সুইডেনের নির্বাচনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীরা কে কতটা এগোলেন, যেভাবে প্রার্থী নির্বাচিত হন

ছবি: রয়টার্স

সুইডেনে ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের ভোট গণনা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। তবে ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত প্রায় ৯৪ শতাংশ ভোটকেন্দ্রের ফল প্রকাশ হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফলে ৩৪৯ আসনের রিক্সদাগে বিরোধী পক্ষ সামান্য এগিয়ে রয়েছে। Socialdemokraterna, Vänsterpartiet, Miljöpartiet ও Centerpartiet নিয়ে গঠিত বিরোধী পক্ষ এখন পর্যন্ত ১৭৬টি আসনে এগিয়ে আছে। অন্যদিকে Moderaterna, Sverigedemokraterna, Kristdemokraterna ও Liberalerna নিয়ে গঠিত Tidöpartierna রয়েছে ১৭৩টি আসনে। ফলে দুই পক্ষের ব্যবধান মাত্র তিনটি আসন। তবে এটিকে এখনই চূড়ান্ত ফল বলা যাচ্ছে না। ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে চূড়ান্ত ভোট গণনা শুরু হয়েছে। দেরিতে আসা ভোট ও বিদেশ থেকে দেওয়া ভোটসহ সব ভোট যাচাইয়ের পরই চূড়ান্ত ফল নির্ধারিত হবে।

প্রকাশিত প্রাথমিক ফলাফলে Socialdemokraterna সবচেয়ে বড় দল হিসেবে ২৮ দশমিক ১ শতাংশ ভোট পেয়ে ১০০টি আসনের অবস্থানে রয়েছে। Moderaterna পেয়েছে ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট ও ৭০টি আসন। Sverigedemokraterna ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট নিয়ে ৬২টি আসনের অবস্থানে রয়েছে। Vänsterpartiet ৮ দশমিক ২ শতাংশ ভোটে ২৯টি, Centerpartiet ৭ দশমিক ১ শতাংশে ২৫টি, Kristdemokraterna ৬ দশমিক ২ শতাংশে ২২টি, Miljöpartiet ৬ দশমিক ১ শতাংশে ২২টি এবং Liberalerna ৫ দশমিক ৪ শতাংশ ভোটে ১৯টি আসনের অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ প্রাথমিক হিসাবে এবারও সুইডেনের রিক্সদাগে প্রতিনিধিত্ব করছে আটটি দল।

এই ফলাফলের রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। Socialdemokraterna সবচেয়ে বড় দল হলেও তাদের ভোট ২০২২ সালের নির্বাচনের তুলনায় কমেছে। অন্যদিকে Moderaterna এবার Sverigedemokraterna-কে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে দুই রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে মাত্র তিনটি আসনের ব্যবধান থাকায় কে সরকার গঠন করবে, সেটিও এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। চূড়ান্ত ফল এবং পরবর্তী রাজনৈতিক আলোচনার ওপরই সুইডেনের নতুন সরকার গঠনের বিষয়টি নির্ভর করবে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

এই নির্বাচনের আরেকটি দিক বিশেষভাবে নজর কেড়েছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সুইডিশ নাগরিকদের মধ্যে। এবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হয়ে কয়েকজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী রিক্সদাগে যাওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তাঁদের মধ্যে Moderaterna-এর ফারজানা খান, Vänsterpartiet-এর লিও আহমেদ এবং Socialdemokraterna-এর মোহাম্মদ জসীম উদ্দীনের নাম বিশেষভাবে সামনে এসেছে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আরও কয়েকজন প্রার্থী আঞ্চলিক ও পৌর নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।

তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। কোনো প্রার্থী রিক্সদাগের নির্বাচনী তালিকায় থাকলেই তিনি রিক্সদাগের সদস্য হয়ে যান না। প্রথমে সংশ্লিষ্ট দলকে নির্বাচনে পর্যাপ্ত ভোট পেয়ে আসন অর্জন করতে হয়। এরপর সেই আসনগুলোর ভিত্তিতে প্রার্থীদের নির্বাচিত করা হয়। কোনো প্রার্থী তালিকার তুলনামূলক নিচের দিকে থাকলেও পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত ভোট পেলে তাঁর অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে। তাই শুধু ব্যালটে কোনো প্রার্থীর অবস্থান দেখে তাঁর জয়-পরাজয় নির্ধারণ করা যায় না।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীরা কোথায়

মডারেট পার্টির ফারজানা খানের অবস্থানটি বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। তিনি স্টকহোম কাউন্টির রিক্সদাগের তালিকায় ২১ নম্বরে ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সালেম পৌরসভাও দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। এবারের নির্বাচনে সালেম পৌরসভার তালিকাতেও তিনি মাডারেটের প্রার্থী ছিলেন। অর্থাৎ তাঁর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ শুধু জাতীয় নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ নয়, স্থানীয় রাজনীতিতেও তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। প্রকাশিত প্রাথমিক ফলাফলে মডারেট ৪৪টি রিক্সদাগ আসনের মধ্যে ১১টি আসনে অবস্থানে রয়েছে। ফলে শুধু দলীয় তালিকার ক্রম বিবেচনা করলে ফারজানা খানের রিক্সদাগে যাওয়ার অবস্থান শক্তিশালী নয়। তবে সুইডেনের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত ভোটেরও গুরুত্ব রয়েছে। কোনো প্রার্থী তাঁর দলের নির্বাচনী এলাকার ভোটের অন্তত ৫ শতাংশ ব্যক্তিগত ভোট পেলে দলীয় তালিকার স্বাভাবিক ক্রম অতিক্রম করার সুযোগ পান। তাই তাঁর চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণের জন্য ব্যক্তিগত ভোটের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ।

বাম দলের প্রার্থী লিও আহমেদও রিক্সদাগ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তাঁর রিক্সদাগের দলীয় তালিকায় অবস্থান ছিল ৩৪ নম্বরে। একই সঙ্গে তিনি সিগটুনা পৌরসভায় শীর্ষস্থানীয় প্রার্থী ছিলেন। ফলে জাতীয় ও স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর অংশগ্রহণের দুটি পৃথক ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তবে রিক্সদাগে তাঁর অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে তার দল কতটি আসন পায় এবং ব্যক্তিগত ভোটে তিনি কতটা এগিয়ে যান, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সোশ্যালডেমোক্যাটার্নার প্রার্থী মোহাম্মদ জসীমউদ্দীনও এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের মধ্যে অন্যতম। উপাসালা ল্যান-এর সোশ্যালডেমোক্যাটার্না-এর রিক্সদাগ তালিকায় তাঁর অবস্থান ৩৫ নম্বরে। একই সঙ্গে তিনি স্থানীয় নির্বাচনেও প্রার্থী হয়েছেন। এবারের নির্বাচনে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় দল হিসেবে এই দলটি অবস্থান করছে এবং ১০০টি রিক্সদাগ আসনের অবস্থানে রয়েছে। তবে দলের শক্তিশালী ফল সত্ত্বেও ৩৫ নম্বর অবস্থান থেকে রিক্সদাগে নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

তিন প্রার্থীর ক্ষেত্রেই তাই একটি বিষয় স্পষ্ট। প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী তাঁদের কেউই এখন পর্যন্ত রিক্সদাগের নির্বাচিত সদস্য হওয়ার অবস্থানে নেই। চূড়ান্ত গণনায় ব্যক্তিগত ভোটসহ সব হিসাব সম্পন্ন হওয়ার পরই আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হবে।

কীভাবে একজন প্রার্থী রিক্সদাগের সদস্য হন

সুইডেনের নির্বাচনী ব্যবস্থা বুঝতে হলে এখানে একটি বিষয় জানা জরুরি। রিক্সদাগে মোট ৩৪৯টি আসন। ভোটাররা মূলত একটি রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন এবং চাইলে সেই দলের একজন নির্দিষ্ট প্রার্থীর পাশে ব্যক্তিগত ভোটের চিহ্ন দিতে পারেন। রিক্সদাগের আসনগুলো ২৯টি নির্বাচনী এলাকার মধ্যে বণ্টিত। মোট ৩৪৯টি আসনের মধ্যে ৩১০টি আসন সরাসরি নির্বাচনী এলাকার ভিত্তিতে এবং ৩৯টি সমন্বয়কারী আসন, যার মাধ্যমে মোট ফলাফলকে ভোটের অনুপাতের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়।

সাধারণভাবে কোনো দলকে রিক্সদাগে আসন পেতে সারা দেশে অন্তত ৪ শতাংশ ভোট পেতে হয়। তবে কোনো দল একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় ১২ শতাংশ ভোট পেলেও সেখানে আসন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। আসনগুলো আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে বণ্টন করা হয়।

আরও পড়ুন

এরপর আসে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভোটের বিষয়টি। কোনো প্রার্থী তাঁর দলের নির্বাচনী এলাকার ভোটের অন্তত ৫ শতাংশ ব্যক্তিগত ভোট পেলে দলীয় তালিকার স্বাভাবিক ক্রমের ওপরে উঠে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পান। আর পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত ভোটে কোনো পরিবর্তন না হলে দলীয় ব্যালটে প্রার্থীদের যে ক্রম নির্ধারিত থাকে, সেই ক্রম অনুসারে আসন পূরণ হয়।

অর্থাৎ একজন প্রার্থীর রিক্সদাগ সদস্য হওয়ার পথটি কয়েকটি ধাপের। প্রথমে তাঁকে কোনো দলের প্রার্থী হতে হয়। এরপর সেই দলকে পর্যাপ্ত ভোট পেয়ে আসন অর্জন করতে হয়। তারপর দলের পাওয়া আসনের মধ্যে প্রার্থীদের অবস্থান নির্ধারিত হয় দলীয় তালিকার ক্রম ও ব্যক্তিগত ভোটের ফলের ভিত্তিতে। সবশেষে চূড়ান্ত ভোট গণনা ও আসন বণ্টন শেষ হলে নির্বাচিত রিক্সদাগ সদস্যদের নাম নিশ্চিত হয়।

এ কারণেই এবারের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের অবস্থানও দেখতে হবে দুই স্তরে। একদিকে তাঁদের নিজ নিজ দলের সামগ্রিক নির্বাচনী ফল, অন্যদিকে তাঁদের ব্যক্তিগত ভোট ও চূড়ান্ত প্রার্থী-নির্বাচনের ফল। বর্তমান প্রাথমিক ফল ও প্রার্থীদের তালিকার অবস্থান অনুযায়ী তাঁদের কেউই রিক্সদাগে নির্বাচিত হওয়ার অবস্থানে নেই। তবে আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগে নির্বাচনকে আইনগতভাবে সম্পূর্ণ শেষ হয়েছে বলা যাবে না।

এবারের নির্বাচনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের অংশগ্রহণ শুধু রিক্সদাগেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন অঞ্চল ও পৌরসভাতেও তাঁদের প্রার্থী হিসেবে দেখা গেছে। অর্থাৎ সুইডিশ রাজনীতিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়েও বিস্তৃত হচ্ছে।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের জন্য এবারের নির্বাচন তাই শুধু জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়। এটি সুইডেনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অভিবাসী প্রজন্মের অংশগ্রহণ কতটা গভীরে পৌঁছেছে, তারও একটি প্রতিচ্ছবি। কেউ এবার রিক্সদাগে জায়গা করে নিন বা না নিন, নির্বাচনী রাজনীতির মূলধারায় তাঁদের উপস্থিতি যে আগের চেয়ে দৃশ্যমান হয়েছে, এবারের নির্বাচন তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

*লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন