তথ্যের সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা: বাংলাদেশের জন্য কি ‘ফেডারেটেড লার্নিং’ নতুন দিগন্ত

ফারজানা ইয়াসমিন ট্রাস্টওয়ার্দি এআই গবেষক। ফেডারেটেড লার্নিং, ব্যাখ্যাযোগ্য এআই এবং অ্যালগরিদমিক ন্যায্যতা, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য তিন পর্বের প্রথম পর্ব পড়ুন আজ

ফাইল ছবি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আজ চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লবের প্রতিশব্দ। ক্যানসার শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে নতুন ওষুধ আবিষ্কার—সবখানেই এআইয়ের জয়জয়কার। কিন্তু এই সাফল্যের মূল জ্বালানি হলো ‘ডেটা’, অসংখ্য রোগীর গোপনীয় চিকিৎসা তথ্য। এখানেই তৈরি হয় এক মহাসংকট: উন্নত এআই মডেল তৈরির জন্য হাসপাতালগুলোর মধ্যে ডেটা শেয়ার করা দরকার, কিন্তু একই সঙ্গে রোগীর তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়াও অপরিহার্য। বাংলাদেশের পটভূমিতে, যেখানে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও ডেটা সুরক্ষা আইন এখনো বিকশিত হচ্ছে, সেখানে এ সংকট আরও তীব্র।

এই দুষ্টচক্রের একটি সম্ভাবনাময় সমাধান হচ্ছে ‘ফেডারেটেড লার্নিং’ (Federated Learning)। এই পদ্ধতিতে, ঢাকা মেডিকেল, সিএমএইচ, কিংবা বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিটি হাসপাতাল তাদের রোগীর মূল্যবান তথ্য নিজেদের সার্ভার থেকে বের না করে, শুধু এআই মডেলটির ‘শিক্ষালাভের সারাংশ’ (অর্থাৎ কী শিখল) একটি কেন্দ্রীয় সার্ভারে পাঠায়। সার্ভারটি সব হাসপাতালের পাঠানো ‘শিক্ষা’ একত্র করে একটি শক্তিশালী, সম্মিলিত মডেল তৈরি করে এবং সেটি আবার সবার কাছে ফেরত দেয়। ফলে রোগীর গোপনীয় তথ্য কখনোই তার হাসপাতালের বাইরে যায় না; শুধু যায় মডেলের জ্ঞান।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আরও পড়ুন

আমি বর্তমানে ‘মেডএইচই’ (MedHE) নামের একটি গবেষণা প্রকল্পে কাজ করছি, যা এই ধারণাকে আরও নিরাপদ ও কার্যকর করে তোলে। এতে ফেডারেটেড লার্নিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘হোমোমরফিক এনক্রিপশন’ নামের আরেকটি শক্তিশালী প্রযুক্তি। সহজ ভাষায়, এটি এমন একটি পদ্ধতি যেখানে ডাটা এনক্রিপ্ট করা বা ‘তালাবদ্ধ’ অবস্থায়ও এআই মডেল তার ওপর গণনা চালাতে পারে। অর্থাৎ হাসপাতালগুলো তাদের পাঠানো ‘শিক্ষার সারাংশটিকেও’ এমনভাবে তালাবদ্ধ করে পাঠায় যে কেন্দ্রীয় সার্ভার তথ্যগুলো পড়তে না পারলেও সেগুলো দিয়ে মডেলটিকে আরও বুদ্ধিমান বানাতে পারে। এই দুই স্তরের সুরক্ষা (ডেটা স্থানীয় রাখা এবং এনক্রিপ্ট করা তথ্য আদান-প্রদান) রোগীর গোপনীয়তা রক্ষায় একটি দুর্গ তৈরি করে।

বাংলাদেশের জন্য এই প্রযুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। প্রথমত, এটি আমাদের ‘ডেটা সার্বভৌমত্ব’ (Data Sovereignty) রক্ষা করে। দেশের অতি সংবেদনশীল স্বাস্থ্য ডেটা বিদেশি কোনো ক্লাউড সার্ভারে জমা না রাখার বিষয়ে আমাদের আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, এটি ছোট ও বড় সব হাসপাতালের মধ্যে সহযোগিতার দরজা খুলে দেবে। একটি জেলা হাসপাতালও তার সীমিত ডেটা নিয়ে জাতীয় স্তরের একটি অত্যাধুনিক এআই মডেল তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারবে, যা শেষ পর্যন্ত সেখানকার রোগীদের জন্য উন্নত সেবা নিয়ে আসবে।

ফারজানা ইয়াসমিন
ছবি: লেখকের পাঠানো

তবে চ্যালেঞ্জও আছে। এই প্রযুক্তির জন্য দরকার দ্রুত ইন্টারনেট এবং কারিগরি দক্ষতা। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে দেশের মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালগুলোতে এই অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং স্বাস্থ্যকর্মী ও আইটি পেশাদারদের প্রশিক্ষণ দেওয়াই হবে আগামীর বড় কাজ। প্রযুক্তির এই নতুন দিগন্তে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিতে হলে, গোপনীয়তা আর উদ্ভাবনের মেলবন্ধন ঘটাতেই হবে। ফেডারেটেড লার্নিং তারই একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।

**আগামীকাল পড়ুন: এআই কি চিকিৎসকের জায়গা নেবে? ব্যাখ্যাযোগ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আস্থার সংকট

*লেখক: ফারজানা ইয়াসমিন, ট্রাস্টওয়ার্দি এআই গবেষক, মেশিন লার্নিং বিজ্ঞানী ও ২১তম আন্তর্জাতিক সিআইবিবি কনফারেন্সের (২০২৬) প্রোগ্রাম কমিটির সদস্য। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টালসা থেকে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। গবেষণা সম্পর্কে জানতে ভিজিট করুন: https://farjana-yesmin.github.io