আলো

তখনো ঠিকঠাক সন্ধ্যা নামেনি। মনে হচ্ছিল শহরটার ওপর কেউ খুব ধীরে, খুব যত্ন করে একটা বিশাল কালো কাপড় বিছিয়ে দিচ্ছে।
সারা দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। কখনো নরম, কখনো এত ঘন যে এক হাত সামনের বস্তুও ঝাপসা হয়ে যায়। সরু গলিটা হাঁটুপানিতে ডুবে গেছে। নর্দমার কালো পানি, বৃষ্টির জল, ভাসমান পলিথিন, একটা ছেঁড়া স্যান্ডেল, সব মিলেমিশে এক অচেনা নদী।
তিন ঘণ্টা ধরে বিদ্যুৎ নেই।
ছয়তলা বাড়িটার সিঁড়িঘর অন্ধকার।
চারতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে নীরা নিচের দিকে তাকিয়ে ছিল। হাতে একটা সাদা খাম।
খামের ভেতর মাত্র একটা পৃষ্ঠা।
‘দুঃখিত, এই মুহূর্তে আপনার আবেদনটি বিবেচনা করা সম্ভব হচ্ছে না।’
নীরা অনেকক্ষণ শব্দটার দিকে তাকিয়ে ছিল।
‘দুঃখিত।’
শব্দটা তার কাছে আর দুঃখী মনে হয় না। বরং নিষ্ঠুর। অনেকটা হাসপাতালের চিকিৎসকদের মতো, যারা খুব শান্ত মুখে বলে, ‘আমরা চেষ্টা করেছি।’
গত আট মাসে সাতাশটা চাকরির আবেদন করেছে নীরা। এগারোটা ইন্টারভিউ। পাঁচটা জায়গা কোনো উত্তরই দেয়নি। চারটা বলেছিল, ‘আমরা আপনাকে জানাব।’ কেউ জানায়নি।
দুটো প্রতিষ্ঠান চিঠি পাঠিয়েছে। দুটোর শুরু একই শব্দে। ‘দুঃখিত।’
নীরা খামটা ভাঁজ করে গ্রিলের ওপর রাখল।
ভেতর থেকে মা ডাকলেন, ‘নীরা?’
সে উত্তর দিল না।
‘মোমবাতিটা কোথায় রেখেছিস রে?’
‘ড্রয়ারে।’
‘কোন ড্রয়ার?’
নীরা বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করল। আজ তার কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।
‘টিভির নিচেরটা।’
কিছুক্ষণ পর আবার মায়ের গলা।
‘পাচ্ছি না তো।’

নীরা ধীরে ধীরে ভেতরে গেল। অন্ধকার ঘরে হাতড়ে মোমবাতি বের করল। দেশলাই ঘষতেই ছোট্ট একটা হলুদ আগুন জ্বলে উঠল। তারপর মোমবাতি। শিখাটা স্থির হতেই মায়ের মুখ দেখা গেল।
নীরা থমকে গেল। মাত্র দুই বছরে মানুষ এত বুড়ো হয়ে যায়? বাবা বেঁচে থাকতে মায়ের চুলে এত সাদা ছিল না। চোখের নিচে এত গভীর কালি ছিল না। গালের চামড়া এমন নেমে আসেনি।
মোমবাতিটা টেবিলে রেখে নীরা সরে যেতে চাইলে মা বললেন, ‘চিঠিটা কিসের ছিল?’
‘কিছু না।’
‘চাকরির?’
নীরা চুপ। মা আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। এই না জিজ্ঞেস করাটাই নীরার সবচেয়ে কষ্ট লাগে। বাবা থাকলে হয়তো বলতেন, ‘হয়নি? তাতে কী? আবার হবে।’
মা কিছু বলেন না। শুধু এমনভাবে তাকান যেন মেয়ের ব্যর্থতাও নিজের শরীরের কোথাও বহন করছেন।
নীরা নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল। তারপর বিছানায় বসে অনেকক্ষণ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। নীরার বাবা হাবিবুর রহমান ছিলেন স্কুলের বাংলা শিক্ষক। তিনি বিশ্বাস করতেন, পৃথিবীর সব সমস্যার উত্তর কোনো না কোনো কবিতায় পাওয়া যায়। বেতন পাওয়ার তিন দিনের মধ্যে সংসারে টাকা থাকুক আর না থাকুক, একটা বই কিনে বাড়িতে ফিরতেন। মা খুব রাগ করতেন।
‘চাল নাই ঘরে, তুমি বই কিনে আনছ?’
বাবা হাসতেন।
‘চাল খেলে মানুষ কয়েক ঘণ্টা বাঁচে। বই পড়লে কয়েক শ বছর।’
‘তোমার এই কথায় দোকানদার চাল দেবে?’
মা বিরক্ত হয়ে রান্নাঘরে চলে যেতেন। বাবা তখন নীরার দিকে চোখ টিপতেন। নীরা হেসে ফেলত।
তখন জীবনটা খুব সহজ ছিল। যেকোনো বিপদে বাবা ছিলেন।
তারপর একদিন সকালে বাবা স্কুলে যাওয়ার জন্য শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে হঠাৎ বসে পড়লেন।
বললেন, ‘নীরা, একগ্লাস পানি দে তো।’
নীরা পানি এনে দেখল, বাবা মেঝেতে শুয়ে আছেন। তারপর সব খুব দ্রুত ঘটেছিল।
অ্যাম্বুলেন্স। হাসপাতাল। আইসিইউ। দরজার ওপর লাল বাতি। মায়ের হাতে তসবিহ।
ডাক্তারের নিচু গলা।
‘আমরা চেষ্টা করেছি।’

তিনটা শব্দ। মাত্র তিনটা। কিন্তু ওই তিনটা শব্দের একপাশে ছিল তাদের পুরোনো জীবন। অন্যপাশে ছিল সম্পূর্ণ নতুন এক জীবন।
বাবার মৃত্যুর পর নীরা প্রথম বুঝেছিল, একজন মানুষ মারা গেলে শুধু সে একা মারা যায় না। তার সাথে কিছু শব্দ, কিছু অভ্যাস, কিছু নিশ্চয়তা আর কিছু ভবিষ্যতেরও মৃত্যু ঘটে।
বাবার মৃত্যুর তিন মাস পর গ্রামের জমি বিক্রি করতে হলো। ছয় মাস পর ভেঙে গেল নীরার বিয়ে।
সজীবের সাথে দীর্ঘদিন ওর প্রেম ছিল। ওর ধারণা ছিল, সজীবও ওকে ভালোবাসে। কিন্তু ছেলেটা একদিন ফোনে বলেছিল,
‘তুমি বুঝতেই পারছ, পরিস্থিতি একটু complicated.’
‘কোন পরিস্থিতি?’
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা। তারপর, ‘তোমার বাবাও নেই। তোমার চাকরিটাও এখনো হয়নি…’
নীরা ফোন কেটে দিয়েছিল।
সেদিন রাতে সে একদম কাঁদেনি। শুধু বাবার আলমারির সামনে বসে ছিল। মানুষ খুব বড় আঘাতে অনেক সময় কাঁদতে পারে না। খুব ছোট কোনো ঘটনায় হঠাৎ ভেঙে পড়ে।
বাবার মৃত্যুর এক বছর পর একদিন বাজারে পেয়ারা কিনতে গিয়ে সেটা হয়েছিল।
এক বৃদ্ধ পেয়ারা বিক্রেতাকে এক ক্রেতা বলেছিল,
‘এত দাম? পেয়ারা, নাকি সোনা?’
বৃদ্ধ হেসে বলেছিল, ‘মা, আমার পেয়ারা খাইলে মন ভালো হয়ে যাবে।’
নীরা চমকে তাকিয়েছিল। বৃদ্ধের সাথে বাবার চেহারার কোনো মিল নেই। অথচ কণ্ঠস্বরে কোথায় যেন মিল আছে। হুবহু।
সে বাজারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেলেছিল। লোকজন তাকিয়ে ছিল। সে নিজেকে থামাতে পারেনি।
সেই বৃষ্টির রাতে নীরা নিজের ঘরে বসে সাতাশ নম্বর প্রত্যাখ্যানপত্রটার দিকে তাকিয়ে রইল।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

তার মাথায় একটাই প্রশ্ন। আর কত? একটা মানুষের জীবনে কতবার দরজা বন্ধ হতে পারে? বাবা নেই। বিয়ে নেই। চাকরি নেই। ব্যাংকে টাকা প্রায় শেষ। বাড়িওয়ালা ভাড়া বাড়াবে। মায়ের ওষুধ কিনতে হয়। চারপাশে তাকালে শুধু খরচ আর খরচ! প্রতিটা হিসাবের শেষে ঋণাত্মক চিহ্ন।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
‘কে?’
বাইরে চিকন গলা।
‘আমি।’
নীরা দরজা খুলল। ছয়তলার ফাহিমা ভাবির ছেলে রনি দাঁড়িয়ে আছে। বয়স দশ-এগারো হবে। জামা ভেজা। হাতে একটা পুরোনো কাচের বোতল।
‘কী?’
‘আপু, একটা মোমবাতি আছে?’
‘কেন?’
‘আমাদেরটা শেষ।’
‘তোমার মা কোথায়?’
রনি একটু চুপ করে বলল,
‘আম্মার জ্বর।’
‘ভিজলে কীভাবে?’
‘দোকানের দিতে যাইতে নিছিলাম। এমন বৃষ্টি আর রাস্তায় পানি যে যাওয়া সম্ভব না।’
নীরা রান্নাঘর থেকে একটা মোমবাতি এনে দিল। রনি দাঁড়িয়ে রইল।
‘আর কিছু?’
ছেলেটা লজ্জিত মুখে বলল, ‘দেশলাইটা দিলে…’
নীরা দেশলাই দিল। রনি চলে গেল। দরজা বন্ধ করার কয়েক সেকেন্ড পর আবার টোকা।
নীরা এবার বিরক্ত। দরজা খুলে বলল, ‘আবার কী?’
রনি মাথা নিচু করে বলল, ‘আপু… আগুনটা ধরায়ে দেন।’
‘দেশলাই দিলাম তো।’
‘হাত ভেজা। কাঠিগুলা নষ্ট হইয়া গেছে।’
নীরা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের মোমবাতির আগুন থেকে রনির মোমবাতি জ্বালিয়ে দিল।
রনি দুই হাত দিয়ে আগুনটা আড়াল করে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল।
কিছুদূর গিয়ে ডাকল,
‘আপু!’
‘কী?’
‘থ্যাংক ইউ!’

তারপর পায়ের শব্দ অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। নীরা দরজা বন্ধ করল। কেন জানি তার মনে হলো, দৃশ্যটা কোথাও আগে দেখেছে।
কোথায়? মনে পড়ল না। রাত প্রায় নয়টা। বিদ্যুৎ এখনো আসেনি। হঠাৎ ছয়তলা থেকে রনির চিৎকার।
‘কেউ আছেন? কেউ আসেন!’
নীরা ছুটে বের হলো।
ওপরে গিয়ে দেখে, ফাহিমা মেঝেতে পড়ে আছে। মুখ ফ্যাকাশে। শরীর কাঁপছে। রনি কাঁদছে।
‘আম্মা নড়ে না, আপু!’
নীরা কপালে হাত দিল। আগুনের মতো গরম। ‘কত দিন ধরে জ্বর?’
‘তিন দিন।’
‘ডাক্তার দেখাওনি?’
রনি কাঁদতে কাঁদতে বলল,
‘আম্মা কইছে, টাকা নাই।’
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। রনির বাবা বাহরাইনে থাকে। অনিয়মিত টাকা পাঠায়। ফাহিমা খুব হিসাব করে খরচ করে।
সে পরিচিত এক ডাক্তারকে ফোন করল। লক্ষণ শুনেই ডাক্তার বললেন, দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
সমস্যা হলো রাস্তা। গলিতে কোমরসমান পানি। রিকশা ঢুকছে না। বাড়ির দরজায় দরজায় নীরা কড়া নাড়ল।
কেউ খুলল। কেউ খুলল না।
যারা খুলল, বেশির ভাগই বলল,
‘এই বৃষ্টির মধ্যে কীভাবে যাব?’
ঠিক কথা। কীভাবে যাবে?
নীরাও উত্তর জানে না।

শেষ পর্যন্ত বাড়ির দারোয়ান জাহাঙ্গীর, পাশের ফ্ল্যাটের কলেজপড়ুয়া রাশেদ আর নীরা মিলে একটা প্লাস্টিকের চেয়ার জোগাড় করল।
ফাহিমাকে তাতে বসানো হলো। চারজন মিলে নিচে নামাল। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি।
নীরা ছাতা ধরে রেখেছে ফাহিমার মাথায়। নিজে ভিজছে। রনি মায়ের হাত আঁকড়ে হাঁটছে।
হাসপাতালে পৌঁছাতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগল।
ডাক্তার বললেন, নিউমোনিয়ার সঙ্গে গুরুতর সংক্রমণ। আরেকটু দেরি হলে বিপদ হতে পারত।
ভর্তি করতে হবে। কাউন্টারে টাকা চাইল। নীরা ব্যাগ খুলল। ভেতরে আগামী মাসের বাড়িভাড়ার টাকা। তার হাত কয়েক সেকেন্ড স্থির রইল। তারপর নোটগুলো এগিয়ে দিল।
পরদিন ফাহিমার জ্ঞান ফিরল।
নীরা হাসপাতালের করিডরের বেঞ্চে ঘুমিয়ে ছিল।
রনি তাকে জাগাল।
‘আপু।’
‘কী?’
‘আম্মা ডাকতেছে।’
ফাহিমা খুব দুর্বল গলায় বলল,
‘আপা… আপনে এইগুলা কী করলেন?’
‘কিছুই করি নাই।’
ফাহিমার চোখে পানি।
‘আমার আপন ভাই থাকলেও এত করত না।’
নীরা অস্বস্তিতে বলল, ‘এসব বাদ দেন। আগে সুস্থ হন।’
‘টাকা আমি শোধ দিমু।’
‘লাগবে না।’
‘না, আপা।’
নীরা একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ঠিক আছে। আপনার ছেলে বড় হয়ে চাকরি করলে সুদসহ নেব।’
রনি সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘আমি চাকরি করব না।’
দুজনেই তাকাল।
রনি খুব গম্ভীর গলায় বলল,
‘আমি বিজ্ঞানিক হমু।’

নীরা হেসে ফেলল। অনেক দিন পর। হাসতে হাসতেই চোখে পানি চলে এল।
রনি অবাক তাকিয়ে রইল। বড়রা খুশি হইলে কান্দে ক্যান?
রনি প্রায় প্রতিদিন বিকেলে নীরার কাছে আসতে শুরু করল।
প্রথম দিন অঙ্ক নিয়ে। ‘আপু, বুঝি না।’
নীরা বুঝিয়ে দিল। পরদিন ইংরেজি। তারপর বিজ্ঞান।
একদিন সঙ্গে আরও দুজনকে নিয়ে এল।
‘এরাও বুঝে না।’
নীরা ভুরু কোঁচকাল।
‘আমি কি কোচিং সেন্টার খুলেছি?’
রনি বলল, ‘না। কিন্তু আপনি সুন্দর বুঝাইতে পারেন।’
কথাটা শুনে নীরার বুকের ভেতর কোথাও কেঁপে উঠল। বাবাও তো বুঝিয়ে বলতে পারতেন।
পরের সপ্তাহে তিনজন থেকে সাতজন। তারপর দশজন। কেউ গৃহকর্মীর সন্তান। কেউ দারোয়ানের। কেউ পাশের বস্তি থেকে আসে।
একদিন নীরার মা দরজায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ দেখলেন।
বাচ্চারা চলে গেলে বললেন, ‘তুই ভালো পড়াস তো।’
নীরা খাতা গোছাতে গোছাতে বলল, ‘আমি আবার কবে পড়ালাম?’
‘এতক্ষণ কী করলি?’
‘ওদের একটু বুঝিয়ে দিলাম।’
মা হাসলেন।
‘তোর বাবাও এই কথাই বলত।’
নীরার হাত থেমে গেল।
‘কী বলত?’
‘আমি পড়াই না। একটু বুঝিয়ে দিই।’
নীরা মাথা নিচু করল। কারণ, চোখে পানি এসে গেছে।
ধীরে ধীরে নীরার জীবনে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন হলো। সে এখন বিকেল চারটার আগেই ঘর গুছিয়ে অপেক্ষায় থাকে। বাচ্চাদের জন্য প্রশ্ন বানায়। বোতলের ঢাকনা দিয়ে ভগ্নাংশ শেখায়। পুরোনো কাগজে সৌরজগৎ আঁকে। রনি পৃথিবীর মডেল বানাতে গিয়ে একটা ফুটবল কেটে ফেলায় মায়ের বকা খায়। মাঝেমধ্যে বাচ্চাদের পড়াতে পড়াতে মনে হয়, বাবা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। দুই হাত বুকের কাছে ভাঁজ করা। মুখে সেই চিরচেনা হাসি।

আরও পড়ুন

একদিন তার মনে হলো, বাবা যেন বলছেন, বুঝলি নীরা? আলো ছড়ালে আলো কমে না।
নীরা চমকে উঠল। বাবা কি সত্যিই কখনো এ কথা বলেছিলেন? নাকি সে নিজেই বানিয়ে নিয়েছে?
স্মৃতি আর কল্পনার মাঝখানে একটা খুব সরু দরজা আছে। প্রিয় মানুষ চলে গেলে সেই দরজা মাঝে মাঝে নিজে থেকেই খুলে যায়।
তিন মাস পর পড়ার দলটার একটা নাম হলো। ‘বাতিঘর’।
নাম দিয়েছিল রনি।
‘জাহাজ হারিয়ে গেলে বাতিঘর রাস্তা দেখায়। আমরা যারা পড়া বুঝি না, আমরা হারানো জাহাজ। আর আপনি আমাদের বাতিঘর।’
নীরা অবাক হয় ছোট্ট রনির মুখে এত পাকা পাকা কথা শুনে।
কয়েক মাস পর স্থানীয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কয়েকজন এল।
কেউ একজন ফেসবুকে বাতিঘরের ছবি দিয়েছিল। তারা সেটা দেখেই খোঁজ নিতে এসেছে।
ছোট ঘরে পনেরোটা শিশু মেঝেতে বসে পড়ছে। দেয়ালে হাতে আঁকা সৌরজগৎ। একপাশে লেখা, ‘ভুল করলে ভয় নেই। না বুঝে চুপ থাকলে খবর আছে।’
সংগঠনের এক মহিলা জিজ্ঞেস করলেন,
‘এটা আপনি চালান?’
‘চালাই বলা ঠিক হবে না। ওরা আসে, আমি পড়াই।’
‘ফি?’
‘কিছু না।’
‘ফান্ডিং?’
নীরা হেসে বলল, ‘শূন্য!’
মহিলা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘আপনি আমাদের সঙ্গে কাজ করবেন?’
‘কী কাজ?’
‘আমাদের আনপ্রিভিলেজড চিলড্রেন এডুকেশন প্রজেক্টের জন্য একজন দক্ষ প্রোগ্রাম কো–অর্ডিনেটর দরকার।’
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
‘আপনার সিভি পাঠাবেন?’
সেদিন রাতে নীরা বহুদিন পর নিজের সিভি খুলল।
ফাইলের নাম ‘নীরা_সিভি_ফাইনাল_ফাইনাল২,পিডিএফ’
নামটা দেখে সে হেসে ফেলল।
তারপর এক্সপেরিয়েন্স অংশে নতুন একটা বাক্য লিখল—
‘ফাউন্ডার অ্যান্ড ভলান্টিয়ার টিচার: বাতিঘর কমিউনিটি লার্নিং ইনিশিয়েটিভ’
কথাটা লেখার পর অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
সে কবেফাউন্ডার হলো? কবেইনিশিয়েটিভ শুরু হলো? সে তো শুধু এক অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল।

শুধু একটা বাচ্চার মোমবাতি জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
মানুষের জীবনের বড় পরিবর্তনগুলো কি কখনো কখনো এত ছোট জায়গা থেকেই শুরু হয়?
কোনো ঘোষণা ছাড়াই?
চাকরিটা নীরা পেল।
প্রথম বেতন হাতে পাওয়ার দিন একটা বই কিনে বাসায় ফিরল।
মা বই দেখে বললেন, ‘এ মাসেই বই কিনতে হলো?’
নীরা স্থির হয়ে গেল।
মা আবার বললেন, ‘কী হয়েছে?’
নীরা হঠাৎ হেসে উঠল।
তারপর মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল।
মা মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
‘বাবার কথা মনে পড়ছে?’
নীরা মাথা নাড়ল।
মা বললেন, ‘আমারও।’
সে রাতে নীরা বইটা বাবার আলমারিতে রেখে দিল। বাবার শেষ কেনা বইয়ের পাশে। দুটো বই পাশাপাশি। মাঝখানে কত বছরের দূরত্ব!
তবু দেখতে মনে হলো, একটা বই যেন গতকাল রাখা হয়েছে। আরেকটা আজ।
বহু বছর কেটে গেল।
গলির সেই পুরোনো বাড়িগুলো আর নেই। সেখানে এখন বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট। ফাহিমা গ্রামে ফিরে গেছে।
বাতিঘর এখন ছয়টি কেন্দ্রে ছড়িয়ে গেছে। হাজারের বেশি শিশু সেখানে পড়েছে। নীরা এখন মাঝবয়সী। চুলে সাদা রেখা। চোখে চশমা। কথা বলার সময় অজান্তেই বাবার মতো হাত নাড়ে। কখন যে মানুষ নিজের মা–বাবার মতো হয়ে যায়, নিজেও বুঝতে পারে না।
এক বর্ষার সন্ধ্যায় নীরা অফিসে কাজ করছিল।
বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি। রিসিপশন থেকে ফোন এল।
‘ম্যাম, একজন আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।’
‘নাম?’
‘রনি ইসলাম।’
নীরা স্থির হয়ে বসে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। দরজা খুলতেই লম্বা এক যুবক হাসিমুখে বলল,
‘আপু। চিনতে পেরেছেন?’
একটা শব্দ। কিন্তু বিশ বছর যেন ওই একটি শব্দের মধ্যে গলে গেল। নীরা তাকিয়ে রইল। বলল,
‘তুই সত্যিই বিজ্ঞানী হয়েছিস?’
রনি হেসে বলল, ‘এখনো হইনি, তবে হতে যাচ্ছি। আমার স্কলারশিপ হয়েছে আপু। পিএইচডি করতে ফ্লোরিডায় যাচ্ছি। সামনের সপ্তাহে ফ্লাইট।’
ব্যাগ থেকে একটা ছোট বাক্স বের করল।
‘আপনার জন্য।’
নীরা খুলল। ভেতরে একটা কাচের বোতল। তার মধ্যে সাদা মোমবাতি।
নীরার হাত কেঁপে উঠল। অন্ধকার সিঁড়ি। ভেজা জামা। ছোট্ট একটা ছেলে।
‘আপু, আগুনটা ধরায়ে দেন?’
সব ফিরে এল।
‘এটা…’
রনি বলল,
‘ওই বোতলটা না। ওটা অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। ওই রকম একটা খুঁজে কিনেছি।’
একটু থামল।
‘কিন্তু গল্পটা সত্যি।’
নীরা তার দিকে তাকাল।
রনির চোখে পানি।
‘আপু, একটা কথা আপনাকে কখনো বলা হয়নি।’
‘কী?’
‘সেই রাতে আম্মা যখন অসুস্থ ছিল, আমি ভাবছিলাম, আম্মা মারা যাবে। আমাদের কেউ নাই। কিছু নাই। সব অন্ধকার।’
সে মোমবাতিটার দিকে তাকাল।
‘তারপর আপনি এলেন।’
নীরা কিছু বলতে গেল।
রনি থামাল।
‘আপনার কাছে হয়তো ওইটা কিছুই ছিল না। একটা মোমবাতি জ্বালানো। হাসপাতালে নেওয়া। কয়েকটা অঙ্ক বোঝানো।’
তার গলা কেঁপে গেল। ‘কিন্তু আমার পুরো জীবনটা সেখান থেকেই বদলেছে।’
নীরা চোখ নামিয়ে নিল।
রনি বলল, ‘আমি ছোটবেলায় ভাবতাম, আপনি খুব ভাগ্যবান মানুষ।’
নীরা মৃদু হাসল। ‘ওই সময়টাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়।’
‘জানি।’
নীরা তাকাল।
‘জানিস?’

‘খালা পরে বলছিলেন। চাকরি ছিল না। খালু মারা গেছিলেন। আপনার বিয়েটাও ভেঙে গেছিল।’
নীরা চুপ।
বিদ্যুৎ চলে গেছে। বাইরে হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকাল। একমুহূর্তের জন্য ঘরটা সাদা হয়ে আবার অন্ধকার হয়ে গেল।
রনি খুব ধীরে বলল, ‘মজার ব্যাপার জানেন, আপু?’
‘কী?’
‘আপনি তখন ভাবতেন, আপনার চারপাশে শুধু অন্ধকার। কিন্তু আপনি একটা জিনিস দেখেননি।’
‘কী?’
রনি মোমবাতিটার দিকে তাকাল। তারপর নীরার দিকে।
‘অন্ধকারটা আপনার চারপাশে ছিল। আপনি নিজে অন্ধকারে ছিলেন না। আপনি নিজেই আলো ছিলেন।’
ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।
বৃষ্টির শব্দ। দূরে গাড়ির হর্ন। ঘড়ির টিক টিক।
নীরা কথা বলতে পারল না।
তার মনে হলো, বহু বছর ধরে বুকের ভেতর যে প্রশ্ন জমে ছিল, কেন মানুষ চলে যায়, কেন কিছু দরজা বন্ধ হয়, কেন জীবন কখনো কোনো কারণ ছাড়াই এত নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে—তার সব উত্তর হয়তো পাওয়া যায় না।
সব কষ্টের মহান কোনো উদ্দেশ্যও থাকে না। কিছু ক্ষতি শুধুই ক্ষতি। কিছু মৃত্যু শুধুই শূন্যতা। কিন্তু অন্ধকারের ভেতরও মানুষের হাতে একটা ক্ষমতা থেকে যায়। সে চাইলে নিজের অন্ধকারটুকু আরেকজনের ওপর ছড়িয়ে দিতে পারে।
অথবা একটা ছোট্ট শিখা এগিয়ে দিতে পারে।
নীরা মোমবাতিটার দিকে তাকাল।
সেই রাতের কথা মনে পড়ল। নিজের মোমবাতি থেকে রনির মোমবাতি জ্বালিয়েছিল।
তখন সে খেয়াল করেনি, আরেকটা আলো জ্বালাতে গিয়ে তার নিজের আলো একটুও কমেনি।
নীরা জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে সন্ধ্যা। হাজার হাজার জানালায় আলো। কোন আলো কার কাছ থেকে এসেছে, বোঝার উপায় নেই।
হয়তো একটা আলো থেকে আরেকটা। সেখান থেকে আরেকটা। তারপর আরও একটা। মানুষ জানেও না, তার কাছ থেকে পাওয়া সামান্য আলো নিয়ে কেউ হয়তো সারা জীবন পথ হেঁটে যায়।

পেছন থেকে রনি বলল,
‘আপু?’
নীরা ফিরে তাকাল।
‘কী?’
‘অন্ধকার হয়ে আসছে। মোমবাতিটা জ্বালাবেন?’
নীরা মোমবাতিটার দিকে তাকাল। তারপর জানালার বাইরে। দীর্ঘক্ষণ।
‘না।’
রনি অবাক হলো।
‘কেন?’
নীরা এবার হাসল। খুব শান্ত একটা হাসি।
‘এটার আর দরকার নেই।’
রনি কিছু বলল না।
নীরাও না।
বাইরে তখন বৃষ্টির মধ্যে একটার পর একটা জানালায় আলো জ্বলছে।
নীরার হঠাৎ মনে হলো, বাবা হয়তো কোথাও যাননি।
মানুষ কি সত্যিই পুরোপুরি চলে যায়? না। যে মানুষ কোনো এক দিন কারও ভেতরে সামান্য আলো জ্বালিয়ে দিয়ে যায়, সে আলো থেকে যায়। একজনের মধ্যে। তারপর আরেকজনের মধ্যে। এক জীবন থেকে আরেক জীবনে। এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে। নীরা জানালার কাচে হাত রাখল।
কাচ ঠান্ডা। ওপাশে শহর ভিজছে।
তার মনে হলো, এত অন্ধকারের পরও পৃথিবী যে পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যায় না, তার কারণ সূর্য নয়, বিদ্যুৎও নয়। কোথাও না কোথাও একজন মানুষ আরেকজন মানুষের দিকে একটু আলো এগিয়ে দেয়।
আর কখনো কখনো, যখন চারপাশের সবকিছু অন্ধকার বলে মনে হয়, মানুষ ভুলে যায় একবার নিজের দিকেও তাকাতে। হয়তো আলোটা কোথাও বাইরে নেই। হয়তো, আলোটা সে নিজেই।