শরৎ
কেউ যদি আমাকে এখন প্রশ্ন করে, আচ্ছা, কোন ঋতু তোমার পছন্দ? আমি চোখ বন্ধ করে বলে দেব—শরৎ। শরৎ ঋতু আমার ভীষণ পছন্দ। না আছে গরম, না আছে শীত, না আছে ভেজা স্যাঁতসেঁতে বৃষ্টি। নিজেকে ভালো রাখার জন্য একটা রোমান্টিক আবহাওয়া প্রকৃতিতে বিরাজমান, আর সেটা হলো এই শরৎকাল। ইংরেজিতে যাকে বলে Autumn or Fall.
আজকাল অফিসে যাওয়ার পথে উঁচু ফ্লাইওভার থেকে গাড়ির কাচ ভেদ করে আকাশের দিকে তাকালেই মন বলে ওঠে,
‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা রে ভাই, লুকোচুরি খেলা।
নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা রে ভাই—লুকোচুরি খেলা॥
ওরে যাব না আজ ঘরে রে ভাই, যাব না আজ ঘরে।
ওরে, আকাশ ভেঙে বাহিরকে আজ নেব রে লুট ক’রে॥’
শরতের প্রকৃতিতে একটা রৌদ্রছায়া খেলা করে। বর্ষার শেষে মিষ্টি রোদ, সাদা মেঘেদের খেলা আর বাঙালি হিন্দুদের শারদীয় উৎসবের আমেজে প্রকৃতিতে শরত আসে আনন্দের আগমনী বার্তা নিয়ে।
শরতের সবুজ মাঠ কাঁচা–পাকা ধানখেত আর প্রাণবন্ত মাঠের ফসলগুলো এক চোখ–ধাঁধানো রূপ তৈরি করে। সরু পিচঢালা পথের দুপাশের বিলের টলমলে জল, মাথার ওপর নীলাভ আকাশ যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস।
আচ্ছা, তোমাদেরও কি আমার মতো শরতের নীলাভ আকাশ ভালো লাগে আর ইচ্ছা করে শৈশবের সেই দিনগুলোতে ঢাকের বাদ্য বাজতেই ছুটে যেতে কাশবনে?
মূলত আষাঢ়–শ্রাবণ মাস শেষ হতেই ভাদ্র ও আশ্বিন মাস নিয়ে শরৎকাল গ্রামবাংলার প্রকৃতিতে নিয়ে আসে এক শান্ত স্নিগ্ধ রূপ। ঘন নীল আকাশে সাদা তুলার মতো মেঘেদের ওড়াউড়ি, নদীর দু’ধারে দেখা যায় কাশফুল, কোথাও কোথাও নদীর মাঝখানে চর জেগে ওঠে, সেখানেও বাতাসে দোলা দেয় কাশফুলেদের দল।
ভোরের নরম কমল ঘাসের ডগায় জমে থাকে শিশিরবিন্দু। শিশিরভেজা সকালে গ্রামের মেঠো পথে শিশুরা বইখাতা হাতে নিয়ে স্কুলে যায়। কী অপূর্ব সেই দৃশ্য!
শরতের আকাশ অনেক বেশি উজ্জ্বল এবং রাতের আকাশে চাঁদের আলোয় গা ভেসে যায় অনায়াসে। একটা সময় গ্রামে রাতে খোলা আকাশের নিচে পাটি পেতে বসে বাড়ির গুরুজন থেকে শুরু করে বাচ্চারা সবাই নানা রকম গল্পের হাঁট বসাত এমন জ্যোৎস্না রাতে। সেখানে চলত জারি সারি, ভাটিয়ালি গান এমনকি ভূতের গল্পও। সেসব দিন এখন ছেলেমেয়েরা চিন্তাও করতে পারে না।
শরৎকালে গ্রামবাংলার প্রকৃতিতে একটা ফুরফুরে আমেজ খুঁজে পাওয়া যায়। নদীতে চর জেগে ওঠে। তাতে কাশফুলের সমারোহ দেখা যায়। শিউলি, জবা, বকুল, মল্লিকা, দোলনচাঁপা ফোটে এই ঋতুতে। পুকুরগুলো ভরে যায় সাদা আর গোলাপি রঙের পদ্মফুলে।
শরৎ মানেই শিউলি ফুলের রাজত্ব। রাতের বেলা শিউলি ফোটে, ভোরে মাটিতে ঝরে পড়ে থাকে। বাড়ির ছোট ছোট মেয়েরা সেই পড়ে থাকা শিউলি ফুল কুড়িয়ে মালা গাঁথে। আমিও ছেলেবেলায় কত মালা গেঁথেছি শিউলি আর বকুল ফুল দিয়ে!
শরৎকালে বাঙালি সনাতনীদের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান উৎসব দুর্গাপূজা হয়। এ ছাড়া লক্ষ্মীপূজা, কালীপূজা, বিশ্বকর্মা পূজাও হয়।
এ সময় নানা রকম দেশীয় ফল পাওয়া যায়। তাল, জলপাই, চালতা, আমলকী। নানা রকম সবজিও বাজারে আসে। পালংশাক, মূলা, নতুন রসুন, পেঁয়াজ, বেগুন, লালশাক, পুঁইশাক।
শরৎকালে আমাদের দেশে নানা রকম লোকজ সংস্কৃতির আনন্দ আমরা উপভোগ করি। যেমন ঘুড়ি উৎসব, নৌকা বাইচ, যাত্রাপালা, বাউল গান, ঘর এবং উঠানে বাড়ির বধূরা চালের গুঁড়া দিয়ে আলপনাও আঁকে এই ঋতুতে।
নবান্নের আগমনী বার্তা অপার এক আনন্দের আবহ নিয়ে আসে বাংলার কৃষকদের কাছে। তারা ধান কাটা শুরু করে দেয়। আহ কি মধুর সেই গ্রামীণ চিত্রপট!
আজকাল শরৎ এলেই বন্ধুরা সবাই দলবেঁধে ছুটে যায় কাশফুলের কাছে। কাশফুলের শুভ্রতায় তারা নিজেরা যেন হারিয়ে যায় তাদের দুরন্ত শৈশবে।
মনপ্রাণ ঢেলে জীবনানন্দের কবিতায় দেখে বাংলার রূপ…
‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে, এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয়, হয়তোবা শঙ্খচিল শালিকের বেশে
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে।’
আসলে প্রকৃতি সত্যি আমাদের মন শান্ত করে দেয়, মনকে প্রফুল্ল করে তোলে। মনে শত দুঃখ–যন্ত্রণা থাকলেও তুমি যখন বিকেলে একা কোনো বয়ে চলা নদীরে পাড়ে কাশফুলের ছায়ায় গিয়ে বসবে, দেখবে নিজের অজান্তেই মন কেমন শান্ত স্থির হয়ে গেছে।
মন অজান্তেই বলে উঠবে…
‘আকাশে বেলা ফুরায় শরৎ আসে।
কাশবন উতলা হাওয়ায় হেলে যায়
গোধূলির বেশে।’
আমরা পরম সৌভাগ্য নিয়ে এই পৃথিবীতে এসেছি। প্রকৃতির এত রং–রূপ–রস–গন্ধ, যাকে আমরা চাইলেই প্রাণভরে উপভোগ করতে পারছি। ছোট্ট একটা জীবন, অনিশ্চিত তার বেঁচে থাকা, তাই মানুষে মানুষে হিংসা–বিদ্বেষ হানাহানি ভুলে আনন্দ নিয়ে বাঁচতে শিখি। মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ানো ওই পাখিদের মতো। প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে ফেলি নিজেকে। সবুজ প্রকৃতি যেন দুহাত উজাড় করে আমাদের দেয়, তেমনি আমরাও প্রকৃতির মতো উদার হতে শিখি।
‘এখানে আকাশ নীল—নীলাভ আকাশ জুড়ে সজিনার ফুল
ফুটে থাকে হিম শাদা—রং তার আশ্বিনের আলোর মতন…।’
*লেখক: রোজিনা রাখী, ফিচার লেখক
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]