স্বাস্থ্যসেবায় এআই: বাংলাদেশি গবেষকের প্রযুক্তি ও মানবকল্যাণের সেতুবন্ধ

লেখক

সাতক্ষীরার ব্যস্ত রাস্তায় বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে আমি খুব কাছ থেকে স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির কঠিন বাস্তবতা দেখেছি। গ্রামীণ ক্লিনিকগুলোতে রোগীদের দীর্ঘ সারি, ডেঙ্গুর মৌসুমি আতঙ্ক, আর সঠিক সময়ে চিকিৎসা পরামর্শ পেতে সাধারণ মানুষের সংগ্রাম—এসবই আমার স্মৃতিতে গেঁথে আছে। এই অভিজ্ঞতাগুলোই পরবর্তীকালে আমাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) নিয়ে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। আমার লক্ষ্য ছিল, সীমিত সম্পদের এই জনপদে কীভাবে এআই-এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার রূপান্তর ঘটানো যায়।

বর্তমানে একজন স্বাধীন গবেষক ও মেশিন লার্নিং বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমার গবেষণার মূল প্রশ্ন একটিই: আমরা কীভাবে এআই-কে চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটি নির্ভরযোগ্য, বৈষম্যহীন এবং সহজলভ্য সহযোগী হিসেবে গড়ে তুলতে পারি?

যশোর থেকে বৈশ্বিক গবেষণাগার: শিকড় থেকে শিখরে—

আমার উচ্চশিক্ষার হাতেখড়ি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলাদেশের উদীয়মান প্রযুক্তির আবহে গড়ে ওঠা সেই ভিত্তিই আমাকে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চতর গবেষণার সুযোগ করে দেয়। সেখানে আমি ‘মাল্টিমোডাল ডিপ লার্নিং’ নিয়ে কাজ করি—যার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের হৃৎস্পন্দন (Bio-signals), ছবি এবং টেক্সট বিশ্লেষণ করে রোগ নির্ণয়ের নিখুঁত পূর্বাভাস দেওয়া।

তবে বিদেশে থাকলেও আমার ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে সব সময় ছিল বাংলাদেশ। আমাদের দেশের স্বাস্থ্য খাতের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার জন্য ‘ট্রাস্টওয়ার্দি’ বা বিশ্বাসযোগ্য এবং ব্যাখ্যাযোগ্য এআই পদ্ধতি তৈরি করাকেই আমি আমার পেশাদার জীবনের মিশন হিসেবে গ্রহণ করেছি।

বাংলাদেশের জন্য উদ্ভাবন: ডেঙ্গু ও স্বাস্থ্য বুলেটিন বিশ্লেষণ—

আমার গবেষণার অন্যতম একটি ফলিত দিক হলো—‘ডেঙ্গু লক্ষণ ট্রায়েজের জন্য এআই চ্যাটবট।’ যশোরে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি এই সিস্টেমটি তৈরি করেছি। এটি বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় তাৎক্ষণিক লক্ষণের ওপর ভিত্তি করে পরামর্শ দিতে পারে। যেসব প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব রয়েছে, সেখানে এই চ্যাটবটটি প্রাথমিক নির্দেশিকা দিয়ে অসংখ্য প্রাণ বাঁচাতে সহায়ক হতে পারে।

কেবল তাৎক্ষণিক সংকট নয়, দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নেও ডেটা সায়েন্সের গুরুত্ব অপরিসীম। আমি ও আমার সহকর্মীরা বাংলাদেশের ২০১৯ এবং ২০২৩ সালের স্বাস্থ্য বুলেটিনের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছি। মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে মাতৃস্বাস্থ্য এবং টিকাদানের মতো জাতীয় তথ্যের গভীরে গিয়ে আমরা এমন কিছু প্রবণতা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি, যা ভবিষ্যতে স্মার্ট জনস্বাস্থ্য নীতি তৈরিতে নীতিনির্ধারকদের সাহায্য করবে।

নির্ভরযোগ্য এআই: নৈতিকতা ও নিরাপত্তার সমন্বয়—

প্রযুক্তি তখনই সার্থক হয়, যখন মানুষ তা নির্ভয়ে গ্রহণ করতে পারে। আমার গবেষণার তিনটি প্রধান স্তম্ভ হলো:

১. বৈষম্যহীন এআই (Fairness-aware AI): চিকিৎসাক্ষেত্রে এআই যেন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা লিঙ্গের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ না করে, তা নিশ্চিত করতে আমি কাজ করছি।

২. গোপনীয়তা রক্ষা (Privacy-preserving Collaboration): ‘MedHE’ ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে আমি এমন এক পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছি, যেখানে হাসপাতালগুলো রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার না করেই সম্মিলিতভাবে শক্তিশালী রোগনির্ণয় মডেল তৈরি করতে পারবে। এটি ঢাকা বা চট্টগ্রামের হাসপাতালের তথ্য শেয়ার না করেও জ্ঞান ভাগাভাগির এক নিরাপদ মাধ্যম।

৩. ব্যাখ্যাযোগ্য এআই (Explainable AI): একটি কম্পিউটার কেন নির্দিষ্ট কোনো রোগের কথা বলছে, তার কারণ যদি চিকিৎসকের কাছে স্পষ্ট না থাকে, তবে তিনি তা প্রয়োগ করতে দ্বিধা করবেন। আমি এআই-কে ‘ব্ল্যাক বক্স’ থেকে বের করে স্বচ্ছ ও ব্যাখ্যাযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করছি।

আগামীর আহ্বান: একটি দেশীয় এআই নীতিমালার স্বপ্ন

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আরও পড়ুন

একজন স্বাধীন গবেষক হিসেবে আমি সব সময় চেষ্টা করেছি বৈশ্বিক বিজ্ঞানের মঞ্চে বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরতে। বাংলাদেশের তরুণ প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীদের প্রতি আমার আহ্বান—আপনারা শুধু অ্যালগরিদম তৈরি করবেন না, বরং এমন এক প্রযুক্তি সংস্কৃতি গড়ে তুলুন যেখানে নৈতিকতা, গোপনীয়তা এবং স্বচ্ছতা অগ্রাধিকার পায়।

আমি বিশ্বাস করি, এআই আমাদের জন্য কেবল একটি দূরবর্তী প্রযুক্তি নয়; বরং এটি হতে পারে আমাদের স্বাস্থ্য ও ক্ষমতায়নের এক বিশ্বস্ত হাতিয়ার। আমাদের দেশের মাটির ঘ্রাণ আর মানুষের লড়াইয়ের গল্পগুলো যেন আমাদের প্রতিটি উদ্ভাবনের লাইনে মিশে থাকে।

লেখক: ফারজানা ইয়াসমিন মেশিন লার্নিং বিজ্ঞানী, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ টালসা থেকে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। গবেষণা সম্পর্কে আরও জানতে ভিজিট করুন