স্মৃতির শবদাহ
সন্ধ্যা নামিয়া আসিয়াছে। নির্জন ঘরের আধো অন্ধকারে জানালার গরাদে মাথা ঠেকাইয়া অতুল স্তব্ধ হইয়া বসিয়া আছে। গোধূলির ম্লান আলোয় একটিমাত্র প্রশ্ন বারবার তাহার বুকের ভেতর শূন্য মন্দিরের ঘণ্টার ন্যায় প্রতিধ্বনিত হইতেছে—‘এই বৃষ্টি যতবার নামিবে, ততবার কি আমার কথা আপনার মনে পড়িবে না?’
প্রশ্নটি যে করিয়াছিল, সে আজ অনেক দূরে। কিন্তু যাইবার বেলায় সে যে অমোঘ সত্যটি উচ্চারণ করিয়া গিয়াছিল, আজ এই নিঃসঙ্গ সন্ধ্যায় তাহা অক্ষরে অক্ষরে ফলিতেছে। সে বলিয়াছিল, ‘ভুলিয়া যাওয়া মানে তো কেবল মনে না রাখা নয়। আমি বলিতে চাহিতেছি, আমার সহিত জড়াইয়া থাকা সেই দিনগুলোর স্মৃতি কি তোমার ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়িবে না?’
অতুল আজন্ম ভাবিয়া আসিয়াছে, সময়ের প্রলেপে বোধ করি পৃথিবীর সকল ক্ষত শুকাইয়া যায়। চোখের আড়াল হইলেই বুঝি মনের আড়াল হওয়া যায়। কিন্তু আজ সে বুঝিতেছে, স্মৃতির কাছে মানুষের অহংকার কতখানি তুচ্ছ। স্মৃতি তো সস্তা খাতায় লিখিয়া রাখা বাজারের হিসাব নহে যে পাতা ছিঁড়িয়া ফেলিলেই তাহা মুছিয়া যাইবে। স্মৃতি হইল ফাল্গুনের সেই ঝরা পাতার মতো—প্রবল বাতাসে যাহাকে উড়িয়া যাইতে দেখিলেও তাহার শূন্য স্থানটি চিরকাল বৃক্ষের ডালে এক নীরব হাহাকার হইয়া থাকিয়া যায়।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
ভুলিতে সে হয়তো অনেক কিছুই পারিয়াছে। সেই মানুষটির কণ্ঠস্বর হয়তো আজ আর ততটা স্পষ্ট নহে, তাহার হাসির শব্দ হয়তো স্মৃতির পাতায় খানিকটা ঘোলাটে হইয়া আসিয়াছে। কিন্তু ওই যে সে বলিয়াছিল, ‘স্মৃতিগুলো কি মনে পড়িবে না?’—সত্য বটে, যখনই বর্ষার প্রথম জল তপ্ত মাটিতে আসিয়া পড়ে, কিংবা শরতের কোনো নির্জন দ্বিপ্রহরে দূর হইতে উদাস করা কোনো সুর ভাসিয়া আসে, তখনই বুকের ভেতরটা অকস্মাৎ হু হু করিয়া ওঠে। এক তীব্র শূন্যতা আসিয়া গলা চাপিয়া ধরে।
আজ বাহিরে সেই আষাঢ়েরই মেঘ জমিয়াছে।
পিতার মৃত্যুর পর অতুলের সংসারে দারিদ্র্যই একমাত্র নিত্য অতিথি। প্রত্যহ প্রভাতে দুই ক্রোশ পথ হাঁটিয়া সে সদরের ইস্কুলে পড়াইতে যায়, সন্ধ্যায় ফিরিয়া রুগ্ণ মায়ের পথ্যের জোগাড় করে। গ্রামের লোকে বলে, ছেলেটি বড় শান্ত, বড় লাজুক। কেবল অতুল জানে, উহা লজ্জা নহে—দারিদ্র্যের সংকোচ। যে মানুষকে নিজের ছেঁড়া চটি জোড়া লুকাইয়া চলিতে হয়, বড়লোকের উঠানে দাঁড়াইয়া সে গলা তুলিয়া কথা কহিতে পারে না।
বিভারা এ গ্রামে আসিয়াছিল বৎসর তিনেক পূর্বে। তাহার পিতা সরকারি চাকুরে; কাছারি-সংলগ্ন বড় বাড়িটিতে তাহারা বাস করিত।
প্রথম আলাপের দিনটিও ছিল বর্ষার। পুকুরঘাটের ভাঙা সিঁড়িতে বসিয়া ভিজিতে ভিজিতে অতুল আপনমনে কবিতা আওড়াইতেছিল; হঠাৎ পিছন হইতে হাসির শব্দ—‘মেঘের সঙ্গে কথা কহিতেছেন বুঝি? মেঘ তো উত্তর দেয় না, মশাই।’
ফিরিয়া দেখে, ছাতা হাতে একটি মেয়ে দাঁড়াইয়া হাসিতেছে। সে হাসিতে বিদ্রূপ ছিল না, ছিল একটা সহজ নির্মল আলো। সেই আলোতেই অতুলের আজন্ম সংকোচ কেমন করিয়া গলিয়া গেল।
তাহার পর কত সন্ধ্যা কাটিয়াছে ওই ঘাটে! মাথার ওপর কৃষ্ণচূড়ার ডাল, পায়ের নিচে ঝরা ফুলের ভেজা রক্তবর্ণ আস্তরণ; বাঁশবনে হাওয়ার একটানা শব্দ, আর পুকুরের জলে বৃষ্টির টুপটাপ। বিভা আবদার করিত, ‘আজ নূতন কিছু শোনান।’ অতুল ছাতা মাথায় দাঁড়াইয়া কবিতা পড়িত, আর বলিত, ‘ওই মেঘই আমাদের সাক্ষী।’
বিভা কপট গাম্ভীর্যে ঠোঁট টিপিয়া উত্তর দিত, ‘সাক্ষী রাখিয়া লাভ কী, মশাই? মোকদ্দমা তো আপনি জন্মেও করিবেন না।’
কথাটির অর্থ অতুল বুঝিত; কেবল উত্তর দিতে পারিত না।
একবার বিভার জন্মতিথিতে তাহাদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ ছিল। অতুল নাই। শূন্য হাতে, তালি দেওয়া জামা গায়ে সে বাড়ির আলো-ঝলমল উঠানে দাঁড়াইবার সাহস তাহার হয় নাই। বিভা পুরা সাত দিন তাহার সহিত কথা কহিল না। অষ্টম দিনে ঘাটে আসিয়া চোখ দুটি জ্বালাইয়া কহিল, ‘আপনার এই অহংকারই একদিন আপনার সর্বনাশ করিবে, দেখিয়া লইবেন।’
অতুল মৃদুস্বরে কহিল, ‘অহংকার নহে, বিভা। শূন্য হাতে আপনাদের উঠানে দাঁড়াইতে’
বিভা মাঝপথে থামাইয়া দিল, ‘আমি কি আপনার হাত দেখিতে চাহিয়াছিলাম?’
বলিয়াই সে নিজের কথায় নিজে লজ্জা পাইয়া রাঙা হইয়া উঠিল এবং আর একটি শব্দও না বলিয়া দ্রুতপদে চলিয়া গেল। তাহার পায়ের নিচে ভেজা কৃষ্ণচূড়ার ফুলগুলো চাপা পড়িয়া রহিল।
সেদিনও অতুল ছুটিয়া গিয়া কথাটা বলিতে পারে নাই। সে ভাবিয়াছিল, আগে চাকরিটা পাকা হউক, মায়ের রোগটা সারুক, ঘরের চালে নূতন খড় উঠুক; তাহার পর একদিন মাথা উঁচু করিয়া বলিবে। মানুষ ভাবে, সময় বুঝি ঘাটে বাঁধা নৌকাটির মতো, তাহার জন্য অপেক্ষা করিয়া থাকিবে।
তাহার পর আসিল সেই আষাঢ়ের সন্ধ্যা। আকাশ কালো করিয়া মেঘ জমিয়াছে, দূরে কোথাও একটানা ডাহুক ডাকিতেছে। বিভা তাহাকে ডাকিয়া লইয়া গেল পুকুরঘাটের সেই পুরাতন কৃষ্ণচূড়াতলায়। মুখখানি সেদিন বড় বিবর্ণ। অনেকক্ষণ সে মাটির দিকে চাহিয়া রহিল, তাহার পর ধীরে মুখ তুলিয়া কহিল, ‘বাবার বদলি হইয়াছে। আগামী শুক্রবার আমরা এ গ্রাম ছাড়িয়া যাইতেছি।’
অতুলের বুকের ভেতরটা হঠাৎ শূন্য হইয়া গেল। বহু কষ্টে সে কেবল বলিতে পারিল, ‘এত শীঘ্র!’
বিভা হাসিল। সে হাসিতে সেই পুরাতন সহজ আলোটুকু আর ছিল না। ‘শীঘ্র! তিন বৎসর ধরিয়া যাহা বলিলেন না, তাহাকে আপনি শীঘ্র বলেন?
অতুল নিরুত্তর রহিল।
‘সাক্ষী তো মাথার ওপরেই রহিয়াছে,’ বিভা কহিল, ‘আজ তবে চুপ কেন?’
অতুলের অন্তরে তখন সহস্র কথা আলোড়িত হইতেছিল। কিন্তু সেই চরম মুহূর্তেও তাহার চোখের সমক্ষে ভাসিয়া উঠিল ভাঙা ঘরের ফুটা চাল, মায়ের ওষুধের বাকি পড়া দাম, নিজের তালি দেওয়া জামাটি। কী দিয়া সে রাখিবে উহাকে? কথাগুলো কণ্ঠের কাছে আসিয়া পাথর হইয়া রহিল।
বিভা কিছুক্ষণ প্রতীক্ষা করিল। তাহার পর একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া চোখ দুটি অন্যদিকে ফিরাইয়া কহিল, ‘থাক্। যাহা এতকাল বলা হইল না, বিদায়ের বেলায় তাহা আর শুনিতে চাহি না। কেবল একটি কথা জানিয়া যাই—এই বৃষ্টি যতবার নামিবে, ততবার কি আমার কথা আপনার মনে পড়িবে না?’
সেইক্ষণে দূরে আকাশ চিরিয়া বিদ্যুৎ চমকাইল, আর বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নামিয়া আসিল। বিভা আঁচল মাথায় তুলিল। যাইবার আগে সে অতুলের মুঠোর ভেতর গুঁজিয়া দিল একখণ্ড ভাঁজ করা কাগজ, তাহাদের নূতন ঠিকানা। কহিল, ‘রাখিয়া দিন। মোকদ্দমা করিবার সাহস যদি কোনো দিন হয়।’
তাহার পর ঘাটের সিঁড়ি বাহিয়া সে উঠিয়া গেল। যাইবার বেলায় একটিবারমাত্র ফিরিয়া চাহিল—সেই শেষ দৃষ্টিটুকু অতুল আজিও ভুলিতে পারে নাই।
কাটিয়া গেল দুইটি বৎসর।
এই দুই বৎসরে অতুলের চাকরি পাকা হইয়াছে, মায়ের রোগ সারিয়াছে, ঘরের চালে নূতন খড় উঠিয়াছে। যে অভাবের সংকোচে সে সেদিন মুখ ফুটিয়া কথা বলিতে পারে নাই, সে সংকোচ আজ আর নাই। আশ্চর্য এই বাধাটি সরিয়া গেল, কিন্তু মানুষটি সরিল না।
বিভার দেওয়া সেই ছেঁড়া কাগজখানি ডায়েরির ভাঁজে যত্নে রাখিয়াও, বহুবার কলম হাতে বসিয়াও, সে একখানি পত্র লিখিয়া উঠিতে পারে নাই। সম্মুখে দাঁড়াইয়া যে কথা বলা হয় নাই, শূন্য কাগজে তাহা লিখিতে গিয়াও তাহার হাত থরথর করিয়া কাঁপিয়াছে; দুই-চারি ছত্র লিখিয়া সে আবার তাহা ছিঁড়িয়া ফেলিয়াছে।
গত পৌষে একবার সে পত্রখানি লিখিয়া, খামে ভরিয়া, ডাকঘরের দরজা পর্যন্ত গিয়াছিল। ভেতরে ঢুকিবার মুখে হঠাৎ মনে হইল—যদি উত্তর না আসে? কিংবা আসে, আর সে উত্তরে লেখা থাকে, ‘বড় দেরি করিয়া ফেলিয়াছেন, মশাই’? সেই ভয়টুকুতেই তাহার পা দুটি আটকাইয়া গেল। খামখানি পকেটে ভরিয়া সে বাড়ি ফিরিয়া আসিল এবং সে রাত্রে উহা কেরোসিন-ল্যাম্পের শিখায় ধরাইয়া দিল। কাগজখানি পুড়িতে পুড়িতে যেভাবে কালো হইয়া কোঁকড়াইয়া গেল, শুইতে গিয়া সেই দৃশ্যই তাহার চোখে লাগিয়া রহিল।
কিন্তু আজিকার এই সন্ধ্যায় বাহিরে যখন আবার সেই আষাঢ়ের বৃষ্টি নামিয়াছে, অতুল হঠাৎ এক অপূর্ব সাহস অনুভব করিল। সে ভাবিল, আর নহে। এতকালের কাপুরুষতার আজ অবসান হউক। বিভা বলিয়াছিল, মোকদ্দমা করিবার সাহস যদি কোনো দিন হয়—আজ হইয়াছে।
অতুল আলো জ্বালাইয়া বসিল। দুই বৎসরের জমানো কথা, বহু নিদ্রাহীন রাত্রির না–বলা ভালোবাসা—সমস্ত উজাড় করিয়া সে এক দীর্ঘ পত্র লিখিল। লিখিতে লিখিতে চোখ জলে ভরিয়া আসিল, তবু আজ আর সে থামিল না। পত্রের শেষে লিখিল—
‘সেদিন উত্তর দিতে পারি নাই—শূন্য হাতে সম্মুখে দাঁড়াইতে সংকোচ হইয়াছিল। আজ হাত আর শূন্য নাই, কেবল আপনি নাই বলিয়া ঘরখানি শূন্য হইয়া আছে। এতকাল যাঁহাকে “আপনি” বলিয়া আসিয়াছি, আজ এই একখানি পত্রে তাঁহাকে একটিবার “তুমি” বলিতে দাও। তোমাকে ভুলি নাই, ভুলিতে পারি নাই। এই বৃষ্টি যত দিন নামিবে, তত দিন তুমিই আমার। সাক্ষী সেই পুরাতন মেঘ। একটিবার কি জানাইবে, তুমি কেমন আছ?’
পরদিন প্রত্যুষে বৃষ্টিধোওয়া নির্জন পথে অতুল ছুটিল ডাকঘরের দিকে। বহু বৎসর পরে আজ তাহার বুক বড় হালকা—যেন এতকালের একটা প্রকাণ্ড ভার নামিয়া গিয়াছে।
ডাকঘরের প্রাচীন পিয়ন খামের ওপরের ঠিকানাখানি চশমার ফাঁক দিয়া বহুক্ষণ নিরীক্ষণ করিলেন। তাহার পর মুখ তুলিয়া মৃদুস্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘বাবা, এই বাড়ির যে মেয়েটি—বিভা—তাহাকেই পত্র লিখিতেছ?”
অতুল সাগ্রহে মাথা নাড়িল।
বৃদ্ধ একটি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিলেন। খামখানি তিনি ফিরাইয়া দিলেন না, কেবল অতুলের মুখের পানে করুণ চোখে খানিকক্ষণ চাহিয়া রহিলেন। শেষে অতি ধীরে কহিলেন, ‘পত্র লইয়া আমি আর কী করিব, বাবা? গত পৌষে ওই বাড়ি হইতেই কাছারির বড়বাবুর নামে একখানি পত্র আসিয়াছিল—আমিই বিলি করিয়াছিলাম। মেয়েটি বড় অল্প বয়সে চলিয়া গেল। জ্বরে ভুগিয়া। মাস ছয়েক তো হইয়াই গেল।’
কহিতে কহিতে বৃদ্ধ থামিলেন। তাহার পর যেন আপন মনেই বলিলেন, ‘খবরটা তো সেই শীতেই গ্রামে আসিয়াছিল, বাবা। তোমাকে কেহ বলে নাই?’
কেহ বলে নাই। কেননা যে কথাটি বলিবার ছিল, অতুল তাহা কাহাকেও বলে নাই—বিভাকেও নহে।
অতুলের হাত হইতে খামখানি খসিয়া ভেজা মাটিতে পড়িয়া গেল।
বাহিরে তখন আবার বৃষ্টি নামিয়াছে। তপ্ত মাটির বুকে প্রথম জলের সেই চিরচেনা সোঁদা গন্ধ চারিদিক ভরিয়া তুলিতেছে। চাতালের পাশে কৃষ্ণচূড়ার ঝরা ফুলগুলি জলে ভিজিয়া লেপটাইয়া আছে—যেন কেহ এইমাত্র একটি আগুন নিভাইয়া দিয়া গিয়াছে। অতুল নিশ্চল দাঁড়াইয়া রহিল; কানে কেবল বাজিতে লাগিল সেই পুরাতন প্রশ্নখানি—‘এই বৃষ্টি যতবার নামিবে, ততবার কি আমার কথা আপনার মনে পড়িবে না?’
উত্তরটি আজ তাহার প্রস্তুত ছিল; কেবল শুনিবার মানুষটি আর নাই।
স্মৃতিকে সে চিতায় তুলিতে চাহিয়াছিল। আজ ডাকঘরের ওই ভেজা চাতালে দাঁড়াইয়া অতুল বুঝিল—দাহ তো অনেক আগেই হইয়া গিয়াছে; কেবল খবরটুকু এত দিন তাহার কাছে আসিয়া পৌঁছায় নাই।
লেখক: কে এম ফারহাত স্নিগ্ধ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত