়ার সময় মনে হয়েছে, আমি একটা দায়িত্ব পালন করছি, অনেকটা চাকরি করার মতো। কিন্তু এবার মনে হলো, আমি কিছু চাইতে এসেছি, দুর্লভ বা দুষ্প্রাপ্য কিছু পাওয়ার আশায় আমি এখানে সিজদা করছি, এই ইবাদতে কোনো ফাঁকি দেওয়া যাবে না, কোনো তাড়াহুড়া করা যাবে না। এখানে তওবা কবুল হওয়ার ও দোয়া কবুল হওয়ার কিছু বিশেষ স্থান আছে। সেখানে ইবাদত করার সুযোগ পাওয়া মানে যেন হাতের কাছে জান্নাতের চাবি পাওয়া। আমরা অনেকেই এসব স্থানে আসি, কিন্তু জান্নাতের চাবি পাই না, পেলেও তা আবার স্বাভাবিক জীবনের গতানুগতিকতায় ফিরে যাওয়ার পর হারিয়ে ফেলি। ভুলে যাই তওবার কথা, ক্ষমাপ্রার্থনার সেই প্রতিশ্রুতি আমরা বিস্মৃত হই বারবার।

শুক্রবার জুমার সময় দেখেছি মানুষ কত আগে এসে বসে থাকে এই মর্যাদাময়, মহিমান্বিত স্থানে নামাজ পড়ার জন্য। সবার মনে একটাই আশা, এই সুযোগ যেন হেলায় না হারায়। জান্নাতুল বাকি আছে পাশেই। সেখানে সমাধিস্থ আছেন আল্লাহর অনেক প্রিয় বান্দা। সেসব কবর জিয়ারত করাও এক পরম সৌভাগ্য।

শনিবার সকালে আমাদের হজ এজেন্সির পক্ষ থেকে মদিনার দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনে নেওয়া হলো। সেই সুবাদে নামাজ পড়ার সুযোগ পেলাম মাসজিদে কুবায়, দেখার সৌভাগ্য হলো ঐতিহাসিক খন্দকের যুদ্ধের ময়দান, উহুদ পাহাড় (যেখানে শায়িত আছেন ৭০ জন শহীদ সাহাবি) ও দুই কেবলার মসজিদ (বায়তুল কিবলাতাইন) পরিদর্শন করার। হাদিসে এসেছে, মসজিদে কুবায় দুই রাকাত নফল নামাজ একটি নফল ওমরাহের সমতুল্য। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) শনিবার সকালে এই মসজিদে নামাজ পড়তে যেতেন। আর বায়তুল কিবলাতাইন হলো সেই মাসজিদ, যেখানে দ্বিতীয় হিজরিতে রাসুল (সা.) নামাজ পড়া অবস্থায় মুসলমানদের কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাসের (ফিলিস্তিন) পরিবর্তে বায়তুল কাবা (মক্কা) নির্ধারণ করে ওহি নাজিল হয়, ফলে নামাজের প্রথম দুই রাকাত ফিলিস্তিনের দিকে ও পরের দুই রাকাত মক্কার দিকে ফিরে পড়িয়েছিলেন মহানবী (সা.)।

আর ওহুদ তো সেই পাহাড়, আমাদের প্রিয় নবীজি যেখানে যুদ্ধ করতে এসে দাঁত হারিয়েছিলেন। ওহুদ সেই পাহাড়, যা জান্নাতে যাবে। ওহুদ সেই পাহাড়, যাকে নেকি পরিমাপের একক হিসেবে হাদিসে এসেছে।

১৮ মে, ২০২৬ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে জিলহজ মাস শুরু। আমরা সকালে রওনা হলাম মক্কার উদ্দেশে। মদিনা ছাড়ার মর্মবেদনা ভাষায় অপ্রকাশ্য। ছেড়ে যেতে মন চায় না। তবু আমাদের বাস ছাড়ল। পাহাড় কেটে তৈরি মহাসড়ক দিয়ে মক্কার দিকে যেতে যেতে ভাবছিলাম, আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এসব পাহাড় আর মরুভূমির বিরূপ প্রতিবেশে হিজরত করেছেন, বারবার সফর করেছেন উটের পিঠে চড়ে, কখানো হেঁটে। আমরা তো চলেছি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত জাপানি বাসে। আমাদের কাফেলার কেউ কেউ ট্রেনে চেপে মক্কা যাচ্ছেন, তাদের অভিজ্ঞতা জেনে নিয়ে পরের পর্ব লিখব আশা করছি।

আমি অতীতে অনেক সফর করেছি, কিছু কিছু ভ্রমণকাহিনি ছাপা হয়েছে, যা ছিল নিছক আনন্দভ্রমণ বা অফিসের কাজে ভ্রমণের গল্প। কিন্তু হজ এমন একটি যাত্রা, যা শুধু ভ্রমণ নয়। এই যাত্রা অর্থ ব্যয় আর কায়িক শ্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই যাত্রায় ধৈর্য, সহ্যশক্তি আর আত্মার পরিশুদ্ধতার মধ্য দিয়ে একজন মুসলমান তার রূপান্তরের সূচনা করেন। সে রূপান্তর বাহ্যিক যতটা, অভ্যন্তরীণ তার চেয়ে অনেক বেশি। সবচেয়ে ভালো লাগছিল যখন অনেক তরুণ হাজি দেখছিলাম। আর বৃদ্ধ মানুষদের কষ্ট দেখে বুক ফেটে যাচ্ছিল। আমার এই লেখার উদ্দেশ্য তাই ভিন্ন। আমার লেখা পড়ে কেউ যদি যৌবন বয়সে হজের প্রস্তুতি নেন, তাহলে আমার এই প্রয়াস সার্থক হবে।

*লেখক: কাজী মনজুর করিম মিতুল, প্রকৌশলী

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]