সমাজ কি অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মুখোমুখি?
রাজনীতি, অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির সঙ্গে সামাজিক ভারসাম্যের পারদ ওঠানামা করে। এর যেকোনো একটিতে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতের পরিমাণ বেশি হলে কৌশল আর পদক্ষেপে সাবধানী হতে হয়। অস্থির মানসিকতা আর আবেগনির্ভর সিদ্ধান্ত চরম বিপদ ডেকে আনে। রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্থিরতা হারালে রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করতে হয়। সংবিধানকে সর্বোচ্চ অবস্থানে রেখে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নির্মোহ ভূমিকা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের নির্লিপ্ততা আর পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ চরম সামাজিক সংকটের জন্ম দেয়। সমস্যা আর সংকট দীর্ঘায়িত হলে উত্তরণের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। ২৪–এর গণ–অভ্যুত্থানপরবর্তী বাংলাদেশ কি সে পথেই এগিয়ে যাচ্ছে?
অর্থনৈতিক দৌরাত্ম্য আর দুর্বৃত্তায়নের কবলে পড়ে পাঁচটি বাণিজ্যিক ব্যাংক মরণদশায় পড়ে। সরকার রেগুলেটরি অথরিটি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশকে আমলে নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিলুপ্ত বা মার্জিং করে দেয়। সহায়সম্পদ একীভূত করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংক নামে নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। ব্যাংকগুলো বিলুপ্তির প্রাক্কালে অর্থ ব্যবস্থাপনার সর্বোচ্চ পদধারী গভর্নর মহোদয় বলেছিলেন, কোনো গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। আতঙ্কিত হয়ে অপ্রয়োজনীয় অর্থ উত্তোলন থেকে বিরত থাকতে নাগরিকদের পরামর্শ দিয়েছিলেন। বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের গ্যারান্টার হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জনগণের আমানত রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গভর্নরের আশ্বাসের বাণীতে আস্থা রেখে গ্রাহকেরাও অপেক্ষায় ছিলেন। তাহলে আজ গ্রামীণ জনপদ থেকে রাজপথে আহাজারি কেন?
অর্থনীতিতে ‘আস্থা’ শব্দটির ভূমিকা বৈপ্লবিক। বিশ্বাসের সঙ্গে উত্থান–পতনের ব্যারোমিটার ওঠানামা করে। আস্থা বা বিশ্বাস নষ্ট হলে খাদের কিনারে পৌঁছাতে সময় লাগে না। দুঃখজনক নিম্নমুখী বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যায় ব্যাংকিং আর আর্থিক ব্যবস্থাপনা। আমাদের সমাজে প্রতারণা একটি সামাজিক ব্যাধি। অন্যকে ঠকিয়ে নিজে বিত্তশালী হওয়ার প্রবণতা অতি পুরোনো। এককালে প্রতারণার এই কৌশল ব্যক্তিপর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও হাল আমলে এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
তবে যখন থেকে শিক্ষিত, মেধাবী আর চৌকস ব্যক্তিরা প্রতারণাকে পেশা হিসেবে বেঁচে নেন, অর্থবিত্তের মালিক হয়ে রাজনীতির সঙ্গে মিশে যান, তখন থেকেই শুরু হয় প্রতারণার প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিকীকরণ। আর এমন দুষ্টচক্রের সামাজিকীকরণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত আর সমাজের খেটে খাওয়া মানুষ। প্রিয় পাঠক, আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, যুব কর্ম সংস্থান সোসাইটির (যুবক) কথা, যারা প্রায় চার লক্ষ গ্রাহকের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছিল আড়াই হাজার কোটি টাকা, যার সরাসরি প্রভাবে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রায় দেড় কোটি প্রান্তিক মানুষ। এই প্রতারণার অনুসন্ধানে ২০১০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দীনকে প্রধান করে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিশন, ২০১১ সালে রফিকুল ইসলামকে প্রধান করে আরও একটি কমিশন গঠন করা হয়েছিল। প্রশাসক নিয়োগ করে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আলোচিত হলেও আইনি মারপ্যাঁচ আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আজও সেটি আলোর মুখ দেখেনি।
এমএলএম কোম্পানি আইনের সুযোগ নিয়ে গঠিত ডেসটিনি ২০০০-২০১২ সালে প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেয় আমজনতার ৫ হাজার কোটি টাকা, গ্লোবাল গেইন ইন্টারন্যাশনাল ১৩ হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে আত্মসাৎ করে আড়াই শ কোটি টাকা। ডিজিটালাইজেশনের সুযোগ নিয়ে প্রতারণার প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিকীকরণের বর্ধিত সংস্করণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ই-কমার্স, যার সুযোগ নিয়ে নোভেরা প্রোডাক্টস ৪০ হাজার ডিসট্রিবিউটর নেওয়ার নামে হাতিয়ে নিয়েছে ৬০০ কোটি টাকা। ২০ হাজার লোককে চাকরি দেওয়ার কথা বলে লাইফওয়ে বাংলাদেশ লিমিটেড হাতিয়ে নেয় ৭০ কোটি টাকা। ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জের হাজার হাজার কোটি টাকার প্রতারণার খবরে গগনবিদারী আহাজারিতে রাজপথ উত্তপ্ত হওয়ার ঘটনা তো সবার জানা। প্রতারণার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের এমন অবারিত সুযোগ পৃথিবীর অন্য কোনো সমাজে আছে বলে জানা নেই।
ক্ষুব্ধ আর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে শান্ত করার এক অভিনব কৌশল ‘উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি’। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব কমিটির রিপোর্ট কখনো আলোর মুখ দেখে না। রিপোর্ট প্রস্তুত হলেও কখনো এর সুপারিশ বাস্তবায়ন হয় না। এর মূল কারণ ক্ষমতাকেন্দ্রে অবৈধ বিত্তশালীদের অবারিত হস্তক্ষেপ। তাঁরা রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে, মন্ত্রী, এমপি তৈরির কুশীলব হয়ে ওঠেন। যাঁকে তাঁদের প্রয়োজন, তাঁকে ওঠান, অপছন্দ হলে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেন। পতিত সরকারের আমলে ঢাকা ডিটেইল এরিয়া প্লান (DAP) নিয়ে এক ভূমিখেকোর হুংকারের সামনে প্রভাবশালী পূর্ত মন্ত্রীর অসহায় দৃশ্য এখনো জনগণের চোখের সামনে ভাসে। এসব দুর্নীতিবাজ বিত্তশালীদের অবারিত ক্ষমতা আজকাল কোনো গোপন বিষয় নয়। তাঁদের হস্তক্ষেপে চোরাচালানি এমপি হন, সৎ মানুষ মনোনয়নবঞ্চিত হন। আইন আর নীতিনৈতিকতায় অটল থাকলে মন্ত্রিত্ব চলে যায়। এমন পরিস্থিতিতে জনগণের বিশ্বাসের জায়গাটি থাকার অবকাশ কোথায়?
অতীতে যাঁরা সরকারি–বেসরকারি কেলেঙ্কারির শিকার হয়ে অর্থবিত্ত হারিয়েছেন, কোনো সরকার তার প্রতিকার করতে সক্ষম হয়নি। সরকার গরম–গরম হুংকার দিয়ে জনগণের পক্ষ নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিকে সামাল দিয়েছে। আখেরে নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা নিগৃহীত জনগণের পরিবর্তে প্রতারক, নীতিহীনদের স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৃণমূল থেকে শীর্ষপর্যায় অবধি ক্ষমতাকাঠামোর নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে।
নীতিহীন দুর্বৃত্তরা নানা কৌশলে মানুষকে বিভ্রান্ত করে। সাধারণ মানুষ প্রতারকদের কৌশলের কাছে বারবার পরাজিত হন। এনজিও বা এমএলএম কোম্পানির নানা প্রতারণার বিপরীতে সাধারণ মানুষ ভেবেছিলেন, ব্যাংকব্যবস্থা নিরাপদ। দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ, ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রতি একধরনের বিশ্বাস ও দুর্বলতা নিয়ে এগিয়ে যান। নতুন প্রজন্মের পাঁচটি ব্যাংকে গ্রাহকসংখ্যা ৯২ লক্ষ। অল্প সময়ে এত অধিকসংখ্যক বিনিয়োগকারী আর গ্রাহক তৈরিতে ধর্মের আশ্রয় আর কূটকৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অবসর গ্রহনকারীদের পেনশনের টাকা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গৃহবধূর সঞ্চয়, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে প্রবাসী শ্রমিকের অমানবিক পরিশ্রমে অর্জিত রেমিট্যান্স—সবই রাষ্ট্রযন্ত্রের ছত্রচ্ছায়ায় গণরাক্ষসের দল ভক্ষণ করে ফেলেছে।
৯২ লক্ষ পরিবারের অন্তত ৪ কোটি মানুষ আজ আহাজারি করছেন! কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অতিকথন আর হেয়ার কাটের মতো সিদ্ধান্তে ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা দিগ্ভ্রান্ত হয়ে উঠছেন। সব হারানোর ভয়ে ক্ষুদ্র আর মধ্য পর্যায়ের বিনিয়োগকারীরা চরম মানসিক অশান্তি আর অস্থিরতায় এলোমেলো বকছেন। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের অস্বস্তিগুলো সামাজিক সংকটে রূপায়িত হচ্ছে।
২৪–এর অভ্যুত্থানপরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিও সামাজিক স্বস্তির অনুকূলে নয়। তরুণদের পরিবর্তনের ডাক জনগণকে মূল্যবোধের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। সাম্যের সমাজ, মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা আর সম্প্রীতির কথা বলেছিল। অসহিষ্ণুতার মাত্রাটি কত তীব্র হলে শিক্ষককে গামছা পড়ানো হয়, মানুষকে জ্বলন্ত পুড়িয়ে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়, তা সহজেই অনুমেয়। রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ গণমাধ্যম। হাজারো প্রতিকূলতা সত্ত্বেও প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার–এর মতো গণমাধ্যম টিকে ছিল, সে প্রতিষ্ঠানগুলোকেও হুংকার দিয়ে প্রকাশ্যে অগ্নিদগ্ধ করা হলো। এই সকরুণ দৃশ্য গণমাধ্যমকে সাহসী হওয়ার পরিবর্তে নতজানু হয়ে টিকে থাকার নীতি গ্রহণ করতে হলো।
যে তরুণেরা ভবিষ্যতের পথ দেখাবেন, তাঁদের স্লোগান আর বক্তব্যের ভাষা শুনলে বনের বানরও লজ্জা পাবে! শিক্ষাঙ্গনে এমন অশ্লীলতা আর অসহিষ্ণুতার সয়লাব নিয়ন্ত্রণের কোনো প্রচেষ্টাও দিকনির্দেশক রাজনৈতিক দলগুলোর এজেন্ডাতে নেই। ক্ষমতার পটপরিবর্তনে আইনের প্রয়োগ বদলে যায়, এমন সমাজ পৃথিবীর কোন দেশে আছে? আজ যিনি চোর, কাল তিনি সাধু। সুফি-সাধক, অলি–আউলিয়ার সুফিবাদি ইসলাম বাঙালি মুসলমানদের বিকাশে যে দায়িত্ব পালন করেছিল, সেটিও যেন আজ বিলুপ্ত হতে চলেছে।
সবাই ক্ষমতা চায়। যেকোনো মূল্যে ক্ষমতাই যেন সমাধান। মাত্র বছরখানেক আগে দুর্নীতি, দুঃশাসন আর স্বৈরতন্ত্রের বিপরীতে একদল তরুণ জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। বিকল্পধারা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে নতুন সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তাঁদের পদ ভাগাভাগির লীলাখেলা দেখে জাতির চক্ষু আজ চড়কগাছ। রাজনীতির রোষানলেও কোটি মানুষের ঘরে অশান্তির দাবানল। কোটি কোটি আমানতকারী দিশাহারা, অর্থনীতি সাঁতার কাটছে গহিন সাগরে, রাজনীতিবিদেরা নীতিহীন কাজকারবারে ব্যতিব্যস্ত, শিক্ষাঙ্গন লক্ষ্যহীন। ঋণের বোঝা, এটি নাকি আর টানার উপায় নেই। দেড় বছরে ১০ গুণ!
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম! যেন চরিত্রহনন, লাম্পট্য, মিথ্যাচার, প্রোপাগান্ডা আর প্রতিশোধ–প্রতিহিংসার এক মহাকাব্য। বাঙালি সমাজের ফেসবুকীয় চিত্র দেখলে স্বয়ং মার্ক জাকারবার্গও হয়তো আতঙ্কে শিহরিত হতেন। সমস্যা–সংকটের এত যানজটেও আগ্রাসনবাদী শক্তির চুক্তির মহরত থেমে নেই। দুই সপ্তাহ পরে নির্বাচন। এখনো বিশ্ব আগ্রাসনবাদীদের চুক্তির মহরত হয় পাঁচ তারকা হোটেলে। চারদিকে দাবানল! পূর্ব-পশ্চিমে, উত্তর-দক্ষিণে স্বার্থবাদীদের মহড়া! প্রাচ্য, পাশ্চাত্য সবার লক্ষ্য আমাদের বদ্বীপ। এমন পরিস্থিতিতে সমাজ কি তবে আরেকটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গের পথেই এগিয়ে যাচ্ছে?
লেখক: কলামিস্ট ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক