আমাদের রোজা ও ইফতারের সালতামামি

ছবি: লেখক

এ বছর রোজা এসেছে নিঃশব্দে, নিরুত্তাপে। চাঁদ দেখা নিয়ে ঝামেলা হলেও আটলান্টায় আমাদের মসজিদে আগে থেকেই ঠিক করা ছিল বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) থেকে রোজা শুরু করবে। অনেকে আবার সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে বুধবারই শুরু করেছে। এ কারণে আমার মা–বাবা বুধবার রোজা থাকলেও আমরা শুরু করেছি বৃহস্পতিবার।

বুধবার কাজে থেকেই ছেলের ফোন, তার শরীর ভালো নয়। ডর্মে থাকে। কাজ শেষে দেখতে গেলাম। রাস্তায় জ‍্যামে দুই ঘণ্টা আটকে থেকে বুঝলাম, আমার ধৈর্য‍ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ছেলের জ্বর কি না, বোঝে না। মাঝেমধ্যে ভাবি, আমি বলেই হয়তো আমার ছেলে এত বোকা। তার মুখে রুচি নেই। খাবার দাবার, ওষুধ নিয়ে তাকে দেখে, খাবার খাইয়ে, ওষুধ খাইয়ে, কী কী ওষুধ কখন কখন খেতে হবে, বুঝিয়ে দিয়ে এলাম। আসতে আসতেই রাত হয়ে গেল। শীতের কারণে এখনো টুপ করে সন্ধ‍্যা নেমে আসে। দিনগুলো এখনো ছোট, তবে প্রতিদিন একটু একটু করে বড় হচ্ছে।

ছেলেবেলায় হাত দেখে কে যেন বলেছিল, আমার বর সাত্ত্বিক ব্রাক্ষণ হবে। ভুল বলেছিল, বলা উচিত ছিল, প্র্যাকটিসিং মুসলমান হবে। সারা বছর সে এমনিতেই নিয়মকানুন মেনে চলে। শুক্রবার জোহরের নামাজ মিস হয় না। রোজা শুরু না হতেই বলা শুরু করেছে, এ মাসে অনেক বেশি নেকি হয়, তাই আরও বেশি ভালো কাজ করতে হবে। তার ভালো কাজের অত‍্যাচারে আমার নাভিশ্বাস ওঠে। সারা বছর ভালো কাজ করার পরও তার মনে হয়, আরও ভালো কী করে করা যাবে!

মনে করিয়ে দিলাম, রোজা শুধু রোজাই তো নয়, রোজার শেষে ঈদ, সেটা যেন ভুলে না যায়। সেটা আমাদের প্রধান উৎসব! সে রোজার সময় দ্বীন–দুনিয়া ভুলে থাকতে পছন্দ করে।

চাহিদা নেই কোনো। সাহ্‌রিতে ভারী খাবার কোনো দিনও খায় না। আগে সিরিয়াল দুধ খেয়ে নিত। এখন স্বাস্থ্যকর বলে ওটমিলে সাহ্‌রি করে নেয়, সঙ্গে খেঁজুর বা ডিম। মনে চাইলে অন‍্য কোনো ফল। ব‍্যস! এই আমাদের সাহ্‌রি। সকালে উঠে রান্নার তাড়া নেই। বাঁচোয়া। নয়তো সারা দিন পর কাজ শেষে এসে ইফতারি বানানো, ডিনার বানানোর পর ভোররাতে সাহ্‌রি রান্না করার মতো এনার্জি আমার থাকত না।

পাকিস্তানি বান্ধবীরা খেজুর দিয়ে রোজা ভেঙে একদম ডিনার করে নেয়। কখনো বিরিয়ানি, কখনো হালিম, কখনো রুটি–মাংসে ওদের খাওয়া হয়ে যায়। আমরা বাঙালিরাই হয়তো এতশত আইটেমে বাহারি ইফতার করি।

ইফতারে বাসার সবাই দেশি স্টাইলে ছোলা–মুড়ি, পেঁয়াজু, বেগুনি, জিলাপি, ফলের সঙ্গে রুহ আফজা বা কোনো ফলের জুস পছন্দ করে। ইফতার শেষে ডিনার সেভাবে করা হয় না। বাসায় এক বেলা ভাত করা হয়, সঙ্গে দেশি খাবার। রোজার দিনে সেটাও হয় না অনেক সময়।

দেশে থাকতেও মা–চাচিদের ভোরে উঠে রাঁধতে দেখিনি। রাতের খাবার এক্সট্রা করে রান্না করে, ভোররাতে তা–ই গরম করে খেয়ে নেওয়া হতো। সাহ্‌রিতে আমিই বরং অলস হয়ে যাই। যখন উঠতে পারি না, শুধু বলে দিই, এক গ্লাস পানি এনে দিয়ো, সাহ্‌রি শেষে। সে দয়া পরবশ হয়ে কখনো খেজুর বা ফল এনে দেয়। একটা সময় প্রচুর লোকজন দাওয়াত করতাম। এখন অনেক কম করা হয়। বান্ধবীদের কখনোসখনো ইনভাইট করি, কখনো তাদের সঙ্গে ইফতার করা হয়। পাকিস্তানি বান্ধবীরা খেজুর দিয়ে রোজা ভেঙে একদম ডিনার করে নেয়। কখনো বিরিয়ানি, কখনো হালিম, কখনো রুটি–মাংসে ওদের খাওয়া হয়ে যায়। আমরা বাঙালিরাই হয়তো এতশত আইটেমে বাহারি ইফতার করি। কখনোসখনো দোকান থেকে ইফতার প্লাটার নিয়ে আসা হয়। কী নেই তাতে? পেঁয়াজু, বেগুনি, ছোলা, সালাদ, কাবাব, জিলাপি, ডিম, সঙ্গে বিরিয়ানি বা তেহারিও। ভাগ‍্যিস এখানে কিছু বাঙালি দোকান আছে। একসময় সন্ধ্যায় একদম মসজিদে চলে যেতাম। এখন দূর হয়ে যায় বলে যাওয়া হয় না।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

এখানে বাঙালি, পাকিস্তানি, সৌদি—সব রকমের মসজিদ আছে। সবখানেই ইফতারির সঙ্গে ডিনারও সার্ভ করে। ভিন্ন ভিন্ন মসজিদে ভিন্ন ভিন্ন খাবার। খেজুর, ফল, রুহ আফজা, সমুচা ইফতারে থাকেই। কখনো ছোলার পোলাও, কখনো কালো মসুরের পোলাও, মাংস, বিরিয়ানি, কখনো নান, মাংস। বাঙালি মসজিদে ডিনারে ভাত–মাংসও সার্ভ করে, তবে বেশির ভাগই পোলাও–মাংস। অনেকেই বাসা থেকে ভাত, বিভিন্ন ভর্তা, শুঁটকি বা মাছের তরকারিও নিয়ে আসে, সবাই মিলে মজা করে ভাগাভাগি করে নেয়। ইফতার শেষে মাগরিবের নামাজ পর ডিনার সার্ভ হয়। তারপর এশা আর তারাবিহর নামাজ শেষে ঘরে ফেরা। সেখানে দেশি কড়া চা–ও পাওয়া যায়। সেটাই ছিল আমার মেইন আকর্ষণ।

এখন বাসায় ইফতার শেষে মাগরিবের পর সে এশা আর তারাবিহর নামাজ পড়তে চলে যায়। ফিরে কখনো মনে হলে ডিনার করে, কখনো নয়। রোজার মাসে যেহেতু সারা দিন পানি খাওয়া হয় না, তাই পানিটা বেশি খাবার চেষ্টা করবেন, ইফতার, ডিনার আর সাহ্‌রিতে। সঙ্গে কলাটা রাখা উচিত। পটাশিয়ামের ঘাটতি মেটাতে। যাঁদের ডায়াবেটিস আছে, তাঁরা মিষ্টিজাতীয় খাবার কম খাওয়ার চেষ্টা করবেন। সারা দিন না খাওয়ায়, সন্ধ‍্যায় ভাজাপোড়া খেলে অ্যাসিডিটির সমস‍্যা বেড়ে যেতে পারে। তাই বুঝে–শুনে নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল রেখে ইফতার বা ডিনার করবেন, সাহ্‌রিও। যাঁরা প্রেশারের বা ডায়াবেটিসের ওষুধ খান, তাঁরা টাইম চেঞ্জ করে নিয়ে ওষুধ ঠিকমতো খেয়ে নেবেন। যাঁদের সুগার লো হয়ে যায়, তাঁরা রোজাটা একদম না পারলে বাদ দেবেন। যদিও নিয়‍ত সবারই থাকে। যাঁদের কিডনির সমস্যা, ডায়ালাইসিস লাগে, তাঁরাও আপনাদের ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করে নেবেন। যাঁরা পারবেন না, মনঃকষ্টে না থেকে রোজাদার খাইয়ে নেবেন। এর মধ্যেই চলে আসবে যাকাত–ফিতরার সময়।

ভুলে যাবেন না, এ মাসটা আসলে সংযমের মাস। তবে যাঁদের জন‍্য রোজা ফরজ নয়, বা যাঁরা শারীরিকভাবে সুস্থ্ নন, তাঁদের সঙ্গে যেন আমরা বেইনসাফি না করে ফেলি। তাঁদের নেকি তাঁদের মতো করেই হাসিল করতে দিন। পুলিশিং করে তাঁদের খাবার আটকানো আসলেই বেইনসাফি।

ডায়াবেটিসের রোগী সুগার কমে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন। সুস্থতা একটা নেয়ামত। আপনি সুস্থ–সবল, আপনি আপনার মতো করে যতটা সম্ভব, নেকি হাসিল করেন। তবে অন‍্যের ওপর জুলুম করাটা ছেড়ে দিয়েন।

*শারমীন বানু আনাম, চিকিৎসক

আরও পড়ুন