দেশের বিজ্ঞানী ফিজিকসে নোবেল পাবেন! আঃ! কী আনন্দ!
ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ফোনে ঘুম ভাঙল। ইন্টারন্যাশনাল কল। বুক ধক করে উঠে। অসময়ে ইন্টারন্যাশনাল কল মানেই দুঃসংবাদ!
ফোন রিসিভ করলাম। ওপাশ থেকে সুইডিশ উচ্চারণে ইংলিশ শোনা গেল। মেয়েলি কণ্ঠ।
‘হ্যালো, মঞ্জুর চৌধুরী বলছেন?’
‘জি।’
‘আমি সুজানা স্মিথ, নোবেল কমিটি থেকে বলছি।’
‘কী বেল থেকে বলছেন?’
‘নোবেল। ইউ নো, ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার, যা পেলে মানুষ ধন্য হয়ে যায়।’
‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অমর্ত্য সেন আর ড. ইউনূস যেটা পেয়েছেন, সেটা?’
‘জি।’
‘শেখ হাসিনা যেটা পাননি, সেই নোবেল?’
‘এই তো ধরতে পেরেছ।’
‘ফোন রাখ গাঞ্জাখোর!’
ধমক দিয়ে ফোন রেখে দিলাম। নোবেল কমিটি আমার কাছে ফোন করবে কোন সুখে? নিশ্চই স্ক্যাম। বলবে, ‘তোমাকে আমরা নোবেল দেব, কিন্তু সে জন্য ফি হিসেবে পাঁচ হাজার ডলার অ্যাডভান্স দিতে হবে।’
আজকাল এসব স্ক্যামারের যন্ত্রণায় অপরিচিত নম্বরের ফোন কল ধরতে ইচ্ছা করে না।
সঙ্গে সঙ্গে আবার ফোন বেজে উঠল, ‘হ্যালো, তুমি মনে হয় বিশ্বাস করছ না। আমরা সত্যি নোবেল কমিটি থেকে ফোন করেছি। তোমার বিশেষ সাহায্য প্রয়োজন।’
‘কী সাহায্য?’ যদিও বিশ্বাস করিনি, তবু মুখ ফসকে বেরিয়ে এল।
‘তোমাদের দেশের এক বিজ্ঞানীকে খুঁজে বের করতে হবে। ফিজিকস শাখায় ওকে এ বছরের নোবেল দেওয়া হবে। ওর যুগান্তকারী আবিষ্কারকে রিকগনাইজ করে নোবেল কমিটি ধন্য হতে চায়।’
মাথা চুলকে বোঝার চেষ্টা করলাম, কোনো বিজ্ঞানী কী আবিষ্কার করে ফেলেছেন যে আজকে নোবেল কমিটি ওকে খুঁজছে?
‘আমি কীভাবে তোমাদের সাহায্য করব?’
‘আমরা তোমার দেশের অনেক ফেসবুক ইউজারের সঙ্গেই যোগাযোগ করছি। অ্যালগরিদম ব্যবহার করে তোমার নামও আমরা খুঁজে পেয়েছি। রেজাল্ট বলছে যে তোমার নিউজফিডে একটা থিওরি খুব শেয়ার হচ্ছে। নিউটনের গ্র্যাভিটি আবিষ্কারের পর এটাই বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। ফিজিকসের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। আমরা সেই থিওরির আবিষ্কারককেই খুঁজছি। হয়তো তুমি আমাদের সাহায্য করতে পারবে।’
আমি চুপ করে আছি বলে মহিলা বলল, ‘তুমি নিউটনের ল গুলো জানো তো?’
‘না, আমি সায়েন্সের স্টুডেন্ট। পরে অ্যাকাউন্টিংয়ে এসেছি। ল নিয়ে পড়াশোনা করি নাই।’
মহিলা একটু থমকে গেল। এরপর হাসতে হাসতে বলল, ‘তোমার রসবোধ আছে। হাহাহা। আই লাইক ইট। এখন আমাকে বলো যে ‘ইলেকট্রিক চেয়ার মেটালের তৈরি হয়, না কাঠের হতে হয়। নাহলে ফ্লোরে দাঁড়ানো আশপাশের সবাই শক খায়।’এই বৈজ্ঞানিক থিওরি কে আবিষ্কার করেছেন?’
খাইছে! বলে কী মহিলা!
আমি বললাম, ‘তুমি নিশ্চিত এমন থিওরি কেউ আবিষ্কার করেছে?’
‘অবশ্যই। বাঙালিদের সোশ্যাল মিডিয়া ভরে গেছে এই থিওরিতে এবং যারাই পোস্ট করছে, তারাই দাবি করছে অপর পক্ষ মূর্খ। ড. ইউনূসের আয়নাঘর নাটকের স্ক্রিপ্ট অতি দুর্বল এবং কোন মূর্খ সেটা লিখেছে। এই সামান্য বৈজ্ঞানিক লজিকের ব্যাপারেও যার জ্ঞান নেই! এ নিয়ে খুব হাসি তামাশা করছে!’
আমার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল।
‘হোলি কাউ! বলো কি!’
‘অবশ্যই! একটু আগে মিস্টার স্টিভেন ওয়েইনবার্গ আমাদের অফিসে ফোন করে এ কথা বললেন। তিনি নিজেও মূর্খের ক্যাটাগরিতে পড়ে গেছেন বলে একটু মর্মাহত হয়েছেন।’
‘তিনি একা না, আমিও একই কাতারে পড়েছি। দাঁড়াও, আমি দেখি কি করতে পারি।’
ফোন রেখে গভীর ভাবনায় পড়ে গেলাম। আমার এখনো মনে আছে প্রাইমারি স্কুলের বিজ্ঞান বইয়ে পড়েছি প্লাস্টিক ও কাঠের মতো সিমেন্টের ফ্লোরও বিদ্যুৎ অপরিবাহী। যদি না তাতে পানি ছড়ানো হয়, যদি না সেটা ভেজা বা স্যাঁতসেঁতে হয়, তাহলে তা দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হবে না।
ক্লাস নাইনে উঠে ফিজিকস নিলাম, সেই বইয়েও একই কথাই লেখা ছিল। আরেকটু ডিটেইলে। সিমেন্ট সাধারণত একটি ‘অপরিবাহী (ইনসুলেটর)’ পদার্থ। এর মানে হলো এটি বিদ্যুতের প্রবাহকে সহজে অনুমতি দেয় না। সিমেন্টের গঠনগত বৈশিষ্ট্য এবং এর মধ্যে বিদ্যমান উপাদানগুলো বিদ্যুতের প্রবাহকে বাধা দেয়।
এইচএসসির ফিজিকসেও দেখি একই কথা লেখা ছিল। ওমা, ইউনিভার্সিটিতে উঠে ফিজিকস নিয়েছি, সেই বইয়েও লেখা যে সিমেন্টে প্রধানত সিলিকেট এবং অন্যান্য খনিজ পদার্থ থাকে, যা বিদ্যুতের জন্য উচ্চ প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। এ ছাড় সিমেন্ট শুষ্ক অবস্থায় থাকলে এর বিদ্যুৎ পরিবাহিতা আরও কমে যায়। তবে, যদি সিমেন্ট ভেজা বা স্যাঁতসেঁতে হয়, তাহলে এর মধ্যে বিদ্যুৎ কিছুটা প্রবাহিত হতে পারে, কারণ জলবিদ্যুতের একটি ভালো পরিবাহী। কিন্তু সাধারণভাবে শুষ্ক সিমেন্টের ফ্লোর বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে দেয় না।
এই বৈশিষ্ট্যের কারণে সিমেন্টকে ভবনের নির্মাণে নিরাপদ এবং উপযুক্ত পদার্থ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
তা বাংলাদেশের বিজ্ঞানী এমন বিদ্যুৎ আবিষ্কার করে ফেলেছে, যা লোহার চেয়ার থেকে সিমেন্টের শুকনো ফ্লোর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আশপাশের সবাইকেই ঝাকানাকা শক দেয়? কে এই মহান বিজ্ঞানী? এ কারণেই ওকে নোবেল কমিটি খুঁজছে!
আমার জীবনের যাবতীয় পড়াশোনা মিথ্যা প্রমাণিত হলো? বাপ্পারাজের মতো বলতে ইচ্ছা করছে, ‘এ আমি বিশ্বাস করি না আ আ আ আ আ!’
আবার অন্যদিকে খুশিও লাগছে। দেশের বিজ্ঞানী ফিজিকসে নোবেল পাবে! আঃ! কি আনন্দ!
তা আপনারা যদি সেই বিজ্ঞানীর নাম–ঠিকানা একটু জানাতেন, আমার বিশেষ উপকার হতো। ভদ্রমহিলা এখনো ফোন ধরে আছেন। ইন্টারন্যাশনাল কলে বিল উঠছে।