শিউলিগাছ
১.
‘কাকু ভালো আছেন?’
অনিরুদ্ধ সেন শিউলিতলা থেকে ফুল কুড়াচ্ছিলেন। তাঁর উঠানের সামনে সীমানাপ্রাচীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা শিউলিগাছটার নিচে সাদা ফুল বিছিয়ে আছে। কমলা ডাঁটাগুলোকে দূর থেকে মনে হয়, কেউ যেন মাটির ওপর ছোট ছোট প্রদীপ জ্বেলে রেখেছে। তিনি প্রতি সকালেই ফুল কুড়ান।
কিশোরী কণ্ঠ শুনে তাঁর পেছনে দাঁড়ানো মেয়েটির দিকে দৃষ্টি ফেরালেন।
তিনি চোখের চশমা ঠিক করলেন। তাঁর বয়স ষাট ছাড়িয়ে গেছে। চশমা ছাড়া কাছের জিনিসও স্পষ্ট দেখেন না। মেয়েটির বয়স ১৪–১৫ হবে। শ্যামলা, রোগা পাতলা একটি ছিপছিপে তরুণী। এই বয়সী মেয়েদের এমনিতেই মায়া কাড়া চেহারা হয়ে থাকে। এই মেয়েটিকে দেখে আরও মায়া লাগছে। চোখের কারণেই কি এমনটা লাগছে? তিনি তার চোখ লক্ষ করলেন। চোখে তো কাজল দেয়নি। তাহলে এই বাড়তি মায়া লাগার উৎস কী?
তিনি জবাবে বললেন ‘হুঁ। তুমি ভালো আছ?’
মেয়েটি হাসিমুখে বলল, ‘জি, আমরা ওই ফ্ল্যাটে উঠেছি।’
বলে মেয়েটি পাশের বাড়ির দোতলার দিকে ইশারা করল। আগের ভাড়াটে দীর্ঘদিন থাকার পর গত মাসেই বাড়ি ছেড়েছে। এরাই তাহলে তাঁর নতুন প্রতিবেশী?
অনিরুদ্ধ সেন বললেন, ‘ও আচ্ছা।’
এবার মেয়েটি বেশ ইতস্তত করে বলল, ‘কাকু আপনাকে একটা কথা বলার ছিল।’
অনিরুদ্ধ সেন ফুল কুড়াতে কুড়াতে বললেন, ‘বলো।’
মেয়েটি লজ্জায় রক্তিম হয়ে বলল, ‘আমি প্রতিদিন সকালে আপনার এই গাছের ফুল চুরি করি।’
মেয়েটির লজ্জা পাওয়া দেখে অনিরুদ্ধ হেসে বললেন, ‘আমি জানি কে আমার ফুল চোর!’
মেয়েটির লজ্জা বিস্ময়ে পাল্টে গেল।
‘কীভাবে?’
‘ফুল কমে যায়, তাই।’
বলেই তিনি হাসলেন। মেয়েটির মন থেকে অপরাধবোধ কাটানো দরকার।
তাঁর হাসিতে কাজ হলো। সে–ও হেসে ফেলল। তারপরই হাসি সামলে বলল, ‘আপনি রাগ করেননি তো?’
অনিরুদ্ধ সেনের ফুল কুড়ানো শেষ। তিনি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, ‘ফুল যদি নিজের জন্যই ফুটত, তাহলে তো সে ফুল হতো না।’
বলেই তিনি তাঁর ঝুড়িভর্তি ফুল মেয়েটির দিকে এগিয়ে দিলেন।
‘এই নাও। আজকে আর ফুল চুরি করতে হবে না। আজকে আমি তোমাকে উপহার দিলাম।’
‘আমি ঐশী।’
‘আমি অনিরুদ্ধ।’
‘আপনাকে সবাই চেনে।’
তিনি হালকা হেসে বললেন, ‘আমি কাউকে খুব একটা চিনি না।’
কথাটা বলে নিজেই চুপ হয়ে গেলেন। সত্যিই তো। মাধবী চলে যাওয়ার পর তাঁর পৃথিবীটা ধীরে ধীরে ছোট হতে হতে এখন এই বাড়ির চারদেয়ালে এসে থেমেছে।
মাধবী তাঁর স্ত্রী। আট বছর হয়েছে যে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছে। সে বেঁচে থাকতে খুব মিশুক স্বভাবের ছিল। পাড়াপ্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন এমন কেউ ছিল না—যার সাথে সে যোগাযোগ রক্ষা করে চলত না। খুবই সাধারণ মেয়ে ছিল। দেখতে সাধারণ, গান গাইত বেসুরো গলায়, নাচতে পারত না। রান্নাবান্নাও যে খুব ভালো পারত এমনও না। কিন্তু যার সাথেই সে কথা বলত, সেই মনে করত যেন কত দিনের চেনা! মানুষদের এতটাই আপন করে নিতে পারত।
অনিরুদ্ধ সেন ঠিক তাঁর বিপরীত স্বভাবের। নিতান্তই অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা আত্মীয় না হলে তিনি সেভাবে কথা বলেন না। আড়ষ্ট বোধ করেন।
গোটা জীবন স্কুলে মাস্টারি করেছেন। ছেলেমেয়েদের গণিত শেখাতেন। তাঁর জীবনের সমীকরণ সব সময় না মিললেও স্কুলের ব্ল্যাকবোর্ডে গণিতের সমীকরণ ঠিকই মেলাতেন।
মাস্টারি ছাড়া তাঁর আরেকটা শখ লেখালেখির। পত্রপত্রিকার সাহিত্য পাতায় মাঝে মাঝে গল্প কবিতা লিখে পাঠাতেন। কয়েকটা বইও প্রকাশ হয়েছে। বইগুলো সেভাবে বিক্রি হয়নি, কাজেই সেগুলো অতি উচ্চমার্গের না অতি অখাদ্য সাহিত্যকর্ম সেটা তিনি বুঝতে পারেননি।
প্রতি বিকেলে প্রাইভেট কোচিং করাতেন। এই বাড়িটা যেখানে তিনি থাকেন, তাঁর অতি কষ্টের টাকা এবং মাধবীর স্বপ্নে একটার পর একটা ইট জুড়ে গড়ে তোলা। এই যে শিউলিগাছটি, সেটিও মাধবীরও বোনা। এই বাড়িতে ওঠার প্রথম দিন স্মরণীয় করে রাখতেই সামনের উঠানের সীমানাপ্রাচীর ঘেঁষে ছোট্ট চারাগাছটি লাগিয়েছিল সে। এরপর কতগুলো বছর কেটে গেছে। কত গাছ লাগানো হয়েছে। কিন্তু এই গাছটির আলাদা বিশেষত্ব আজও রয়ে গেছে। তিনি গাছটিকে ‘মাধবী’ বলেই ডাকেন। মানুষের দৃষ্টির আড়ালে গাছটির সাথে মাঝে মাঝে আলাপসালাপও করেন।
মাধবীর প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল গাছপালা ও ফুলের প্রতি। বেঁচে থাকতে গোটা বাড়িকেই সে বাগানে পাল্টে ফেলেছিল। এমন না যে তিনি বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বাড়ি বানিয়েছেন। সামান্য কয়েক কাঠা জমির ওপর একতলা বাড়ি। এর চেয়ে বেশি কিছু করার সামর্থ্য একজন স্কুলমাস্টারের থাকে না। ফাঁকা জায়গা বলতে গেলে প্রায় নেইই। কিন্তু সেই জায়গাটুকুও এমনকি ছাদও সে গাছগাছালিতে ভরে ফেলেছিল।
সেগুলোর যত্ন নিতে নিতেই তাঁর সময় পেরিয়ে যেত।
মাঝে মাঝে অনিরুদ্ধ খুব বিরক্ত হতেন। বাড়িতে এত গাছ থাকলে সাপ, বিচ্ছু, পোকামাকড় ইত্যাদি আসার সম্ভাবনা বাড়ে। তিনি সেটা মুখ ফুটে বলতেই মাধবী বেশ ফিল্মি কায়দায় বলেছিল ‘ইট–পাথরে বাড়ি বানানো যায় মিস্টার সেন, কিন্তু সেখানে সবুজ পাতা এবং ফুল না থাকলে সেই বাড়িতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা পায় না!’
কথাটা কতটুকু সত্য কে জানে! তবে আট বছর ধরে অনিরুদ্ধ বুঝেছেন, বাড়ির গৃহিণী যদি বাড়িতে না থাকে, তাহলে সেই বাড়ি শ্মশান হয়ে যায়।
অনিরুদ্ধ সেনের দুই মেয়ে। মালতি ও মাধুরী। দুই মেয়েই প্রতিষ্ঠিত। বড় মেয়ে মালতি আমেরিকায় স্বামী সংসার নিয়ে আছে। পেশায় করপোরেট অ্যাকাউন্ট্যান্ট। স্বামী ধীরেন ইঞ্জিনিয়ার। সেই ঘরে দুই নাতি নাতনি। প্রতিবছর দুই সপ্তাহের জন্য বেড়াতে আসে।
আরেক মেয়ে মাধুরী এ শহরেই থাকে, পেশায় ডাক্তার। স্বামী তাপসও ডাক্তার। নিঃসন্তান স্বামী স্ত্রী দুজনই খুব ব্যস্ত সময় কাটায়। তারপরও শত ব্যস্ততার মাঝেও তাঁর দুই মেয়েই প্রতিদিন বাবার খোঁজ নিতে ভোলে না। লোকে পুত্রসন্তান পুত্রসন্তান বলে হাহাকার করে। অথচ তাঁর দুই কন্যাই তাঁকে যে পরিমাণ যত্ন করে এবং ভালোবাসে, হাজার পুত্রের পক্ষেও তা সম্ভব হতো না।
বেশ খানিক্ষণ ধরে মোবাইল ফোনে রিং হচ্ছে। তিনি ছুটে এসে ফোন ওঠালেন। মাধুরী কল করেছে।
‘ফোন উঠাতে এত দেরি হলো কেন?’
‘কাজে ব্যস্ত ছিলাম মা।’
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
‘তুমি জানো না তুমি একা থাকো বলে আমাদের কত টেনশন হয়! কতবার বলেছি তুমি আমার সাথে এসে থাকো।’
তিনি হাসলেন। মেয়েরা চাইলেই কি আর তাঁদের বাড়িতে গিয়ে থাকা যায়? যদিও তাপস খুবই ভালো ছেলে। কিন্তু তাঁর বাড়ি যেমনই হোক, নিজের বাড়িতে নিজের স্বাধীনতা থাকে।
মেয়ের সাথে ফোনালাপ শেষে সকালের নাশতা বানাতে যাবেন এমন সময়ে ঐশী এসে দরজায় টোকা দিল।
‘কাকু নমস্কার! আবার এলাম।’
হাতে একটা বাটি।
‘মা পায়েস বানিয়েছে। আপনার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছেন।’
তিনি বললেন ‘সকাল সকাল মিষ্টি!’
‘মিষ্টি হলো মিষ্টি, এর কোনো সকাল–বিকাল নেই।’
সে বাটির ঢাকনা সরাল। ভেতর থেকে এলাচের গন্ধ নাকে এল। তিনি চমকে উঠলেন। মাধবীও পায়েসে প্রচুর এলাচ দিত। তিনি বিরক্ত হয়ে বলতেন, ‘এতে পায়েসের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়।’
মাধবী বলতেন, ‘মানুষ স্বাদ ভুলে যায়, কিন্তু গন্ধ অনেক দিন মনে রাখে।’
এ বাড়িতে পায়েস রান্না হয় না আট বছর তো হবেই। কী আশ্চর্য! এত বছর পুরোনো স্মৃতি হঠাৎ এক গন্ধেই ফিরে এল!
‘এসো মা, বসো।’
‘না কাকু, আমার তাড়া আছে। কলেজের দেরি হয়ে যাচ্ছে।’
‘তুমি কলেজে পড়ো নাকি? দেখে তো মনে হয় এখনো স্কুলই পেরোওনি।’
মেয়েটি হেসে বলল, ‘আমি বড় হয়ে গেছি কাকু! সেকেন্ড ইয়ার এইচএসসি!’
‘বাহ্ বেশ! সায়েন্স না আর্টস?’
‘কমার্স।’
‘বাহ্! বেশ ভালো!’
মেয়েটি ত্বরা কণ্ঠে বলল ‘বাটিটা রেখে যাচ্ছি। পরে এসে নিয়ে যাব।’
তারপরই যেন প্রজাপতির মতো উড়ে গেল। তিনি তাকিয়ে রইলেন তার গমন পথে। ওকে অনুসরণ করতে করতেই তাঁর দৃষ্টি পড়ল শিউলি গাছের ওপর। গাছের গায়ে একটা লাল দাগ কাটা।
তাঁর বুক খোঁচা দিয়ে উঠল।
আগামীকালই সেই দিন!
২.
সরকার তাঁর শিউলিগাছটার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছেন।
রাস্তা সম্প্রসারণ হবে। এক লেন বাড়ানো হবে। তাঁর সীমানাপ্রাচীর ও উঠানের একটি অংশ চলে যাবে রাস্তার পেটে। সেই অংশেই শিউলিগাছটা আছে।
সরকারি কর্মকর্তা খুবই নির্বিকারভাবে তাঁকে সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন।
‘চিন্তা নেই, আপনাকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে!’
তিনি হাহাকার করে উঠেছিলেন।
‘আমার গাছটা কেটে ফেলবেন?’
তাঁরা নিরাসক্ত গলায় বললেন, ‘গাছ তো যাবেই। বাড়ি যে যাচ্ছে না সেটার জন্য নিজেকে ভাগ্যবান মনে করুন। ১১৭ নম্বর বাড়ির পুরোটা চলে যাচ্ছে। ১১৪ নম্বরের অর্ধেকটা।’
তাঁর কাছে মনে হলো এঁরা সরকারি কর্মচারী নন, জল্লাদ। তাঁর মাধবীর ফাঁসির রায় কার্যকর করতে এসেছে। আট বছর আগে স্ত্রীকে একবার হারিয়েছিলেন, এবার দ্বিতীয়বার একই কষ্টের মধ্য দিয়ে তাঁকে যেতে হবে!
তিনি আপিল করেছিলেন। পরদিনই তিনি সড়ক বিভাগের অফিসে গেলেন।
অফিসটা শহরের পুরানো অংশে, একটা তিনতলা ভবন। নিচতলায় ঢুকতেই একটা টেবিলের পেছনে বসা লোকটা তাঁর দিকে না তাকিয়েই বলল, ‘কী দরকার?’
‘আমার বাড়ির সামনের গাছ কাটার নোটিশ পেয়েছি। এটা নিয়ে কথা বলতে চাই।’
‘তিনতলায় যান। রুম নাম্বার ৩০৪।’
তিনতলায় গিয়ে দেখলেন রুম ৩০৪ তালাবদ্ধ। পাশের রুমের একজন বলল, ‘স্যার আজ আসেননি। কালকে আসেন।’
পরদিন আবার গেলেন। এবার রুমটা খোলা, কিন্তু ভেতরে কর্মকর্তা নেই। এক পিয়ন বলল, ‘স্যার মিটিংয়ে গেছেন। বসেন, আসবেন।’
দুই ঘণ্টা বসে থাকার পর কর্মকর্তা এলেন। তাঁর সমস্যাটা শুনে একটা ফাইল খুললেন, তারপর বন্ধ করে দিলেন।
‘দেখুন স্যার, প্ল্যান পাস হয়ে গেছে। এখন এটা পাল্টানো আমার হাতে নেই।’
‘তাহলে কার হাতে?’
তিনি ওপরের মহলে দরখাস্ত করতে বললেন।
ওপর মহলে যাওয়ার জন্য আরেকটা দরখাস্ত লিখতে হলো। সেই দরখাস্ত জমা দেওয়ার জন্য আরেকটা লাইনে দাঁড়াতে হলো। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মধ্যবয়সী লোক তাঁকে ফিসফিস করে বললেন, ‘ভাই, শুধু দরখাস্ত জমা দিলে হবে না। একটু ব্যবস্থা করতে হয়।’
‘মানে?’
অনিরুদ্ধ সেনের ফুল কুড়ানো শেষ। তিনি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, ‘ফুল যদি নিজের জন্যই ফুটত, তাহলে তো সে ফুল হতো না।’
লোকটা তাঁর দিকে অদ্ভুত চোখে তাকালেন, যেন এত সহজ জিনিস কেউ না বুঝলে সেটা অবাক হওয়ার বিষয়।
‘স্যার, খামে করে কিছু দিতে হয়। নাহলে ফাইল টেবিলের নিচে পড়ে থাকবে।’
অনিরুদ্ধ সেন কিছু বললেন না। ৪০ বছর মাস্টারি করে এসে এখন তাঁকে ঘুষ দেওয়ার পরামর্শ শুনতে হচ্ছে। তিনি ফিরে এলেন, দরখাস্তটা জমা দিয়েই।
সাত দিন পরেও কোনো উত্তর এল না। তিনি আবার গেলেন। এবার যথাযথ কর্তৃপক্ষের সাথে দেখা হলো বটে, কিন্তু মাত্র চার মিনিটের সাক্ষাৎ।
‘স্যার, আমি আপনার সমস্যাটা বুঝি। কিন্তু প্ল্যানটা মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদিত। এটা বদলাতে হলে অনেক ধাপ পেরোতে হবে। এমপি সাহেবের সুপারিশ লাগবে।’
‘আমার কাছে এমপি সাহেবের কাছে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই।’
তিনি একটা মৃদু হাসি দিলেন, যে হাসিতে করুণা আছে, কিন্তু সাহায্যের কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।
‘চেষ্টা করে দেখুন স্যার। আমার হাতে আর কিছু নেই।’
সেদিনই তিনি যখন করিডরে হতাশ দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন এক যুবক তাঁর সামনে এসে দাঁড়ায়।
‘স্যার, আমাকে চিনতে পারছেন?’
তিনি ঠিকমতো তাঁর মুখের দিকে তাকালেন। তাঁর ছাত্র, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু কিছুতেই নাম বা চেহারা মনে করতে পারলেন না।
‘স্যার আমি তোফায়েল। তোফায়েল হোসেন সিদ্দিকী! ২০০১ এসএসসি ব্যাচ। এখন মাথার চুল পাতলা হয়ে গেছে বলে হয়তো চিনতে অসুবিধা হচ্ছে। তাছাড়া স্কুলে পড়ার সময়ে আমার দাড়িও ছিল না। হাহাহা।’
যুবকটা হো হো করে হাসছে। স্যারকে সামনে পেয়ে সত্যি সত্যিই আনন্দিত হয়েছে।
তিনি শুধু ‘ও আচ্ছা’ বললেন। কণ্ঠ শুনেই বোঝা গেল তিনি কিছুই মনে করতে পারছেন না।
‘ক্লাস সেভেনে থাকতে আমি অঙ্কে লাগাতার ফেল করতাম। অনুপাতের অঙ্ক কিছুতেই আমার মাথায় ঢুকত না। অ্যালজেব্রাও না। ষাণ্মাসিক পরীক্ষায় এক শতে সতেরো পাওয়ায় আপনি আমার খাতায় বড় করে লাল কালিতে ‘গরু’ লিখে দিয়ে বলেছিলেন বাবার সিগনেচার নিয়ে আসতে। এখন মনে পড়েছে?’
তিনি বিব্রত হাসি হেসে বললেন, ‘এখন মনে পড়েছে।’
তোফায়েলও হেসে বলল ‘সেই আমিই এসএসসিতে সাধারণ গণিতে এ প্লাস পেয়েছিলাম। হায়ার ম্যাথেও এ প্লাস ছিল।’
‘বাহ্! বাহ্! বেশ ভালো! তা তুমি এখন কোথায় আছ?’
‘স্যার এখন আমি ইঞ্জিনিয়ার হয়েছি। সড়ক বিভাগে।’
বলেই সে স্যারের পা ছুঁয়ে সালাম করল। অনিরুদ্ধ সেনের বুকটা হু হু করে উঠল। খাতায় ওভাবে ‘গরু’ লেখাটা উচিত হয়নি। বেচারা এখনো ভুলতে পারছে না। শিক্ষকেরা শাসন করেন, ভুলেও যান। কিছু শাসন ছাত্রদের মনে আজীবন দাগ কেটে রাখে।
‘গরু লেখাটা উচিত হয়নি বাবা। কিন্তু তুমি কিছুতেই অঙ্ক প্র্যাকটিস করতে না। গোটা ক্লাস ভালো মার্ক্স পেয়ে পাস করল, শুধু তুমিই ফেল।’
ছেলেটা হাসতে হাসতে বলল, ‘তা–ও যেই সেই ফেল না স্যার, একেবারে ফেল নিয়ে নিচের ক্লাসে ডিমোশন হয়ে যাওয়ার মতো ফেল। হাহাহাহা!’
তোফায়েল হোহো করে হাসছে। তাঁর হাসি দেখে অফিসের অনেকেই এদিকে ঘুরে তাকাচ্ছে। হেড ক্লার্ক নড়েচড়ে বসেছে। চেহারায় কাঁচুমাচু ভাব চলে এসেছে। ইঞ্জিনিয়ার স্যার যাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করে, তাঁকে অবহেলা করা মনে হয় ঠিক হয়নি।
‘ছাত্ররা ফেল করলে আমার নিজের ওপর খুব রাগ হয়। নিজেকে ব্যর্থ মনে হয়। সেই রাগ সামলাতে পারিনি। তুমি কিছু মনে রেখো না।’
তোফায়েল সাথে সাথে জিব কেটে বলল, ‘স্যার! সেদিন যদি আপনি শাসন না করতেন, তাহলে আজকে কি আমি এই চাকরি পেতাম?’
তারপর কণ্ঠস্বর পাল্টে বলল, ‘বলেন স্যার, হঠাৎ কী কাজে এখানে এসেছেন? আমাকে দেখতে যে আসেননি সেটা তো অনুমান করতেই পারি। আমার পক্ষে যদি কিছু করার থাকে, তাহলে হুকুম করেন।’
তিনি তাঁর সমস্যার কথা বললেন। তোফায়েল খুবই মনোযোগ দিয়ে শুনল। তারপর বলল, ‘আমি আমার লেভেলে যা করা সম্ভব, চেষ্টা করব স্যার!’
তিন দিন পর তোফায়েল নিজেই তাঁর বাড়িতে এল। মুখটা থমথমে।
‘স্যার, একটা কথা বলি। আপনি রাগ করবেন না তো?’
‘বলো।’
‘মূল প্ল্যানে রাস্তাটা যেদিক দিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেই পথে কমিশনার সাহেবের বাড়ি পড়ে। তাঁর বাড়ি বাঁচাতে প্ল্যান বদলে আপনাদের দিকে নিয়ে আসা হয়েছে। আমি আমার স্যারকে এটা নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি সরাসরি বলে দিলেন, “এসব প্রশ্ন করার তুমি কে? তোমার কাজ ড্রয়িং বানানো, নীতি ঠিক করা না।” আমাকে সাবধানও করে দিলেন, বেশি খোঁচাখুঁচি করলে চাকরিতে সমস্যা হতে পারে।”’
অনিরুদ্ধ সেন চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ।
‘তুমি আর কষ্ট কোরো না বাবা। তোমার চাকরির ক্ষতি হোক, এটা আমি চাই না।’
‘স্যার, তা–ও আমি একবার এমপি অফিসে খোঁজ নিয়ে দেখি। হয়তো....’
‘না। থাক।’
তোফায়েল চলে যাওয়ার পর তিনি বুঝলেন, এটা আর শুধু কাগজপত্রের লড়াই নয়। ক্ষমতার একটা চাকা তাঁর গাছটার ওপর দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে, আর সেই চাকা থামানোর সাধ্য একজন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলমাস্টারের নেই। এক স্কুলমাস্টারের হাত অত দূর পর্যন্ত পৌঁছে না।
তিনি আবার এলেন শিউলিতলায়। গাছটির গায়ে হাত রাখলেন।
‘আমাকে ক্ষমা করো মাধবী।’
গাছটি মৃদু দুলল। বাতাসে। তাঁর মনে হলো মাধবী তাঁর কথার উত্তর দিয়েছেন।
লাল দাগটিতে আঙুল বোলালেন। ইচ্ছা হলো মুছে দেন। দাগ তো সহজেই মুছে ফেলা সম্ভব, কিন্তু এর ভাগ্যে যা লেখা হয়ে গেছে, সেটা কি মোছা যাবে?
তিনি দীর্ঘশ্বাস বাতাসে মিলিয়ে দিলেন।
সন্ধ্যায় ছোট মেয়ে এসে উপস্থিত।
‘বাবা, তুমি ঠিক আছ?’
তিনি বললেন ‘বেঠিক থাকব কেন?’
‘কাল তো গাছটা কেটে ফেলার দিন।’
তিনি কিছু বললেন না। বড় মেয়ে কিছুক্ষণ আগেই ফোনালাপ। তারও একই কথা, আগামীকাল গাছটি কেটে ফেলার দিন। তিনি যেন মন খারাপ না করেন।
মাধুরী বলল, ‘আমি চেষ্টা করেছিলাম পরিচিতদের ধরে যদি কিছু করা যায়। লাভ হলো না। প্ল্যান পাল্টাতে হলে সরকারের নাকি আরও অনেক অনেক বেশি টাকা খরচ হবে।’
‘হুঁ।’
মাধুরী জানে গাছটা বাবার কাছে কতটা প্রিয়। মায়ের অসংখ্য স্মৃতির মধ্যে এই গাছটিই প্রধান। মা চলে যাওয়ার পর বাবা এই গাছটির মধ্যে মায়ের ছায়া খুঁজে নেন।
‘আজকে এক কাজ করলে কেমন হয় বাবা? যেহেতু গাছটা কেটেই ফেলবে, আমরা না হয় এই গাছটাকে আনন্দের সাথেই বিদায় দিই?’
তিনি কন্যার দিকে ফিরে বললেন, ‘কীভাবে?’
‘ধরো আজকে গাছের নিচে বসে পিকনিক করলাম। মায়ের প্রিয় কিছু গান শুনলাম। মায়ের গল্প করলাম। আপাকেও ফোনে রাখলাম।’
তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘মন্দ হয়না।’
কিছুক্ষণের মধ্যেই মাধুরী একটা বিছানার চাদর এনে শিউলি তলায় বিছিয়ে দিল। আলোর ব্যবস্থা করল। চিকেন স্যান্ডউইচ, ডিমের স্যান্ডউইচ, বিস্কুট, চা নিয়ে এল। মোবাইল ফোনে কিছু রবীন্দ্রসংগীত, হেমন্ত, লতা, আশার গান ছেড়ে দিল। ফোনে মালতি ভিডিও কলে যুক্ত। তাঁর দুই নাতিকেও দেখা যাচ্ছে। ওরা ব্যস্ত, ‘হাই নানা ভাই’ বলেই চলে যেতে যাচ্ছিল। মা ধমক দিয়ে ওদের বসিয়ে দিল।
তিনি বললেন, ‘আহা বেচারাদের ধমক দিস না।’
মালতি বলল, ‘ধমকাতে হবে বাবা। নাহলে একেকটা বেয়াদব হবে। সারা দিন ট্যাব খুলে বসে থাকা, এদের নিয়ে কী যে যন্ত্রণায় আছি!’
মালতির বড় ছেলেকে মাধুরী বাবু ডাকে। সে তখন, ‘এই বাবু, তুই এখন কোন ক্লাসে পড়িসরে?’
ছেলেটা আমেরিকান একসেন্টে বলল, ‘ক্লাস কী?’
পাশ থেকে মালতি বলল, ‘গ্রেড।’
বাবু জবাব দিল, ‘থার্ড গ্রেড।’
মাধুরী বলল, ‘শুনলাম, তোর ক্লাসের কোন এক ব্লন্ড মেয়েকে নাকি তোর ভালো লেগেছে? বড় হয়ে ওকে বিয়ে করতে চাস?’
বাবু লজ্জায় লাল হয়ে গেল। ‘তোমাকে এসব কে বলেছে?’
‘খবর পাই! আমার অনেক স্পাই আছে আমেরিকায়। ওরাই আমাকে খবর দেয়। মেয়েটার নাম কি বলে দেব?’
বাবু আতঙ্কিত স্বরে বলে, ‘না! এখানে না!’
সবাই একসাথে হেসে ওঠে।
অনেক বছর আগে, যেন আগের জন্মের কথা, এ বাড়িতে এমন পারিবারিক আড্ডা জমত। হয়তো কোনো ক্রিকেট বা ফুটবল খেলা ঘিরে বা কোনো নাটক দেখার সময় সবাই টিভির সামনে এভাবে হাসিমুখে বসত। মাধবী ব্যস্ত থাকত রান্নাঘরে। চুলায় খাবার বসিয়ে যোগ দিত এবং কিছুক্ষণ পরপর রান্নাঘরে ছুটে যেত।
আজকেও মনে হচ্ছে সে পাশেই আছে। শিউলিগাছটা বাতাসে দুলছে, ফুল ঝরাচ্ছে।
রাতে তাঁদের আড্ডা দিতে দেখে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঐশী এসে যুক্ত হলো। তার সাথে তার মা–বাবাও এসে পরিচিত হলেন। সকালে পাঠানো পায়েসটা সবাই মিলে খেলেন। রাতে তাপস চলে এল। হাতে বিরিয়ানির প্যাকেট। ঐশীদের দেখে জিব কেটে বলল, ‘আহা! আমি জানতাম না যে আপনারাও থাকবেন! তাহলে আরও কয়েক প্যাকেট নিয়ে আসতাম। আমাকে একটু সময় দেন, আমি যাব আর আসব।’
ঐশীর বাবাকে মনে হলো ফুর্তিবাজ মানুষ। তিনি সেই কণ্ঠেই বললেন, ‘আরে বাদ দেন! মিলমিশ করে দিব্যি খাওয়া যাবে। কথায় আছে না, যদি হয় সুজন, তেঁতুল পাতায় নয়জন!’
তাপস একই স্বরে জবাব দিল, ‘তারপর বাড়িতে গিয়ে বলবেন কিপটা জামাই তিন প্লেট বিরিয়ানি ছয়জনকে খাইয়েছে। নারে ভাই, সে সুযোগ আমি দেব না! হাহাহা।’
চমৎকার হইহুল্লোড়ে রাত গভীর হলো।
গাছটার জীবনের শেষ রাত্রি আনন্দেই কাটলো বলা চলে।
৩.
পরদিন ভোরটাও সাধারণ ভোরের মতোই শুরু হলো। শিউলিগাছটি কিছুই জানে না। রাতভর ফুল ঝরিয়েছে। সাদা পাপড়ির নরম বিছানায় উঠোন ঢেকে গেছে।
অনিরুদ্ধ ঝুড়ি হাতে বেরিয়ে এলেন। দীর্ঘদিনের অভ্যাস। মস্তিষ্ক সহজে মনে রাখতে পারে, শরীর ভুলে যায়।
আজ তিনি ফুল কুড়াতে পারলেন না।
ঝুঁকে বসে শুধু হাত রাখলেন মাটির ওপর।
মনে হলো, আজ ফুলগুলো কুড়িয়ে নিলে যেন বিদায়ের প্রস্তুতি হয়ে যাবে।
তিনি প্রস্তুত নন।
সকাল আটটার দিকে প্রথম ট্রাকটি এল। তারপর আরেকটি। ট্রাকের ইঞ্জিনের শব্দে ঘুম ভাঙা পাখিরা এক ঝাঁকে উড়ে গেল শিউলিগাছটা থেকে। অনিরুদ্ধর মনে হলো, পাখিরাও যেন জেনে গেছে আজ কী ঘটতে চলেছে।
কয়েকজন শ্রমিক নামল। একটা চেইন স, মোটা দড়ি, একটা মই। একজন লোক গাছের গোড়ায় গিয়ে মাপজোখ করতে লাগল। খাতায় কী যেন লিখল। গাছটাকে দেখল এমনভাবে, যেন এটা শুধু একটা সংখ্যা, একটা বাধা, যেটা সরাতে হবে।
পাড়ার মানুষজন ধীরে ধীরে জড়ো হতে লাগল। কেউ কেউ ফিসফিস করছে। একজন প্রবীণ প্রতিবেশী এসে অনিরুদ্ধর কাঁধে হাত রাখলেন, কিছু বললেন না, শুধু কাঁধটা একবার চাপলেন।
ঐশী কলেজে যায়নি। সে গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে, হাত দিয়ে গাছের গায়ে সেই লাল দাগটা ঢেকে রাখার চেষ্টা করছে, যেন হাত দিয়ে ঢেকে রাখলে দাগটা মুছে যাবে।
অনিরুদ্ধর দুই পাশে তাঁর মেয়ে এবং মেয়েজামাই। তাঁরা রাতটা এ বাড়িতেই ছিল। এখনো অফিসে যায়নি।
একজন কর্মকর্তা কাগজ দেখে এগিয়ে এলেন।
মিস্টার অনিরুদ্ধ সেন?
জি।
‘আমরা দুঃখিত। কাজটা আজই করতে হবে।’
অনিরুদ্ধ মাথা নাড়লেন। রাগ না। অভিমানও না। মন হয়তো মেনে নিতে শুরু করেছে।
তোফায়েলকেও দেখা গেল। বেচারা কেমন চোরের মতো মুখ করে দূরে দাঁড়িয়ে আছে। স্যারকে সাহায্য করতে না পারার ব্যর্থতার গ্লানি তাঁর চোখে মুখে। যেন স্যার আবারও তাঁর খাতায় লিখে দিয়েছেন, ‘গরু।’
শ্রমিকদের একজন সিঁড়ি বেয়ে গাছের ওপরের দিকে উঠল। প্রথম আঘাতটা এল একটা ডালে। চেইন সয়ের প্রথম শব্দ শোনার সাথে সাথে অনিরুদ্ধের শরীরটা কেঁপে উঠল, যেন আঘাতটা গাছে নয়, তাঁর নিজের শরীরে পড়েছে।
একটা ডাল কেটে নিচে পড়ল। তারপর আরেকটা। প্রতিটা ডাল পড়ার সাথে সাথে অজস্র সাদা ফুল ঝরে ঝরে পড়তে লাগল, যেন গাছটা নিজের সবটুকু সৌন্দর্য এক মুহূর্তে বিলিয়ে দিতে চাইছে, কারও কাছে কিছু জমিয়ে না রেখে।
অনিরুদ্ধর চোখের সামনে একটা দৃশ্য ভেসে উঠল। ২৮ বছর আগে, এই একই জায়গায়, মাধবী হাঁটু গেড়ে বসে মাটি খুঁড়ছেন, হাতে কাদা, চুলে রোদ পড়ে চিকচিক করছে।
‘এই দেখো, একদিন এই ছোট্ট চারাটা এত বড় হবে যে তুমি ওর ছায়ায় বসে বই পড়বে।’
তিনি তখন হেসেছিলেন, বলেছিলেন, ‘তুমি বড্ড বেশি স্বপ্ন দেখো মাধবী।’
এখন সেই গাছের ডালগুলো একে একে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে।
মূল কাণ্ডে করাত বসল। শব্দটা এবার অন্য রকম। গভীর, ভারী, একটানা। কাঠের গুঁড়া উড়ছে বাতাসে। অনিরুদ্ধর মনে হলো তাঁর নিজের বুকের ভেতর কিছু একটা কাটা হচ্ছে, স্তরে স্তরে, ধীরে ধীরে।
মাধুরী বাবার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। তার চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে নিঃশব্দে।
ঐশী আর তাকিয়ে থাকতে পারল না। মুখ ঘুরিয়ে নিল, তারপর নিজের মায়ের কাঁধে মুখ গুঁজল।
করাতের শব্দ একসময় থেমে গেল। একজন শ্রমিক চিৎকার করে বলল, ‘সবাই সরে যান!’
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। তারপর একটা মড়মড় শব্দ। কাণ্ডের ভেতরের তন্তুগুলো ছিঁড়ে যাওয়ার শব্দ। আর গাছটা ধীরে ধীরে কাত হতে শুরু করল। প্রথমে ধীরে, তারপর দ্রুত। শেষে বিশাল একটা শব্দ করে মাটিতে আছড়ে পড়ল।
মাটি কেঁপে উঠল, এমনটাই মনে হলো অনিরুদ্ধর।
ধুলো আর ছড়িয়ে পড়া ফুলের একটা মেঘ কিছুক্ষণের জন্য বাতাসে ভেসে রইল। সেই মেঘের ভেতর দিয়ে সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ছিল অদ্ভুতভাবে, যেন কেউ ইচ্ছা করেই একটা শেষ দৃশ্য সাজিয়ে দিয়েছে।
চেইন স’র শব্দ থামার পর অনিরুদ্ধ বাড়ির দিকে ফিরলেন না। তিনি দাঁড়িয়েই রইলেন। এবার তাঁর পা দুটো নড়ল না। তিনি এগিয়ে গেলেন কাটা গুঁড়িটার কাছে। হাঁটু গেড়ে বসলেন। বছরের পর বছরের বলয়গুলো দেখা যাচ্ছে কাটা অংশে। প্রতিটা বলয় একটা বছর, একটা বসন্ত, একটা শরৎ।
তিনি হাত রাখলেন কাটা কাণ্ডের ওপর। কাঠটা তখনো উষ্ণ, যেন এইমাত্র প্রাণ চলে গেছে এমন কারও শরীর ছোঁয়ার মতো অনুভূতি।
‘আমাকে ক্ষমা করো মাধবী।’ তিনি আবার বললেন, এবার ফিসফিসিয়ে, শুধু নিজেকে শোনানোর মতো করে।
শ্রমিকেরা ডালপালা টুকরো টুকরো করে ট্রাকে তুলতে লাগল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জায়গাটা ফাঁকা হয়ে গেল। শুধু একটা তাজা কাটা গুঁড়ি আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা শুকিয়ে যেতে থাকা সাদা ফুল ছাড়া আর কিছু রইল না।
মাধুরীর মনে হলো যেন মা শেষ বিদায়ের আগে আশীর্বাদ দিয়ে গেলেন। কী আশ্চর্য! সে–ও কি গাছটির মাঝে মাকে খুঁজত?
অনিরুদ্ধ চোখ বন্ধ করলেন। অদ্ভুত কারণে তাঁর মনে হচ্ছে না যে মাধবী চলে যাচ্ছে। উল্টো মনে হচ্ছে দীর্ঘদিন আটকে থাকা কোন দরজা যেন নীরবে খুলে গেল।
মাধুরী কাঁদছে। তিনি মেয়ের কাঁধে হাত রাখলেন।
সন্ধ্যার দিকে, যখন সবাই চলে গেছে, তিনি একা এসে দাঁড়ালেন খালি জায়গাটায়। গাছের শিকড় যেখানে ছিল সেই মাটিতে এখনো গোলাকার একটা দাগ। তিনি সেই দাগের মাঝখানে বসলেন, ঠিক যেখানে গাছটা একদিন দাঁড়িয়েছিল।
আকাশে তখন শেষ বিকেলের আলো। তিনি বসে রইলেন অনেকক্ষণ, কিছু না বলে, কিছু না ভেবে শুধু বসে থাকলেন, যেভাবে একজন মানুষ কারও কবরের পাশে বসে থাকে।
৪.
কয়েক বছর পরের কথা।
অনিরুদ্ধ সেন এখনো সেই বাড়িতেই আছেন। বাড়ির সামনের উঠোন ছোট হয়ে গেছে। সেটা এখন নতুন রাস্তার গর্ভে। তাঁর সীমানাপ্রাচীর মূল ভবনের একদম কাছাকাছি এসে গেছে।
তাঁর মাথার চুল আরও পাতলা হয়েছে। কালো চুলের অস্তিত্ব এখন বিলুপ্ত।
তিনি এখনো খুব ভোরে ওঠেন। অ্যালার্মের প্রয়োজন হয় না। তবে আর উঠোনে যান না। উঠোনই নেই, সেখানে যাবেন কি? বরং ছাদেই কিছুটা সময় কাটান। শহর এদিকটায় এখন পর্যন্ত নিজের আগ্রাসন বিস্তার করতে পারেনি। আশপাশের বাড়িগুলো এখনো আকাশ ছোঁয়ার প্রতিযোগিতায় শামিল হয়নি। তাঁর ছাদ থেকে আকাশের বিশালত্ব অনায়াসে চোখে পড়ে। দৃশ্যটা তাঁর ভালো লাগে।
মাধবীর বানানো ছাদবাগান না থাকলেও আজও ছাদে কিছু গাছপালা টিকে আছে। বেশির ভাগই ফুলের গাছ। এরই মাঝে একটি হচ্ছে শিউলিগাছ। সেই ঘটনার পরে ঐশী এসে ছাদের টবে নতুন চারা লাগিয়ে গিয়েছিল, এখন দিব্যি বেড়ে চলেছে। এখন আর চারা নয়, বেশ পোক্ত একটা গাছ, ছাদের রেলিং ছাড়িয়ে মাথা তুলেছে।
ঐশী এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, অন্য শহরে। বছরে দু-একবার আসে। এবার এসেছে পুজোর ছুটিতে, সাথে তার পাঁচ বছরের ভাইঝি তিতির। ভীষণ মিষ্টি স্বভাবের। তাঁর বাগানে এসে গল্প করত। গাছগুলোতে পানি দিত। বেচারির বাগানের খুব শখ ছিল কিন্তু ভাড়াবাড়িতে সেই সুযোগ কখনোই পায়নি।
আগের গাছটি কেটে ফেলার দিন তিনি একটি সত্য আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি গাছটির মধ্যে মাধবীকে খুঁজতেন। গাছটি চলে যাওয়া না পর্যন্ত টেরই পাননি যে মাধবী কোনো নির্দিষ্ট গাছে নয়, মাধবী মিশে আছে তাঁরই মাঝে। গাছটি তাঁকে মাধবীর স্মৃতি মনে করিয়ে দিত কেবল। এখন মাধবীকে স্মরণ করতে তাঁর কোনো মাধ্যম লাগে না।
ভোর। আকাশে হালকা কুয়াশা। সূর্য ঠিকঠাক জেগে ওঠেনি। অনিরুদ্ধ সেন ছাদে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন।
শিউলিগাছটার নিচে ছোট্ট একটা মূর্তি বসে আছে। পিঠ তাঁর দিকে ফেরানো। ছোট্ট দুটো হাত সন্তর্পণে মাটি থেকে ফুল কুড়িয়ে নিজের কোলে জমাচ্ছে।
তিথি।
তিনি গলা খাঁকারি দিলেন। মেয়েটি চমকে ঘুরে তাকাল। ধরা পড়ে যাওয়ার লজ্জায় তার মুখ লাল।
‘দাদু, আমি...আমি ফুল নিচ্ছিলাম।’
অনিরুদ্ধ সেনের মুখে সেই পুরোনো হাসিটা ফিরে এল, যে হাসিটা তিনি বহু বছর আগে আরেকটা লজ্জা পাওয়া মুখের সামনে দিয়েছিলেন।
‘চুরি করছিলে বুঝি?’
মেয়েটি আরও লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল। ‘স্যরি দাদু।’
তিনি ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসলেন তার পাশে। হাতের ঝুড়িটা মাঝখানে রাখলেন।
‘শোনো তিথি। ফুল যদি নিজের জন্যই ফুটত, তাহলে তো সে ফুল হতো না।’
কথাগুলো তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, অথচ মনে হলো যেন অন্য কারও কণ্ঠ ধার নিয়ে বললেন। ঠিক একই বাক্য, একই উঠোন থেকে অনেক বছর আগে আরেকজনের উদ্দেশে বলা।
তিথি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। বুঝল না ঠিক, কিন্তু কথাটার মধ্যে কিছু একটা আছে যা তার ছোট্ট মনেও নাড়া দিল।
তিনি ঝুড়িভর্তি ফুল তার কোলের দিকে ঠেলে দিলেন।
‘এই নাও। আজকে থেকে আর চুরি করতে হবে না। এই গাছের ফুল এখন থেকে তোমার।’
মেয়েটি খুশিতে ঝলমল করে উঠল, ছোট্ট হাতে ফুলগুলো আঁকড়ে ধরল, তারপর ছুটে সিঁড়ির দিকে চলে গেল।
অনিরুদ্ধ সেন একা রয়ে গেলেন গাছের নিচে। নতুন চারাটির নিচে আরও কয়েকটা শিউলি ফুল পড়ে আছে, যেগুলো তিথির চোখ এড়িয়ে গেছে। এ বছরের প্রথম ফুল। আজও কমলা ডাঁটাগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে কেউ যেন মাটির ওপর ছোট ছোট প্রদীপ জ্বেলে রেখেছে।
তিনি ধীরে ধীরে নিচু হয়ে একটি ফুল তুলে নিলেন। চোখ বন্ধ করলেন। ফুলটি নাকে নিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
‘ধন্যবাদ।’
কাকে বললেন?
গাছকে?
মাধবীকে?
নাকি জীবনকে?
তিনি নিজেও জানেন না।
নিচ থেকে তিথির উত্তেজিত গলা ভেসে এলো, ‘মা মা দেখো, দাদু আমাকে এত্তগুলা ফুল দিয়েছে!’
অনিরুদ্ধ সেন চোখ খুললেন। ছাদের রেলিং ধরে নিচের দিকে তাকালেন না। শুধু কান পেতে রইলেন সেই কণ্ঠস্বরের দিকে, যতক্ষণ না সেটা বাড়ির ভেতর মিলিয়ে গেল।
শিউলির গন্ধ ভেসে আসছিল। সূর্য উঠছিল ধীরে ধীরে। নতুন গাছের পাতায় শিশির ঝিলমিল করছিল।
তিনি বুঝলেন, গাছ কেটে ফেলা যায়। মানুষ চলে যায়। কিন্তু একটা বাক্য, একটা ভঙ্গি, একটা ভোরবেলার অভ্যাস, এসব কখনো সম্পূর্ণ হারায় না। এক প্রজন্মের হাত থেকে আরেক প্রজন্মের কোলে গড়িয়ে পড়ে, ঠিক যেভাবে ফুল ঝরে পড়ে মাটিতে, নতুন কারো হাতে কুড়িয়ে নেওয়ার জন্য।
শোক একদিন স্মৃতি হয়। স্মৃতি একদিন কৃতজ্ঞতা হয়। আর কৃতজ্ঞতা, যদি ভাগ্য ভালো থাকে, একদিন আবার কারও কাছে উপহার হয়ে ফিরে আসে, ঠিক একটা ঝুড়িভর্তি সাদা ফুলের মতো।