ফায়ার নয়, টার্মিনেশন অব কনট্র্যাক্ট!!
চাকরি আজ আছে, তো কাল নেই! এমন পরিবেশের সঙ্গে আমাদের সমাজ পরিচিত নয়। চাকরি মানেই স্থায়িত্ব, মাস শেষে বেতন। ঈদ, পূজা-পার্বণ আর নববর্ষে উৎসব ভাতা! বছর শেষে ইনক্রিমেন্ট। মূল বেতনের সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ভাতা, আবদালি ভাতা আরও কত কী! গ্র্যাচুইটি, পেনশন তো আছেই! কর্ম আছে কি নেই, সেটি বিবেচ্য না হলেও বেতন–ভাতা, সালাম, আদাবে গোলমাল হলেই শুরু হয় তুলকালাম। এমন এক কর্পোরেট সংস্কৃতির আবহে যাঁরা বেড়ে উঠেছেন, তাঁদের জন্য বিপরীত চিত্রটি শুধু অস্বাভাবিক নয়, অকল্পনীয়ও বটে।
১৯৯৬ সালে হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হয়ে যোগ দিলেন মার্কিন বংশোদ্ভূত ডোরা প্যানাজাইডিস। আন্তর্জাতিক এই উন্নয়ন সংস্থা বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় করে মাঠকর্মীদের বেতন–ভাতা বাবদ। মজার ব্যাপার হলো, কাজের ধরনের কারণে মাঠ ব্যবস্থাপনা বিভাগের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের প্রতি দেড় মাস অন্তর প্রায় এক মাস কোনো কাজ থাকে না। এই কর্মহীন সময়কালেও কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন–ভাতায় কোনো ব্যত্যয় ঘটে না।
বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে ডোরা প্যানাজাইডিস খুবই বিস্মিত হলেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ডেকে এর কারণ জানতে চাইলেন। প্রস্তাব করলেন, ‘যখন কাজ থাকবে, বেতন–ভাতা হবে, আর যখন যাঁদের কাজ থাকবে না, তাঁদের সেই সময়ের জন্য কোনো বেতন–ভাতা দেওয়া হবে না।’ বিষয়টি শুনে ঊর্ধ্বতন বাংলাদেশি ব্যবস্থাপকেরা তেলে–বেগুনে জ্বলে উঠলেন। একদিকে কর্মহীন সময়ের জন্য বেতন–ভাতা প্রদানের নিয়মনীতি দেখে ডোরা যেমন বিস্মিত, অন্যদিকে শুধু কর্মকালীন সময়ের বেতন–ভাতা প্রদানের প্রস্তাব শুনে বাংলাদেশের ব্যবস্থাপকেরাও বিস্মিত। কান্ট্রি ডিরেক্টরের এমন প্রস্তাবে কান্ট্রি অফিসটির ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সব স্তরের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের মধ্যে চরম ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। অবশেষে উপায়ান্তরহীন কান্ট্রি ডিরেক্টর তাঁর প্রস্তাবটি ফিরিয়ে নিতেই বাধ্য হন।
‘দূর পরবাস’-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
১০ বছর পর ২০০৬ সাল। সেই কান্ট্রি ডিরেক্টরের সামাজিক–সাংস্কৃতিক বলয় উত্তর আমেরিকার কানাডায় শুরু হয় আমার অভিবাসী জীবন। চাকরি করছি নরটেল নামক একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে। প্রায়ই দেখি, মানব সম্পদ বিভাগের ম্যানেজার আর তাঁর সহকারী বিভিন্ন বিভাগে আসেন। এক–দুজন করে ডেকে নিয়ে যান। যাওয়ার সময় তাঁদের প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত জিনিসপত্র সঙ্গে নিতে বলেন। অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করি, তাঁদের কেউ আর কর্মস্থলে ফিরে আসেন না।
বিষয়টি আমার কাছে খুবই রহস্যজনক মনে হয়। একদিন এক সিনিয়রের কাছে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলাম। এই প্রথম ‘লে-অফ’ মানে চাকরি নেই—এ রকম একটি দৃশ্য স্বচক্ষে অবলোকন করলাম। এর পর থেকে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপক আর তাঁর সঙ্গীদের দেখলেই আমার হৃৎকম্পন শুরু হয়ে যায়। বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করি, আমার সহকর্মীদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে তেমন উৎকণ্ঠা নেই। একটি চাকরি মানে বেঁচে থাকার অবলম্বন। বিদেশবিভূঁইয়ে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। চাকরি না থাকলে শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাব! বিনা ভাড়ায় নিজের বাড়িতে থেকে জমির ফলানো ফসলে কিছুদিন জীবনটা কাটিয়ে দেব! প্রবাসজীবনে এমন করে ভাবনার কোনো অবকাশ নেই।
এমন সাত–পাঁচ ভাবতে ভাবতে চরম এক অস্থিরতা আমায় ভর করে। এভাবে প্রায় তিন মাস কেটে যায়। সাতসকালে বের হলে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরি। একদিন লাঞ্চ ব্রেকের ঠিক মিনিট দশেক আগে, পাকিস্তানি বন্ধু প্রকৌশলী আরাফাত আর আমি পাশাপাশি কাজ করছি। ঠিক সেই মুহূর্তেই আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেন হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজার ডায়ানা আর তাঁর সহযোগী শেলি হাড়িস। সাদা ধবধবে চেহারায় কেমন যেন গম্ভীরতার ছাপ। সদা হাস্যোজ্জ্বল এই মানুষ দুটির বদলে যাওয়া চেহারা দেখে আমার খুব উদ্ভট লাগে। কাছে এসেই আরাফাতকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ব্যক্তিগত জিনিসপত্র গুছিয়ে দ্রুত তাঁদের ফলো করার নির্দেশ দেন। পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে চটপটে আরাফাতকে কিছুটা অগোছালো আর অস্থির লাগে। হিউম্যান রিসোর্সের সহকারী শেলি, আরাফাতের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র গোছানোর কাজে সহযোগিতা করেন। সবকিছুই এতই দ্রুত হচ্ছিল, আমি কয়েক সেকেন্ডের জন্যও আরাফাতের সঙ্গে কোনো কথা বলার সুযোগ পাইনি। না, সেদিন আরাফাত আর ডেস্কে ফিরে আসেননি। মানে ‘লে-অফ’ নামক ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পাকিস্তানের মেধাবী প্রকৌশলীটি তাঁর জীবনজীবিকার অর্জনকে নিমেষেই হারিয়ে ফেলেন।
আরাফাত আমার মতোই পাকিস্তান থেকে আসা নতুন অভিবাসী। দেশে সম্মানজনক সরকারী প্রকৌশলীর চাকরি ছেড়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুন্দর জীবনের প্রত্যাশায় কানাডার অভিবাসী হয়েছেন। সেদিন লাঞ্চ বিরতির পর থেকে আরাফাতকে ছাড়াই একা একা আমাকে কাজ করতে হয়েছে। তবে সময়টা ছিল নিদারুণ কষ্ট আর অস্বস্তির। সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরে আরাফাতকে ফোন করি। কথোপকথনে বুঝতে পারি, জীবনে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন তিনি আর কখনো হননি। চাকরি শুরুর কয়েক মাসের মধ্যেই চাকরি চলে যাবে, এমনটি তাঁর ভাবনার বাইরে ছিল। বিষণ্ন আরাফাতকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষাও সেদিন আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম। সব শেষে তিনি আমাকে বলেছিলেন, চাকরি চলে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই কাজে যেয়ো। তাহলে কাগজটি হাতে পেলে কষ্টের মাত্রাটি কম হবে। পরের দুই দিন উইকেন্ড মানে শনিবার, রোববার ছুটির দিন। ছুটি হলেও হৃদ্যন্ত্রের তোলপাড় থেমে নেই। অনিশ্চয়তা আর দুর্ভাবনায় দুটি দিন কেটে যায়।
নতুন অভিবাসী, গাড়ি নেই। সহকর্মী জিম প্রতিদিন সকাল–সন্ধ্যা লিফট দেন। হাই, হ্যালো ছাড়া তেমন কথা হয় না। আমার বাসা থেকে কর্মস্থলের দূরত্ব সাত মিনিটের ড্রাইভ। সকালে ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে জিমের গাড়ি চড়ে কাজে যাই। তাই তেমন কথা হয় না। আমার সঙ্গে তাঁর তেমন জানাশোনা না থাকলেও প্রতিদিন ড্রপ অফ আর পিকআপ করতে তাঁর মধ্যে কোনো অস্বস্তি দেখিনি। বিষয়টি মাঝেমধ্যে আমাকে দারুণ বিস্মিত করে। দুই দিন থেকে আরাফাতের বিষয়টি আমাকে বেশ দুশ্চিন্তায় ফেলে। তাই আগবাড়িয়ে সোমবার সকালে গাড়িতে উঠেই জিমের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করি। আমি বিষয়টিকে যতটা সিরিয়াসলি দেখছি, জিমের কাছে বিষয়টি যেন পান্তা ভাত। ‘নরটেল তাঁর জীবনের ২৭ নম্বর চাকরি’—এটিই নাকি কানাডিয়ান চাকরিজীবনের বৈচিত্র্য। আমাকে অভয় দিয়ে বলেন, ‘দ্রুতই তুমি এ বৈচিত্র্যময় জীবনে নিজেকে মানিয়ে নেবে।’
এ দেশে কিনে নেওয়া শ্রমঘণ্টায় আড্ডাবাজি আর গল্পগুজবের সুযোগ নেই। ওয়াশরুমে যাওয়া, আর নিতান্ত ইমারজেন্সি ছাড়া প্রতিটি মিনিট কাজ করেই কাটাতে হয়। তবে চার ঘণ্টা পর ব্রেকের সময়টি নিতান্তই নিজস্ব। ৮টা থেকে ১২টা, ৪ ঘণ্টা পরে আধা ঘণ্টার বিরতিটি বেশ ভালোই লাগে। প্রতিদিনের মতো আজও বিরতি শেষে কেবল কাজে ফিরেছি। মিনিট দশেক পরেই সাক্ষাৎ জম আর তাঁর সহযোগী আমার সামনে হাজির। তল্পিতল্পা গুটিয়ে তাঁদের অনুসরণ করার নির্দেশ। কিছুদিনের ঘটনাবলি দেখে কী হতে যাচ্ছে, তা বুঝতে আর বাকি থাকে না। তাই বিষণ্ন মনে তাঁদের অনুসরণ করা ছাড়া আর কি উপায় আছে?
মিনিট দুই–এক হেঁটেই পৌঁছে যাই হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজার ডায়নার কক্ষে। ভাবগম্ভীর পরিবেশে একটি ফাইল টেনে নিয়ে কিছু কাগজপত্র বের করলেন। ‘You are very dedicated, hard working, intelligent & well disciplined.’ এমন নানা রকম প্রশংসাবাক্যের মধ্য দিয়ে একটি পত্র পাঠ শুরু করলেন। কয়েকটি বাক্য শুনে মনে হচ্ছিল, তিনি কোনো পদোন্নতিপত্র পাঠ করছেন। না, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ঘোর কেটে যায়। ‘Nortel proudly recognizes your hard work but unfortunately the company is not in a position to continue your job from’!! এভাবেই ভদ্রোচিত বিদায়বাণীর মধ্য দিয়েই প্রবাসে আমার চাকরিজীবনের অবসান ঘটে। অভিবাসী জীবনে প্রথম লে-অফের স্বাদ পাই। তবুও ভালো, সেটি ফায়ার নয়, ছিল টার্মিনেশন অব কনট্র্যাক্ট!
লেখক: কলামিস্ট ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক