জিগাতলার সেই কিশোরী আজ সুইডিশ পার্লামেন্টের প্রতিদ্বন্দ্বী
১৪ বছরের এক দুরন্ত কিশোরী। মা-দাদির সঙ্গে ঢাকার জিগাতলার কলোনিতে থাকে। বাবা সুইডেনপ্রবাসী। ক্লাস নাইনে ওঠার পর পড়ানোর জন্য বাসাতেই রেখে দেওয়া হলো এলাকার ভালো ছাত্র, আসাদ খান নামের তরুণকে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বাবার কাছে যাওয়ার ডাক এল। পরিচিত স্কুল, পাড়া-মহল্লা ছেড়ে মায়ের সঙ্গে কিশোরী মেয়েটি পাড়ি জমাল সুইডেনে। বাবার কাছে আর বিদেশে যাওয়ার আনন্দে সেদিন সেই কিশোরী বোঝেনি এই ছেড়ে যাওয়ার মানে কতটা বদলে যাওয়া।
বলছি সুইডিশ সরকারে থাকা মডারেট (মদারেতনা) পার্টির গুরুত্বপূর্ণ নেতা, এবারের (২০২৬) সুইডিশ জাতীয় নির্বাচনে পার্লামেন্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ফারজানা খানের কথা। ১ সেপ্টেম্বর দেখা হয়েছিল তাঁর সঙ্গে। আড্ডা, গল্পে সুইডিশ রাজনীতিতে নিজের অভিজ্ঞতা, বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক-স্মৃতি-স্বপ্ন নিয়ে কথা হলো। নিজের কথা বলতে গিয়ে ফারজানা খান বলেন, সুইডেনে আসার পর বন্ধুহীন, বরফশীতল এ দেশের একাকিত্বের দিনগুলোতে চিঠি লিখতে শুরু করেন বাংলাদেশে অল্প সময়ের জন্য বন্ধুর মতো পাওয়া শিক্ষক আসাদকে। চিঠিতে চিঠিতে সেই বন্ধুত্ব গড়াল প্রেমে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
মুচকি হেসে এই রাজনীতিবিদ বলেন, ‘আমার জীবন থেকে যখন ক্রমশ বাংলাদেশ দূরে সরে যাচ্ছিল, সেই সময় আমি তাকে আঁকড়ে ধরেছিলাম। হয়তো সেদিন আমি বাংলাদেশকে হারিয়ে ফেলতে চাইনি বলে মানুষটাকে চিঠি লিখতে শুরু করেছিলাম। সেও আমাকে বড় বড় চিঠি লিখত। সে চিঠি ভরা থাকত বাংলাদেশের কথা। স্কুল থেকে ফিরে যখন দেখতাম আমার পড়ার টেবিলে বাংলাদেশ থেকে আসা একটা চিঠি, তখন মনটা আনন্দে ভরে যেত। সহজে খুলতাম না সে চিঠি। মনে হতো, খুললেই তো ফুরিয়ে যাবে বাংলাদেশের অপরূপ সুন্দর সব ছবি!’
ফারজানাকে বিয়ে করে সুইডেনে এলেন আসাদ খান। দুজনে মিলে উমিও ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা শুরু করলেন। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়ই প্রথম সন্তানের জন্ম। সেই ছোট্ট শিশুকে নিয়েই ইউনিভার্সিটির ক্লাস করেছেন, পরীক্ষা দিয়েছেন ফারজানা খান। পড়ালেখা শেষে ফারজানা খান পারিবারিক আইন নিয়ে সোশ্যাল ওয়ার্কার হিসেবে কাজ শুরু করেন। আর তাঁর স্বামী আসাদ খান ফিন্যান্স খাতে। ফারজানা ২০০৮ সালে রাজনীতিতে যোগ দেন।
ফারজানা খান মনে করেন, আমরা কোথা থেকে এসেছি, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং আমরা কোথায় যেতে চাই, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। মডারেট পার্টি করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দেখুন, আমরা যখনই সুইডেনের কথা চিন্তা করি, তখন আমাদের মাথায় যে শব্দটা প্রথম আসে সেটা হচ্ছে, নিরাপত্তা। সেটা আর্থিক ও সামাজিক দুটোই। মডারেট পার্টির রাজনীতির মধ্যে আমি এই নিরাপত্তাটা অনুভব করি।’
নিজের রাজনৈতিক পথচলার কথা বলতে গিয়ে ফারজানা বলেন, ‘আমার রাজনৈতিক জার্নিটা শুরু হয়েছে কমিউন থেকে। তারপর রিগিউন আর এখন রিকসদগ (পার্লামেন্ট)-এর পথে। এ জার্নিটা সহজ ছিল না। কিন্তু সেটা আমার ব্যক্তিগত সংগ্রাম। এ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমি এ পর্যন্ত এসেছি। আমি মডারেট পার্টি থেকে সুইডিশ পার্লামেন্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য নির্বাচিত হয়েছি। এই দলে আমার অবস্থান ২০। এ দল থেকে ৫০ জন প্রার্থী এবার পার্লামেন্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আমার আগে যে ১৯ জন প্রার্থী আছেন, তাঁদের মধ্যে আছেন সুইডেনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী থেকে বিভিন্ন এমপি এবং রাজনৈতিক নেতা। ১৩ সেপ্টেম্বর সুইডিশ পার্লামেন্ট নির্বাচন। সেই নির্বাচনে আমি যত বেশি ভোট পাব, তত বেশি মডারেট পার্টি থেকে পার্লামেন্ট মেম্বার হওয়ার সুযোগ পাব।’
ফারজানা সুইডেনের স্টকহোম লাইনে বসবাসকারী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ভোটারদের তাঁকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমার বাবা বলেন, সাহায্য চাইতে হলে নিজের মানুষের কাছে চাও। তাই আমি আজ নিজের মানুষদের কাছে এসেছি। আপনাদের সাহায্য চাইছি। একজন বাংলাদেশি হিসেবে আপনারা আমাকে ভোট দিন। কথা দিতে পারি, আমি যদি নির্বাচিত হই, সুযোগ পেলে অবশ্যই আমি বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষের কথা সুইডিশ পার্লামেন্টে জোর গলায় বলব। বাংলাদেশের জন্য ভালো কিছু কাজ করার চেষ্টা করব।’